দুর্বলচরিত্র গ্রীক-রোমান দেব-দেবী, প্লেটো, সেন্ট অগাস্টিন ও ‘দি সিটি অব গড’

দুর্বলচরিত্র গ্রীক-রোমান দেব-দেবী, প্লেটো, সেন্ট অগাস্টিন ও ‘দি সিটি অব গড’:

প্রবল প্রতাপশালী রোম নগরী ৪১০ খ্রীষ্টাব্দে লুন্ঠিত হয় গথদের দ্বারা। রোমের এই বিপর্যয়ে অনেকটাই উল্লসিত হয়ে প্যাগান (মূর্তিপূজারী)-রা বলতে শুরু করে যে, প্রাচীন দেব-দেবীদের উপাসনা বন্ধ করে দেয়ার কারণেই রোমানদের এই করুণ হাল হয়েছে। যতদিন জুপিটারের উপাসনা হয়েছে ততদিন রোম শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিলো। যেহেতু এখন আর জুপিটারের উপাসনা হয় না, তাই দেব-দেবীরা রোম রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি।

প্যাগানদের এই টিপ্পনীর উত্তর দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে। এগিয়ে আসেন একেশ্বরবাদী সেন্ট অগাস্টিন (Augustine of Hippo), ৪১২ থেকে ৪২৭ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ধীরে ধীরে লেখেন গ্রন্থ ‘The City of God Against the Pagans’, সংক্ষেপে এই বইকে বলা হয় ‘দি সিটি অব গড’, যা কালজয়ী হয়েছিলো। এই গ্রন্থে তিনি প্যাগানদের টিপ্পনীর ও খোঁড়া যুক্তিগুলোর যথাযথ উত্তর দেন।

গ্রন্থটিতে পরিকল্পিত আকারে দেখানো হয়েছে যে, খ্রীষ্টপূর্ব সময়েও (প্যাগান যুগে) রোমে অধিকতর খারাপ ঘটনা ঘটেছে। সেন্ট অগাস্টিন বলেন, যেসব প্যাগান-রা টিপ্পনী কেটেছে, লুন্ঠনের সময় তাদের অনেকেই চার্চে আশ্রয় নিয়েছিলো, এবং গথরা চার্চগুলো আক্রমণ না করায় তারা বেঁচে যায়। অপরপক্ষে ট্রয় নগরী লুন্ঠনের সময় ট্রয়বাসীগণ জুনোর মন্দিরে আশ্রয় গ্রহন করেও রক্ষা পায়নি, কিংবা দেব-দেবীগণ শহরটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেনি (ইলিয়াড পাঠে জানা যায় যে, দুশ্চরিত্র দেব-দেবীদের রেষারেষিতেই মানুষের হাতে তিল তিল করে গড়া ওঠা ট্রয় নগরী ধ্বংস হয়েছিলো)। এমনকি খোদ রোমানগণও যুদ্ধজয়ের পর কোন নগর লুন্ঠনের সময় মন্দির লুন্ঠন বাদ রাখেনি (এখান থেকেই হয়তো কথা এসেছে যে, ‘নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না’)। এদিক থেকে গথদের কর্তৃক রোম লুন্ঠন ছিলো অধিকতর লঘুমাত্রার। সেন্ট অগাস্টিন-এর মতে একেশ্বরবাদী হওয়ার কারণেই রোমের এই শান্ত অবস্থা ছিলো।

তিনি আরো বলেন যে, এই লুন্ঠনের ফলে গথদের সাময়ীক অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বা ফায়দা দেখে মন খারাপ করার বা আফসোস করার কিছু নাই, কারণ পার্থিব কিছু সুখ তারা পেলেও, তাদের অপকর্মের ফলস্বরূপ পরকালে তারা শাস্তি ভোগ করবে। এই পৃথিবীতেই যদি সব শাস্তি হয়ে যায় তাহলে শেষ বিচারের আর কোন প্রয়োজন পড়ে না। পক্ষান্তরে রোমের যেসব একেশ্বরবাদীরা এই লুন্ঠনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা যদি পূণ্যবান হন, তাহলে পরিনামে তারা মানসিক ও নৈতিকভাবে উন্নত হবেন।

এরপর তিনি অধার্মিক দেব-দেবীদের নীতিবিবর্জিত চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করেন। উদাহরণ: ‘তোমাদের নাট্যমঞ্চে অভিনীত নাটকে অপবিত্র বিষয়ের প্রদর্শনী, কাম-লালসার বিষয় মানুষের দুর্নীতি দ্বারা সর্বপ্রথম রোমে আনয়ন করা হয়নি, বরং তোমাদের দেব-দেবীর প্রত্যক্ষ নির্দেশে এগুলো এসেছে।’

সেন্ট অগাস্টিন মনে করতেন যে ঐসব দুশ্চরিত্র দেব-দেবীদের উপাসনা করার চাইতে পূণ্যবান কোন মানুষের উপাসনা করা অধিকতর ভালো। তাই রোম লুন্ঠনে একেশ্বরবাদী খ্রীষ্টানদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন প্রয়োজন নাই। কারণ তাদের রয়েছে ‘ঈশ্বরের তীর্থযাত্রার নগর’।

দেব-দেবী-দের নৈতিক নির্দেশনাবলী দুর্বল, কারণ তারা নিজেরাই দুর্বল চরিত্রের। সেন্ট অগাস্টিন মনে করতেন দেব-দেবী-রা অশুভ আত্মা।

দার্শনিক প্লেটো দেখিয়েছিলেন যে, উনার একক কার্যাবলীর মূল্য, ঐ সকল দুর্বল চরিত্রের দেব-দেবী-দের কাজের মূল্যের চাইতে বেশী। প্লেটো উপলদ্ধি করেছিলেন যে, ঈশ্বর কোন দেহধারী বস্তু নয়, কিন্তু সব বস্তুই ঈশ্বর এবং অপরিবর্তনীয় কোন কিছু থেকে সত্তাপ্রাপ্ত হয়।

(আমার সেন্ড করা এই স্ট্যাটাসটি ফেসবুকে প্রকাশিত হয়েছিলো ৬ই জুন, ২০১৭ তে)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.