পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৭

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৭
————————- ড. রমিত আজাদ

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে যেমন কিছু নেই, বিজ্ঞানেও তেমনি শেষ কথা বলে কিছু নেই। epoch of new era-এর যুগে মনে হয়েছিলো যে, প্রকৃতি জগতের সব রহস্যের বুঝি সমাধান হয়ে গেলো, নিউটনীয় মেকানিক্স সব কিছুই ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। কিন্তু আলোর গতিবেগের ধ্রুবতা ব্যাখ্যা করতে যখন নিউটনীয় মেকানিক্স অসমর্থ হলো তখন বোঝা গেলো যে, ঐ বিজ্ঞানটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আলবার্ট আইনস্টাইনের প্রতিভায় অবশেষে আলোর গতিবেগের ধ্রুবতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলো, এবং সেই সাথে জন্ম হলো একটি নতুন বিজ্ঞানের, এর নাম ‘রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স’ বা ‘থিওরী অব রিলেটিভিটি’। এই নতুন বিজ্ঞানটি স্থান ও কালের ধারণা সম্পর্কে এক বিপ্লবের সূচনা করে। এরিস্টটল, গ্যালিলিও ও নিউটন মনে করতেন যে, সময় পরম, তাই তারা আলোর বেগ ও দূরত্বকে অধ্রুব ও ভিন্ন ভিন্ন মনে করতেন। আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স’-এর প্রথম অংশটির নাম ‘স্পেশাল থিওরী অব রিলেটিভিটি’ (STR), এই STR অনুযায়ী আলোর বেগ ধ্রুব, তাই দূরত্ব ও সময় অধ্রুব বা আপেক্ষিক। তার মানে প্রতিটি পর্যবেক্ষকের কালের নিজস্ব মাপন থাকতে হবে। এভাবে কোন একটি গতিশীল কায়ার গায়ের সাথে লাগানো কোন একটি ঘড়ি যে সময় দেবে, আর দূরে অন্য কোথাও রাখা কোন ঘড়ি যে সময় দেবে তা এক রকম হবে না। কায়ার গায়ের সাথে লাগানো ঘড়িটির সময়কে বলা হয় proper time, আর দূরে অন্য কোথাও রাখা ঘড়িটির সময় হলো relativistic time।

থিওরী বা তত্ত্ব-এর সংজ্ঞা হিসাবে স্যার আইজাক নিউটন ১৬৮৭ সালে বলেছেন, ‘Theory is a mathematical description of phenomena in space and time’. আর ১৯২৯ সালে বিজ্ঞানী নীলস বোর বলেছেন, ‘Theory is a mathematical symbolism able to predict (in terms of probability) the outcomes of experiments’। ক্লাসিকাল ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর দৃষ্টিভঙ্গীতে পার্থক্য থাকার কারণে থিওরী-র সংজ্ঞায় কিছুটা পার্থক্য সৃষ্ট হলেও মূল বিষয়টি একই রয়ে গেছে, আর তা হলো থিওরী কোন প্রতিভাসের গাণিতিক বর্ণনা। এ যাবতকাল আমরা যা জেনেছি, তার আলোকে বলা যায় যে, যেকোন ন্যাচারাল ফেনোমেনাই গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। পিথাগোরাস যথার্থই বলেছিলেন যে, ‘সৃষ্টিকর্তা একজন ভালো গণিতবিদ’।

সময়ের আপেক্ষিকতা স্বীকৃত হওয়ার পর পাওয়া গেলো দুই ধরনের সময় proper time ও relativistic time। এদের মধ্যে সম্পর্ক নিশ্চয়ই থাকবে, এবং তার গাণিতিক প্রকাশও থাকবে। এই গাণিতিক সম্পর্কটিকে আইনস্টাইন বের করেছিলেন। জটিলতার কারণে আমি সেই সমীকরণ আর এখানে তুলে ধরছি না, শুধু এই বলতে চাই যে relativistic time সমান কয়েকগুন proper time; সেখানে আরো রয়েছে কায়াটির গতিবেগ ও আলোর গতিবেগ। যদি কোন একটি কায়া কোন পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে আলোর গতিবেগের খুব কাছাকাছি বেগে গতিশীল থাকে তাহলে ঐ কায়ার নিজস্ব সময় (proper time) অপেক্ষা পর্যবেক্ষকের ঘড়ির সময় (relativistic time) হবে প্রায় দশগুন বেশী।

একইভাবে দূরত্বের ক্ষেত্রেও রয়েছে proper length ও relativistic length। তবে এই আর্টিকেলে আমি দূরত্ব নিয়ে আলোচনা খুব একটা করবো না।

এ সব তো গেলো গণিতের কথা। আবার স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই সবকিছু গণিতের কোন খেলা নয়তো? এমনও তো হতে পারে যে গণিতে গণিতে এমনটি হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এইসবের দেখা মিলবে না কোনদিনও। প্রশ্নটি অবান্তর নয়, আধুনিক বিজ্ঞানের জনক আল হাইয়াম তো বলেই দিয়েছেন যে, পরীক্ষার দ্বারা যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমানিত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সত্য বলে মেনে নেয়া যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ জ্ঞান বিজ্ঞান হবে না। অতএব আইনস্টাইনের এই ‘সময়ের আপেক্ষিকতা’ সংক্রান্ত গণিতগুলোর বাস্তব প্রমাণ থাকাও প্রয়োজন। সেই প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিলো কি?

(চলবে)

তারিখ: ২০শে মে, ২০১৭
সময়: রাত ৯টা ৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.