‘ইনকুইজিশন’-এর ভয়, সত্য বলা থেকে বিরত থাকা, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, ব্রুনো, অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপ ও ঝলমলে দক্ষিণ এশিয়া

‘ইনকুইজিশন’-এর ভয়, সত্য বলা থেকে বিরত থাকা, কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, ব্রুনো, অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপ ও ঝলমলে দক্ষিণ এশিয়া
—————————- ড. রমিত আজাদ

Inquisition শব্দটির সাথে নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগই পরিচিত নয়, এমনকি আগের প্রজন্মের অনেকেও ঐ সম্পর্কে জানেননা (আমার জরিপ তাই বলে)। ঐ একই সাথে বলা যায় যে ইউরোপ মহাদেশের অন্ধকার যুগ সম্পর্কেও তাদের ভালো জানা নেই। তবে পৃথিবী ঘুরছে কি ঘুরছে না এই নিয়ে যে চার্চের সাথে গ্যালিলিও-র একটি সংঘর্ষ হয়েছিলো, যেখানে গ্যালিলিও বলেছিলেন যে পৃথিবী ঘুরছে আর চার্চ বলেছিলো যে ‘এমন হতে পারে না’, এই বিষয়টি অনেকেরই জানা আছে। তবে তার পটভূমি, অনেকের কাছেই সুস্পষ্ট নয়।

ইউরোপীয় চার্চের দন্ডমুন্ডের কর্তা পোপ গ্রেগরী (৫৪০-৬০৪ খ্রীঃ)-র কিছু হঠকারী নির্দেশের ফলে সমগ্র ইউরোপে নেমে আসে ‘অন্ধকার যুগ’। তার পরবর্তি ফলাফল ছিলো ইনকুইজিশন। পোপ নবম গ্রেগরি ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে একটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেন এর ফলেই রাষ্ট্রীয়ভাবে রোমান সাম্রাজ্যে ইনকুইজিশন চালু হয়। চার্চের কর্তৃত্ব ধরে রাখা এবং বিরোধীদের দমনের জন্যেই রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বিরোধীদের গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। বিচারের সময় তাদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালানো হত অমানবিক নির্যাতন। যদি কেউ এমন কথা বলতো যা চার্চ সঠিক মনে করতো না তাহলে তার সর্বচ্চো শাস্তি ছিলো ‘তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা’। ভয়াবহ নির্যাতন ও জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার পদ্ধতিটিই ‘ইনকুইজিশন’ নামে পরিচিত। ইনকুইজিশন-এর ব্যাপ্তিসময় ছিলো ১২৩১ থেকে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ অব্দি। এই ইনকুইজিশন শুধু খ্রিস্টধর্ম বিরোধীরাই নয়, বহু নিরপরাধ মানুষ নারী ও শিশুরাও নির্যাতন ভোগ করেছিলো।

চার্চ মনে করতো, পৃথিবী গতিহীন নিশ্চল, এবং তা মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। চার্চের এই ধারনা যে সঠিক নয় এই সম্পর্কে ইউরোপে প্রথম আলোকপাত করেছিলেন নিকোলাই কোপার্নিকাস (1473 – 1543 খ্রীঃ), উনার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ Dē revolutionibus orbium coelestium (On the Revolutions of the Heavenly Spheres)-এ। তবে এই গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি আর বেশিদিন বাঁচেননি, তাই ইনকুইজিশন-এর আওতায়ও তাঁকে পড়তে হয়নি। তবে কিছুকাল পরে গ্যালিলিও (1564 – 1642 খ্রীঃ) একই কথা বললে, তিনি চার্চের রোষে পড়েন ও ইনকুইজিশন-এর আওতায় আসেন। শেষ পর্যন্ত কথা ফিরিয়ে নিয়ে চার্চের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তবে চার্চ-এর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্য কথা বলার মত সাহসীকতা দেখিয়েছিলেন জর্দানো ব্রুনো (1548 – 1600 খ্রীঃ), যার ফল স্বরূপ চার্চ তাঁকে পুড়িয়ে হত্যা করে।

এইসব ঘটনা থেকে অনেকেরই ধারনা যে, পৃথিবীর ঘুর্ণন ও হেলিওসেন্ট্রিসিজম সম্পর্কে ইউরোপীয়ানদের আগে কেউই কিছু বলেননি। যা একেবারেই সঠিক নয়। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও ও ব্রুনোর কয়েকশত বছর আগেই এই সম্পর্কে অনেকেই বলেছিলেন আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায়। উনাদের একজনের নাম আর্যভট্ট (476–550 খ্রীঃ)।

আর্যভট্ট বলেছিলেন যে, পৃথিবী তার নিজ অক্ষের চতুর্দিকে ঘোরে, এবং তারাদের যে আপাত গতি আমরা দেখি তা মূলত পৃথিবীর গতির কারণেই হয়। পাশাপাশি তিনি এও বলেছিলেন যে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের সময় উপরিস্থিত কায়াগুলো ছিটকে পড়ে না এই কারণে যে, কোন একটি বল (মহাকর্ষ বল) তাদেরকে টেনে পৃথিবীতে ধরে রাখে।

Motions of the solar system: Aryabhata correctly insisted that the earth rotates about its axis daily, and that the apparent movement of the stars is a relative motion caused by the rotation of the earth, contrary to the then-prevailing view, that the sky rotated.

তারিখ: ১৩ই জুন, ২০১৭
সময়: বিকাল ৪ টা ৫৭ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.