পিইইইম পিইইইম পাগোল

পিইইইম পিইইইম পাগোল:
ছোটবেলায় একটা লোককে দেখতাম ছালা পড়ে রাস্তা দিয়ে হাটতো আর একটু পরে পরেই বলতো, “পিইইইম পিইইইম পিইইইম ……..।” এর বেশী কোন কথা বা শব্দ তার মুখে কোনদিন শুনিনি। ইউজুয়ালী সন্ধ্যার পরে তাকে দেখা যেত। আলো-আঁধারী পরিবেশে অমন লোক অমন ডাক কিছুটা রহস্যময়তারও সৃষ্টি করতো! সেই সময় লোকটাকে আমি ভয় পেতাম, তাই কাছে কখনো যাইনি, দূর থেকে দেখতাম। বুঝতাম পাগোল, তাই ওরকম করে। পাগোলের থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই নিরাপদ। তবে মানুষ কেন পাগোল হয়, এই প্রশ্ন আমার মনে মনে ফিরতো। আমার বয়স যখন সতেরোর কাছাকাছি তখনও তাকে দেখতাম। তাকে ইউজুয়ালী দেখা যেত ঢাকার সিদ্ধেশরী রমনা বেইলী রোড ইত্যাদি এলকায়। আমাদের এলাকার এক বড় ভাই আমাকে স্নেহ করতেন, উনার কাছে একবার ঐ পাগোল সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি দেখলাম তথ্য আমার চাইতে বেশী রাখেন। বললেন, “ও চিৎকার করে করে বলে প্রেম প্রেএএম প্রেএএএম। ও হেটেই চলাচল করে মীরপুর মাজার থেকে যাত্রা শুরু হয় সদরঘাট পর্যন্ত যায়।” সব শুনে ভাবলাম প্রেমের পাগোল-টাগোল হবে বোধ হয়। হায়রে প্রেম, মানুষের অবস্থা কেমন শোচনীয় করে ফেলে! একদিন সন্ধ্যার সময় গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি রাস্তা দিয়ে সে যাচ্ছে আর তার বিখ্যাত শ্লোগানটি দিচ্ছে, “প্রেম প্রেএএম প্রেএএএম।” গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো কয়েকটি রিকশা। এদের মধ্যে ইয়াং এক চালকের মতিভ্রম হলো, সেও তাকে ভেঙচি কেটে বলে উঠলো, “প্রেএএম”। পাগোলটি কোন ভ্রুক্ষেপ না করে আবারো বললো, “প্রেএএম”। ইয়াং রিকশাচালকটি আবারো ভেঙচি কেটে বলে “প্রেএএম”। এবার পাগোলটি কড়া চোখে তার দিকে তাকালো। পাগোলটি আবারো চিৎকার দিয়ে উঠলো, “প্রেএএম”। ইয়াং রিকশাচালকটি আবারো হেসে বলে “প্রেএএম”, এবার তার সাথে আরেক রিকশাচালক যোগ দিলো। বুঝলাম ওরা মজা পেয়েছে। আমি ভাবলাম আহারে পাগোল, বেচারা ঐ একটি শব্দই জানে, তাই ও আর কি বলতে পারে? আমাকে অবাক করে দিয়ে এবার পাগোলটি ঐ রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে, “ঐ কুত্তার বাচ্ছা!” দেখলাম না সে আরো দুটি শব্দ বলতে পারে। রিকশাচালকটি এবার হো হো হেসে উঠলো। পাগোলটি কয়েক পা সামনে গিয়ে আবারো চিৎকার করে উঠলো, “প্রেএএম”। এবার দুজন রিকশাচালক সমস্বরে, প্রতিধ্বনী করলো, “প্রেএএম”। পাগোল আবার ওদের দিকে তাকিয়ে বললো, “ঐ শুয়োরের বাচ্ছা!” দেখলাম না পাগোলটি আরো কিছু কথা জানে! এবার, পাগোলটি ওদের দিকে এগিয়ে এলো। এই প্রথম আমি তাকে কাছ থেকে দেখলাম। তামাটে রঙের মাঝ বয়সী একটা লোক, বয়স ত্রিশ-পয়ত্রিশের মাঝামাঝি, বলিষ্ঠ শরীর, লম্বা চুল, মুখে হালকা দাড়ি আছে। এগিয়ে এসে ইয়াং রিকশাচালকটিকে বললো, “কি হইছে? এইহানে কি করস?” দেখলাম না সে আরো কথা বলতে পারে। রিকশাচালকটিও ত্যাঁদর কম না, হাসতে হাসতে বলে “এইত তো ক্ষ্যাপ লমু”। পাগোলটি বলে, “ক্ষ্যাপ লবি তো ক্ষ্যাপের চিন্তায় থাক। আমারে চেতাস ক্যা?” তারপর কিছুক্ষণ রিকশাচালকটির দিকে গরম চোখে তাকিয়ে থেকে, চলে গেলো। যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ আর “প্রেএএম” বলে চিৎকার দিলো না। রিকশাচালকটিও আর ভেঙচি কাটলো না। আমি মনে মনে একবার ভাবলাম যে, রিকশাচালকটি কাজটা ভালো করেনি, পাগোল চেতানো ঠিক হয়নি, আবার ভাবলাম একদিক থেকে ভালোই হয়েছে, না হলে পাগোলটি সম্পর্কে আমার মনে চিরকাল ভুল ধারনাই থেকে যেত!

হায়রে প্রেম! এই প্রেমের কারণে এত সমস্যা!

রমিত আজাদ
তারিখ: ২৯শে মার্চ, ২০১৭
সময়: ভোর ১২ টা ২৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.