কবিতা বনাম দর্শন ও দার্শনিক কবি প্লেটো

কবিতা বনাম দর্শন ও দার্শনিক কবি প্লেটো
——————————- ড. রমিত আজাদ

ইংরেজী paradox শব্দটি এসেছে লাতিন paradoxon থেকে যার বাংলা অনুবাদ ‘কূটাভাস’ বা ‘আপাতবৈপিরিত্য’। যা আপাততঃ স্ববিরোধী বলে মনে হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে তা সত্য। এমন একটি paradox হলো কবি প্লেটোর কবিতাবিরোধীতা। বহুবিদ্যাজ্ঞ (polymath) প্লেটোর নাম শোনেননি এমন বিদগ্ধ ব্যাক্তি খুঁজে পাওয়া যাবেনা। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি দার্শনিক হিসাবেই বেশী পরিচিত।

মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-এর সরাসরি শিষ্য প্লেটোর বিরূদ্ধে এহেন অভিযোগ নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা যেতে পারে। কবি প্লেটো কেন কবিতা বা কবিদের বিরোধী ছিলেন এটি সত্যিই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অলঙ্কারশাস্ত্র (rhetoric) ও কাব্য (poetry) এই নিয়ে প্লেটোর আলোচনা ব্যাপক ও প্রভাবক্ষম। প্রাথমিকভাবে এটা আমাদের কাছে অনেকটাই অস্পষ্ট যে, কেন তিনি এই দুটি প্রসঙ্গকে সংযুক্ত করলেন। তিনি তাদেরকে খুব কাছাকাছি এনে বলেছেন যে, কাব্য হলো এক ধরনের অলংকারশাস্ত্র (poetry is a kind of rhetoric)। উপরন্তু তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’-এ বলেছেন,
“there is an old quarrel between philosophy and poetry” (Republic, 607b5–6).
এবার আবার মনে প্রশ্ন জাগে, দার্শনিক ছিলেন বলেই কি তিনি কাব্যের বিরোধিতা করেছিলেন?

এর বীজ সম্ভবত প্রোথিত রয়েছে প্লেটোর গুরু মহাজ্ঞানী সক্রেটিস-এর অভিজ্ঞতায়। প্লেটোর গুরু সক্রেটিস কবিদের সাথে এক ধরনের বিরোধীতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন কবিরা জ্ঞানী কিনা এই অনুসন্ধান করতে তিনি কবিদের কাছে যান, এবং তাদের কবিতার কিছু অনুচ্ছেদের সঠিক অর্থ ব্যাখ্যা করতে বলেন। কিন্তু তারা তাদের কবিতার সঠিক অর্থ ব্যাখ্যা করতে পারেনি। সক্রেটিস বলেন, “তখন আমি বুঝতে পারলাম কবিগণ জ্ঞান দ্বারা কবিতা লেখেন না, বরং এক ধরনের সৃজনী ক্ষমতা ও অনুপ্রেরণার দ্বারাই কবিতা লেখেন।” এখান থেকে আমরা ধরে নিতে পারি যে সক্রেটিস মনে করতেন যে, কবিরা জ্ঞানী নয় ও তাদের রচিত কবিতাগুলোতে জ্ঞানের কোন প্রতিফলন নেই।

গ্রীসের প্রথম পূরাণ ‘ইলিয়াড’ ও ‘ওডিসি’ রচনা করেছিলেন কবি হোমার (যদিও বিতর্ক রয়েছে যে, হোমার নামে যে অন্ধ কবির কথা বলা হয়ে থাকে, তেমন কোন একক ব্যক্তি ছিলেন না। আসলে ইলিয়াড ও ওডিসি লেখা হয়েছে একটি দীর্ঘ সময়কালে (আনুমানিক দুইশত বছর), এই হিসাবে কাজটি ছিলো অনেক কবির সম্মিলিত কর্ম। এরা সকলেই ‘হোমার’)। এই কবি হোমার সম্পর্কে সক্রেটিস বলেছিলেন,
“হোমার কোন নগররাষ্ট্র আপনার বদৌলতে উত্তমরূপে শাসিত হইতেছে?” ” স্পার্টা যেমন লাইকারগাস-এর নিকট ঋণী, ইতালি এবং সিসিলি তাহাদের সংবিধানের জন্য চারোন্দাজের নিকট ঋণী, আমরা ঋণী সলোনের নিকট। আপনি বলুন কোন রাষ্ট্রের মানুষ অনুরূপভাবে আপনার নিকট ঋণী হইয়াছে?’ (রিপাবলিক: প্লেটো)

আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে ঐতিহাসিক জবানবন্দী দিয়েছিলেন সক্রেটিস তার কয়েকটি অংশে তিনি হোমারের উল্লেখ করেন:

“বন্ধু, আমি কাঠ-পাথরের তৈরী নই, আর দশজনার মতোই আমিও একজন রক্ত-মাংসের মানুষ, যেমনটি হোমার বলেছিলেন;”
“পরলোকে গিয়ে অর্ফিউস, মুসিউস, হেসোইড এবং হোমার প্রমুখের সাথে আলাপ-আলোচনার সৌভাগ্যলাভের জন্য মানুষের অদেয় আর কি থাকতে পারে? এই যদি হয় সত্য তাহলে আমি বারবার মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত আছি।”

এভাবে দেখা যায় যে সক্রেটিস হোমারের প্রসংসা ও সমালোচনা দুইই করেছেন।

গ্রীসের প্রথম একেশ্বরবাদী জিনোফেনস বলেছিলেন, “মানবের মধ্যে যা কিছু ভর্ৎসনা ও তিরষ্কার যোগ্য রয়েছে যেমন চৌর্যবৃত্তি, ব্যাভিচার, প্রতারণা; ইত্যাদি সবই দেবতাদের মধ্যে রয়েছে।” তবে এর অর্থ এই যে হোমার ও হেসোইড দেবতাদের ভাঁওতাবাজি সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন করে ফেলেছেন। এই দুই মহাকবি তৎকালীন দেবতাদেরকে কামুক, খুনি, চোর, মিথ্যাবাদী, বেঈমান, পরশ্রীকাতর, হিংসুক এবং প্রতিশোধ পরায়ণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যা কিনা কোনভাবেই কোন ভালমানুষের গুণাবলী হিসাবে স্বীকৃত নয়।

প্লেটো শিশুদেরকে হোমারের ইলিয়াড পড়ানোর বিরোধী ছিলেন, কারণ সেখানে দেবতাদের অনেক ঋণাত্মক চরিত্র (কামুক, হিংসুটে, প্রতিশোধপরায়ন, ইত্যাদি) প্রকাশ পেয়েছে। প্লেটো বলেছিলেন ইশ্বর হবেন গম্ভীর ও কেবলই মঙ্গলের ধারনা।

এবার প্রশ্ন, প্লেটো কি সব কবিদেরকেই নির্বাসিত করতে চেয়েছিলেন? সব কবিতাকেই কি নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন?

একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতেই হবে যে, সক্রেটিস-প্লেটো পরবর্তি কবিদের কর্ম ও কবিতাকে উদাহরণ হিসাবে টেনে সক্রেটিস ও প্লেটোর ঐ সংক্রান্ত মতামত-এর সমালোচনা করা ঠিক হবেই না। তাঁরা তাঁদের সময়কার কবি ও কবিতার ভিত্তিতেই সেই সব মতামত দিয়েছিলেন। পরবর্তিকালে যদি কবিগণ ও কবিতারাজী পরিবর্তন ও উন্নতি লাভ করে থাকে সেটা তাঁদের জানা থাকার কথা নয়, অথবা হয়তোবা সেটা তাঁদের সমালোচনারই সুফল।

প্লেটো একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, সেই আদর্শ রাষ্ট্রে তাঁর প্রস্তাবিত শিক্ষাব্যবস্থায় সঙ্গীত-কে বিশেষ স্থান দিয়েছিলেন। তবে এই সঙ্গীত মানে কেবল গীত-বাদ্য-নৃত্য নয়, সামগ্রিকভাবে কলা অর্থে সঙ্গীত শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। প্লেটো শতভাগ কবিতা বিদ্বেষী হলে এমনটা করতেন না। তিনি বিপথগ্রস্ত কবিদের সম্পর্কে এমনটা করেছিলেন বলে মনে হয়।

নীচে কবি প্লেটোর রচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ করলাম

ভালোবাসা তন্দ্রাবিষ্ট
————— প্লেটো
(অনুবাদ – রমিত আজাদ)

আমরা পৌঁছুলাম উপবনের গভীর ছায়ায় এবং সেখানে দেখতে পেলাম,
সিথেরার পুত্র মিষ্টি তন্দ্রার বাঁধনে শৃঙ্খলিত;
বৃক্ষে শোভিত লালবর্ণ আপেলের মতো লাগছে তাকে,
তার সাথে ছিলো না কোন তূণ ও কোন বাঁকানো ধনু;
ওগুলো নিলম্বিত ছিলো একটি পল্লবিত সেচনী-তে,
নিজে শুয়ে ছিলো গোলাপ-শোভিত ঝুলনে,
তার ঘুমন্ত মুখে ছিলো স্মিত হাসি,
এদিকে বাদামী মৌমাছিরা উড়তে উড়তে
তার নরম ঠোঁটে পরম যত্নে নির্মান করছিলো,
মোমের শিল্পকর্ম, যেন সেখানে তাদের মধু রাখতে পারে।

Love Asleep – Poem by Plato
We reached the grove’s deep shadow and there found
Cythera’s son in sleep’s sweet fetters bound;
Looking like ruddy apples on their tree;
No quiver and no bended bow had he;
These were suspended on a leafy spray.
Himself in cups of roses cradled lay,
Smiling in sleep; while from their flight in air,
The brown bees to his soft lips made repair,
To ply their waxen task and leave their honey there.
———————————————————————–

এই প্রাংশু পাইন পাদপের তলে
———————— প্লেটো
(অনুবাদ – রমিত আজাদ)

এই প্রাংশু পাইন পাদপের তলে,
যা মৃদুমন্দ হাওয়ায় দোলে
হালকা মর্মর সুর তুলে,
সে কিছুটা ঝুঁকে আছে,
শীতল জল-ধারার কাছে।
আমার এই বাঁশি,
বাজাবে দরদী গান, সে গাইতে জানে,
আর নামিয়ে আনবে ঘুম তোমার মায়াবী নয়নে।

Neath This Tall Pine – Poem by Plato
Neath this tall pine,
That to the zephyr sways and murmurs low,
Mayst thou recline,
While near thee cooling waters flow.
This flute of mine
Shall pipe the softest song it knows to sing,
And to thy charmèd eyelids sleep will bring.
———————————————————————

নক্ষত্র-কে
— প্লেটো
(অনুবাদ – রমিত আজাদ)

তুমি নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে দেখ, আমার নক্ষত্র!
আহ! আমি যদি হতাম অন্তরীক্ষ
অজস্র নক্ষত্র খচিত অভ্র
সেই সহস্র নয়ন মেলে ধু ধু,
তোমাকেই দেখতাম শুধু।

To Stella – Poem by Plato
Thou gazest on the stars, my star!
Ah! would that I might be
Myself those skies with myriad eyes,
That I might gaze on thee.
—————————————–

(‘ভালোবাসার স্পর্শে সকলেই কবি হয়ে ওঠে’ – প্লেটো)

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
http://plato.stanford.edu/entries/plato-rhetoric/
http://coxsbazartimes.com/archives/13044

https://books.google.com.bd/books?id=O2c5n9ivkR0C&pg=PA379&lpg=PA379&dq=Socrates+Homer+Sparta+Lycurgus&source=bl&ots=0mwWffl-Q9&sig=GU1jlf3jRulOThbWaXK9K1qQh3s&hl=en&sa=X&redir_esc=y#v=onepage&q=Socrates%20Homer%20Sparta%20Lycurgus&f=false

The History of Western Philosophy: Bertrand Russell

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.