প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৩

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৩
————————- ড. রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

কয়েক দিন যাবৎ ফেসবুকে ঢুকতে পারিনি নানা ব্যস্ততায়। তানিয়ার কথা যে মনে পড়েনি তা নয়, কয়েকবার মোবাইলের দিকে হাত চলে গিয়েছিলো ওকে ফোন করার জন্য। তারপরই থেমে গিয়েছি। ও আমাকে ফোন করতে নিষেধ করেছে। কি হবে আমি ফোন করলে? হয়তো অচেনা কেউ ফোন করা নিয়ে বাড়ীতে সমস্যা হতে পারে ওর।
ও বিবাহিত, এক সন্তানের জননী; এটা ভুলে গেলে তো চলবে না। ওর বাঙালী স্বামী, যে বাঙালী স্বামীরা নিজে যতই এদিক-সেদিক করুক না কেন, স্ত্রীর বিষয়ে পুরোপুরি সজাগ। তার স্ত্রীর অতীত থাকলেও সেটা যেন বর্তমান হয়ে না যায় সেদিকে তৎপর। শুধু কি তাই? কোন পুরুষের সাথে স্ত্রী একটু হেসে কথা বললেও রাগ চেপে বসে অতি মর্ডান বাঙালী স্বামীর মনেও, যাকে বলে পৌরুষালী ঈর্ষা। এরকম ঘটনা তো খুবই ফ্রিকোয়েন্ট যে, হাজারটা গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে যৌবন পার করার পর বিয়ের সময় এলে একজন সতি-সাবিত্রী খুঁজে বেড়ায় বাঙালী পুরুষ। বাইরে সেকেলে মন-মানসিকতা বিরোধী কথা বলে ঠিকই, কিন্ত ভিতরে পরহেজগার বৌ খুঁজে বেড়ায়। আর সন্তানরা? তারা ভূমিষ্ঠ হয় মায়ের ঘর বদলের পরে। তাই মায়ের অতীতের কোন গুরুত্ব আছে বলে তারা মনে করেনা। তবে মেয়ে সন্তানেরা পরিণত হওয়ার পরে মাকে বুঝতে শেখে। অনেক সময় মায়ের সুখ-দুঃখ তারা ভাগও করে নেয়, এক নারীর পাশে আরেক নারী ভরসা দিয়ে দাঁড়ানোর মত।

অফিসে কাজের ফাঁকে গেলাম একটু কফি খেতে। আমি যে ফ্লোরে বসি তার নীচের তলায় এক জায়গায় কফি বিক্রী হয়, খুব ভালো কফি বানায় তারা। ভিতরে ঢোকার সাথে সাথে তাজা বিনের সুবাস এসে মনটা ভরিয়ে দেয়। শুধু শুধুই বলেনি, ‘ঘ্রানে অর্ধ ভোজন’। এক কাপ কফি নিয়ে টেবিলে বসেছি, এসময় আরেক কাপ কফি হাতে আমার টেবিলে এসে বসলেন ইমরান সাহেব। তিনি এই বিল্ডিংয়েই আরেকটি অফিসে চাকরী করেন। কানাডায় লেখাপড়া করেছেন। বয়সে আমার চাইতে কয়েক বছরের ছোট হবেন। খুব হাসিখুশী ও নিরংহকারী এই লোকটাকে আমার ভালো লাগে। কানাডায় চাকরী-বাকরী করে ভালোই ছিলেন, হঠাৎ বাংলাদেশে এসে থাকতে শুরু করলেন। পরে জেনেছি কারনটা। কানাডায় বসে অনলাইনে পরিচয় এক বাংলাদেশী মেয়ের সাথে, অনলাইনে চ্যাট করতে করতে আকাশজালীয় ঘনিষ্টতা, তারপর একসময় দেশে এসে দেখা সাক্ষাৎ, এরপর প্রণয়, অবশেষে পরিণয়। এখন বৌ আর একটি সন্তান নিয়ে দেশেই আছেন। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আপনি এতগুলো বছর কানাডায় পার করেছেন, কানাডিয়ান কোন মেয়েকে বিয়ে করে ওখানে থেকে গেলেই তো পারতেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “আমরা যারা অনেকগুলো বছর বিদেশে থাকি, দেশের জন্য তাদের মন আনচান আনচান করে। ওখানকার সহজলভ্য মেয়েদের চাইতে বাংলাদেশী মেয়েদের প্রতি আকর্ষণ ছিলো বেশী, সেই থেকেই সবকিছু।” আজ একই টেবিলে আমার সামনে বসে একগাল হেসে বললেন, “কি সৌভাগ্য আমার, স্যারের সাথে দেখা হয়ে গেলো!” আমি বললাম
আমিঃ কেমন আছেন?
ইমরানঃ জ্বী, ভালো আছি।
আমিঃ অফিস কেমন চলছে?
ইমরান: জ্বী, ভালো। মানে ব্যবসা কিছুটা স্লো, বোঝেনই তো বর্তমান অবস্থা। যাহোক চলছে তবুও।
আমি: আপনাদের কানাডার প্রাইম মিনিস্টার তো খুব পপুলার।
ইমরান: জ্বী, খুবই পপুলার।
আমি: এদিকে আমেরিকায় তো ট্রাম্প জিতে গেলো!
ইমরান: (একটু উদ্বেগ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে) এটা কি হলো বলেন তো স্যার? আমেরিকার জনগণ এটা কি করলো?
আমি: কি জানি ভাই। আপনাদের ওদিককার ব্যাপার, আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।
ইমরান: এবার কানাডার উপর চাপ বেশি পড়বে। অনেক এ্যামেরিকান ইমিগ্রান্ট কানাডা চলে আসতে চাইবে। কানাডায় সবকিছু টিপটপ ছিলো, জানিনা এখন কি হয়!

আমার সাথে টুকরো টুকরো কথার ফাঁকে ফাঁকে, দেখলাম উনি মোবাইলে কি যেন করছেন। আমি আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে বললাম, “কি ভাই ফেসবুকে কাজ করছেন?”
ইমরান একগাল হেসে, “বুঝে ফেলেছেন? দুনিয়াটাই এখন ফেসবুকময় হয়ে গেছে স্যার।” আমি একটা টোপ ফেলে বললাম, “প্রেমের আলাপ করছেন না তো আবার?” ইমরান আরেক গাল হেসে বললো, “সুযোগ পাইনা স্যার। প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডগুলা এ্যাভয়েড করে যায়!” উনার কথায় আমি বিস্মিত হবো, না স্বাভাবিকভাবে নেব, বুঝতে পারলাম না। উনি কি জোক করলেন নাকি অকপট সত্যি কথা বললেন? আমি কি ধরে নেব যে, উনিও মাঝে মাঝে ইনবক্সে উনার এক্সদেরকে নক করেন? এই নতুন টেকনলজিটি দেখছি সবকিছু ওলট-পালট করে দেবে!

রতে নেটে বসলাম। ফেসবুকে ঢোকার ইচ্ছা নিয়েই বসেছিলাম, তারপর হঠাৎ কেন যেন ইচ্ছা হলোনা। মানুষের মন বড় বিচিত্র মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে বুঝিনা। কি করা যায় ভাবছি। হঠাৎ আলবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরীর কথা মনে এলো। স্কুল জীবনে আইনস্টাইনের বর্নাঢ্য জীবন কাহিনী পড়ে এতটাই চমৎকৃত হয়েছিলাম যে মনের অজান্তে আইনস্টাইন হওয়ার বাসনা জেগেছিলো। পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঐ সাবজেক্টটি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলাম, এবং ভালো মার্কসও পেয়েছিলাম। সে সময় একটা কথা ছিটেফোটা শুনেছিলাম কিন্তু খুব একটা গুরুত্ব দেইনি, দুয়েকদিন আগে আরো একজন আমাকে কথাটা বলেছিলো যে, আলবার্ট আইনস্টাইন-এর কাজগুলো মূলতঃ তাঁর স্ত্রী মিলেভা-র করা, আইনস্টাইন তার কো-অথর টাইপের, তবে মিলেভা ম্যারিক তার স্বামীকে বড় দেখতে চেয়েছিলেন তাই গবেষণাপত্র স্বামীর নামে পাবলিশ হলেও তিনি কিছু মনে করেন নাই। অবশেষে নোবেলটাও তার স্বামী পেয়েছিলেন। অথচ গবেষণাপত্রগুলো যৌথ নামেও প্রকাশ হতে পারতো! নোবেলও তাহলে যৌথভাবেও পেতেন। বিষয়টা সিগনিফিক্যান্ট। আমি ছোটবেলায়ই উনার জীবনীতে পড়েছিলাম যে আইনস্টাইন অংকে কাঁচা ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স পড়তে গিয়ে আমি দেখেছি ওখানে টেনসর এ্যানালাইসিসের মত জটিল ম্যাথমেটিক্স ব্যবহার করা হয়। যার কাছে এ্যানালিটিকাল ম্যাথই কঠিন ছিলো, তিনি টেনসর সামলালেন কিভাবে? বইপত্রে অবশ্য এই কৃতিত্ব তার বন্ধু মার্সেল গ্রসম্যান-কে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স-এর বিশেষত জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি-র জটিল বিষয়গুলো সমাধান করতে আইনস্টাইনকে সাহায্য করেছিলেন গ্রসম্যান। প্রশ্ন হলো জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি-র আগের গ্রাউন্ড ব্রেকিং কাজগুলোতেও জটিল গণিতের ব্যবহার আছে ওগুলোতে উনাকে কে সাহায্য করেছিলেন? উত্তর তবে থেকে যায় একটিই, উনাকে এই কাজে সাহায্য করেছিলেন উনার স্ত্রী মিলেভা, যিনি জুরিখ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একজন মেধাবী ছাত্রী ছিলেন এবং ঐ প্রতিষ্ঠানের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ সমাপ্তকারী দ্বিতীয় নারী ছিলেন। তবে মিলেভা-আলবার্টের প্রেমের গভীরতা ব্যাপক হলেও সংসার উনাদের টেকেনি। এক সময় বিচ্ছেদ নেমে এসেছিলো উনাদের যৌথ জীবনে। তবে যতদিন একসাথে ছিলেন ততদিন মিলেভা গবেষণার কাজে আলবার্ট-কে সাহা্য্য করেছিলেন কিনা, এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমি কিছুটা আগ্রহ নিয়ে আইনস্টাইনের বায়োগ্রাফী আরেকবার পড়লাম। এবার আর আবেগভিত্তিক নয়, তথ্যভিত্তিক। আকাশজালের এই যুগে তথ্য খুব সহজলভ্য হয়ে গেছে। আঙুলের ডগা দিয়ে ক্লিক করলেই অনেক কিছু ঘরে এসে ধরা দেয়। মনযোগ দিয়ে উনার বায়োগ্রাফী পড়ে একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম উনার বড় সব গবেষণাই ছিলো ১৯১৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৯১৯ সালে মিলেভার সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর উনার আর বড় কোন গবেষণাপত্রই নেই। কেবল বাঙালী অধ্যাপক সত্যেন বসুর সাথে একটি গবেষণাপত্র আছে ১৯২৪ সালে যার নাম ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’, তবে এটিতে মূলতঃ আইনস্টাইনের পূর্বেকার একটি হাফ-ডান ওয়ার্ক-কে সাফল্যের সাথে সমাপ্ত ও সমাধান করেছিলেন ঢাকার বিজ্ঞানী সত্যেন বসু। এটা কি এই ইঙ্গিত দেয় যে মিলেভা ছাড়া আইনস্টাইন অচল ছিলেন?

মিলেভা-আলবার্টের প্রেম কাহিনীও ইন্টারেস্টিং। আইনস্টাইন ‘সুইজ ফেডারেল পলিটেকনিক স্কুল’-এর ছাত্র ছিলেন। উনার মতে জুরিখের দিনগুলি উনার খুব সুখেই কেটেছিল। সেখানে তিনি অনেক বন্ধুর দেখা পান যাদের সাথে উনার ভাল সময় কেটেছে। যেমন গণিতজ্ঞ মার্সেল গ্রসম্যান এবং বেসো যাদের সাথে তিনি স্থান-কাল নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতেন। অসমাধানকৃত এই বিষয়টি তখন বিজ্ঞানের জগতে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছিলো। উনাদের এই আলোচনায় যোগ দিতে অনেকেই আসতেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সার্বিয়া থেকে আগত মিলেভা মেরিক। সেখানেই আইনস্টাইনের সাথে মিলেভার পরিচয় হয়। প্রকৃতপক্ষে মিলেভা ছিলেন ঐ প্রতিষ্ঠানের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একমাত্র ছাত্রী। বিজ্ঞানের আলোচনা টেবিলের এই বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে যার ফল স্বরূপ মিলেভাকেই পরবর্তীকালে বিয়ে করেন আলবার্ট। তাদের ঘরে তিন সন্তানের জন্ম হয়। প্রথম কন্যা সন্তানটি মিলেভার গর্ভে এসেছিলো তাদের বিয়ের আগেই ১৯০২ সালে। তবে সেই সন্তানটি অল্প বয়সেই মারা যায়। ১৯০৩ সালে তারা আনুষ্ঠানিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আইনস্টাইনের মা মিলেভাকে কয়েকটি কারনে পছন্দ করেননি – মিলেভা দেখতে সুন্দরী ছিলেন না, ইহুদি ছিলেন না, আবার বয়সেও মিলেভা ছিলেন আইনস্টাইনের চাইতে চার বছরের বড়। এত কিছুর পরেও আইনস্টাইন-মিলেভা দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যান। ১৯০৪ সালে তাদের দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। তৃতীয় সন্তানের জন্ম হয় ১৯১০ সালে। ১৯১৪ সালের এপ্রিলে আইনস্টাইন-মিলেভা পরিবার বার্লিনে আসেন বসবাস করার উদ্দেশ্যে। এখানে এসে শুরু হয় মিলেভার অসুখী জীবন, যখন তিনি জানতে পারলেন যে আলবার্টের জীবনের প্রধান রোমান্টিক আকর্ষণ ছিলো তারই কাজিন ‘এলসা’। বার্লিনে আসার পর আলবার্ট এলসার সাথে নিয়মিত মধুর সম্পর্ক রাখতে শুরু করে। এটা তাদের দাম্পত্য কলহের কারণ হয়, অবশেষে মিলেভা তার দুই ছেলেকে নিয়ে জার্মানী ছেড়ে জুরিখে ফিরে আসেন। কিছুকাল পৃথক থাকার পর ১৯১৯ সালে তাদের চূড়ান্ত বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর আইনস্টাইন তার কাজিন সিস্টার এলসা-কে বিয়ে করেন।

এই আইনস্টাইনের জীবনের আরেকটি প্রেম ছিলো মেরি উইনটেলার। ১৯১০ সালে মেরিকে লিখিত একটি পত্রে আইনস্টাইন বলেছেন, “I think of you in heartfelt love every spare minute and am so unhappy as only a man can be”। মিলেভা যখন আইনস্টাইনের দ্বিতীয় সন্তানকে গর্ভে ধারন করেছেন তখন আইনস্টাইন মেরিকে বলেছিলেন একটি “misguided love”-এর কথা, এবং মেরি-র জন্য কতটুকু তার মন পোড়ে সেকথাও তিনি বলেছিলেন।
জানিনা বিষয়টিকে কিভাবে দেখবো। আইনস্টাইন-কে কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ বলবো? যার সাহায্য নিয়ে আইনস্টাইন এত বড় বিজ্ঞানী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন, তাকে ঘরে রেখেই তিনি দু’দুটি এক্সট্রা মেরিটাল এ্যাফেয়ারে জড়িয়ে পড়লেন!

নাকি এইসব কিছুই জীবনের জটিলতা? ঐ যে বলে ‘ঘরকা মুরগী ডাল বরাবর’। মিলেভা হয়তো আইনস্টাইনের জন্য ঘরকা মুরগী ছিলো। দূরে থাকা না পাওয়া এলসা বা মেরি-দেরকেই উনার বেশী আকর্ষণীয় মনে হতো। কে কাকে ভালোবেসেছিলো? আইনস্টাইন মিলেভা-কে নাকি মিলেভা আইনস্টাইন-কে?

এসব ভাবতে ভাবতে ফেসবুকটা চালু করলাম। প্রথমেই চোখে পড়লো নওশীন-এর আপলোড করা কিছু ফটোর দিকে। আমাদের অফিসেই চাকরী করতো মেয়েটি। ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ শেষ করে মাত্র জবে ঢুকেছিলে, একেবারেই অল্পবয়স্ক তরুণী। মেয়েটি দেখতে দুর্দান্ত সুন্দরী, সেই সাথে যোগ হয়েছিলো অল্পবয়সের লাবণ্য, সব মিলিয়ে ভরা পূর্ণিমার রূপ। মাঝে মাঝে আসতো আমার সাথে কথা বলতে। মিষ্টি মিষ্টি হেসে কথা বলতো, ওর চোখের তারায় রঙিন প্রজাপতি নাচতো। পুরুষ মানুষ আমি, রূপসীর রূপের ঝলকানী প্রত্যাখ্যান করি কি করে? আমিও আগ্রহ নিয়ে গল্প করতাম ওর সাথে। তবে একটু সাবধানও থাকতাম, আমাদের এই অল্পস্বল্প গল্প করার কাহিনী যেন আবার পুরো অফিসের গালগল্প হয়ে না যায়! হঠাৎ করে একদিন দেখলাম ও আর অফিসে আসছে না। কাউকে আর জিজ্ঞাসা করিনি ওর ব্যাপারে, কে আবার কি ভেবে বসে। ওর মোবাইল নাম্বার ছিলো আমার কাছে, দুয়েক সময় আমরা টেলিফোনে কথাও বলেছিলাম। তবে এবার আর ফোন করে কিছু জানতে চাইনি। ভেবেছিলাম, সিরিয়াস কিছু হলে ওই হয়তো ফোন করবে, আর তা নইলে ধরে নেব ও ভালো আছে। ভালো থাকলেই ভালো। হঠাৎ একদিন দেখলাম ফেসবুকে ওর বিয়ের ছবি। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে ওর। বিয়ে করে ওরা অস্ট্রেলিয়া চলে গেছে। ছেলেটা হ্যান্ডসাম হলেও তুলনামূলকভাবে বয়স্ক মনে হলো। সে যাই হোক, ওর পছন্দ হলেই হলো। নওশীন দেখছিলাম বিয়ের আগে কিছুদিন যাবৎ নিজের খুব সুন্দর সুন্দর ফটো আপলোড করছে ফেসবুকে। একটা পুরো এ্যালবাম দেখলাম ওর একক ছবির, নানা পোষাকে, নানা সাজে, নানান জায়গায় (কখনো সমুদ্র সৈকতে, কখনো চা বাগানে, কখনো কোন গার্ডেনে)। তখন আমার মনে হচ্ছিলো ও কোন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এটা করছে। হয়তো এভাবে ও নিজেকে প্রকাশ করেছে, মোটা কথায় নিজের বিজ্ঞাপন বলা যেতে পারে। হয়তো এরই ফলাফল হিসাবে সেই সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন পয়গাম পাঠিয়েছে ওকে। তার ফল ঐ শুভ পরিণয়। ক্লিক করে করে ওর নতুন ছবিগুলো দেখতে লাগলাম। পঁচিশটির মতো ছবি, সবই তার স্বামীর সাথে অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন জায়গায় বেড়ানোর ছবি। নতুন এই দম্পতিকে বেশ সুন্দরই লাগছে! সবগুলো ছবিতেই লাইক দিলাম (মন্তব্য ইচ্ছে করেই দিলাম না)। গোপনে বলে রাখি, অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরও ইনবক্সে ওর সাথে আমার দুয়েকবার কথা হয়েছে, শী ইজ হ্যাপী উইথ হার লাইফ, গুড! সূখী হোক মেয়েটি।

হঠাৎ স্ক্রীণে ভেসে উঠলো মেসেজ, ‘ তুমি অনলাইনে? কেমন আছো?’ তানিয়ার পাঠানো মেসেজ।
একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলাম ও আগেও দুদিন দুটি মেসেজ পাঠিয়েছে, “কোথায় তুমি? ফেসবুকে দেখিনা কেন?” “তুমি কি খুব ব্যস্ত? না কি কোন সমস্যা হয়ছে? ফেসবুকে আসোনা কেন?”
খারাপ লাগলো আমার। আহা এর আগেও দুদিন ও মেসেজ পাঠিয়েছে অথচ আমি খোজও রাখিনি!

আমি দ্রুত উত্তর দিলাম, “আমি ভালো আছি, আমি অনলাইনে”। তানিয়া মেসেজ পাঠালো, “তোমাকে ফোন করা যাবে?” আমি কালক্ষেপন না করে ঝড়ের গতিতে উত্তর দিলাম, “যাবে, কল মি প্লিজ।”

আমার মোবাইলে বেজে উঠলো, “তু যো নেহি হ্যায়। তো কুছ ভি নেহি হ্যায়, ইয়ে মানা কি মেহফিল জওয়া হ্যায় হাসি হ্যায়” (এই গজলটি ইদানিং আমার খুব ভালো লাগতে শুরু করেছে, অবিকল যেন আমার মনের কথা বলছে, তাই এটাকেই আমার রিংটোন করেছি)।
ফোন ধরলাম

আমিঃ হ্যালো তানিয়া। কেমন আছো?
তানিয়াঃ ভালোই। তুমি কেমন আছো।
আমিঃ ভালো।
তানিয়াঃ তুমি, ‘ভালোই’ বলোনা। ‘ভালো’ বলো। তার মানে সত্যিই ভালো আছো, তাইতো?
আমিঃ এতকাল পর তোমাকে খুঁজে পেলাম। সেই তোমার সাথে ফোনে কথা বলছি। ভালো থাকবো না?
তানিয়াঃ ও। শুনে ভালো লাগলো।
আমিঃ এখন রাত দুইটা। তোমার স্বামী কি বিদেশ থেকে ফেরে নাই?
তানিয়াঃ ফিরেছিলো। আবার চলে গেছে।
আমিঃ ও। বলো তাহলে।
তানিয়াঃ আজ তুমি বলো। এ কয়দিন ফেবুকে আসোনি কেন?
আমিঃ অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত ছিলাম।
তানিয়াঃ অফিসের কাজে তো দিনে ব্যস্ত ছিলে, রাতে তো ফেসবুকে বসতে পারতে?
আমিঃ রাতে? আসলে সারাদিন কাজ করে রাতে আর এনার্জি হয়নি। আর কেন যেন ইচ্ছেও করছিলো না।
তানিয়াঃ আমার সাথে যোগাযোগ করারও কোন ইচ্ছে করছিলো না?
আমিঃ (আমি একটু থমকালাম। ঐদিন হুট করে ফোন রেখে দিলো, আজ আবার যোগাযোগ করিনি বলে মনে খারাপ করছে) না মানে, আমি ফোন করতে চাচ্ছিলাম। তারপর ভাবলাম তুমি তো নিষেধ করেছ ফোন করতে।
তানিয়াঃ ফোন না করে ভালোই করেছ। ফোন করার দরকার নাই। আচ্ছা তোমার মোবাইলে ইন্টারনেট ফেসবুক নাই?
আমিঃ না। ইচ্ছে করে লাগাইনি। এটা নারকোটিকের মত একটা নেশা, এত নেশা ভালো না। রাতে ফেসবুকে বসি এটাই যথেষ্ট।
তানিয়াঃ অফিসের কম্পিউটারে ইন্টারনেটতো না থাকার কথা নয়?
আমিঃ ইন্টারনেট আছে, ফেসবুক নাই। ফেসবুক থাকলে কাজে হ্যাম্পার হয়, তাই ঐ অপশনটা অফ কর আছে।
তানিয়াঃ ও। আচ্ছা তুমি থাকো কোথায়?
আমিঃ ধানমন্ডি।
তানিয়াঃ আর অফিস?
আমিঃ বনানীতে।
তানিয়াঃ কিসের অফিস? কি করো তুমি?
আমিঃ একটা কর্পোরেশন। মাল্টিপারপাস বিজনেস, অনেক কিছুই আছে ওদের।
তানিয়াঃ ওদের মানে?
আমিঃ মানে আমার এক বন্ধু মালিক। আমি বিদেশ থেকে আসার পর ও আমাকে রিকোয়েস্ট করলো।
তানিয়াঃ কি করো তুমি ওখানে?
আমিঃ সবই করি।
তানিয়াঃ সবই করো মানে? ফ্লোরও ঝাড়ু দাও নাকি?
আমিঃ (আমার উত্তরের ধরন বোধহয় ওর পছন্দ হয়নি, তাই ক্ষেপে গিয়েছে) আরে ক্ষেপে যেওনা। বিষয়টা হলো, ও আমার স্কুল জীবনের বন্ধু। খুব ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে।
তানিয়াঃ তুষার? তোমার বন্ধু তুষার?
আমিঃ (আরেকটা ধাক্কা খেলাম আমি। সেই সময় আমি হয়তো ওকে তুষারের কথা বলেছিলাম দুয়েকবার, কিন্তু আটাশ বছর পর ও সেই নাম মনে করলো কি করে!) তোমার মনে আছে ওর নাম?
তানিয়াঃ মনে না থাকলে বললাম কি করে?
আমিঃ একমাত্র ছেলে তো। বাবাও এখন আর বেঁচে নাই। আমাকে বললো, “এতো বড় ব্যবসা একা সামলাতে পারিনা। আমার তো আর কোন ভাই নাই। তুই আমার সাথে এলে আমার উপকার হয়।” ওর কথা আমি ফেলতে পারলাম না।
তানিয়াঃ তা কি করো ওখানে?
আমিঃ ঐ যে বললাম। ওর পাশে থেকে ব্যবসাটার দেখাশোনা করা।
তানিয়াঃ তুমি কি বিদেশে ফিজিক্স নিয়ে পড়োনি?
আমিঃ হ্যাঁ ফিজিক্স নিয়েই পড়েছি।
তানিয়াঃ ফিজিক্সওয়ালা ব্যবসার কি বোঝে?
আমিঃ সেরকম কিছু বোঝার কথা না। তবে ওখানে ফিজিক্স খুব উন্নত একটা সাবজেক্ট। ফিজিক্স-এর পাশাপশি ওখানে ম্যাথমেটিক্সও পুরো পড়িয়ে দেয়। গণিতে যার মেধা আছে তার বিশ্লেষণি ক্ষমতা বেশি, তাই সে ………।
তানিয়াঃ (আমাকে কথা শেষ করতে দিলো না তানিয়া) বুঝতে পেরেছি। তুমি বড় পন্ডিত! তাই যেই কাজ দেয় সেটাই পারো, এই বলতে চাইছো তো?
আমিঃ না মানে ………….।
তানিয়াঃ এত মানে মানে করতে হবেনা। তোমাকে আমি চিনি।

আবার ধাক্কা খেলাম। ও এমনভাবে বলছে যেন আমাকে হাজার বছর চেনে। অথচ ওর সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো মাত্র ছয়মাস! না আমি ভুল বলছি, সময়ের লেংথটা বড় কথা নয়। ঐ যে একটা গান আছে, ‘মনে হলো তুমি যেন, অনেক দিনের চেনা!’

তানিয়াঃ চুপ কেন?
আমি: না ভাবছি।
তানিয়াঃ কি ভাবছো? গল্পের প্লট? কবিতার থিম?
আমিঃ মানে?
তানিয়াঃ খুব সুন্দর সুন্দর গল্প কবিতা লেখো তো তুমি।
আমিঃ (আবার চমকালাম! ওকি আমার ব্যাপারে এতকাল সব খোজই রেখেছে?) কিভাবে জানলে?
তানিয়াঃ তোমার টাইমলাইনে গিয়ে পড়েছি।
আমিঃ ও।
তানিয়াঃ আচ্ছা, তোমার লেখা একটা প্রেমের গল্প দেখলাম, একটা মালেশিয়ান মেয়েকে নিয়ে লেখা। ওটা কি তোমার জীবনের সত্যি ঘটনা?
আমিঃ এরকম মনে হলো কেন?
তানিয়াঃ সত্যিই তো মনে হচ্ছে। কেমন অবিকল বর্ণনা!
আমিঃ এটা একটা সমস্যা।
তানিয়াঃ কি সমস্যা?
আমিঃ প্রেমের গল্প লেখা।
তানিয়াঃ কেন?
আমিঃ যখনই কোন প্রেমের গল্প লিখি, অমনি সবাই হামলে পরে। বলে “এটা নিশ্চয়ই আপনার জীবনের সত্য কোন ঘটনা।”
তানিয়াঃ ওরা সন্দেহ করে তাই বলে। ওরা কি ঠিক বলে না?
আমিঃ আরে এই বিষয়ে কি বলবো? একবার একজন বলে, “সত্যি না হলেও আমরা ধরে নেব সত্যি। যেমন সৈয়দ মুজতবা আলী-কে সবাই বলেছিলো, আপনি আফগানিস্তানে গিয়ে প্রেম করেছেন, তা নইলে এত জীবন্ত গল্প লিখলেন কি করে?”
তানিয়াঃ ঠিকই বলেছে।
আমিঃ তুমিও ওদের সাথে সুর মেলালে? আচ্ছা শোন আমি এ পর্যন্ত দশ-এগারোটা প্রেমের গল্প লিখেছি। এখন তুমি কি এই বলতে চাও যে, আমি দশ-এগারোটা প্রেম করেছি?
তানিয়াঃ হতেই পারে, জীবনে দশ-এগারোটা প্রেম তো নরমাল।

ওর কথা শুনে হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না) মনে হচ্ছিলো ওর মুখের উপর বলি, “তুমি কি জীবনে দশ-এগারোটা প্রেম করেছ?” কিন্তু না। কিছুই বললাম না। মুহূর্তেই চুপসে গেলাম। এরকম প্রশ্ন আমি ওকে করি কি করে?

তানিয়াঃ শোন।
আমিঃ কি?
তানিয়াঃ আমাকে নিয় একটা গল্প লেখোনা।
আমিঃ তোমাকে নিয়ে গল্প লিখবো? এখন?
তানিয়াঃ হ্যাঁ, ওসুবিধা কি?
আমিঃ তোমার জামাই অস্ত্রের ব্যবসা করে না?
তানিয়াঃ করে, তাতে কি হলো?
আমিঃ তোমাকে নিয়ে এখন আমি যদি গল্প লিখি। তোমার সাহেব এসে আমার বুকে একটা গুলি শুধু খরচ করবে!
তানিয়াঃ হি হি হি। এমনভাবে লিখবে যেন বোঝা না যায়। নামটাম সবকিছু পাল্টে দেবে। শুধু আমি জানবো যে এটা আমাকে নিয়ে লেখা।
আমিঃ ওকে। কি লিখবো বলো? থিম দাও, প্লট দাও।
তানিয়াঃ এই ধরো, একটা মেয়ে ছিলো খুব হাসিখুশী প্রাণবন্ত। তারপর সব কেমন হয়ে গেলো! মানে সবকিছু ওলট-পালট। মেয়েটি এখন অসহনীয় দিন পার করে, রাত জেগে নীরবে চোখের জল ফেলে।

আমি আর ওর কথা শুনতে পারছিলাম না। মাথার ভিতরটা ভোঁ ভোঁ করতে লাগলো। ও কি বলতে চাইছে? কাকে দোষ দিতে চাইছে? আমাকে না ওর স্বামীকে। এই প্রশ্ন আমিই বা ওকে করি কি করে? ওর স্বামী কি ওকে খুব কষ্ট দেয়? ব্যাটাকে! না আমি কোনমুখে এই কথা বলি? আমি কি ওকে কম ব্যাথা দিয়েছি?

আমিঃ তানিয়া।
তানিয়াঃ আমি এখন ফোনটা রাখি।
আমিঃ তানিয়া।
তানিয়াঃ আমার আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

ফট করে লাইনটা কেটে দিলো ও।
আবার সেই! আমাকে একটা যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে লাইনটা কেটে দিলো। ফেসবুকে মেসেজ বক্সের দিকে তাকালাম। ওর কাছ থেকে কোন মেসেজ পাওয়া যায় কিনা। না আগের বারের মত এবার কোন ‘গুড নাইট’ মেসেজও এলোনা।

“যে টুকু সময় তুমি থাকো কাছে,
মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে,
বাকীটা সময় যেন মরণ আমার,
জীবন জুড়ে নামে অথৈ আঁধার।”

একসময় তানিয়া আর আমি একসাথে এই গানটি শুনতে খুব ভালোবাসতাম!

(চলবে)

তারিখ: ২৬ নভেম্বর, ২০১৬ সাল
সময়: সকাল ৫ টা বেজে ২ মিনিট।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.