আমাদের পথ: জিয়াউর রহমান বীর উত্তম

আমাদের পথ: জিয়াউর রহমান বীর উত্তম

আজ ৩০ মে জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ৩৫-তম শাহাদত বার্ষিকি। এই দিনে উনার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আমাদের দেশের এই মহান নেতা একদিকে যেমন ছিলেন একজন দক্ষ সমরনায়ক অপরদিকে ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। দীপ্তিমান এই ব্যাক্তিত্বের আরো কিছু গুন ছিলো, এর মধ্যে একটি হলো – তিনি খুব সুন্দর প্রবন্ধ লিখতেন, এরকম একটি বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম ‘একটি জাতির জন্ম’। এইসব প্রবন্ধগুলোতে উনার গভীর চিন্তাশীলতার ছাপ পাওয়া যায়। ছাপ পাওয়া উনার প্রিয় মাতৃভূমী বাংলাদেশের প্রতি উনার গভীর মমত্ববোধের, সেই সাথে পরিচয় পাওয়া দেশের রাজনীতি সম্পর্কে উনার স্বচ্ছ ধারণার ও সুদূরপ্রসারী দর্শনের। আজ আমি উনার লিখিত একটি প্রবন্ধ হুবুহু তুলে দিচ্ছি সাথে থাকছে আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানে কিছু বিশ্লেষণ। প্রবন্ধটির নাম ‘আমাদের পথ’

আমাদের পথ
———— জিয়াউর রহমান

মানুষের কর্ম, চিন্তাভাবনা, রাজনীতি – এসব কিছুই নির্ণিত ও পরিচালিত হয় একটা বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তিতে এ জীবন দর্শনের তারতম্যও ঘটতে পারে। তাই কোন মানুষের রাজনীতি ভীতির উদ্রেক করলেও সব সময় তা বিপজ্জনক নাও হতে পারে। বস্তুত কোন কিছুকে অবলম্বন না করে কোন রাজনীতি কোন দর্শনের উন্মেষ এবং বিকাশ ঘটতে পারেনা।

উদাহরণ স্বরূপ মার্কস-ইজমের কথা বলা যেতে পারে। যদি আমরা মার্কস-ইজম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করি তাহলে দেখা যাবে এর একটা আদর্শ এবং লক্ষ্য আছে। এ আদর্শ ও লক্ষ্য ভিত্তি করেই রাশিয়ায় মার্কসইজম কায়েম হয়েছিল। এ কথা আজ বিনা দ্বিধায় বলা যেতে পারে, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় মার্কসইজমের প্রভাব না ঘটলে হয়তো রুশ জাতি এতোটা উন্নত অবস্থায় উপনীত হতে পারতো না। হয়তো বা সেখানকার সাধারণ মানুষের অবস্থার আরো অবনতি ঘটতো।

এই যে আমরা সবাই রাতের বেলায় আলো জ্বালাই এর পেছনেও যুক্তি আছে, ভিত্তি আছে। রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার পেছনেও রয়েছে একটা ভিত্তি। এ ভিত্তিটা কি? অপরাপর বিরোধী রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক দর্শনেকে যথার্থভাবে যুক্তি ও কর্মসূচীসহ মোকাবেলা করে স্বীয় জীবনবোধের আলোকে সমাজ ও জাতিকে গড়ে তোলা এবং কখনও কখনও পথভ্রষ্ট স্বেচ্ছাচারের কাছ থেকে বাঁচার তাগিদই হচ্ছে একটি রাজনৈতিক মতের পতাকাতলে সমবেত হবার মৌল কারণ। এর অর্থ এই দাঁড়াচ্ছে যে – রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বাস মানুষের একটি সুষ্ঠু সুন্দর চেতনাবোধ।

“বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে আমি কিছু বলতে চাই। উপমহাদেশের এবং এ অঞ্চলের মানচিত্রের দিকে তাকালে এটা স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ভৌগলিক অবস্থানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ একটা গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের সঙ্গে তুরষ্ক-মিশর-মরক্কো ও স্পেনের ভৌগলিক অবস্থানের সাদৃশ্য রয়েছে। বাংলাদেশ উপমহাদেশে ও এ অঞ্চলের সামরিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। এর উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বত আর দক্ষিণে সুগভীর বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার যোগসূত্র স্থাপন করে রেখেছে বাংলাদেশ তার আপন ভূখন্ডের বৈচিত্র দিয়ে। তাই বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটিতে অতীতে অনেক উত্থান-পতন ঘটে গেছে। হাজার হাজার বছরের পট পরিবর্তনের ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে আছে বাংলাদেশ।

এখানে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইংরেজ জাতি এ অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ কায়েমের প্রাথমিক ক্ষেত্র হিসাবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিলো কেন? উপমহাদেশের অন্য যেকোন স্থান তারা প্রথম দখল করতে চাইলে হয়তো পারতো। কিন্তু . বাংলাদেশকে. তারা এ’জন্য বেছে নিয়েছিলো যে, এখান থেকে আন্তর্জাতিক চলাচলে সুবিধা হবে। বাংলদেশের যে ভৌগলিক অবস্থান ও আকার তাতে এখান থেকে পশ্চিমে ও পূর্বদিকে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করাও সুবিধাজনক বলে ইংরেজগণ এ দেশেকে প্রথমে বেছে নিয়েছিলো। সুচতুর ইংরেজরা এ’ পরিকল্পনা এতটা নির্ভুলভাবে করেছিলো যে পর্যায়ক্রমিকভাবে তারা গোটা ভারতবর্ষ এবং ব্রহ্মদেশ দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিলো। এ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ছিলো এক বিরাট স্ট্রাটেজিক অবস্থানে এবং বলা বাহুল্য যে সেই অবস্থান আজও গুরুত্বপূর্ণই রয়ে গেছে। এ কারণেও বাংলাদেশের ভূখন্ড ও বঙ্গোপসাগরের জলরাশির উপর এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এবং পরাশক্তিগুলোর অশুভ দৃষ্টি রয়েছে। যা আমাদের জন্যে মারাত্মক হুমকী স্বরূপ। আমাদের প্রতি হুমকী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আধিপত্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারনবাদ। কাজেই বাংলাদেশের নয় কোটি মানুষের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে এবং এই আধিপত্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারনবাদ সমূহের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্যে আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করতে হবে। আমাদের কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি হলো জাতীয়তাবাদী চেতনা। কারণ জাতীয়তাবাদী চেতনাই দেশকে ও জাতিকে বহিঃশক্তির হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ যখনই হুমকির সম্মুখীন হয়েছে তখনই জাতীয়তাবাদী চেতনার পথ অবলম্বন করেছে। জার্মানীর হিটলারও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু ছিলোনা। তারা ‘জার্মান’-‘এরিয়ান’ জাতীয়তাবাদের ছত্রছায়ায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলো। পঞ্চাশের দশকে জাতীয়তাবাদের ছত্রচ্ছায়ায় সমগ্র আরব জাহানে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা চলছিল। মিশরের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এতে কিছুটা সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার সুফলও তারা পেয়েছেন। জাতীয়তাবাদী চেতনার ঝড় আজ প্রবাহিত হয়ে চলেছে কালো আফ্রিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। বিদেশীদের দ্বারা শোষিত, লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়ে আজ তারা আফ্রিকান জাতীয়তাবাদের আদর্শ গ্রহণ করেছে। ফলে তাদের মধ্যে একতার সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয়তাবাদের আবার রকমফের আছে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে কার্যকর হয়েছে। আরব জাতীয়তাবাদ, জার্মান জাতীয়তাবাদ, এরিয়ান জাতীয়তাবাদ হলো ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। কেউ ভাষা ভিত্তিক আবার কেউ ধর্ম ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের সমর্থক।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স আঞ্চলিক মাতবাদ গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। আসিয়ান-এর ভিত্তিতে তাদের এ আঞ্চলিক মতাদর্শ পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে অর্থনীতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে ইইসি। এটিকে আমরা যুদ্ধভিত্তিক জাতীয়তাবাদও বলতে পারি। কিন্তু আমাদের জাতীয়তাবাদ এদের চেয়ে পৃথক। আমরা খন্ডিত চেতনায় বিশ্বাসী নই। তাই আমাদের জাতীয়তাবাদ হলো সার্বিক ভিত্তিক। এ জাতীয়তাবাদের মধ্যে রয়েছে জাতিগত চেতনা, ভাষার ঐতিহ্য, ধর্মীয় অধিকার, আঞ্চলিক বোধ, অর্থনৈতিক স্বাধিকার অর্জনের প্রচেষ্টা এবং সংগ্রামের উন্মাদনা।

অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এসেছে। অকারণ এ দাবি নয়। বিশ্বের অপরাপর দেশের নেতৃবৃন্দ রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশে আগের তুলনায় অনেক পরিমাণে স্থিতিশীলতা এসেছে। এ স্থিতিশীলতা, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’-এর যে পন্থায় আমরা গড়ে তুলতে চাচ্ছি তারই ফলশ্রুতি।

বিশ্বে আর যাই থাকুক মতাদর্শের অভাব অন্ততঃ নেই। মার্কসইজম, লেনিনইজম, মাওইজম, ক্যাপিটালইজম ইত্যাদি বহু ধরনের ইজমের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের উৎকর্ষ এত দ্রুততার সঙ্গে ঘটে চলেছে যার ফলে এসব ইজম তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এসব মতাদর্শের স্রষ্টাদের মানসিক এলাকা থেকে বিজ্ঞান বর্তমান পরিবেশকে বহু দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কাজেই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে এসব মতাদর্শের প্রয়োজীয় সংশোধন এবং সংযোজন। কিন্তু একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া এক্ষেত্রে আছে। কেন আমরা এসব মতাদর্শের রদবদল ঘটাবো? সমাজতান্ত্রিক দেশে মার্কসীয় দর্শন পুরোপুরিভাবে রূপ পরিগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছে না। রেজিমেন্টেশনের জাতাকলে পড়ে হিউম্যান এনার্জি স্থবির হয়ে রয়েছে। এদের কাছে বিজ্ঞান ও কারিগরি সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। একটা মানুষকে তার ইচ্ছা ও পছন্দ মতো বিষয়ে গড়ার অধিকার দিতে হবে। তবেই না তার প্রতিভার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে ঘটতে পারে। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের যেসব দেশে রেজিমেন্টেশন চরমভাবে বিদ্যমান সেখানে প্রতিভার বিকাশ স্বাভাবিকভাবে ঘটতে পারছে না।

এ সত্য উপলদ্ধি করে গণচীন আজ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্ব দুয়ার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে চীনে সংঘটিত ব্যাপক ধরনের এ রদবদলকে প্রত্যক্ষ ভাবে দেখার করার সুযোগ আমার হয়েছিল। ১৯৭৭ সালের প্রথম দিকে চীনদেশে যে অবস্থা দেখেছিলাম তার থেকে আজকের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কিন্তু সব সমাজতান্ত্রিক দেশ এখন মারাত্মক স্ববিরোধিতায় ভুগছে। আমাদের সামনে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের স্ববিরোধিতামূলক তিক্ত পরিবেশের চিত্র রয়েছে। কাজেই যে মতাদর্শে গলদ রয়েছে তা আমরা গ্রহণ করবো কেন? যে জিনিস আমাদের পুরোপুরি কাজে লাগে না তা গ্রহণ করে কি লাভ?

আমাদের সামনে বর্তমানে লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো দেশ ও জাতি গঠন। দু’শত বছর পরধীন থাকার ফলে দেশ ও জাতির অনেক ক্ষতি হয়েছে, সময়ও নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আমাদের প্রয়োজন অবিলম্বে জনশক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা। তবে কথা থেকে যায়, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা হবে কিভাবে? একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে? নিশ্চয়ই নয়। ‘ওয়ান পর্টি সিস্টেম’ এবং ‘রেজিমেন্টেশন এনফোর্স’ করে যে সাফল্য অর্জন করা যায় না, নিকট অতীত তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশের জনগোষ্ঠিকে একটা পথে পরিচালিত করাই সর্বোত্তম পথ বলে আমি মনে করি। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাল খনন-এর কর্মসূচিতে সাড়া দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে রেজিমেন্টেশনের মাধ্যমে যে কাজ হতো সে কাজ আমরা জনগণের স্বেচ্ছা অংশগ্রহণের ভিত্তিতে করিয়ে নিচ্ছি। এখানেই আমাদের দর্শনের সাফল্য।

অপ্রিয় হলেও একটা সত্য কথা বলতে চাই। তা হলো, চারিত্রিক বলিষ্ঠতা অর্জনের প্রসঙ্গটি। আমাদের যে চরিত্রগত দিক রয়েছে তা ভালো নয়। আমাদের গলদ, আমরা নিজেরা যা পছন্দ করি না তা অপরকে করতে বলি। “আতা মারুনা আননাশা বিল বারবে ওয়া কনমুনা আন ফুসাকুম” – অর্থাৎ তুমি নিজে যেটা করো না তা অন্যকে করতে বলো কেন? এ ব্যাপারে সবাই সংযত বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আমরা আরো দ্রুতগতিতে অগ্রগতির পথে চলতে পারবো।

এ দেশের মানুষ কোনোদিন ভালো কিছু পায়নি। সব সময় পেয়েছে দুঃখ, নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার আর এক্সপ্লয়েটেশন। একই সঙ্গে দেশের সর্বত্র বিরাজ করছে পাহাড়-পর্বতের মতো সমস্যা। সবচেয়ে বড় সমস্যা জনসংখ্যা বিস্ফোরণ। গত বছরের আগের বছর হাভানায় গিয়েছিলাম। ফিডেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে আলোচনার এক পর্যায়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা কতো, এমন প্রশ্নের উত্তরে সাড়ে আট কোটি জানালে তিনি মাথায় হাত দিয়ে জিভ কেটে বললেন – “এটা চালাও কিভাবে?”

আদর্শ ভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে না উঠলে জগদ্দল পাথরের মতো সমস্যাবলির সমাধান করা সম্ভব নয়। সেই দুরূহ কাজে আট কোটি মানুষের হাতকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশ গড়ার কাজে লাগাতে হবে।

(তথ্যসূত্র: একজন জিয়া – হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ)

প্রবন্ধটি খুব সম্ভবত ১৯৮১ সালে লেখা কারণ প্রেসিডেন্ট জিয়া ১৯৭৯ সালে হাভানা (কিউবা) সফর করেছিলেন। (Bangladesh president Ziaur Rahman became the first Bangladeshi head of state to pay an official visit to Havana in 1979. )

আমার বিশ্লেষণ:

জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের এই প্রবন্ধ ছিলো অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা। বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে সংঘটিত ঘটনাবলীতে উনার এই প্রবন্ধে উল্লেখ্য অনেক কিছুরই প্রতিফলন রয়েছে। এবার আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এই প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করতে চাই।

প্রথম অনুচ্ছেদ-এ তিনি লিখেছেন ‘বিশ্বাস’ সম্পর্কে। সেই সৃষ্টিলগ্ন থেকে মানুষের মনের এই বিশেষ অবস্থাটি পুরাণ, দর্শন, ধর্ম ও বিজ্ঞান সহ জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মানুষের কর্ম, চিন্তাভাবনা, চারপাশে সংঘটিত সামাজিক ও প্রাকৃতিক ঘটনাবলী, সামাজিক-রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে মানব মনে জন্ম নেয় এই বিশ্বাস, আবার এই বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই নির্ণিত ও পরিচালিত হয় মানুষের পরবর্তি কর্ম, চিন্তাভাবনা, রাজনীতি ইত্যাদি; লেখক তাই আমাদের দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে বিশ্বাসের গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনি এও বলতে চেয়েছিলেন যে, ব্যাক্তি থেকে ব্যাক্তিতে এই বিশ্বাস-এর তারতম্যও ঘটতে পারে। কেউ এক ধরণের বিশ্বাস-এর উপর আস্থা রাখে তো অপরে ভিন্নরকম এমনকি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী বিশ্বাস-এ আস্থাবান হতে পারে। আমার বিবেচনায় অপরের বিশ্বাস ভীতিকর মনে হলেও হতে পারে, তবে তা কেবলই আমার জানা-বোঝার ভিত্তিতে বিবেচিত, কিন্তু আমার এই জানা-বোঝার পরিসর বৃদ্ধি করলে অথবা মানব-ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তা বিপজ্জনক নয়; উদাহরণ স্বরূপ আমি বলতে পারি যে মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-এর ‘বিশ্বাস’-কে সেই সময়ের শাসক চক্র ভীতিকর মনে করেছিলো যার ফল হিসাবে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছিলো মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-কে, আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বারংবার তিনি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, উনার প্রচারিত ‘বিশ্বাস’ সঠিক ও মঙ্গলময়, যা শাসকচক্র ও বিচারকদের বোধগম্য হয়নি, কিন্তু পরবর্তি জমানায় সক্রেটিস-এর ‘বিশ্বাস’-কেই স্বাগত জানানো হয়েছিলো। বস্তুত যেকোন সমাজসংস্কারকই তার সময়কার অধিরাজ-অধিকর্তাদের রোষের স্বীকার হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তিতে তাদের সংস্কারমূলক চিন্তাভাবনাই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো।

একই অনুচ্ছেদ-এ তিনি মার্কসইজম-এর ইতিবাচকতা সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলেন, যার সাথে আজ আমি আর একমত নই। তবে মনে রাখতে হবে যে জিয়াউর রহমান বীর উত্তম যে সময়ে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তখনও মার্কসইজম বেইজড পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকে ছিলো। যেটি ছিলো একটি বদ্ধ রাষ্ট্র সেখানকার কোন সংবাদ বাইরে আসার সুযোগ ছিলোনা, এমনকি ঐ দেশের অভ্যন্তরে একটি শহরে ঘটে যাওয়া কোন দুর্ঘটনা (বা ঋণাত্মক ঘটনা)-র সংবাদ দেশের অন্য অংশে প্রচারিত হতোনা। তাই দেশটি সম্পর্কে সঠিক কোন চিত্র পাওয়া সম্ভব ছিলোনা। যে সংবাদ পাওয়া যেত তা ছিলো কেবলই দরবারী। ঐসব দরবারী সাজানো চিত্রের উপর ভিত্তি করে কোন মতামত দিলে তা নির্ভুল হওয়ার কথা না।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে তিনি রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বাস-কে মানুষের একটি সুষ্ঠু সুন্দর চেতনাবোধ বলে উল্লেখ করেছেন। আমার মনে আছে, উনার সময়ে রাজনীতিকে সুষ্ঠু সুন্দর চেতনাবোধ বলেই মানুষ মনে করতো। মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলো। অথচ জিয়ার শাহাদতের পরে স্বৈরাচারী হ. ম. এরশাদের শাসনামলে রাজনীতি এতটাই কলুষিত হয়ে পড়েছিলো যে জনতার অধিকাংশই রাজনীতিকে ঘৃণা করতে শুরু করে।

তৃতীয় অনুচ্ছেদে তিনি বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছিলেন। ‘বাংলাদেশ এ অঞ্চলের সামরিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে’ এই ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই আমাদের প্রতি শ্যেন-দৃষ্টি রয়েছে আধিপত্যবাদিদের; যার ফল হিসাবে আমাদের ইতিহাস উত্তাল।

চতুর্থ অনুচ্ছেদে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অল্প কথাতেই বিঝিয়ে দিয়েছেন। প্রথমত আমাদের দু’শো বছর শোষণ করে যাওয়া ইংরেজ একটি চতুর জাতি। দ্বিতীয়ত চতুর ইংরেজরা এই উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিলো কোন মহৎ অথবা সাদাসিধা উদ্দেশ্য নিয়েও নয়। প্রোটেস্টান্ট ইংরেজরা সম্প্রসারনবাদে বিশ্বাসী। তাদের দূরভিসন্ধি ছিলো সম্পদশালী এই অঞ্চলটিকে দখল করে যাবতীয় ধন-সম্পদ তাদের নিজ দেশে পাচার করা। তৃতীয়ত, যেহেতু বাংলাদেশ এতদঞ্চলের সামরিক-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাই এখান থেকেই তারা যাত্রা শুরু করে ও বাংলাকে কেন্দ্র করেই তাদের সামরিক-রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে, বাংলার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা পর্যায়ক্রমে তারা গোটা ভারতবর্ষ এবং ব্রহ্মদেশ দখল করে নেয়। চতুর্থত, পৃথিবীর ভৌগলিক মানচিত্র যেহেতু পাল্টায়নি তাই অতীতের মত এখনও বাংলাদেশের স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব রয়েই গেছে। পঞ্চমত, আঞ্চলিক ও পরাশক্তিদের অশুভ দৃষ্টি রয়ে গেছে বাংলাদেশের সম্পদশালী ভূখন্ডের ও বঙ্গোপসাগরের বিপুল জলরাশির উপর, যা আমাদের জন্য হুমকী স্বরূপ। ইতিহাস পর্যালোচনা করে বর্তমানকে বিচার করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো জিয়াউর রহমান বীর উত্তম-এর। ষষ্ঠত: ‘নয়া উপনিবেশবাদীদের অশুভ দৃষ্টি রয়েছে আমাদের প্রতি’, এই কথা বলে থেমে গেলেই হবেনা সাহসিকতার সাথে তার মোকাবেলাও করতে হবে। সপ্তমত, যেকোন অভিযান আরম্ভ করা ও পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ যা সমগ্র দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবে। অষ্টমত, জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এই মতাদর্শ সৃষ্টি করেন ও তার নাম দেন ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। তিনি মনে করেছিলেন এই চেতনাই দেশ ও জাতিকে বহিঃশক্তির হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারবে।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে তিনি বহিঃশত্রুর হুমকী থেকে বাঁচার জন্য জাতীয়তাবাদ যে একটি উত্তম পথ তার স্বপক্ষে বলেছেন। তবে পাশাপাশি জাতীয়তাবাদ যে ভাষাভিত্তিক, ধর্মভিত্তিক, বর্ণভিত্তিক, যুদ্ধভিত্তিক, মিশ্রিত ইত্যাদি নানান রকমের হয় সেটাও তিনি উদাহরণসহ উল্লেখ করেছেন।

সপ্তম অনুচ্ছেদে তিনি ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর মূল উপাদানগুলোর উল্লেখ করেছেন, আর তা হলো ১। ভাষা, ২। ধর্মীয় অধিকার, ৩। ভূখন্ডের বোধ, ৪। অর্থনৈতিক স্বাধিকার; একে তিনি সার্বিক ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বলেছেন। এই সার্বিকতাই সত্য, কারণ যিনি বাংলাদেশের নাগরিক তিনিই বাংলাদেশী, ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান যেই হোন না কেন, এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়টি একটি অসাম্প্রদায়ীক পরিচয়; আবার এথনিক পরিচয়ে তিনি বাঙালী-অবাঙালী যেই হোন না কেন তাঁর পরিচয় বাংলাদেশীই থাকছে, সেই হিসাবে এটি একটি অএথনিক পরিচয়; যা ডাইভার্সিটি-কে ছাপিয়ে ইউনিটি এনে দিচ্ছে।

আট নং অনুচ্ছেদে উনার শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা-র কথা বলেছেন। এবং এর মূল কারণ যে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ তা তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

নয় নং অনুচ্ছেদে তিনি মার্কসইজম-লেনিনইজম-মাওইজম এক কথায় বামপন্থী মতাদর্শের অসাড়তার কথা বলেছেন। তার কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি কর্তৃক পাল্টে দেয়া বিশ্বের কথা বলেছেন। আবার এইসব মতাদর্শ সংশোধন -সংযোজন করলে তা যে আর ঐ মতাদর্শ থাকছে না সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন। বামপন্থায় বিশ্বাসী দেশগুলো যে চলছে রেজিমেন্টেশনের আওতায় আর তা যে মুক্ত-স্বাধীন চিন্তার অধিকারী মানবজন্মেরই বিরোধিতা করছে এবং মানব মনের বিকাশকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে তা জিয়াউর রহমান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে তিনি আরও বলতে চেয়েছিলেন যে, বামপন্থী মতাদর্শ আর বেশিদিন টিকবে না।
এখানে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো এই যে, তিনি প্রবন্ধটি লিখেছিলেন ১৯৮১ সালে, তার ঠিক তিন বছর পর ১৯৮৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন মিখাইল সের্গেইভিচ গর্বাচভ। সেই সাথে দেশটিতে শুরু হয় পেরেস্ত্রোয়কা (পুনর্গঠন) নীতি। বছর তিনেক পরে ১৯৮৭ সালে গর্বাচভ একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন তার নাম ‘Perestroika: New Thinking for Our Country and the World’, সেখানে তিনি জিয়াউর রহমান-এর প্রবন্ধে উল্লেখিত ঐ বিষয়গুলিই বলেছিলেন। আর তার কয়েক বছর পর ১৯৯০ সালে পেরেস্ত্রোয়কা নীতিও টেকেনি, ভরাডুবি হয়েছিলো সমাজতন্ত্রের। এইসবকিছু অনেক আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান, এতটাই বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন তিনি।

দশম অনুচ্ছেদে তিনি গণচীন ও তার রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। চীনের কথা বিশেষভাবে বলতে হয় কেননা আমাদের প্রায়-প্রতিবেশী চীন একটি পরাশক্তি ও তার সাথে রয়েছে আমাদের কয়েক হাজার বছরের সম্পর্ক। এই দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনোই খারাপ ছিলোনা। ‘ওল্ড ফ্রেন্ড ইজ গোল্ড’ এই নীতি ধরে চীনের সাথে আমাদের চিরকালীন সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তবে ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কট্টরপন্থী কম্যুনিস্ট নেতা মাও সেতুং (Mao Zedong) জীবিত ছিলেন। মাও-এর মৃত্যুর পরপরই চীনে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতে শুরু করে। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারীতে জিয়াউর রহমান বীর উত্তম চীন সফর করেন, অর্থাৎ মাওবাদী চীনের দেহাবশেষ তিনি দেখতে পান, একই সাথে অনুভব করেন পরিবর্তনের ঢেউ। ১৯৮০ সালে জিয়া যখন আবার চীন সফর করেন তিনি সেখানে ব্যপক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন; উনার পর্যবেক্ষণ এই বলে যে সমাজতান্ত্রিক চীনে অসাড়তা নেমে এসেছিলো, মতাদর্শের পরিবর্তন যে চীনে সুদিন নিয়ে এসেছে তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন। স্ববিরোধিতায় ভোগা গলদওয়ালা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকে দূরে ঠেলে রাখাই যে ভালো তা তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। এবং সেই অনুযায়ী মুক্ত মানসিকতার মার্কিন ক্যাম্প বেছে নেন। আমার মনে আছে যে, উনার এই মনোভাবের কারণে তিনি তখন দেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও ছাত্রসমাজের দ্বারা ব্যপকভাবে সামালোচিত হয়েছিলেন। অথচ আজ আমরা সবাই এটা বুঝি যে সেদিন যদি তিনি সমাজতান্ত্রিক ক্যাম্প বেছে নিতেন তাহলে ওদের সাথে সাথে আমাদেরও ভরাডুবি হতো।

একাদশতম অনুচ্ছেদ-এও তিনি স্বল্প কথায় বেশ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছেন – এক. লক্ষ্য একটাই, দেশ ও জাতি গঠন, দুই. পরাধীনতার বৃটিশ শাসনামলে দেশের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে (বৃটিশের অনেক দালাল এখনো বলে থাকে যে, বৃটিশরা আমাদের অনেক কিছু দিয়ে গিয়েছে), তিন. জাতি গঠনে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য, চার. একদলীয় শাসন ব্যবস্থা একটি হঠকারী শাসন-ব্যবস্থা, জাতীয় ঐক্যের খাতিরে তা প্রয়োজন আছে বলে প্রচার করা হয়ে থাকে, কিন্তু তা মূলতঃ দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে, তাছাড়া ‘ওয়ান-পার্টি সিস্টেম’ নিছক রেজিমেন্টেশন ছাড়া কিছুই নয়, আর রেজিমেন্টেশন যে অহিতকর এবং কেন অহিতকর সেটা পূর্বের একটি অনুচ্ছেদে খোলাসা করে বলা হয়েছে; পাঁচ. তারপরেও প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যের বহুদলীয় মুক্তমনতার মধ্যে থেকেই, কিভাবে সেটা সম্ভব? সেটা সম্ভব, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের উদ্দীপনাই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে; ছয়. জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপের মধ্যে একটি ছিলো ‘খাল খনন-এর কর্মসূচি’, এ ছিলো এক ঢিলে অনেকগুলো পাখী মারা – ধেয়ে আসা দুর্ভিক্ষকে ঠেকিয়ে দেয়া, কৃষির সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আন্তনদী যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, জলজ প্রাণীর প্রজনন ও চলাচল বৃদ্ধি করা, ভূগর্ভস্থ পানির উচ্চতা বাড়ানো, খরা ও বন্যার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা, ভিক্ষার মনোভাব দূর করে কাজের মনোভাব তৈরী করা, ইত্যাদি।

বারোতম অনুচ্ছেদে তিনি একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন, তা হলো ‘চরিত্র’। আমাদের দেশে ‘চরিত্র’ জিনিসটি অনেক ব্যাপক। প্রতিটি জাতিরই স্বকীয়তা থাকে সেই স্বকীয়তার সবলতা থাকে দুর্বলতাও থাকে। আমাদের চারিত্রিক দুর্বলতা হলো ‘নিজেরা যা পছন্দ করি না তা অপরকে করতে বলি’। নিজ জাতির এই দুর্বলতাটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর বলিষ্ঠতা ছিলো জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের মধ্যে। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে যে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে সেটা তিনি উল্লেখ করেছেন।

ত্রয়োদশ অনুচ্ছেদে তিনি আমাদের দুঃখ বেদনার কথা উল্লেখ করেছেন। সুদীর্ঘ উপনিবেশিক শোষনের যাঁতাকলে পড়ে আমাদের জাতি পেয়েছে কেবল দুঃখ, নির্যাতন, অন্যায়-অত্যাচার আর এক্সপ্লয়েটেশন। আর এই সব কিছু দেশে সৃষ্টি করেছে পাহাড়-পর্বতের মতো সমস্যা। জনসংখ্যা সমস্যার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আসলে কাজে না লাগাতে পারলে জনসংখ্যা সমস্যা আর কাজে লাগাতে পারলে জনসংখ্যা হয়ে ওঠে পরম সম্পদ; একটি অদক্ষ জনসংখ্যা-কে কাজে লাগানো প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়, তার পরেও সেই অসম্ভবকেও তিনি সম্ভব করেছিলেন, দেশের অদক্ষ বেকার যুবকদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়ে।

সর্বশেষ অনুচ্ছেদে তিনি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছিলেন ‘আদর্শ ভিত্তিক নেতৃত্ব’-এর কথা। ‘আদর্শ ভিত্তিক নেতৃত্ব’ থাকলে দেশের মানুষ পথের দিশা পায়, পায় অনুপ্রেরণা, এগিয়ে যায় দেশ। জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নেতৃত্ব ছিলো একটি আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব। তার শাহাদাত বরণের সাথে সাথে আমরা হারিয়েছি সেই ‘আদর্শ ভিত্তিক নেতৃত্ব’-কে।

(অনেকে মনে করেন যে উনার মৃত্যুতে হাত রয়েছে বহিঃশত্রুদের। যারা আমাদের দেশ ও জাতির শত্রু, আমাদের মঙ্গল চায়না, আমাদের দেশকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চায়, তারা এমন অপকর্ম করতেই পারে। কিন্তু যখন দেখি যে সেই দলে ভিড়ে গিয়ে এদেশীয়দের কয়েকজন তা এক্সিকিউট করে তখন হতবাক হতেই হয়। এই বীর যোদ্ধা ও মহান দেশপ্রেমিক নিহত হয়েছিলেন উনার খুব কাছের মানুষের হাতে। মনে করিয়ে দেয় জুলিয়াস সিজারের সেই বিখ্যাত উক্তি “Et tu, Brute?)

৩০ শে মে, ২০১৬ সকাল ৯:৩৭

(ইতঃপূর্বে প্রকাশিত)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.