পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৪

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৪
————————- ড. রমিত আজাদ
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আল হাইয়াম (Al hazen ((965 – c. 1040 AD).)) যেমন আধুনিক বিজ্ঞানের জনক, তেমনি তিনি অলোকবিজ্ঞানেরও জনক। উনার লেখা বিশ্বখ্যাত বইয়ের নাম The Book of Optics (Arabic: Kitāb al-Manāẓir‎‎ (كتاب المناظر); Latin: De Aspectibus or Perspectiva; Italian: Deli Aspecti) is a seven-volume treatise on optics and other fields of study। আলোকে তিনি অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে অধ্যায়ন করেছিলেন। জ্ঞানী ব্যক্তি হিসাবে গবেষণার জন্যে একটি মোক্ষম বিষয়কেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন। আলোর বেগ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, ‘আলোর গতি অতীব উচ্চ তবে সসীম’। আজ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে এই আলো নিয়ে আলোচনাই সবচাইতে বেশী।

গ্যালিলিও গ্যালিলেই (1564 – 1642) আল হাইয়াম-এর কয়েকশত বছর পরে আলোর গতিবেগ মাপতে গিয়ে হিমসীম খেয়ে শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন যে, ‘আলোকের গতিবেগ অসীম’। আজ আমরা জানি যে, গ্যালিলিও-র এই স্টেটমেন্ট সঠিক নয়। তবে তিনি বেগের একটি সংজ্ঞা ঠিক করে দিয়েছিলেন – ‘বেগ হলো কোন গতিশীল কায়ার অতিক্রান্ত দূরত্ব ও ঐ দূরত্ব অতিক্রম করতে গৃহিত সময়ের ভাগফল বা অনুপাত (v = s/t)। তার মানে হলো বেগ, দূরত্ব ও সময় এই তিন পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। এবার স্বভাবতঃই একটা প্রশ্ন জাগে যে, গ্যালিলিও তুলনা করার জন্য সময়কেই বেছে নিয়েছিলেন কেন? উত্তরটা আসলে খুব সহজ, গ্যালিলিও ‘সময়’-কে ভেবেছিলেন ধ্রুব বা পরম তাই বেগ পরিমাপের জন্য সময়কেই বেছে নিয়েছিলেন। এবার লক্ষ্য করুন যে, যেহেতু বেগ, দূরত্ব ও সময় এই তিন পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত, সেই অনুযায়ী সময় ধ্রুব হলে বেগ ও দূরত্ব সমানুপাতিক (এমনটাই শুরুতে ভাবা হয়েছিলো)। আবার বেগ (v) ধ্রুব হলে সময় ও দূরত্ব পরস্পর সমানুপাতিক।

আমরা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবো যে দুটি ট্রেন বা বাস যদি পরস্পরের মুখোমুখী চলে তাহলে তারা খুব দ্রুতই একে অপরকে অতিক্রম করে চলে যায়। আবার তাদের গতি যদি একই দিকে হয় সেক্ষেত্রে পিছনের ট্রেন বা বাস-এর গতিবেগ যদি বেশী হয় তাহলে সে ধীরে ধীরে সামনের ট্রেন বা বাসটিকে পেরিয়ে যাবে। আর তারা যদি পাশাপাশি চলতে থাকে ও তাদের গতিবেগ একই হয় তাহলে তারা পরস্পরের সাপেক্ষে স্থির আছে বলে মনে হবে। সেক্ষেত্রে এক ট্রেনের যাত্রী আরেক ট্রেনের যাত্রীকে চায়ের কাপও এগিয়ে দিতে পারবে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? এখানে আসে বেগের সংযোজন-বিয়োজন সূত্র। অর্থাৎ ট্রেন দুটি যখন মুখোমুখী হবে তখন তাদের আপেক্ষিক গতিবেগ হবে তাদের দুজনার গতিবেগের যোগফল। এবং ট্রেন দুটি যদি একই দিকে চলে তাহলে সেক্ষেত্রে তাদের আপেক্ষিক গতিবেগ হবে তাদের দুজনার গতিবেগের বিয়োগফল।

এবার মনে করুন যে, আপনি একটি ট্রেনের ছাদে আছেন। ট্রেনটির গতিবেগ ৩০ কিমি/ঘন্টা। ট্রেনটি যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। আপনি ওখানে থেকে একটা ঢিল ছুঁড়ে মারলেন স্টেশন মাস্টারের কপাল বরাবর। ঢিলটির গতিবেগ ১০ কিমি/ঘন্টা। স্টেশন মাস্টারের কপাল বরাবর ঢিলটি আঘাত করবে ৪০ কিমি/ঘন্টা বেগে (বেগের সংযোজন সূত্র (৩০+১০ = ৪০))। আবার ধরুন ট্রেনটি যাচ্ছে স্টেশনের বিপরীত দিকে, এবার আপনার ছোঁড়া ঢিল যাবে ২০ কিমি/ঘন্টা বেগে (বেগের বিয়োজন সূত্র (৩০ – ১০ = ২০ ))। এ পর্যন্ত পুরো বিষয়টা খুবই লজিকাল বা র‍্যাশনাল।

এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গবেষণা করে পাওয়া গেছে যে গ্যালিলিওর কথা ঠিক নয়, আল-হাইয়ামের কথাই ঠিক, মানে আলোর বেগ সসীম এবং পরিমাপ করে সেটা বের করা হয়েছে ৩*১০^৮ মিটার/সেকেন্ড। গবেষণা করে আরো চমকপ্রদ যে বিষয়টি পাওয়া গেছে তা হলো যে, স্টেশনের দিকে যাওয়া ঐ একই ট্রেনের ছাদ থেকে একটি টর্চ লাইটের উৎস থেকে যদি আপনি আলো ফেলেন তাহলে তার গতিবেগ ৩*১০^৮ মিটার/সেকেন্ড, অর্থাৎ যা ছিলো তাই থাকবে; মানে বেগের সংযোজন সূত্র সিদ্ধ হচ্ছে না। অনুরূপভাবে স্টেশনের বিপরীত দিকে যাওয়া ঐ একই ট্রেনের ছাদ থেকে একটি টর্চ লাইটের উৎস থেকে যদি আপনি আলো ফেলেন সেখানেও তার গতিবেগ ৩*১০^৮ মিটার/সেকেন্ড, অর্থাৎ যা ছিলো তাই থাকবে; মানে বেগের বিয়োজন সূত্র সিদ্ধ হচ্ছে না। কেন এমন হয়?

আগেই বলেছি যে, বেগ, দূরত্ব ও সময় এই তিন পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। এবার দেখা গেলো যে বেগ ধ্রুব। দূরত্ব তো ভেরিয়েবল, তাহলে কি? বিস্ময়টা এখানেই, বেগের ঐ সংজ্ঞা-সূত্র অনুযায়ী এবার সময়কে আর ধ্রুব বা পরম ধরা যাচ্ছে না। তাহলে কি বিজ্ঞান মতে সময় পরম নয় বরং আপেক্ষিক?

(চলবে)

তারিখ: পহেলা মে, ২০১৭ সাল
সময়: রাত ০৩ ঘটিকা, ০৩ মিনিট

‘আলো আর আলো দিয়ে,
তোমার খুশিটি নিয়ে,
প্রেমকে নতুন করে জানলাম।
মনে হয় আজ আমি
হাজার সূর্য উঠা দেখলা.’

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.