একজন এক’শ বছরের বুড়ো

–সাকি বিল্লাহ্

আমি একজন এক’শ বছরের বুড়ো
বুড়ো থুড় থুড়ো,
হাতের কুঁচকানো শুকনো চামড়,
ঝুলে আছে থুতনির ভাজে পড়া অসাড় ।
মস্তকের গুটি কয়েক চুলের উঁকি দেয়া,
প্রান্তিক ভাগে আছে শেওলা ধরা ছাঁয়া ।

আমি দেখেছি শত পাখির উড়ে যাওয়া,
দেখেছি শত বুনো হাঁসের জলকেলি খেওয়া;
আমি বুড়ো এক’শ বছরের বুড়ো,
চামড়া কুঁচকানো বুড়ো থুড়থুড়ো ।

রাতের অভিসারে গাছের সাথে মাখামাখি,
বাতাসের ভেলা যেন মুঁদেছে দুটি আঁখি;
ঘন বনে দেখেছি কত জোনাকির খেলা,
সারারাত গান গেয়ে ক্লান্ত ভোর বেলা;
বাঁশ ঝাড়ের পেঁচাটা কেঁদেছে ঘনঘন,
সাক্ষী শুধু এই বুড়ো, পেঁচার প্রিয়জন ।

শত বছরে আমি দেখেছি শত মানুষ,
দেখেছি তাদের ধ্বংস লীলা আর ফানুস;
মানুষ নামের ধারক হয়ে বধেছি কত প্রাণ,
ধ্বংস করেছি মনুষত্ব আর আত্মসম্মান;
প্রকৃতি গ্রাসী নরমাংসী এই মানুষী,
শত বছরে বদলায়নি একটুখানি অমানুষী;
আমি তাই একজন অতীকায় বুড়ো,
মানুষ না পরিচয়ে বলি বুড়ো থুড়থুড়ো ।

আমি দেখেছি স্বদেশী, দেখেছি একাত্তর,
দেখেছি মায়ের রক্ত ত্রিবেদী ১৯৫২’র;
অগ্নি ঝরা দুপুরে কিংবা রাতের নিঃশব্দে,
দেখেছি দামাল মুক্তি সেনাদের যুদ্ধশত অব্দে;
অরুন তরুণ দামাল ছেলে দেখেছি তাদের যুদ্ধ,
মায়ের মান রাখতে যারা বরণ করেছে মৃত্যু ।

শত বছরের বয়সের ভারে হয়েছে দেহ অসাড়,
জ্ঞান আর ইতিহাসে হয়েছে নত শির আমার;
জ্ঞানের ডালে বসে সে ইতিহাসের পাখি,
কথা বলে আজও মুক্ত পাতার আঁখি ।

হাজার দিনে উঠেছি সকালে মোরগের ডাক শুনে,
ঘরে ফিরেছি সান্ধ্য আযানের আহবানে;
হাজার ক্রোশ হেঁটেছি আমি যেতে বহুদূরে,
দুপাশে ছিল মুক্ত বনের গাছের সারি জুড়ে;
এখন মানুষ জ্ঞান আহড়নে পুজিছে কলকব্জা,
পুজিবে গাছেরে সময় কোথায় নীতিহীন এই রাজা ।

বিংশ অব্দে জ্ঞান সমুদ্রে ভেসে ভেসে,
শত বছরের বুড়োর ঝাপসা চোখের দৃশ্যে,
দেখছি আমি ধুলো মাখা প্রিয় ধরণীকে,
সবুজ হারিয়ে নরক ধুসর রং-এ তোমাকে;
দেখছি আর ভাবছি তোমার ধৈর্যশৈলী মনটি,
গো গ্রাসে কেন গিলছো না সবের নরমুন্ডি ।

আজ এত বছর পর যখন পথে পথে ঘুরি,
দেখি না বনের সবুজ আর গাছ গাছারি,
ঝোপের আড়ালে বসে থাকা কাকাতুয়া,
হারিয়ে গেছে বনের সাথে গোধূলির সাজ নিয়া ।

এখন শুধু বসতির বন চারিদিকে,
সবুজ মিশিয়া ইটের দালান সবদিকে;
ঝাপসা চোখের ঝাপসা চাহনিতে,
দেখছি আমি ধ্বংস হচ্ছে মানুষ অহমিতে;
মোরগের ডাক শুনিনা এখন গাড়ির হর্ণ বাজে,
তোমাদের কাছে সুমধুর লাগে, আমার লাগে বাজে;
তাই আমি ভুলতে চাই তোমাদের মায়া,
ভগ্ন শরীরে অপেক্ষায় আছে আমার কায়া;
শূন্য দাঁতের হাসি দিতে করি না কার্পণ্য,
আমি বুড়ো থুড়থুড়ো, নতুনের কাছে নগণ্য ।

এখনও সময় আছে, এখনও আছে উপায়,
পোঁড়ামাটি ছেড়ে ভুলো সজীব মাটির মায়ায়;
আমি একজন এক’শ বছরের বুড়ো, অতীব বুড়ো,
বুড়ো থুড় থুড়ো ।।

folk singer of bangladesh by Syeda Oishee

মন্তব্য করুন..

২ মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.