পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৮ (শেষ পর্ব)

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ৮ (শেষ পর্ব)
——————————— ড. রমিত আজাদ

এক টুকরো সাদা কাগজ হাতে নিয়ে কিছু অংক কষে গেলাম। আমার মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনার একটি বিমূর্ত প্রতিরূপ তৈরী হলো সাদা কাগজের বুকে গণিত নামক কিছু সিম্বোলিজমের দ্বারা। এই কি সব? ওখানে যা বলে, সেটাই কি বাস্তব? বিশ্বজগতটাকে স্টাডি করতে গিয়ে বাঙালী দার্শনিক কপিল আজ থেকে আনুমানিক ২৭৫০ বছর আগে দেখলেন যে এর সাথে বৈদিক দেব-দেবীদের কোন সম্পর্ক নেই সম্পর্ক আছে গণিতের। গণিত মানেই তো যুক্তি, আর জ্ঞানী কপিল নিজে বুঝলেন ও বিশ্ববাসীকে বোঝালেন যে, মহাবিশ্বের ঘটনাবলীর ব্যাখ্যাগুলো গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। জ্ঞানী কপিল-এর সাংখ্য দর্শন সবাই বুঝতে পেরেছে কিনা, জানিনা, তবে ঘটনার সূত্রপাত তিনি ঘটিয়েছিলেন, দর্শন, গণিত, মহাজাগতিক ঘটনাবলী ইত্যাদির মধ্যে ওতপ্রোত সম্পর্ক তিনি দেখিয়েছিলেন। ভল্টেয়ার বলেছিলেন যে পিথাগোরাস গঙ্গাঋদ্ধি-তে (প্রাচীন বাংলায়) এসেছিলেন, এবং এখান থেকে যা কিছু শিখেছিলেন তাই দিয়ে তিনি ইউরোপকে আলোকিত করেছিলেন। সেই পিথাগোরাস বলেছিলেন যে, ‘সৃষ্টিকর্তা একজন ভালো গণিতবিদ’।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো যে, কোন এক কালে কোন একটি ফিজিকাল ফেনোমেনন স্টাডি করার পর তার গাণিতিক সম্পর্কগুলো বের করা হতো। যেমন চার্জ সম্পর্কে জেনেছি অনেক আগেই, কিন্তু চার্জের মধ্যকার আকর্ষণ-বিকর্ষণ সংক্রান্ত গাণিতিক সম্পর্ক কেমন হবে তা বের করা হয়েছিলো পরে, যাকে এখন কুলম্বের আইন বলা হয়। কিন্তু গাণিতিক উৎকর্ষ সাধিত হওয়ার পর, এখন অনেক কিছুই গণিত আগে ভবিষ্যদ্বানী করে আর ফিজিকালি তাকে বের বা সনাক্ত করা হয় পরে। যেমন আগের পর্বে উল্লেখ করেছি যে, ১৮৬৫ সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন যে পানির হ্রদে যেভাবে তরঙ্গ উত্থিত হয়, তেমনি তড়িৎ-চুম্বক ক্ষেত্রেও তরঙ্গ উত্থিত হয়। এর নাম electromagnetic wave। তবে তিনি তা দেখিয়েছিলেন তাত্ত্বিক বা গাণিতিকভাবে, আর ১৮৭৯ সালে Heinrich Rudolf Hertz তর্কাতীতভাবে electromagnetic wave-এর অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন। একইভাবে ১৯২৮ সালে চন্দ্রশেখর White Dwarf-এর অস্তিত্ব গাণিতিকভাবে বের করেছিলেন। এবং তার কয়েক বছর পরে রুশ বিজ্ঞানী লেভ লান্দাউ গাণিতিকভাবে বের করেছিলেন নিউট্রন স্টার-এর অস্তিত্ব। কিন্তু ফিজিকালি তাদের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় আরো পরে। তাহলে কি বুঝলাম? এই জমানায় কোন কিছু ফিজিকালি আবিষ্কৃত হওয়ার আগেই গাণিতিকভাবে তাকে বের করা সম্ভব? হ্যাঁ, এখন মোটামুটি এই পথেই এগুচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমে দর্শন পথকে আলোকিত করছে, তারপর গণিত তাকে আবিষ্কার করছে, আর তারপর বিজ্ঞান তার ফিজিকাল অস্তিত্ব প্রমাণ করছে।

আলবার্ট আইনস্টাইনের মত জগতবিখ্যাত বিজ্ঞানী Prussian Academy of Sciences-এর লেকচার-এ ১৯২১ সালের ২৭শে জানুয়ারী তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Geometry and Experience-এ বলেছেন, “One reason why mathematics enjoys special esteem, above all other sciences, is that its propositions are absolutely certain and indisputable, while those of all other sciences are to some extent debatable and in constant danger of being overthrown by newly discovered facts”I

তবে নিঃসন্দেহে গাণিতিকভাবে আবিষ্কার বা ভবিষ্যদ্বানী হওয়ার পরেও ফিজিকালী তার অস্তিত্ব প্রমাণ করার দায়িত্বতা থেকে যায়।

সময়ের আপেক্ষিকতার বিষয়টিও তাই। মিওন (muons) নামে এক ধরণের কণিকা আছে, তারা বেশী সময় বাঁচেনা। তার মীন লাইফটাইম হলো মাত্র ২.২ মিলি সেকেন্ড, এর পরেই তারা ভেঙে যায়। এই মিওন-দের জন্ম ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে তিন কিলোমিটারের বেশী। যদিও তাদের গতি আলোকের গতির খুব কাছাকাছি, তারপরেও ভূপৃষ্ঠ পৌছাতে তাদের সময় লাগার কথা ৬.৪ মিলি সেকেন্ড। তার মানে হলো, এই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে পৌছানোর আগেই মিওন-রা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে অর্থাৎ তাদের মৃত্যু হবে; অতএব ভূপৃষ্ঠে তাদেরকে পাওয়া যাবে না। অথচ মিওন রেকর্ড করার যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা করে Bruno Rossi ও D. B. Hall আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন যে, ভূপৃষ্ঠে ঠিকই মিওন পাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষাটি করা হয়েছিলো ১৯৪০ সালে। এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, মিওনরা ঐ তিন কিলোমিটার উপর থেকে এতটা পথ ও সময় পেরিয়ে সশরীরে ভূপৃষ্ঠে পৌছালো কি করে? হ্যাঁ পরম সময়ের ধারনা তথা নিউটনীয় মেকানিক্স এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে না। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্ব ও সময়ের আপেক্ষিকতার ধারনা সুস্পষ্টভাবে এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে। ঘটনাটা হলো এই যে, মিওনের সশরীরে ভূপৃষ্ঠে পৌছাতে ভূপৃষ্ঠে দাঁড়ানো আমাদের ঘড়ি অনুযায়ী সময়টা লাগার ৬.৪ মিলি সেকেন্ড, কিন্তু আলেকের বেগের খুব কাছাকাছি বেগে গতিশীল মিওনের গায়ের সাথে লাগানো ঘড়ি অনুযায়ী সময়টা (Proper time) লাগছে ২.২ মিলি সেকেন্ড-এর কম, কারণ অতি উচ্চ বেগে গতিশীল বলে তার ঘড়ি চলছে আমদের ঘড়ির চাইতে ধীরে, এটাই ‘টাইম ডাইলেশন’। (আবার যে দূরত্বটা আমাদের কাছে ঠেকছে তিন কিলোমিটার, মিওনের কাছে সেটা অনেক কম, এটাকে বলে ‘লেংথ কনট্রাকশন’)। এই পরীক্ষণের মাধ্যমে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্ব ও সময়ের আপেক্ষিকতা ফিজিকালীই প্রমাণিত হয়ে গেলো।

এবার সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আসতে পারে যে, পবিত্র লাইলাতুল মিরাজে সংঘটিত যাবতীয় ঘটনাবলী কি বৈজ্ঞানিক বা গাণিতিকভাবে ১০০ পারসেন্ট প্রমানিত হয়েছে? আমি উত্তরে বলবো যে, না হয়নি। তাহলে কেন এই আর্টিকেলটি লিখলাম? তার আগে আরেকটি প্রশ্নের জবাব দেই। প্রশ্নটি হলো, নবিজী(সঃ)-র এই ভ্রমণটি কি আত্মিক ছিলো, না শারীরিক ছিলো? উত্তর হলো পবিত্র মিরাজ-এর বর্ণনার বিশ্লেষণে যা বোঝা যায় যে, এটি শারীরিক ভ্রমণই ছিলো। যেমন, পরদিন নবিজী(সঃ) যখন উনার ভ্রমণের কথা সকলকে বললেন, তখন শ্রোতাদের অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করলে তিনি জানান যে, তিনি জেরুজালেমে যাওয়ার পথে একটি কাফেলাকে মক্কার দিকে আসতে দেখেছেন, এবং কয়েকদিন পর ঐ কাফেলাটি সত্যিই মক্কায় এসে পৌঁছেছিলো, এতে শ্রোতাদের অনেকের সন্দেহ দূর হয়। তবে উনার(সঃ) উর্ধ্ব গমণ অর্থাৎ দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বা অন্যান্য আসমানে পৌঁছানো বিষয়টি কিভাবে ঘটেছিলো? ঐ সকল আসমান মহাবিশ্বের বাইরে না ভিতরে? তিনি গতিশীল হয়ে, না কি অন্য কোন উপায়ে ওখানে পৌঁছেছিলেন তা আমার (আমাদের) কাছে বোধগম্য নয়। তাই বিনয়ের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করতে অপারগতা প্রকাশ করছি। হয়তো গণিত ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে কোন একদিন আমরা ঐ সকল প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো। আপাততঃ আমরা যেটুকু জানতে ও বুঝতে পেরেছি তা হলো, আজ থেকে ১৪০০ বছর পূর্বে পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ-এর ঘটনায় ইঙ্গিত রয়েছে যে, সময় পরম কিছু নয় বরং সময় আপেক্ষিক। এবং আজ তা গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক দুইভাবেই প্রমাণিত।

তারিখ: ২২ শে মে, ২০১৭
সময়: ভোর ৩টা ৩২ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.