পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ২

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ২
————————- ড. রমিত আজাদ
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সময়ের প্রহেলিকা বুঝতে গেলে স্বভাবতঃই জানা প্রয়োজন, স্থান (space) ও কাল (time) কি? আমার ইতিপূর্বে রচিত ‘রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা’ সিরিজের পর্ব ৩-এ স্থান ও কাল সম্পর্কে মোটামুটি বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম, সেই লেখা থেকে একটা অংশ তুলে ‘সময়’ সংক্রান্ত আলোচনার উপর আলোকপাত করলাম।

স্থান ও কাল:
স্থান কি ও কাল কি? মানব জ্ঞান ও মানব জাতির ইতিহাসে এটি মৌলিক প্রশ্ন সমূহের একটি। মানব ইতিহাসের গতিধারায় স্থান ও কালের ধারনাও পাল্টেছে বহুবার। বস্তুর এই গুনাগুন (attributes) দুইটিকে সম্মিলিত ভাবেই অধ্যয়ন করা হয়। কারণ এরা একে অপরের সাথে জড়িত।

স্থানের প্রকৃতি, গুনাবলী ও অস্তিত্বের ধরণ নিয়ে বিতর্ক চলছে সেই অনাদিকাল থেকে। যেমন প্লেটোর ট্রিটিজ (treatise) Timaeus অথবা সক্রেটিসের khora (অর্থাত্ “স্থান”), অথবা এরিস্টটলের (ডেল্টা বইয়ের IV নং অধ্যয় ) topos (অর্থাৎ জায়গা)-এর সংজ্ঞা, অথবা ১১ তম এর শতাব্দীর আরব polymath আলহাজেন-এর “স্থান সম্পর্কিত ডিসকোর্স (Qawl fi al-Makan)”-এর মধ্যে “স্থানের জ্যামিতিক ধারণা” “space qua extension” হিসাবে আলোচিত হয়েছে।

রেনেসাঁ-র যুগেও এই সকল চিরায়ত দার্শনিক প্রশ্নগুলো আলোচিত হয়েছে । তারপর ১৭ শতাব্দীতে বিশেষত চিরায়ত বলবিজ্ঞানের প্রথম যুগে তাদেরকে পূণর্বিন্যাসও করা হয়েছে। স্যার আইজাক নিউটনের মতে, স্থান হচ্ছে পরম – অর্থাৎ স্থান স্থায়ীভাবে এবং স্বাধীনভাবে চিরকাল ছিল ও আছে। সেই স্থানে বস্তু থাকুক বা না থাকুক তার উপর স্থান নির্ভরশীল না।

গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এবং এপিকুরাস মনে করতেন স্থান হলো সমসত্ত্ব (homogenous) ও অসীম শূণ্যতা, যা কম বেশী পরমাণু দ্বারা পরিপূর্ণ।

অন্যান্য প্রাকৃতিক দার্শনিকরা, যাদের মধ্যে Gottfried Leibniz-এর নাম উল্লেখযোগ্য, তিনি ভেবেছিলান যে স্থান হচ্ছে বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি সংগ্রহ, যা নির্ধারিত হচ্ছে একে অপরের থেকে তাদের দূরত্ব এবং দিকবিন্যাস দ্বারা। ১৮ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ জর্জ বার্কলে তার রচনা “Towards a New Theory of Vision” – এ “স্থানিক গভীরতার দৃশ্যমানতা” (visibility of spatial depth) সম্পর্কে নতুন ধরনের বিবৃতি প্রদান করেন।

পরবর্তীতে, অধিবিদ্যাবিদ (meta-physician) ইমানুয়েল কান্ট বলেন স্থান বা সময় কাউকেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে (empirically) হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না, তারা একটি পদ্ধতিগত কাঠামোর উপাদান যা মানুষ তার সকল অভিজ্ঞতা কাঠামোগত করার জন্য ব্যবহার করে থাকে।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে গণিতবিদরা অ-ইউক্লিডিয় জ্যামিতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন, যেখানে স্থান আর সমতল নয় বরং বক্র।
আমাদের এ যাবৎকাল যা জানা আছে তার মধ্যে সময় সম্পর্কে লিখিত প্রাচীনতম লেখাটি মিশরীয় চিন্তাবিদ প্টাহহোটেপ (Ptahhotep (c. 2650–2600 BCE))-এর তিনি বলেছিলেন: “Do not lessen the time of following desire, for the wasting of time is an abomination to the spirit.” আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ বেদ (খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ সালে লিখিত বলে ধারণা করা হয়)-এ বিশ্বতত্ব (cosmology)-এর বর্ণনা রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে এই মহাবিশ্ব চক্রাকারে বারংবার সৃস্টি, বিকাশ, ধ্বংস ও পূনর্জন্মের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি চক্রের বয়স ৪৩২০০০০ (তেতাল্লিশ লক্ষ বিশ হাজার ) বছর ।

গ্রীকরা যেমন ধারণা করেছিল যে, এই মহাবিশ্বের রয়েছে অসীম অতীত এবং এর কোন শুরু নাই। গ্রীকদের বিপরীতে মধ্যযুগীয় দার্শনিক ও ধর্মতত্ববিদরা এই ধারণা বিকশিত করেন যে, মহাবিশ্বের একটি সসীম অতীত ও প্রারম্ভ রয়েছে । এই দৃস্টিভঙ্গী উৎস হলো তিনটি আব্রাহামীক ধর্ম (Abrahamic religions): ইহুদী, খ্রীস্টান ও ইসলাম ধর্ম। যে সকল দার্শনিক এই ধারণাকে বিকশিত করেন তারা হলেন, খ্রীস্টান দার্শনিক জন ফিলিপোনাস, ইহুদী দার্শনিক সাদীয়া গাওন, মুসলিম দার্শনিক আল কিন্দি, আল গাজ্জালী প্রমুখ। অসীম অতিতের ধারণার বিপরীতে তারা দুইটি যুক্তি ব্যব হার করেন, প্রথমতঃ “সত্যিকারের অসীম বলে কোন কিছু থাকা সম্ভব না”। যা বলে “ঘটনসমুহের (events) অসীম সময়গত ক্রমাগত প্রত্যাবর্তনই হলো সত্যিকারের অসীম” (An infinite temporal regress of events is an actual infinite.”), ” “ঘটনসমুহের অসীম সময়গত ক্রমাগত প্রত্যাবর্তনের কোন অস্তিত্ব নেই (∴ An infinite temporal regress of events cannot exist)”
দ্বিতীয় যুক্তিটি হলো, ” সত্যিকারের অসীমকে পরবর্তীকালীন যোগ দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব না (An actual infinite cannot be completed by successive addition.”)। দ্বিতীয় যুক্তিটি খ্যাতিমান হয়ে ওঠে ইমানুয়েল কান্ট যখন তাকে তার নিবন্ধ the first antinomy concerning time – এ ব্যবহার করেন।১১ শতকের শুরুতে মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজেন (Ibn al-Haytham (Alhacen or Alhazen) তার গ্রন্থ ‘আলোকবিজ্ঞান’-এ স্থান উপলদ্ধি ও তার জ্ঞানতত্ব বিষয়ক প্রয়োগ (space perception and its epistemological implications ) নিয়ে আলোচনা করেন। পূর্বে স্থানের দৃষ্টিগত যে উপলদ্ধি ছিল, আল হাজেনের পরীক্ষামূলক প্রমাণের পরে সেই ধারনা বদলে যায়। তিনি টলেমি ও ইউক্লিডের স্বজ্ঞাজনিত স্থান উপলদ্ধি ( intuitiveness of spatial perception )-কে একবাক্যে বাতিল করেন, তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থির করার লক্ষ্যে, আকৃতি ও দূরত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা না থাকলে দৃষ্টি আমাদেরকে প্রায় কিছুই বলতে পারবে না (Without tangible notions of distance and size for correlation, sight can tell us next to nothing about such things.”

দক্ষিণ আমেরিকার ইনকারা স্থান ও কাল-কে একীভূত (single concept) মনে করত, তারা স্থান-কাল-এর একটি নাম দি্যেছে, পাচা (pacha), আন্ডিজ পর্বতমালার অধিবাসীরা এখনো এই ধারণাই পোষণ করে।

নিউটন-লেইবনিজ স্থান-কাল বিতর্কঃ
স্থান ও কাল নিজে নিজেই সত্যিকার অবজেক্ট (real objects ) নাকি তারা সত্যিকার অবজেক্ট সমূহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক এই নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল দুই খ্যাতিমান বিজ্ঞানী স্যার ইসাক নিউটন ( Isaac Newton ) ও গটফ্রীড লেইবনিজ (Gottfried Leibniz)-এর মধ্যে। স্যার ইসাক নিউটন মনে করতেন স্থান ও কাল বস্তুর উপর নির্ভরশীল নয়। স্থান আরও যথাযথভাবে বললে চরম স্থান হলো একটি শূণ্য আধার যা নানাবিধ কায়া (body) ধারণ করে। এই আধার (স্থান) গতিহীন, অবিরাম ও সকল বিন্দুতে ও সকল দিকে সমসত্ত্ব (homogeneous)। এখানে কায়াগুলো থাকে তবে কায়াগুলো স্থানকে অথবা স্থান কায়াগুলোকে কোনভাবেই প্রভাবিত করেনা। একইভাবে সময় হলো পরম যা কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়। সময়ের তীর অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বহমান। স্থান যেমন কায়ার আধার সময় তেমনি ঘটনার আধার । নিউটন আরো মনে করতেন স্থান ও কাল পরস্পরের উপর নির্ভরশীল নয়।

পক্ষান্তরে স্যার আইজাক নিউটনের ধারণা বা তত্ত্বের বিরোধী আর একটি ধারণা বা তত্ত্ব প্রতিস্ঠিত হয় এরিস্টটলের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করেন গটফ্রীড লেইবনিজ । এই ধারণা অনুযায়ী স্থান ও কাল বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং তার উপর নির্ভরশীল। স্থান হলো কিছু কায়ার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও কাল হলো কিছু ঘটনার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক । যেখানে কায়া নাই সেখানে স্থান নাই এবং যেখানে ঘটনা নাই সেখানে কাল নাই। মহাবিশ্বের আবির্ভাবের সাথে সাথে জন্ম হয়েছে স্থান ও কালের। আবার মহাবিশ্ব কোন দিন যদি তীরোভুত হয়ে যায়, তার সাথে সাথে স্থান ও কাল-ও তীরোভূত হবে।

এদিকে জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যার আপেক্ষিকতত্ত্ব (Theory of Relativity) নামের বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা বিজ্ঞানের জগতে সূচনা করেছে এক নতুন যুগের, তিনি স্থান ও কাল সম্পর্কে দিয়েছেন আরো একটি নতুন ধারণা। পরবর্তি পর্বে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

পাশাপশি সময় সম্পর্কে খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০ সালে বিস্তারিত আলোচনা করেছে বৌদ্ধ দর্শন। এই বিষয়েও পরবর্তি পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

তারিখ: ২৬শে এপ্রিল, ২০১৭ সাল
সময়: ১৮ ঘন্টা ৩২ মিনিট

সময়ের প্রহেলিকা
—- ড. রমিত আজাদ

হে সময়!
তুমি কি পরম-ধ্রুব নও?
নও কি তুমি অবিচল-স্থির ঐ হিমশৃঙ্গের মত?

নাকি তুমিও প্রসারিত-সংকুচিত হও,
নব যৌবনা তরুণীর বক্ষস্থলে অবরুদ্ধ অস্থির হৃদয়ের মত?

তবে তোমাকে বেঁধে নেই কোন্ কঠিন শাসনে বলো?
মহাজগতের কালের নিয়মে বাঁধা,
আমিও ক্ষণস্থায়ী প্রাণ,
একদিন কাটিব বাঁধন নির্বন্ধ একালের,
অথবা রাখিব পদ
নতুন কোন বিধানতন্ত্র-লোকে।

(সময় (time) পরম কিছু নয়। সেও আপেক্ষিক, নানান প্রসঙ্গ কাঠামোতে তার নানান হিসাব। ধর্মগ্রন্থগুলোতে এ’ সম্পর্কে অনেক আগেই বলা হয়েছিলো। বিজ্ঞান কিছুকাল হয় তা গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছে।)

The Relativity of Time
——— Dr. Ramit Azad
(২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:৫২)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.