প্রসারমান মহাবিশ্ব, যার একটি প্রারম্ভ রয়েছে (পর্ব ১)

প্রসারমান মহাবিশ্ব, যার একটি প্রারম্ভ রয়েছে (পর্ব ১)
———————————- ড. রমিত আজাদ

ইমাম গাজ্জালি (রহ•) (১০৫৮ সাল – ১১১১ সাল) রচিত Tahafut al-Falasifa (Incoherence of the Philosophers, দার্শনিকদের অসঙ্গতি) গ্রন্থটি হাতে নিয়ে আমি প্রথমবারের মত পড়েছিলাম আমার স্কুল জীবনে, তখন আমি খুব সম্ভবত নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। সেই বয়সে ঐ কঠিন লেখার প্রায় কিছুই বুঝতে পারিনি। আজ আরেকবার বইটি পড়া শুরু করলাম। সূচীপত্রের ২নং অধ্যায়ে আমার চোখ আটকে গেলো, Refutation of their belief in the everlasting nature of the world, time, and motion। স্থান, কাল ও গতি এগুলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তথা কসমোলজির মেজর টপিক, আর ইমাম গাজ্জালি (রহ•) সেই একাদশ শতাব্দীতেই এই নিয়ে লিখেছেন! অধ্যায়ের প্রথম প্যারাগ্রাফটি তুলে দিচ্ছি। (বাকিটা এই প্রবন্ধের নীচে উল্লেখ করলাম)

LET it be known that this problem is a corollary of the preceding one. For as the philosophers consider the world to be eternal — i.e., without a beginning in time — so do they consider it to be everlasting — i.e., never coming to an end. (They say that) its corruption or annihilation is impossible; and that it always was, and ever will be, as it is.

অয়োনীয় দার্শনিক এরিস্টটলের মতে জগৎ অনাদি। তিনি শূন্য থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে- এ মতবাদে বিশ্বাসী নন, এমনকি তিনি গতিকেও অনাদি বলে বিবেচনা করতেন (`steady state scenario”)। পক্ষান্তরে আল-গাযালী জগতের অনাদিত্বের পক্ষে দার্শনিকদের যুক্তিসমূহ প্রথমে উপস্থাপন করে পরে তা খণ্ডনের চেষ্টা করেন। তিনি বলেছেন ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী জগৎ সৃষ্ট।

ইমাম গাজ্জালি (রহ•)-এর চিন্তাভাবনা মিলে যায় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কসমোলজির সাথে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কসমোলজির জনক আলবার্ট আইনস্টাইনও শুরুতে মহাবিশ্বের অপ্রসারনতায় (স্থিরতায়) বিশ্বাসী ছিলেন (বিজ্ঞানের শুরুতেও রয়েছে বিশ্বাস, একজন বিজ্ঞানীকে কোন একটা বিশ্বাস নিয়েই এগুতে হয়)। তিনি steady state-এ এতটাই বিশ্বাসী ছিলেন যে আপেক্ষিক তত্ত্বে তিনি ওটা ঠিক রাখার জন্য উনার সমীকরণে একটি ধ্রুবক ব্যবহার করেছিলেন, এর নাম দিয়েছিলেন cosmological constant । আইনস্টাইন ১৯৩১ সাল পর্যন্ত উনার এই ধারনায় স্থির ছিলেন, যদিও এর মধ্যে steady state scenario-র বিপক্ষে অনেক বিজ্ঞানীই অনেক কথা ও কাজ করে ফেলেছিলেন।

১৯২২ সালে রুশ পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্রিডমান দেখালেন যে, আইনস্টাইনের সমীকরণই গতিশীল মহাবিশ্বের কথা বলে ও গতিশীল মহাবিশ্বের ক্ষেত্রেই সমীকরণটি সঠিক। ১৯২৭ সালে জর্জ লেমেতর (George Lemaitre) বললেন যে আইনস্টাইনের ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ এবং জ্যোতির্বিদ্যা-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ সমন্বিত করলে এই বোঝা যায় যে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। এদিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবেল ১৯২৯ সালে উনার বৃহদাকৃতি টেলোস্কোপটির সাহায্যে দেখলেন যে মহাবিশ্ব স্থির নয়, সে ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। গণিতের ভবিষ্যদ্বানী যে সফল হয় এই ঘটনা তার আরো একটি প্রমাণ।

বিজ্ঞানে এমপিরিকাল প্রমাণের পর আর কোন কথা থাকেনা। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন তাও প্রসারমান মহাবিশ্বকে মানতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু উনার তত্ত্ব বাস্তবের সাথে খাপ খাচ্ছিলো না। পরিশেষে ১৯৩১ সালে তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করেন ও প্রসারমান মহাবিশ্বকে মেনে নেন। আর এর মানে হলো মহাবিশ্বের একটা শুরু রয়েছে।

(চলবে)

———————————————

তারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০১৭
সময়: রাত ২টা ৪৩ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.