ডেমোক্রেসি-র টুকিটাকি

ডেমোক্রেসি-র টুকিটাকি:
—- ড. রমিত আজাদ

নির্বাচিত শাসক পদ্ধতি আমাদের উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। যতদূর জানা যায় মহামতি বুদ্ধের পিতা শুদ্ধোধন এমন একজন নির্বাচিত শাসক ছিলেন।
গ্রিসে এই নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে আরো পরে। তার আগে বলি ডেমোক্রেসি-র এটিমোলজি। এখানে দুটি গ্রীক শব্দ আছে, ‘দেমোস’ মানে সাধারণ মানুষ আর ‘ক্রাটোস’ মানে শাসন, অর্থাৎ ডেমোক্রেসি মানে হলো সাধারণ মানুষের শাসন। গ্রীসে অভিজাত (এরিস্টোক্রেট) ও সাধারণ (দেমোস)-দের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, এবং এতে প্রচুর হতাহত হয় ও দেশে অরাজকতা নেমে আসে। এই অরাজকতার হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করতে দার্শনিক ও শাসক সোলন একটি রিফর্ম আনেন, যাতে দেমোস-দের স্বার্থের দিকেও নজর রাখা হয়। সেই থেকে গ্রিসে ডেমোক্রেসি বিষয়টি চালু হয়। সংঘর্ষ ও রক্তপাত ঠেকানোর জন্য অনেকটা বাধ্য হয়েই রিফর্মটি করতে হয়েছিলো সোলন-কে। তারপর একসময় চালু হয় নির্বাচন পদ্ধতি (সেই পদ্ধতির অবশ্য রকমফেরও ছিলো)।
এদিকে মহাজ্ঞানী সক্রেটিস ছিলেন ডেমোক্রেসির ঘোরতর বিরোধী। তিনি মনে করতেন কেবলমাত্র জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শাসক নির্বাচিত করা যেতে পারেনা, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা করার ভার তাকেই দিতে হবে যার সেই গুনাগুন ও দক্ষতা রয়েছে। তার শিষ্য প্লেটো ডেমোক্রেসি-র বিপরীতে ‘ফিলোসফার কিং’ ও ‘রিপাবলিক’-এর ধারণার রূপরেখা দিয়েছিলেন।
রোমান রিপাবলিকে একধরনের শাসক নির্বাচনের একটি ব্যবস্থা ছিলো, তবে সেখানে ওয়েটি ভোটের সিস্টেম ছিলো। মেধাবী ও পড়ুয়া কিশোর ব্রুটাস প্লেটোর রিপাবলিক পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, এবং রাষ্ট্র যে একজন ‘এনলাইটেন্ড ডিক্টেটর’ কর্তৃক পরিচালিত হওয়া উচিত এমন ধারনা মাথায় ঢুকিয়েছিলেন কনসুল জুলিয়াস সিজারের মাথায়। পরবর্তিতে জুলিয়াস সিজার রোমের ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর প্রচলিত পদ্ধতিকে পরোয়া না করে প্রতাপশালী ডিক্টেটর-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তবে এটাই তার কাল হয়, তিনি সিনেটরদের রোষে পড়েন। সিজার রিপাবলিক ধ্বংস করছে এমন অভিযোগে তার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ও শেষ পর্যন্ত সেই ব্রুটাস-এর নেতৃত্বেই সিনেটরদের একটি গ্রুপ সিজার-কে হত্যা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো ডিক্টেটরশীপের অবসান ঘটিয়ে ‘রিপাবলিক’ পদ্ধতিকে পূণঃপ্রতিষ্ঠা করা।

সপ্তম শতকে ইসলামী খেলাফতে খোলাফায়ে রাশেদীন-এর খলিফারা নির্বাচিত ছিলেন।
অস্টম শতকে ইমাম জয়নাল আবেদীন রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-রিসালা-আল-হুকুক’ (অধিকারশাস্ত্র) মানবাধিকারের উপর রচিত প্রথম গ্রন্থ।
অস্টম শতকে বাংলার শাসক গোপাল-ও নির্বাচিত শাসক ছিলেন।
১০৫৯ সালের আগে পোপ সিলেকসন-এর কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিলোনা। তবে 1276 সাল থেকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি পোপ নির্বাচিত হতে শুরু করেন।
পনেরো-ষোল শতকে আমেরিকার Iroquois Nation-এর মধ্যে ডেমোক্রেটিক সোসাইটি ছিলো।
সতেরো শতকের দিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় কিছু কিছু নির্বাচন হতে শুরু করে।
বৃটেনে প্রথম পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭০৭ সালে, তবে সেখানে ভোট দিতো টোটাল পপুলেশনের মাত্র তিন পারসেন্ট।
১৭৮৯ সালে ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে জর্জ ওয়াশিংটন স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ফ্রান্সে ১৭৮৯ সালে adopt করা হয় the Declaration of the Rights of Man and of the Citizen এবং ১৭৯২ সালে ফ্রান্সে short-lived একটি National Convention নির্বাচিত হয়েছিলো, সেখানে সব পুরুষরা ভোট দিয়েছিলো (নারীদের ভোটাধিকার ছিলোনা)।

১৮৪৮ সালে ঐতিহাসিক ফরাসী বিপ্লবের পর ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় অনুরূপ বিপ্লব হতে শুরু করে ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবী ওঠে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পিছনে ইমানুয়েল কান্ট-এর বিখ্যাত লেখা What is Enlightenment? প্রবন্ধটির ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া ভল্টেয়ারের দর্শন ও সাহিত্যকর্মেরও অবদান রয়েছে।

পরিশেষে ১৮৬৩ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান আব্রাহাম লিংকন উনার ঐতিহাসিক Gettysburg Address (1863)-এ আধুনিক গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়ন করেন নিম্নরূপে – “government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth”।
আমাদের বাংলায় প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন (বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচন) হয় ১৯৩৭ সালে বৃটিশ শাসনামলেই এবং সেখানে নির্বাচিত হয়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শের-ই-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।

হিটলার গণতন্ত্র পছন্দ করতেন না, তিনি বলেছিলেন, “গণতন্ত্র এমন একটা পদ্ধতি যেখানে মানুষের চারিত্রিক গুনাবলীর কোন মূল্যায়ন হয়না, যা হয় তা হলো, এক শ্রেণীর অযোগ্য-অপদার্থের সংখ্যাগরিষ্টতার প্রাধান্য”।

প্রাচীন গ্রীসে ডেমোক্রেসি বলতে যা বোঝাতো আধুনিক যুগে এসে তা অনেক বেশী সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন আমরা গণতন্ত্র বলতে বুঝি ১। বাক স্বাধীনতা, ২। চিন্তার স্বাধীনতা, ৩। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ৪। নিজ পছন্দ অনুযায়ী দার্শনিক ধর্মীয় রাজনৈতিক মতাদর্শ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা, ৫। মানবাধিকার ৬। ন্যায়বিচার ৭। নির্বাচন, ৮। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ৯। সংবিধান, ১০। নির্বাচিত পার্লামেন্ট, ১১। নির্বাচিত সরকার। (উল্লেখ্য: নির্বাচন নিয়ে আপাতত: কোন বিতর্ক নেই, তবে নির্বাচন পদ্ধতি কেমন হবে সেই নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন নির্বাচন পদ্ধতি রয়েছে।

যারা সমাজে ও দেশে উপরোক্ত এগারোটি বিষয় নিশ্চিত করতে চান নিজের ও অপরের জন্য, তারাই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.