আমার জীবনে দেখা প্রথম হোলি উৎসব ও টুকরো ঋণাত্মক স্মৃতি

আমার জীবনে দেখা প্রথম হোলি উৎসব ও টুকরো ঋণাত্মক স্মৃতি:

ঘটনা ১৯৮৯ সালের। আমি তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানীতে তিবিলিসি স্টেট ইউনিভার্সিটির ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছাত্র। আমরা সেখানে অধ্যায়ন করছিলাম মোট ২২ জন বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী, এদের মধ্যে ১৮ জন ছেলে ও চারজন মেয়ে। চারতলা ডরমিটরির তিনতলার একপাশে থাকতাম আমরা বাংলাদেশীরা ও অপর পার্শ্বে ভারতীয়রা। তাদের মধ্যে আবার ছিলো ২০ জন ছেলে ও ২০ জন মেয়ে। ঐ প্রথম আমরা ভারতীয়দের খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম, এর আগে বোম্বাই ফিল্মেই কেবল ওদের দেখতাম। একই উপমহাদেশের বলে আমাদের মধ্যে কিছুটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিলো। তবে ভারতীয় ছেলেদের চাইতে ভারতীয় মেয়েরা আমাদের সাথে বেশী বন্ধুভাবাপন্ন ছিলো। আমরা বাংলাদেশীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম ও কিছুটা ঝাঁঝালো ছিলাম বলে, ভারতীয় ছেলেরা আমাদের কিছুটা সমঝে চলতো। আমরা বাংলাদেশীরা খুব উৎসবমুখর ছিলাম, নানা অজুহাতে পার্টি, দাওয়াত এটা-সেটা আমাদের লেগেই থাকতো। তবে আমাদের উৎসবগুলোতে শালীনতা ছিলো, আমরা দলবেধে রান্না-বান্না করে খাওয়া-দাওয়া করে, গানের আসর বসাতাম, কবিতা পাঠ করতাম, গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা ইত্যাদি। কখনো কখনো হঠাৎ অন্য ডরমিটরি থেকে এসে আমাদের সাথে সামিল হয়ে যেতেন আমাদের সিনিয়র ভাইয়েরা। তারা এসে বলতেন, “ছোট ভাই-বোনেরা এই পার্টিটার খরচ কিন্তু আমি/আমরা দিচ্ছি”। আমাদের সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক ছিলো মধুর, স্নেহ-শ্রদ্ধার (যা আমাদের আবহমান কালের সংস্কৃতি)। পক্ষান্তরে ভারতীয়দের দেখেছি সিনিয়র-জুনিয়র র‍্যাগিং ও অন্যান্য তিক্ততা করতে (হয়তো ওটাই ওদের আবহমান কালের ঐতিহ্য!)। আমাদের এই উৎসব মুখরতা এত বেশী ছিলো যে, একবার ডরমিটরির এক শিখ বন্ধু আমাকে বললো, “তোমাদের আজ কোন পার্টি নেই?” আমি বললাম, “কিসের পার্টি?” সে বলে, “তোমাদের তো হররোজই পার্টি!” আমি হেসে ফেলেছিলাম। যাহোক, একবার এলো হোলি উৎসব। সকাল থেকেই লক্ষ্য করলাম এতে ভারতীয় ছেলেরা বেশী তৎপর! আর ওদের টার্গেট মেয়েরা। কিছু ভারতীয় মেয়েদের দেখলাম স্বেচ্ছায় ঐ মাস্তিতে যোগ দিতে, আর কিছু মেয়েদেরকে দেখলাম যোগ না দিতে। আরপরেও ছেলেরা জোর করে ওদের গায়ে রঙ মাখানোর চেষ্টা করছিলো। আমাদের বাংলাদেশী মেয়েদের মুখে ওরা জোর করে রঙ মাখাতে সাহস পায়নি, আমরা বাংলাদেশী ছেলেরা শক্ত অবস্থান নিয়েছিলাম বলে। এক পর্যায়ে ভারতীয় ছেলেরা বেপরোয়া হয়ে উঠলে, কয়েকজন ভারতীয় মেয়ে আমাদের রূমে এসে আশ্রয় নিলো। ওদেরকে ভিতরে রেখে আমরা করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এবার দেখলাম বেপরোয়া ছেলেগুলা আর আমাদের রূমে ঢুকতে সাহস করলো না। কিছুক্ষণ পর আমরা রূমে ঢুকে দেখলাম, একটি মেয়ে টেনশনে জ্ঞান হারিয়েছে। পুরো বিষয়টি সেদিন আমাদের খুব অসহ্য লেগেছিলো, ‘এ কেমন উৎসব?!”
—————– রমিত আজাদ

তারিখ: ১৫ই মার্চ, ২০১৭
সময়: ভোর ১২ টা ৫৮ মিনিট।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.