গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ২

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ২
————————- ড. রমিত আজাদ

দুনিয়াতে কত যে জ্ঞান!

গত ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর ছিলো 12th Global Engineering, Science and Technology Conference। নিজে পেপার প্রেজেন্ট করলাম, সেশন চেয়ার হিসাবে অন্যদের পেপার প্রেজেন্টেশন শুনলাম। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সাথে নলেজ শেয়ার করলাম। মুরুব্বী বিজ্ঞানী ড. ইউসুফ ও ড. জিয়াউল হক স্যারের মূল্যবান বক্তব্য শুনলাম। কত কিছু যে নতুন শিখলাম! কত নতুন নতুন জ্ঞানের সাথে যে পরিচিত হলাম! সেইসব অভিজ্ঞতাগুলোর টুকরো টুকরো কথা ও নিজের কিছু কথা মিলিয়ে লেখাটি লিখছি।

মিথ, ফিলোসফি ও সায়েন্স:
প্রশ্ন: সমদ্রের জল লবণাক্ত কেন?
উত্তর:
মিথ – অনেক অনেক কাল আগে একটা বাটি ছিলো, বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে যা চাওয়া হতো তাই পাওয়া যেত। আর বাটিটি বাম দিকে ঘুরিয়ে তা বন্ধ করা যেত। এক লোক খুব ভালো ছিলো, কিন্তু সে খুব গরীব ছিলো। একদিন তার বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে দেবতা তাকে ঐ বাটিটি উপহার দিলো। সেই ভালো মানুষটি ঐ বাটিটি ব্যবহার করে ধনী হয়ে গেলো। তবে সে কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঐ বাটিটি ঘুরিয়ে নিতো না। একবার এক হিংসুটে ও লোভী লোক লুকিয়ে লুকিয়ে বিষয়টা দেখে ফেললো। তবে সে শুধু অর্ধেকটা দেখেছিলো, অর্থাৎ বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়, এটুকুই শুধু দেখেছিলো। একদিন হিংসুটে লোকটি ভালো লোকের কাছ থেকে বাটিটি চুরি করলো। তারপর তাকে আর পায় কে? সে উল্লাসে মেতে উঠলো – এবার সে পৃথিবীর সবচাইতে ধনী ব্যাক্তিতে পরিণত হবে! সে ঐ বাটিটি নিয়ে একটা নৌকায় চড়ে সমুদ্রের গভীরে চলে গেলো, ভাবলো এখানে আর কেউ তাকে দেখতে পাবে না, বাটিটি ঘুরিয়ে সে তার খেয়াল-খুশী মতো সোনা-রূপা হীরা-জহরৎ চাইবে। ইতিমধ্যে নৌকা বাইতে বাইতে সে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো, তাই ভাবলো আগে খেয়ে নেই, মজা করে খাওয়ার জন্য প্রথমে তার লবণের কথা মনে পড়লো। বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে সে লবণ চাইলো। বাটি উপচে লবণ পড়তে থাকলো। লোকটি যেহেতু বাটিটি বন্ধ করার উপায় জানতো না, তাই লবণ ধীরে ধীরে নৌকা ভরিয়ে ফেললো। লোকটি যতই বলে “থাম থাম”, বাটিটি কিছুতেই থামেনা। একসময় নৌকা লবণে ভরে নৌকা ডুবে লোকটি মারা গেলো, আর বাটিটি চলে গেলো সমুদ্রের গভীর তলদেশে। সেই বাটিটি থেকে আজ হাজার হাজার বছর ধরে লবণ বেরুচ্ছে তাই সমদ্রের জল লবণাক্ত।

ফিলোসফি – গ্রীক দার্শনিক এম্পিডোক্লেস (৪৯০ – ৪৩০ খ্রীষ্টপূর্ব) বলেছিলেন, “সমুদ্র হলো পৃথিবীর ঘাম (The Fragments, Book1, p.179)”। দার্শনিক এনাক্সিমেন্ডার ও ডায়োজেনেস বলেছিলেন, “পৃথিবী প্রথমে ক্লেদ (moisture) দ্বারা বেষ্টিত ছিলো, এই moisture-এর কিছু অংশ পরবর্তিতে সমুদ্র গঠন করেছিলো।” এনাক্সাগোরাস বলেছিলেন যে, “Just as water strained through ashes becomes salt, so the sea owes its saltness to the mixture of earth with similar properties.”

বিজ্ঞান – কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে প্রবাহিত নদীগুলো কিছু মাত্রায় লবণ বহন করে সমুদ্রের বুকে ফেলছে। কোটি কোটি বছর ধরে জমা হতে হতে সমুদ্রের জল আজ লবণাক্ত। সমুদ্রের জল সৌরতাপে যদিও বাষ্পীভূত হয় কিন্তু ঘনত্বের কারণে সমুদ্রের লবণ সমুদ্রের বুকেই রয়ে যায়। এই কারণেই সমুদ্রের জল লবণাক্ত।

উপরের উদাহরণ দিয়ে দেখালাম মিথ, ফিলোসফি ও সায়েন্স-এর মধ্যকার পার্থক্য। মিথ কোনরূপ যৌক্তিকতা ছাড়াই মনগড়া গাল-গপ্পের মাধ্যমে কোন জীবন-জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে থাকে। ফিলোসফি ঐ প্রশ্নের উত্তর অভিজ্ঞতার আলোকে যৌক্তিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করে। তবে সেই ব্যাখ্যার গ্রহনযোগ্যতা ইমপিরিকালী ভেরিফাই করেনা। আর বিজ্ঞান যৌক্তিকভাবে প্রদত্ত ব্যাখ্যা এক্সপেরিমেন্টালী ভেরিফাই না করে তাকে স্বীকৃতি দেয়না। প্রমান ছাড়া বিজ্ঞান কোন কিছুই গ্রহন করেনা।

প্রাচীনকালে ছিলো মিথ, তারপর এলো ফিলোসফি আর তারপর আধুনিক যুগকে ডোমিনেট করছে বিজ্ঞান।

একটা অফ-টপিক: আমাদের দেশে ইদানিং মিথ-এর পরিমান আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা প্রগতিশীলতা নয়, পশ্চাদপদতা।

সায়েন্স আর রিসার্চের জন্ম একই সাথে বলা যায়। সায়েন্স ছাড়া রিসার্চ হয়না, আর রিসার্চ ছাড়া সায়েন্স হয়না।

রিসার্চ-এর একটা বড় উদ্দেশ্য হলো নতুন নতুন জ্ঞান তৈরী করা। যে জাতি নতুন নতুন জ্ঞান তৈরী করতে পারেনা তারা অনেকটাই বাধ্য হয় অন্যান্য জাতিকে অনুসরন করতে। গবেষণা ও জাতীয় উন্নয়ন মোটামুটি প্রতিশব্দ।

ড. জিয়াউল হক স্যার বললেন,

১। রবীন্দ্রনাথ তার ‘গোরা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার আগে মোট এগারোবার লিখেছিলেন। অর্থাৎ তিনি প্রথমবার লিখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তাই আরো দশবার তাকে সংশোধন-পরিবর্তন-পরিবর্ধন ইত্যাদি করতে হয়েছে। একটি উপন্যাসকে যদি প্রকাশনার আগে দশবার সংশোধন করতে হয় তাহলে একটা গবেষণাপত্রকে প্রকাশনার আগে কতবার সংশোধন করতে হবে! ভেবে দেখুন।
২। একটি গবেষণাপত্রকে একটি উপন্যাসের মতই ইন্টারেস্টিং হতে হবে। একটি উপন্যাসের একটি পাতা পড়ার পর যেমন পরবর্তি পাতাটি পড়ার আগ্রহ জাগে, পরবর্তি পাতাটি পড়ার পর যেমন তার পরবর্তি পাতাটি পড়ার জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে, একইভাবে একটি গবেষণাপত্র-এর একটি পাতা পড়ার পর যেন পরবর্তি পাতাটি পড়ার আগ্রহ জাগে, তারপর তার পরের পাতাটি, তারপর, তারপর, এভাবে একজন পাঠক যেন পূর্ণ আগ্রহ নিয়ে গবেষণাপত্রটির শেষ পর্যন্ত পড়েন। তাহলে গবেষণাপত্রটিকে সফল বলা যেতে পারে।
৩। রিসার্চ কোশ্চেন – কোশ্চেন আর রিসার্চ কোশ্চেন-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। কোশ্চেন হলো আপনি কেমন আছেন? কি দিয়ে ভাত খেয়েছেন? কোথায় যান? ইত্যাদি, আর রিসার্চ কোশ্চেন হলো সেই কোশ্চেন যার উত্তর দিতে হলে রিসার্চ করতে হবে। রিসার্চ করার পরে সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া যাবে। উদাহরণ: আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরটি অন্য কোন দেশকে ব্যবহার করতে দিলে আমাদের কি লাভ হবে? রিসার্চ না করে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে না।

ড. ইউসুফ স্যার বললেন,
‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’ ‘বাংলাদেশ বিমানের’ মতই একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান ছিলো। একবার এক গবেষক তার পিএইচডি ডিসার্টেশনের টপিক করলেন ‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’-কে নিয়ে। এবং তার ঐ অভিসন্দর্ভপত্রে তিনি ‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’-এর যাবতীয় দোষ-ত্রুটি দুর্বলতা সমস্যা ইত্যাদি বিস্তারিত তুলে ধরলেন। এবং পাশাপাশি কিভাবে এর সমাধান ও উন্নয়ন করা যা্য তা উল্লেখ করলেন। এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ার পরে মালেয়শীয় সরকার ও এয়ারলাইন্স বিষয়টির দিকে নজর দিলো এবং সেই মোতাবেক যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে সমস্যাগুলোর সমাধান করলো ও তার উন্নয়ন করলো। এভাবেই গবেষণা কোন কিছুকে আমূল পাল্টে দিতে পারে।

Literature Review (পূর্ববর্তি জ্ঞানসমূহ পর্যালোচনা):
গবেষণা শুরু করার আগে গবেষককে অনেক বই-পত্রিকা-জার্নাল-সাইট ইত্যাদি অনেক কিছু পড়তে হবে নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যেগুলিতে
1. ইতিপূর্বে এই নিয়ে কেউ কাজ করেছে কি না?
2. পূর্বে যারা এই জাতীয় টপিক নিয়ে যারা রিসার্চ করেছে তাদের উইকনেসই হলো বর্তমানে যিনি রিসার্চ করবেন তার স্ট্রেংথ।
3. আগের গবেষকের রিসার্চ গ্যাপ থাকলে তা পূর্ণ করা।
4. অথর-দের নাম ধরে ধরে উল্লেখ করতে হবে। উনারা কি করেছেন ও কি করেন নাই মোটামুটি বিস্তারিত বলতে হবে।

Why:

একটি মজার ঘটনা:
টমাস আলভা এডিসন-কে ট্রেনের টিকেট চেকার এসে বললো —
চেকার: ইয়োর টিকেট প্লিজ।
এডিসন: হোয়াই?
চেকার: (বিস্মিত ও বিরক্ত হয়ে, আরো উচ্চকন্ঠে বললো) শো মি ইয়োর টিকেট।
এডিসন: হোয়াই?
এবার চেকারের ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে গেলো। সে এডিসনের কান বরাবর একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
আবারো এডিসন প্রশ্ন করলেন,
এডিসন: হোয়াই?

ঘটনাটির মোরাল হলো – গবেষক সর্বক্ষণই কেবল প্রশ্ন করবেন ‘হোয়াই?’ ‘হোয়াই?’ ‘হোয়াই?’
(প্রফেসর জিয়াউল হক স্যারের কাছ থেকে মজার ঘটনাটি শোনা)

Limitation of a research paper (গবেষণাপত্রটির সীমাবদ্ধতা):
১। আমি রিসার্চটি এই হতে এই পর্যন্ত করেছি, এর আগে বা পরে করিনি। যেমন, ব্রহ্মপুত্র নদীর স্রোত চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, গবেষক কেবল ভারতের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত অংশটুকু নিয়ে কাজ করেছে, চীন ও বাংলাদেশ অংশটুকু নিয়ে কাজ করেননি – এটা লিমিটেশন। অথবা ঐ নদীর স্রোত নিয়ে কাজ করেছেন ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, তার আগে বা পরের সময় নিয়ে কাজ নিয়ে কাজ করেননি – এটা লিমিটেশন।
২। গবেষক এই এই তথ্য যোগাড় করতে পেরেছেন, এই এই তথ্য যোগাড় করতে পারেননি, তাই কেবলমাত্র প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা করতে হয়েছে – এটা লিমিটেশন।
৩। এ্যানথ্রোপমেট্রিক্স হিসাবে কেবলমাত্র ককেশিয়ানদের ডাটাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে, নিগ্রোয়িড বা অস্ট্রেলয়িডদের ডাটা ব্যবহার করা হয়নি – এটা লিমিটেশন।

Justification (ন্যায্যতা প্রতিপাদন):
1. কোন একটি রিসার্চ-এ নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট ক্ষেত্র সিলেক্ট করা হয়। প্রশ্নটা হলো নির্দিষ্ট ওটাই সিলেক্ট করা হলো কেন? এই বিষয়টি যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করতে হবে।

Research মানে search:
আমাদের দেশে কিছু কিছু কনফারেন্সে দেখা যায় যে, কেউ একটি প্রজেক্ট করেছে সেটাকে তারা রিসার্চ হিসাবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু আদতে সেটাকে রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। এ’ প্রসঙ্গে একটা উপমা দেয়া যায় – কোন এক ব্যাক্তি বিশাল বড় একটি জাহাজ তৈরী করলো। সে যদি ঐ জাহাজ তৈরীর স্টেটমেন্ট-টি লেখে, এটা কোন রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি পাবেনা, যদিও সে একটি বড় পরিশ্রমের ও প্রয়োজনীয় কাজ করেছে। কারণ সে সেখানে সার্চ করে নতুন কিছু উদ্ঘাটন করেনি। কিন্তু যদি সে এটা উদ্ভাবন করতো যে, কি করে আরো ভালো বা উন্নত একটি জাহাজ তৈরী করা যায়, তাহলে সেটা রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি পেত।

I am different:
একটি রিসার্চ পেপারকে হতে হবে different।
একটি কবিতা আছে,
I am different from my head to my toes
I am different from my eyes to my nose
(Kaylynn)
সেরকম একটি রিসার্চ পেপার-কে অন্যান্য পেপার থেকে different হতে হবে মোটামুটি সব দিক থেকেই।

————————————– X——————–X———————————————

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ১
(নিম্নের লিংকে)

গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা

মন্তব্য করুন..

১ মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.