পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৬

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৬
————————- ড. রমিত আজাদ

মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাইয়াম একাদশ শতাব্দিতে বলেছিলেন যে, ‘আলোকের গতিবেগ অতি উচ্চ, তবে সীমিত’। উনার কয়েকশত বছর পরে ১৬৭৬ সালে ডেনমার্কের বিজ্ঞানী ক্রিস্টেনসেন রোমার আরেকবার এটা আবিষ্কার করেন। রোমার আলোকের গতিবেগ নির্ণয় করেছিলেন ১৪০০০০ মাইল/সেকেন্ড, যা আধুনিক হিসাবের কাছাকাছি। রোমার-এর আবিষ্কার-টি এই কারণে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি এটা আবিষ্কার করেছিলেন স্যার আইজাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া মাতেমাতিকা’ প্রকাশিত হওয়ার ১১ বৎসর আগে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া মাইকেল ফ্যারাডে অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহন করার সুযোগ পাননি। কিন্তু প্রতিভা কখনো থামিয়ে রাখা যায় না। স্বশিক্ষিত ফ্যারাডেই বিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন যার সুফল আজ আমরা ভোগ করছি। উনার অন্যতম আবিষ্কার হলো magneto-optical effect বা Faraday effect; ১৮৪৫ সালে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, চুম্বক ক্ষেত্র আলোর উপর প্রভাব বিস্তার করে। এর দ্বারা এই বোঝা যায় যে, আলোর তড়িৎ-চুম্বকীয় বৈশিষ্ট রয়েছে।

ফিজো (Fizeau) ১৮৪৯ সালে নির্ণয় করেছিলেন যে আলোকের গতিবেগ 299,796 kilometers per second, এটাই এখন আমরা মেনে নিয়েছি।

১৮৬৫ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে পানির হ্রদে যেভাবে তরঙ্গ উত্থিত হয়, তেমনি তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রেও তরঙ্গ উত্থিত হয়। এর নাম electromagnetic wave। তবে তিনি তা দেখিয়েছিলেন তাত্ত্বিক বা গাণিতিকভাবে। ১৮৭৯ সালে Heinrich Rudolf Hertz তর্কাতীতভাবে electromagnetic wave-এর অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। আলো যে এক ধরনের electromagnetic wave এই conjecture-এর স্বপক্ষে ম্যাক্সওয়েল-এর অন্ততপক্ষে তিনটি আর্গুমেন্ট ছিলো। প্রথমটা ছিলো দার্শনিক (Chap. XX, section 781), শূণ্য স্থানে সঞ্চালিত হতে পারে এমন তরঙ্গ কল্পনা করা উনার পক্ষে কষ্টকর ছিলো, তাই তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে এমন কোন মাধ্যম আছে যা স্থানকে পূর্ণ করে ও যার মধ্য দিয়ে electromagnetic wave সঞ্চালিত হয়। দ্বিতীয়ত, ম্যাক্সওয়েল-এর নির্ণিত electromagnetic wave সঞ্চালনের গতিবেগ আশ্চর্যজনকভাবে ইতিমধ্যে নির্ণিত আলোকের গতিবেগের সাথে মিলে গিয়েছিলো। তৃতীয়ত, তিনি ফ্যারাডের magneto-optical effect নিয়েও আলোচনা করেন। এই তিনটিই ছিলো আলোকের electromagnetic nature-এর স্বপক্ষে কনভিন্সিং।

এবার আসা যাক ‘ইথার’ প্রসঙ্গে। উপরের আলোচনায় অবশ্য এর কিছুটা আভাস পাওয়া গিয়েছে। ম্যাক্সওয়েল-এর তত্ত্ব অনুযায়ী electromagnetic wave বা আলোর তরঙ্গ একটি সীমিত গতিবেগে সঞ্চালিত হয়। আবার নিউটনীয় ফিজিক্স পরম স্থিতির ধারণা থেকে মুক্ত হয়েছিলো; মানে হলো যেহেতু পরম স্থির কোন কায়া নেই তাই গতিবেগ কারো না কারো সাপেক্ষে হয়ে থাকে (যা ইতিপূর্বে অন্য পর্বগুলিতে আমি দেখিয়েছি)। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে আলোর তরঙ্গ-এর গতিবেগ কারো না কারো সাপেক্ষে হতে হবে। তাই অনুমান করতে হলো যে ‘ইথার’ বলে একটি বস্তু (matter) আছে যা সর্বত্র বিরাজমান। এমনকি শূণ্য স্থানেও ‘ইথার’ রয়েছে। শব্দ যেমন বাতাসের ভিতর দিয়ে চলাচল করে, আলোর তরঙ্গ-ও তেমনি ইথারের ভিতর দিয়ে চলাচল করে।

এবার আসি গতিবেগের সংযোজন ও বিয়োজন সূত্রে। ইথারের মধ্য দিয়ে পৃথিবী চলাচলের সময় পৃথিবী যখন আলোর উৎসমুখে যাবে তখনকার আলোর বেগ ও আড়াআড়িভাবে আসা আলোর বেগ ভিন্ন হবে। আলোর উৎসমুখে গতিবেগ হবে বেশী ও আড়াআড়িভাবে গতিবেগ হবে কম, নিউটনীয় তত্ত্ব এই কথাই বলেছিলো। কিন্তু কথা হলো মানুষের আবিস্কৃত তত্ত্ব অনুযায়ী জগৎ-সংসার চলেনা, বরং সৃষ্টিকর্তার নির্মিত জগৎ-সংসার অনুযায়ীই মানুষকে তত্ত্ব তৈরী বা আবিষ্কার করতে হয়। সৃষ্টিকর্তা যা কিছু করছেন ওগুলোই ফ্যাক্ট। তাই ১৮৮৭ সালে আলবার্ট মাইকেলসন ও এডওয়ার্ড মর্লি অতি যত্নে একটি পরীক্ষা করেন (Michelson-Morley experiment)। উনারা পৃথিবীর গতির অভিমুখে আলোর বেগ ও পৃথিবীর গতির অভিমুখের সমকোণে আলোর বেগ নির্ণয় করেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেলো দুটি বেগই সমান। তত্ত্বের সাথে পরীক্ষণের ফলাফলের অমিলে বিজ্ঞান সংকটে পড়ে গেলো।

১৮৮৭ সালে থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার ফলাফল ব্যাখ্যা করার নানাবিধ চেষ্টা করা হলো। কিন্তু কেউই তা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেন না। আসলে সবগুলি ব্যাখ্যাই ছিলো ‘ইথার’ কনসেপ্ট-কে অক্ষুণ্ণ রেখেই। অবশেষে ১৯০৫ সালে অখ্যাত এক বিজ্ঞানী মানবজাতিকে এই সংকট থেকে উদ্ধার করলেন। উনার নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি দেখালেন ‘ইথার’ বলে কিছু নাই, তা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু ইথার-এর অপ্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে উনাকে আর একটি বৈপ্লবিক ধারণার সূত্রপাত করতে হলো, আর সেটা হলো পরম কাল (absolute time) বলে কিছু নেই।

(চলবে)

তারিখ: ২০শে মে, ২০১৭
সময়: ভোর ১ টা ৩৪ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.