পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৩

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৩
————————- ড. রমিত আজাদ
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মহামতি বুদ্ধ-কে ভিক্ষু মালুংক্য পুত্র জগৎ ও জীবন সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। প্রশ্নগুলো হলো ১. জগৎ কি শ্বাশত? ২. জগৎ কি অশ্বাশত? ৩. জগৎ কি সান্ত (স-অন্ত মানে যার শেষ আছে)? ৪. জগৎ কি অনন্ত? ৫. দেহ ও মন কি এক? ৬. দেহ ও মন কি ভিন্ন? ৭. মৃত্যুর পর কি অস্তিত্ব থাকে? ৮. মৃত্যুর পর কি অস্তিত্ব থাকে না? ইত্যাদি।

প্রশ্নগুলো শুনে মহামতি বুদ্ধ বলেছিলেন – “এসব প্রশ্নের মিমাংসার সাথে সৎ জীবন গঠনের কোন সম্পর্ক নেই। ……………..। আমরা যেহেতু দুঃখের সাগরে ভাসছি, আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিৎ এই দুঃখের হাত থেকে কীভাবে বাঁচা যায় তার চেষ্টা করা।”

এখান থেকে এই বোঝা যায় যে, জগৎ শ্বাশত কি অশ্বাশত, সান্ত কি অনন্ত? এই জাতীয় প্রশ্নের উত্তর মহামতি বুদ্ধ দেননি। এই শ্বাশত-অশ্বাশত, সান্ত-অনন্ত-এর সাথে সময় বিষয়টিও চলে আসে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সময় সম্পর্কে আদি বৌদ্ধ দর্শনে কিছু কিছু কথা বলা হয়েছে, আমি নীচে সেইগুলি উল্লেখ করছি:

১। ‘কল্প’ বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে বৌদ্ধ দর্শনে বলা হয়েছে যে,
‘সময় বা কালের আদিও নাই, অন্তও নাই। এই অনাদি অনন্তকালের আবর্তে মহাজাগতিক প্রক্রিয়া চক্রাকারে পুনঃ পুনঃ চলেই যাচ্ছে।মহাজাগতিক প্রক্রিয়ায় চক্রাকারে জগতের সততই আবর্তন বিবর্তন হচ্ছে। বৌদ্ধ দর্শন মতে জগত্ অনিত্য। এই অনিত্য জগতের সৃষ্টি ও বিলয় কালের পরিমাপে কল্প এককরূপে গৃহীত হয়েছে । ইংরেজীতে কল্পকে Cyclic Unit on a Cosmic Scale বলে অভিহিত করা যেতে পারে।’

২। যদিও সময় সকল সাধারণ মানুষদের গ্রাস করে, তদুপরী যে মানুষেরা জ্ঞানদীপ্ত হয়েছে তারা সময়কে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিতে সক্ষম। (Although time is supposed to overwhelm ordinary human beings, yet the one who has attained enlightenment is able to bring time under his control)

৩। সময় বিষয়ে বৌদ্ধ দর্শনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী ‘পরম সময়’-এর ধারণাকে চরম ধরা হয় আবার ‘সময় রহস্যময় মায়া’ এই ধারণাকেও চরম ধরা হয়। তাই দুটার কোনটাকেই সমর্থন না করে সময়কে মহাবিশ্বের একটি বৈশিষ্ট্য হিসাবে ধরা হয়েছে।
(With regard to the problem of time, early Buddhism seems to have followed the middle path, so famous in the history of Buddhist thought. It appears as if it considered absolute time as an extreme and an unnecessary hypothesis. The other extreme is the consideration of time as a mysterious illusion of the intellect. Avoiding both these extremes, the Buddha seems to have considered tune as an essential feature
of the universe and the experience of it.)

৪। বৌদ্ধ দর্শনে সময়ের বিপুলতার কথা বলা হলেও, বলা হয় যে, ঘটনাসমুহ ঘটছে, এই ঘটনাগুলির (events) উপর ভিত্তি করে আমরা সময় পরিমাপ করি।
(while emphasizing the immensity of time, also shows aeon. that we can observe events only and use processes based on these events to I measure time.(8) Thus we derive time from events which are in time (kaalika), but not vice versa.(9)

৫। সৃষ্টি (evolution) ও লয় (dissolution) ঘটে কার্যকারণ তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।

৬। সময়ের বাস্তবতা ও মহাবিশ্বের অসংখ্য উপাদানগুলোর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। (“there is a profound connection between the reality of time and the existence of an incalculable element in the universe,”)

৭। এভাবে সময়ের পর্যায়কে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্য (On the basis of this theory of causality, it is possible to define the three periods of time, past, present, and future, in the following manner: the past is the determined (=bhuuta); the present is the moment of becoming (=bhava); and the future is the as yet undetermined (=bhavya.

৮। সময় হলো অতীত ও বর্তমানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। যে জন্মেছে তার মৃত্যুটা হলো কিছু সময়ের ব্যাপার, মনে জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্টাই হলো সময় বা এক জীবনকাল। (Time is the mediator between the past and the present. Hence for that which is born (jaatassa), death is a matter of time।

৯। বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুন এই ধারণার সমালোচনা করেছিলেন যে, কোন জিনিস (বা পদার্থ) এবং সময় একে অপরের উপর নির্ভরশীল ও একে অপরের সাপেক্ষ। (Naagaarjuna takes up for criticism. His criticism was based on the fact that a thing (bhaava) or its substance (bhaavasvabhaava) and time (kaala) are relative to or dependent upon one another।

১০। নাগার্জুন মনে করতেন যে, দুটি জিনিস সম্পর্কিত হতে পারেনা যদিনা তারা ‘একই সঙ্গে বর্তমান’ (coexistent) হয়। যদি বর্তমান ও ভবিষ্য অতীতের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাহলে বর্তমান ও ভবিষ্য-কে অতীতেই থাকতে হবে। এভাবে বর্তমান ও ভবিষ্য-কে স্বীকৃতি দেয়ার কিছু নাই (Naagaarjuna’s. agrument was based on the assumption that two thing cannot be related unless they are coexistent. Hence, if present and future are held to be contingently related to the past, then both present and future should be in the past. Otherwise they cannot be contingently related. On the other hand, present and future could not exist without being contingent on the past. Hence, according to Naagaarjuna, there is no justification for the recognition of a present and a future time.)।

১১। নাগার্জুন বলেছেন যে, সময়কে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। কেননা, অস্থায়ী ও অস্থির সময়-কে পরিমাপ করা যায়না, কারণ তাকে ম্যানিপুলেট করা যায়না। স্থায়ী ও স্থির সময়কে ম্যানিপুলেট করা যায়, কিন্তু এমন ধরণের সময়ের কোন অস্তিত্ব নেই। (Naagaarjuna pointed out that it is not possible to measure time. He maintained that nonenduring or nonstatic time cannot be measured, because it cannot be manipulated, and that an enduring or static time, although manipulatable, does not exist.)

এই দর্শনের অর্থ হলো এই যে, স্থায়ী ও স্থির-কেই কেবল পরিমাপ করা যায়; আমাদের মনে রাখতে হবে যে পরিমাপের জন্য একটা সাপেক্ষ লাগে। যা অস্থায়ী ও অস্থির তাকে পরিমাপ করবো কি করে, বা সাপেক্ষ নিজেই যদি অস্থায়ী ও অস্থির হয় তাহলে তার দ্বারা আদৌ কোন কিছু পরিমাপ করা সম্ভব কি? উদাহরণ স্বরূপ বলতে চাই যে, গতিশীল কোন কায়ার বেগ মাপা হয় তার অতিক্রান্ত দূরত্ব ও অতিবাহিত সময়ের অনুপাতের দ্বারা। এখন কথা হলো যে, সময় নিজেই যদি অস্থির হয়, তাহলে বেগটা মাপবো কি করে?

১২। নাগার্জুন-এর দর্শন অনুযায়ী, কোন একটি অস্তিত্ববান কাঠামোর সাপেক্ষে সময় যদি থেকেই থাকে তাহলে, ঐ অস্তিত্ববান কাঠামো ছাড়া সময়কে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এরকম কোন অস্তিত্ববান কাঠামো পাওয়া যায়নি। সুতরাং এই হিসাবে, ‘সময় বলে কিছু নেই’। (Naagaarjuna points out that if time exists depending on existential structure, then it cannot be obtained without such structure. But no existential structure is to be found, for he has already refuted such a structure.(59) Hence, according to him, time does not exist।

উপরের সব আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে আদি বৌদ্ধ দর্শন অনুযায়ী সময় আপেক্ষিক (early Buddhism presented an empiricist and relativistic conception of time)।

(চলবে)

তারিখ: ২৭ শে এপ্রিল, ২০১৭।
সময়: ২০ ঘটিকা ।

তথ্যসূত্র:
১। ত্রিপিটক
২। http://buddhism.lib.ntu.edu.tw/FULLTEXT/JR-PHIL/kalupa.htm
৩। https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A7%8C%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7_%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE_%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%B6%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F_%E0%A6%9F%E0%A7%80%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B9#.E0.A6.9A.E0.A6.95.E0.A7.8D.E0.A6.B0.E0.A6.AC.E0.A6.BE.E0.A6.B2
৪। http://www.buddhanet.net/pdf_file/milinda.pdf

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.