প্রসঙ্গ: আদালত অবমাননা

প্রসঙ্গ: আদালত অবমাননা

আবছা মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় একটা নাটক দেখেছিলাম প্রথমে মঞ্চে পরে বিটিভি-তে। আমার জনৈক বড় ভাই আমাকে বলেছিলেন, “এই নাটকটি নিয়ে মামলা হয়েছে”। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, “কেন?”
তিনি বলেছিলেন, “এই নাটকে বিচারকদেরকে অপমান করা হয়েছে। তাদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা হয়েছে।”
আমি: বিচারকদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা হলে কি হয়?
বড়ভাই: আদালত অবমাননা করা হয়।
আমি: আদালত অবমাননা কি?
বড়ভাই: আদালত একটা খুব সিরিয়াস ব্যাপার বিচারক-রা খুব সম্মানী ব্যাক্তি। উনাদের অপমান করা ঠিক না। আমরা তো সুবিচারের জন্য উনাদের কাছে যাই। উনারা উনারা জ্ঞানী ব্যাক্তি, উনারা জানেন কিভাবে বিচার করতে হবে, উনারা সুবিচার করে রায় দেন, সেই রায় সবাই মানতে বাধ্য।

তারপর একটা সিনেমা দেখেছিলাম, তার নাম ‘তুমি বড় ভাগ্যবতী’। সেখানে এক নিষ্ঠাবান বিচারকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শক্তিমান অভিনেতা খলিল। একজন প্রবল ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন সৎ, নির্ভিক, জ্ঞানী বিচারকের চরিত্রটি তিনি খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। একটি ডায়লগ এখনো মনে পড়ে – উনার স্ত্রী বলছিলেন, “তোমার এখনকার মামলার আসামীটিকে আমি বিচারক হলে কিন্তু মুক্তি দিয়ে দিতাম।” বিচারক প্রথমে বিস্মিত হয়ে, তারপর প্রবল ব্যাক্তিত্ব নিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, “এজন্যেই তুমি হওনি।” ঐ দেখে আমাদের শিশুদের মনে ‘বিচারক’ সম্পর্কে একটা ভালো ইমেজ তৈরী হয়েছিলো।

‘বিচারক’-দের উর্ধে্ব আবার রয়েছেন ‘বিচারপতি’। প্রথম যেই বিচারপতির নাম শুনেছিলাম, তার নাম বিচারপতি সায়েম, তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন বছর দেড়েকের মত। আমি তখন ছোট ছিলাম স্বভাবতই বুঝতাম কম, তারপরও বিচারপতি সায়েম-কে ব্যাক্তিত্বসম্পন্নই মনে হতো। পরবর্তি যার নাম শুনেছিলাম তিনি বিচারপতি সাত্তার, তিনি প্রথমে উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তারপর দেশের এক চরম দুর্যোগময় মুহুর্তে হাল ধরেছিলেন। এরপর তিনি নির্বাচিত রাস্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেছিলেন। তিনি একবার তার বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমাদের অর্থ ও সম্পদের কোন অভাব নেই, তবে অনেকের মধ্যেই রয়েছে দেশপ্রেমের অভাব।” উনার এই উক্তিটি আমি কোনদিনই ভুলবো না। সবসময়ই শুনে এসেছি বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের দেশ, আর বিচারপতি সাত্তার কিনা বললেন ‘আমাদের অর্থ ও সম্পদের কোন অভাব নেই’! অবশ্য এখন উনার কথার মর্ম বুঝতে পারি।

পরিবর্তিতে একটা গান শুনেছিলাম, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা’। আমার মনে বিচারপতি-র ইমেজ ও এই গানটির কথার মধ্যে একটা সেলফ-কনট্রাডিকশন খুঁজে পেলাম। ‘বিচারপতি’-র আবার বিচার হয় নাকি? তিনিই না বিচার করেন, আর আমরা সবাই মাথা পেতে নেই সেই বিচার। তাহলে জনতা উনার বিচার করবে এটা আবার কেমন কথা? মর্মার্থ না বুঝে নিজের মনের মধ্যে একটা বৈপিরিত্য ও মানসিক দ্বন্দ্ব অনুভব করলাম। মহানায়ক উত্তম কুমার অভিনীত একটা ছবি দেখেছিলাম, নাম ‘সবার উপরে’। সেখানে দেখানো হয়েছিলো কিভাবে আদালত বিচার করে একজন নির্দোষ মানুষকে অনেকগুলো বছর জেল দিয়ে দিলো। তারপর তার ছেলে (উত্তম কুমার) বড় হয়ে উকিল হয়ে প্রথমে জনতার আদালতে ফরিয়াদ করলেন, তারপর রাষ্ট্রীয় আদালতে সেই মামলাটি পুনর্জ্জীবিত করে প্রমাণ করলেন যে তার পিতা নির্দোষ ছিলেন। এবার আদালত তাকে মুক্তি দেয়ার রায় দিলো। এক আদালত, দুই রকম বিচার!!! মুক্তি পেয়ে অভিযুক্ত ও বিনা দোষে দন্ডপ্রাপ্ত ব্যাক্তি চিৎকার করে বলেছিলেন, “ফিরিয়ে দাও আমার সেই দশটি বছর!”

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার মনেও শত প্রশ্ন এসে ভীড় করলো। আইন কি? আদালত কি? বিচার কি? রায় কি? যারা আইন তৈরী করেন তারা কারা? কতটুকু পারফেক্ট তারা? কিসের ভিত্তিতে আইন তৈরী করা হয়? আমাদের দেশে প্রচলিত পুরাতন আইনগুলোকে উৎখাত করে লর্ড ম্যাকলে প্রবর্তিত বৃটিশের আইনের প্রতি এত অশ্রদ্ধা ছিলো কেন এদেশের মুক্তিকামী মানুষদের?” “বৃটিশদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করার পরও ওদের প্রবর্তিত আইনগুলোকে তুলে দেয়া হলো না কেন?” ‘আইনের শাসন চাই’ বলতে কি বোঝায়? ‘কালাকানুন কি?’ ‘আইনটাই যদি কালা হয়, তাহলে সেই আইনের শাসনে সমাজে কতটুকু মঙ্গল হবে? জ্ঞানী সক্রেটিস-কে তো আইনের আওতায়ই বিচার করা হয়েছিলো, রাষ্ট্রই তো তাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলো, তবে কেন ঐ বিচারকে সঠিক মনে করা হয়না? শহীদের মর্যাদা নিয়ে কেন তিনি রয়েছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে? আদালতে দাঁড়িয়েই তো জ্ঞানী সক্রেটিস বিচারপদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন! হৃদয়বান যীশু-কেও তো রোমান আইনের আওতায় বিচার করা হয়েছিলো, তবে কেন সেই বিচার নিন্দনীয়? কোটি কোটি মানুষ তাঁর অনুসারী!

আদালতের রায় না মানলে কি আদালত অবমাননা হয়? তাহলে নিম্ন আদালতে বিচার হওয়ার পরে কেন উচ্চ আদালতে আপীল করা হয়? উচ্চ আদালতে আপীল যখন করা হলো তখন কি নিম্ন আদালতের রায়ের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত অবমাননা করা হলো না? ‘নিম্ন আদালত সুবিচার নাও করতে পারে’, এই ধারণা থেকেই তো উচ্চ আদালতে পুনরায় বিচার হয়, তাহলে কি এই বুঝবো যে, ‘আদালতের বিচারের পারফেকশন নিয়ে তো আদালতেই সন্দেহ রয়েছে!’

আদালতে একটি বিচারের রায় হওয়ার পর যখন জনতার একাংশ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করতে থাকে যে, ‘এই রায় মানিনা, মানবো না’, আদালত তখন তাদের ‘আদালত অবমাননার’ অভিযোগে অভিযুক্ত না করে, সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠায়? এর মানে কি? এর মানে কি এই ধরে নেব যে, আদালত জনতার একাংশের প্রতিবাদে তার নিজের বিচারের সঠিকতা নিয়ে সন্দিহান? তাহলে কার বিচার করার এক্সপারটাইজ উর্ধে্ব, আদালতের না জনতার একাংশের?

আসলে একটা বড় প্রশ্ন ‘আদালত অবমাননা’ মানে কি?

(আমি অতীব সাধারণ মানুষ, বুঝি খুবই কম, অনুগ্রহপূর্বক যারা বিষয়টি বোঝেন তারা কিছু লিখুন)

— ড. রমিত আজাদ
তারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০১৭ সাল
সময়: দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.