দীর্ঘকাল প্রতাপশালী ডিক্টেটর, তারপর হঠাৎ ধপাস!

দীর্ঘকাল প্রতাপশালী ডিক্টেটর, তারপর হঠাৎ ধপাস!

বলছিলাম রুমেনিয়ার একসময়কার রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই চসেস্কু-র কথা। ক্ষমতার লোভে অথবা অন্য কোন উদ্দেশ্যে অন্ধ শাসকেরা প্রতিবাদী কন্ঠের টুটি চেপে ধরে তা চিরকালের জন্য স্তব্ধ করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে যুগে যুগে। পরিণতিতে সেই শাসকরা হয়ে পড়েছে জনবিচ্ছিন্ন, তারপর একসময় গণধিকৃত হয়ে অপমানজনকভাবে সিংহাসনচ্যুত হয়েছে। ইতিহাসে তারা স্থান পেয়েছে সত্য, তবে তা বিশ্ববাসীর ঘৃণায়।

আমার এখনো মনে পড়ে, আমি যখন স্কুল গোয়িং, বাংলাদেশের যুবসমাজে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার তখন রমরমা অবস্থা। সে সময় বামদের হাতে ধরা লাল লাল বইয়ে পড়তাম যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো স্বর্গরাজ্য। স্বাভাবিক সালামের পরিবর্তে লাল সালাম বিনিময়কারী নাস্তিকেরা বলতো, ‘অত শান্তিতে পৃথিবীর কোন দেশের মানুষ থাকে না’। অথচ এই একজীবনেই দেখলাম চোখের সামনে কিভাবে দ্যা সো-কল্ড শক্ত ভিতের উপর দাঁড়ানো সোভিয়েত ইউনিয়ন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। সেই সাথে দেখলাম তছনছ হয়ে যাওয়া পূর্ব ইউরোপ, ও দেখলাম রুমানিয়ার ডিক্টেটর নিকোলাই চসেস্কু-র সস্ত্রীক মৃত্যুদন্ড।
১৯৮৯ সালের ক্রিসমাস ডে সমগ্র পৃথিবীকে ঝাঁকুনি দিয়েছিলো। ১৯৬৭ সালে কমিউনিস্ট রুমানিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসা চসেস্কু সুশাসক হওয়ার খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। সমাজতান্ত্রিক রুমানিয়ায় বাকস্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তা বলে কিছু ছিল না। ক্ষমতাসীনদের যেকোনো ধরনের সমালোচনা ও বিরুদ্ধতাকে নিষ্ঠুর ভাবে দমন করা হতো। দেশের সর্বত্র ছিল গোপন পুলিশের উপস্থিতি। পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া পুরো দেশটাই ছিলো একটি কারাগার।

বিরামহীন ক্ষমতায় বিশ্বাসী লালদের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হলো ১৯৮৪ সালে, যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতায় এলেন স্বল্পপরিচিত ও তুলনামূলকভাবে তরুণ মিখাইল গর্বাচেভ। উনার প্রবর্তিত দুটি নীতি (পেরেস্ত্রয়কা ও গ্লাস্তনস্ত) অনেক বাঘা বামকেই ভাবিয়ে তুললো। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকলে যা হয় আর কি! প্রকৃত সমাজতন্ত্রের অবস্থা ঘরে-বাইরে কেউই আঁচ করতে পারেনি। কেবল তোতা পাখীর মত আউরিয়েই গিয়েছে ‘ভালো ভালো ভালো’।

আস্তে ধীরে বোঝা গেলো যে, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ভিতরে মহাঘাপলা। বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তাহীনতার এই সমাজব্যবস্থায় কাঠামোগতভাবে দেশ রূপ নেয় পুলিশি রাষ্ট্রে ও পুরো দেশটাই হয়ে ওঠে কারাগার। ঘুনে ধরে ভিতরটা ফাঁপা হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে।
যাহোক, সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পালের গোদা খোদ সোভিয়েতই যখন দুলতে লাগলো পরিবর্তনের ঢেউয়ে, ক্ষুদ্র দেশগুলো তখন খোলামকুচির মত কম্পমান। এরকম একটা পর্যায়ে ১৯৮৯ সালে রুমেনীয়ার রাজধানী বুখারেস্টে কম্যুনিজম বিরোধী গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সেই বিক্ষোভ ঠেকাতে পাগল হয়ে চসেস্কু আর একদফা শুরু করে গণহত্যা, গণগ্রেফতারসহ নানাবিধ স্বৈরাচারী আচরণ। তারপরেও শেষরক্ষা হয়নি, টিকে থাকতে পারেননি তিনি। ঐ বছর ২২ ডিসেম্বরে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে কমিউনিস্ট পার্টির সদর দপ্তরের বাইরে আন্দোলনকারী বিক্ষুব্ধ জনতা জমায়েত হলে চসেস্কু ও তাঁর স্ত্রী হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যান। কিন্তু পালানো সম্ভব হয় না, ধরা পড়েন তারা, জনতাই ধরিয়ে দেয়। যেই বাহিনী একসময় তার অনুগত ছিলো, সেই বাহিনীই তাকে ধরে নিয়ে আসে।

চসেস্কুরই নিযুক্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী Victor Stănculescu চাইলেন তাকে দ্রুত মৃত্যুদন্ড দিতে। কিন্তু রুমেনিয়ার provisional president জনাব Ion Iliescu চাইলেন একটি বিচার-এর বন্দোবস্ত করতে। ১৯৮৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর ক্রিসমাসের দিনে, সামরিক আদালতে মাত্র এক ঘণ্টার বিচার শেষে স্ত্রীসহ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয় রুমানিয়ার স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কুকে। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে চসেস্কুর বাইশ বছরের স্বৈরশাসনের। যে দেয়ালে ঠেকিয়ে তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো তা এখন জাদুঘর।

উনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ছিলো
Genocide – over 60,000 victims
Subversion of state power by organizing armed actions against the people and state power.
Offense of destruction of public property by destroying and damaging buildings, explosions in cities etc.
Undermining the national economy.
Trying to flee the country using funds of over $1 billion deposited in foreign banks.

ঐ ডিক্টেটর দম্পতির ট্রায়ালে একজন আইনজীবি বলেছিলেন, “এটা ছিলো গণহত্যা, মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে, শীতার্ত রেখে, অন্ধকারে রেখে গণহত্যা। আর সবচাইতে বীভৎস অপরাধ ছিলো, পুরো জাতির আত্মা-কে দমন করা।” উল্লেখ্য যে এই ঘটনার এক দশক আগে অনুরূপ ট্রায়াল হয়েছিলো চীনের মাও সেতুং-এর স্ত্রীর। সেখানেও অনুরূপ বক্তব্য রেখেছিলেন আইনজীবিরা।
চসেস্কু-র মৃত্যুদন্ডকে সমর্থনকারী একজন রুমেনীয় নাগরিক বলেছিলো, “গুলি করে হত্যা করা, এই দৃশ্য পুরো রুমেনীয়া জুড়ে আমরা অসংখ্যবার দেখেছি বহু বছর চসেস্কুর শাসনামলে। আজ সেটাই ফিরে এলো চসেস্কুর নিজ জীবনে।”

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.