পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ১

পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ ও সময়ের আপেক্ষিকতা: পর্ব ১
————————- ড. রমিত আজাদ

পবিত্র ‘লাইলাতুল মিরাজ’-এর ঘটনা প্রথম শুনতে পাই আমার শ্রদ্ধেয় ফুপুর কাছে। আমার সেই শিশু বয়সে মুরুব্বীরা যা বলতেন কোন প্রশ্ন-সন্দেহ ছাড়াই তা বিশ্বাস করতাম। ঐ বয়সটাই বিশ্বাসের বয়স, মা একটি অক্ষরের উপর হাত রেখে বলতেন, এটা ‘ক’ আমিও উনাকে বিশ্বাস করে বলতাম, “ক”; মা বলতেন, “এটা ১” আমিও বলতাম, “এক”; আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলতেন, “ওটা চাঁদ”, আমিও নির্দ্বিধায় মেনে নিতাম যে, ওটা চাঁদ। ঐ বিশ্বাসটুকু না থাকলে সমাজ অচল হয়ে যাবে। যাহোক, ‘লাইলাতুল মিরাজ’-এর যে ঘটনাটি আমাকে সব চাইতে বেশী চমকপ্রদ করেছিলো তা হলো, ফুপু যখন বললেন, “আমাদের প্রিয় নবীজী (স.) উর্ধ্বাকাশে অবস্থান করেছিলেন অনেকগুলো বছর, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখলেন যে, উনার ওযুর পানি গড়িয়ে পড়ছে।” কথাটি শোনার সাথে সাথে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম, ‘এটা আবার কি? তিনি (স.) ওখানে এতগুলা বছর কাটালেন অথচ, এখানে পার হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড!’ কথাটি এমনভাবে আমার মনে বেজেছিলো যে আর কোনদিনও ভুলতে পারিনি।

তারপর ইসলামী বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলাম আমাদের কলেজের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব আবদুর রব স্যারের কাছ থেকে। তিনি আমাদের ইসলাম ধর্ম শিক্ষা দিতেন। অতীব চমৎকার বিনয়ী পরহেজগার একজন মানুষ। স্যার যেদিন আমাদের ‘শব-ই-মিরাজ’-এর বর্ণনা শোনালেন, সেদিনও স্যার সময়ের ঐ প্যারাডক্সটি সম্পর্কে বলেছিলেন। তখন আমাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ বিষয়টির সম্ভাব্য অথবা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি হতে পারে, তা জানতে চাচ্ছিলো। স্যার নিজে যেহেতু বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন না, তাই বিনয়ের সাথে ঐ প্যারাডক্স-এর বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। আমাদের ফিজিক্সের শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় অমিতাভ বিশ্বাস স্যার, নিবেদিতপ্রাণ শক্তিমান একজন শিক্ষক ছিলেন তিনি, উনার মত শিক্ষক পাওয়া ছিলো পরম সৌভাগ্য। আমার মধ্যে ফিজিক্সের প্রতি আগ্রহ তিনিই জাগিয়ে তুলেছিলেন। অমিতাভ স্যারের ফিজিক্স ক্লাসেই প্রথম জানতে পেরেছিলাম যে দেয়ার ইজ সামথিং কলড ‘থিওরী অব রিলেটিভিটি’ আলাবার্ট আইনস্টাইন নামক একজন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ঐ তত্ত্বের জনক। আর ঐ তত্ত্বেরই আওতায় আছে ‘সময়ের আপেক্ষিকতা’ বলে একটা কিছু। ইতিমধ্যে আমি ছোটদের জন্য লেখা আইনস্টাইনের একটা জীবনী পড়েছিলাম, সেখানে রিলেটিভিটি সম্পর্কে সামান্য টাচ ছিলো। তারপর কলেজেরই শব-ই-মিরাজ সম্পর্কিত অনুষ্ঠানে ছাত্রদের কেউ একজন একটা প্রবন্ধ পাঠ করে মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছিলো। প্রবন্ধটি পাঠ করার সময় আমি গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনছিলাম ‘টাইম প্যারাডক্স’-টির বিষয়ে কি বলা হয় সেখানে। তবে সেই প্রবন্ধে ‘টাইম প্যারাডক্স’-টি সম্পর্কে কোন টাচ দেয়া হয়নি; শুধু রকেট, স্যাটেলাইট, মহাশূণ্য ভ্রমণ ইত্যাদি প্রসঙ্গকে টেনে উর্ধ্বাকাশে গমণ যে সম্ভব সেটাই বলা হয়েছিলো। আমাদের উদারনৈতিক অমিতাভ বিশ্বাস স্যার অমুসলিম হলেও খুব আগ্রহ নিয়ে ‘শব-ই-মিরাজ’-এর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন এবং অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে অমিতাভ বিশ্বাস স্যার ঐ প্রবন্ধ পাঠকের কাছ থেকে আগ্রহ করে স্ক্রিপ্ট-টি চেয়ে নিয়েছিলেন পড়ে দেখার জন্য।

এরপর একটি অনুষ্ঠানে প্রথম হওয়ার জন্য আমি কলেজ থেকে পুরষ্কার পেয়েছিলাম একটি বই – আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনী, তবে এই বইটির কলেবর ছিলো আমার আগে পড়া বইটির চাইতে বড়, এবং এখানে আপেক্ষিক তত্ত্বের অনেক কিছুই লেখা ছিলো। সেখানে পেলাম একটি বিষয় ‘টাইম ডাইলেশন’। তবে আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারিনি। ড. আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিন-এর লেখা একটি পপুলার বইয়ে পড়লাম যমজ প্যারাডক্স। মানে যমজ দুই ভাই-এর একজন একটি রকেটে চড়ে আলোর কাছাকাছি গতিতে ঘুরে এলেন মহাশূণ্যে, তারপর তিনি পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখলেন যে, তার ভাই অনেক বুড়িয়ে গেছে আর সে এখনও তরুণ। খুব অবাক হয়েছিলাম এটা পড়ে, তারমানে ওখানে সময় পার হয়েছে কম, আর পৃথিবীতে সময় পার হয়েছে বেশী। আবারও মাথায় কিছু ঢুকলো না। এটা কেন হচ্ছে, সময় নানান রকম কি করে হয়? আলোর গতির সাথে সময়ের সম্পর্ক কি? সময় জিনিসটা আসলে কি? এই প্রশ্ন আরো কয়েকটি বছর মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকলো। তারপর আমার মনের আশা পূর্ণ করে বিদেশে যখন ফিজিক্স বিষয়েই পড়ার সুযোগ পেলাম, তখন সুযোগ হলো বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানার।

এই লেখার পরবর্তি পর্বে, এই বিষয়ে আলোকপাত করবো।

তারিখ: ২৫শে এপ্রিল, ২০১৭
সময়: দুপুর ২ টা, ১৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.