একটি গবেষণার সাহিত্য পর্যালোচনা

একটি গবেষণার সাহিত্য পর্যালোচনা/ প্রাক-কথন (Literature review):
————————— ড. রমিত আজাদ

দশম শতকের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল হাইয়াম বিশ্বাস করতেন ইসলাম ধর্মে। উনার ধর্মীয় বিশ্বাস জন্ম দিয়েছে এক নতুন পদ্ধতির এর নাম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (Method of Investigation)। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘মানুষ খুঁতপূর্ণ, কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তাই নিখুঁত’। তাহলে যত জ্ঞানী ব্যাক্তিই হোন না কেন, শেষতক তিনি মানুষই, তাই উনার বলা কথা সঠিক নাও হতে পারে, তিনি যা বললেন তা সঠিক কি বেঠিক তা যাচাই করা উচিৎ। তিনি বলেন,

“একজন সত্য-সন্ধানী তিনি নন, যিনি প্রাচীন মানুষের লেখা পড়েন, এবং নিজের প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত হয়ে সেগুলির উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন, বরং তিনিই সত্য-সন্ধানী যিনি সেগুলির উপর নিজের সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং সেখান থেকে যা আহরণ করেন তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন— তিনি এমন একজন মানুষ যিনি যুক্তি ও নিরীক্ষার আশ্রয় নেন।”

“The duty of the man who investigates the writings of scientists, if learning the truth is his goal, is to make himself an enemy of all that he reads, and … attack it from every side. He should also suspect himself as he performs his critical examination of it, so that he may avoid falling into either prejudice or leniency.” — Alhazen

উপরের উক্তি থেকে একদিকে যেমন গবেষণায় Method of Investigation-এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছি, তেমনি আরেক দিকে যে কোন গবেষণার শুরুতেই Literature review-এর তাৎপর্য বুঝতে পারছি।

বিজ্ঞান জগতের আরেক নক্ষত্র স্যার আইজাক নিউটন সতের শতকে বলেছিলেন যে,
“একটি দৈত্যের কাঁধে চড়ে আমি যদি আরো দূরতক দেখতে পেতাম!”
“If I have seen it is by standing on the shoulders of Giants.”
এই উক্তি থেকে বোঝা যায় যে, যেকোন গবেষণা শুরু করার আগে তার পূর্ববর্তি জ্ঞানগুলোকে যতবেশী সম্ভব জানা।

বিষয়টা মূলত: সেরকমই, যেকোন গবেষণার শুরুটাই করতে হয় সাহিত্য পর্যালোচনা দ্বারা। এটা করলে বিষয়টি সম্পর্কে তার বিস্তারিত জ্ঞান হবে, এবং সেই জ্ঞানের ভিত্তিতেই তিনি গবেষণা করতে পারবেন। পাশাপাশি তিনি জানতে পারবেন ইতিপূর্বে এই বিষয়ে কি কি কাজ হয়েছে ও কি কি কাজ হয়নাই। Literature review করার একটি বড় কারণ হলো, গবেষককে দেখাতে হবে যে, তার গবেষণা পূর্ববর্তি ও চলমান গবেষণাগুলোর একটি বা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ research gap পূরণ করবে।

এখানে কতগুলি প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়:
১। এই ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে কি কি গবেষণা করা হয়েছে? এবং ঐ গবেষণাগুলোর findings সম্পর্কে গবেষকের উপলব্ধি কি?
২। পূর্ববর্তি গবেষণাগুলোতে কি কি অনুপস্থিত (missing) রয়েছে?
৩। এই গবেষণায় যে রিসার্চ কোশ্চেনগুলো রয়েছে তাদের উত্তর পূর্ববর্তি গবেষণাগুলোয় কি করে খোঁজ করা হয়নি?

Literature review একইসাথে এই দেখায় যে, এই গবেষণাটি কি করে মৌলিক (original) ও উদ্ভাবনমূলক (innovative)।

গবেষণাপত্রের শেষে যে রেফারেন্স (Bibliography) দেয়া হবে সেইগুলোর একটা সর্বাঙ্গীন (comprehensive) সাহিত্য পর্যালোচনায় থাকতে হবে। এবং বিপরীতক্রমে গবেষণাপত্রের বডিতে যে Literature গুলো থাকবে, সতর্ক থাকতে হবে যে, সেইগুলো যেন Bibliography থেকে বাদ না পড়ে।

Review করা শুরু করতে হয় সবচেয়ে পুরণোটা থেকে শুরু করে লেটেস্ট-টা পর্যন্ত।
Literature review কাজটা খুব কঠিন। এত এত বই-পত্রের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় বই বা জার্নালটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই দুটি সহজ পথে কাজটা করা যায়। ১। গবেষকের এই গবেষণার রিলেটেড কাজের পুরণো একটা গবেষণাপত্র নিয়ে, সেটার বিবলিওগ্রাফী দেখে সেই পেপারগুলো পড়তে হবে। ২। গবেষণার ‘কী ওয়ার্ডস’-গুলো প্রয়োজনীয় সার্চ ইঞ্জিনে দিলে রিলেটেড অনেক লিটারেচার পাওয়া যাবে। এমন দুটো সাইট হলো https://scholar.google.com/ ও https://www.scopus.com/freelookup/form/author.uri ।

লিটারেচারগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে? সেগুলো সংগ্রহ করা যায় নিম্নোক্ত সোর্সগুলো থেকে, বই, সায়েন্টেফিক জার্নাল, খ্যাতিমান সংবাদপত্র (দৈনিক বা সাপ্তাহিক বা মাসিক ইত্যাদি), খ্যাতিমান ম্যাগাজিন, সরকারী অথবা অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও ইয়ারবুক, অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রচার মাধ্যমের ভিডিও, খ্যাতিমান ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাক্তিদের/বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, ইত্যাদি।

টপিক সিলেক্ট হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই Literature review শুরু করে দিতে হয়, আবার টপিক সিলেকশনের জন্যও Literature review লাগে।

গবেষণাপত্রের দ্বিতীয় অধ্যায় সাহিত্য পর্যালোচনায় নিম্নোক্ত পয়েন্ট তিনটি থাকে।
2.1 Theory (গবেষণাপত্রে ব্যবহৃত তত্ত্ব)
2.2 Review of literature related to the research (সংশ্লিষ্ট গবেষণাসমূহের সাহিত্য পর্যালোচনা)
2.3 Previous researches (পূর্ববর্তী গবেষণাসমূহ)

সাহিত্য পর্যালোচনার ক্ষেত্রে Media Skepticism বিষয়টি আমলে আনা অতীব জরুর. এই বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী কোন আর্টিকেলে আলোচনা করবো।

তারিখ: ২রা মার্চ, ২০১৭
সময়: ১৯টা ১১ মিনিট

মন্তব্য করুন..

১ মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.