প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৪

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৪
————————- ড. রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

‘বেঁচে থাকার অনেক আশা প্রিয়তমা,
তোমাকে ভালোবাসার মতই একান্ত বেঁচে থাকা।’
আমার অনেক প্রিয় একটি কবিতার লাইন। একসময় ভাবতাম ক্যারিয়ারই জীবনের সব। আরো ভাবতাম, একটিই জীবন তার আবার শেষও আছে। তাহলে জীবনের উদ্দেশ্য কি? গ্রিক মিথলজির অন্যতম নায়ক একিলিস-কে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “একিলিস তোমার সামনে দুটো অপশন আছে – এক. তুমি চাইলে অমর দেবতা হতে পারো, দুই. চাইলে মরণশীল মানব হবে কিন্তু তোমার কীর্তির মধ্যে দিয়ে তুমি চিরকাল মানুষের হৃদয়ে রয়ে যাবে, এটাও একধরনের অমরত্ব। একিলিস বলো তুমি কি চাও?” অমর দেবী থেটিস ও মরণশীল মানব রাজা পেলেউস-এর পুত্র, একিলিস ভাবলো অমর দেবতার জীবন বড় একঘেয়ে, তার চাইতে বরং মরণশীল মানব হয়ে কীর্তির মধ্য দিয়ে মানবজাতির হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে অমরত্ব লাভ করাই শ্রেয়। একিলিসের এই চিন্তা-ভাবনার দ্বারা আমি ভীষণ প্রভাবিত ছিলাম। অবিনশ্বর আত্মা ও নশ্বর দেহের সংমিশ্রণ এই আমি একদিন এই পৃথিবী থেকে নিশ্চিত বিদায় নেব। কিন্তু কোনভাবে যদি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারি, তাহলে তো মরেও অমর হবো! আমার এই দুটি ভাবনার কোনটাতেই ভালোবাসা-র স্থান ছিল না। এই কারণেই হয়তো আমার হৃদয়ে প্রেম কোন স্থান পায়নি। তাহলে আমি যে মানবের হৃদয়ে স্থান পাবার কথা বললাম, এটা কতটুকু ঠিক? শত শত শ্রমিকের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে গড়া তাজমহল দিয়ে সম্রাট শাহজাহান কি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছেন? অথবা মস্কোর রেড স্কয়ারের উপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বর্ণিল নয়টি গম্বুজ সম্বলিত ‘সেন্ট বেসিল’স ক্যাথেড্রাল’-এর নির্মাতা চতুর্থ ইভান যার আরেক নাম ‘ইভান দি টেরিবল’ তার স্থপতিদের চোখ অন্ধ করে দিয়ে কি মানুষের হৃদয়ে কোন স্থান পেয়েছেন? কীর্তি (সেটা সুকীর্তি হোক আর কূকীর্তি হোক) দিয়ে আসলে মানবের হৃদয়ে নয় স্মৃতিতে স্থান করা যায়।

একিলিস-এর ভালোবাসা ছিলো ব্রাইসিস। যিনি ছিলেন শত্রুপক্ষের মেয়ে, ভিন জাতির মেয়ে। ভালোবাসার জন্য একিলিস যুদ্ধচেতনা, শত্রু-মিত্র, জাতিভেদ সব ভুলে গিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ-র স্ত্রীর শুদ্ধতানাশ করেছিলো সম্রাট শাহজাহান। লাম্পট্যের এত বড় কলঙ্ক ললাটে রেখেও বেগম মমতাজ-কে ভালোবাসার জন্য হয়তো কিছুটা হলেও প্রেমিক পরিচয় পাবেন তিনি। রক্তপিপাসু ‘ইভান দি টেরিবল’-এর হাতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছিলো, একমনকি সে তার নিজ পুত্রকেও হত্যা করেছিলো। উপরন্তু তার তিপ্পান্ন বছর দীর্ঘ জীবনে বিবাহ করেছিলেন মোট আটবার। এদের মধ্যে তিনজনকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলো ইভানের কাছের লোকজনই (সমাজের অভিজাতরা), দুজন তাকে চীট করে প্রেমিক পুরুষদের সাথে গোপন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলো এবং ধরা পড়ে জার কর্তৃক ভয়াবহ শাস্তিপ্রাপ্ত হয়েছিলো। এত কিছুর পরও এটা সর্বজনবিদিত যে তিনি তার প্রথম স্ত্রী আনাস্তাসিয়া (নাস্তিয়া)-কে ভালোবাসতেন। প্রচন্ড বদমেজাজী ও অত্যাচারী এই দানবের মনেও প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিলো তার প্রথম স্ত্রী-র প্রতি।
প্রেম-ভালোবাসার অনুভূতিহীন আমি কি শাহজাহান-ইভানের চাইতেও নিকৃষ্ট?

ফেসবুকের ইনবক্সের দিকে চোখ গেল। এখানে একটা মেসেজ আছে। মন আনচান করে উঠলো, নিশ্চয়ই ওটা তানিয়ার পাঠানো। ক্লিক করলাম। নাহ তানিয়ার নয়। তবে? ভালো করে নামটার দিকে তাকালাম ‘যুঁথি বিথিকা’। কে উনি? আমি কি চিনি? যুঁথি নামটা তো কমোন। মেসেজ-এর লেখার দিকে তাকালাম, “আমাকে মনে পড়ে? আমি যুঁথি। অনেক বছর আগের কথা যদিও। তোমাদের বাড়ীর কাছাকাছিই থাকতাম। ঐ যে তোমার ক্লাসমেট তানিয়া ওর কাজিন বড় বোন আমি। তানিয়ার এ্যাকাউন্টে গিয়ে ফ্রেন্ডলিস্টে গিয়ে তোমার নাম পেয়েছি। আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট-টা একসেপ্ট করে নিও।” একসাথে অনেকগুলো কথা মনে পড়ে গেলো। হ্যাঁ, আমাদের বাড়ীর কাছাকাছিই থাকতেন যুঁথি আপা। দেখতে সুন্দরী ছিলেন, তাই পাড়ার বড় ভাইদের দুর্বলতা ছিলেন তিনি। আমার সাথে পরিচয় ছিলোনা, দূর থেকেই চিনতাম। তবে একদিন আমাদের পাড়াতুতো বড় ভাই কাজল ভাই উনার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। এই কাজল ভাইটা খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। আমাকে খুব ভালোবাসতেন, বেশিরভাগ বিকেলবেলাটা আমরা একসাথে গল্প করে কাটাতাম। কোনদিন আমি দেরী করলে উনি বাসায় চলে আসতেন। সেই কাজল ভাইয়ের মুখে উনার প্রশংসা শুনে বললাম, “কি ব্যাপার কাজল ভাই, উনার সাথে টাংকি-টুংকি মারা শুরু করেছেন নাকি?” কাজল ভাই লজ্জা পেয়ে বললো, “না রে ভাই, বামন হয়ে চাঁদের গায়ে হাত বাড়াই কি করে বলো। ও বুয়েটের ছাত্রী আর আমি পড়ি জগন্নাথে!” উনার কথা শুনে হেসে ফেলেছিলাম। তারপর যুঁথি আপার সাথে একদিন হঠাৎ করেই দেখা ইউনিভার্সিটিতে। তানিয়াই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। বললো, “আমার কাজিন যুঁথি আপা, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন”। ভাবছিলাম। আমি বলবো কিনা যে উআনকে আমি চিনি। আমার আগেই যুঁথি আপা বলেছিলো, “ওকে তো আমি চিনি, আমাদের এলাকাতেই থাকে।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমার তো অনেক শুনাম এলাকায়!” তারপর তানিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেছিলেন, “ওকে দেখে রাখিস। একদিন বড় কেউ হবে।” নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জ্বা পেয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। যুঁথি আপা চলে যাওয়ার পর তানিয়াকে বলেছিলাম, তোমার বড় বোনকে আমি চিনি। উনি এলাকায় কত ভাইদের যে হৃদয়ের রাণী!” এরপর তানিয়া হেসে বলেছিলো, “হ্যাঁ, আমাদের কাজিন ব্রাদারদের মধ্যেও উনাকে নিয়ে কমপিটিশন আছে।”

সেই যুঁথি আপার কাছ থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। একসেপ্ট করতেই হয়। ক্লিক করার জন্য আঙুল বাড়িয়েছি, হঠাৎ আঙুলটা থেমে গেলো। ক্লিক করবো? উনি আমাকেও চেনেন তানিয়াকেও চেনেন। তানিয়া ও আমার মধ্যে যে নতুন করে একটা যোগাযোগ হয়েছে এটা কাউকে জানাতে চাইনা। যেকোন মানুষেরই তিনটি লাইফ থাকে পাবলিক, প্রাইভেট ও সিক্রেট। আমার পাবলিক লাইফই বেশি ছিলো বা আছে, প্রাইভেট লাইফ একেবারেই নেই, সিক্রেট লাইফও কিছু কিছু ছিলো। তানিয়ার সাথে ইদানিংকার ব্যাপারটাতো টপ-সিক্রেট। এটার মধ্যে কেউ ইন করুক আমি চাইনা।

এর মধ্যে আরেকটা মেসেজ পেলাম। হ্যাঁ, এটা তানিয়ার মেসেজ, ‘জেগে আছো? ফোন করবো?’ আমি লিখলাম, “ফোন করো।”

রিংটোন বেজে উঠলো, ‘জনম জনম তব তরে কাঁদিবো, যতই হানিবে হেলা ততই সাধিব’ রিংটোনটা পাল্টেছি। কাজী নজরুল ইসলাম-এর এই গানটাও আমার হৃদয়ের কথা বলে। তিনি এত সুন্দর গান লিখতেন কি করে বুঝে পাইনা!

আমি: হ্যালো তানিয়া।
তানিয়া: ভালো আছো।
আমি: হু ভালো। (আজ আর ওকে প্রশ্ন করলাম না যে, ও কেমন আছে। ও যা উত্তর দিবে তা শুনে আমার মন খারাপ হবে। থাক।) তোমার জামাই বিদেশ থেকে ফেরে নাই?
তানিয়া: ফিরেছে।
আমি: তাহলে?
তানিয়া: ক্লাবে গিয়েছে। এখনো বাসায় ফিরে নাই। আরো হয়তো ঘন্টা খানেক পরে ফিরবে।
আমি: ও। তুমি যাওনাই ক্লাবে।
তানিয়া: আমিও যাই মাঝে মাঝে। তবে ওর সাথে কম যাওয়া হয়।
আমি: (কেন ওর সাথে কম যাওয়া হয়? এই প্রশ্নটি কি ওকে করা ঠিক হবে? থাক) হ্যাঁ, আমি তোমার ফটো এ্যালবামে গিয়ে দেখেছি। বান্ধবীদের সাথে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াও। এই পার্টি সেই পার্টি, বিয়ে জন্মদিন, কতকিছু!
তানিয়া: আর কি করবো বলো? ঘরে তো কাজ তেমন নেই। ঘর ভর্তি একগাঁদা কাজের লোক, রান্নাটাও তো করতে হয়না। তাই সময় কাটানোর জন্য এইসব করে বেড়াই। যতটুকু সময় বাইরে থাকি মনটা হালকা থাকে।
আবারো আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বাইরে থাকলে ওর মন হালকা থাকে, তাহলে কি ঘরে এলে ওর মন খারাপ হয়ে যায়? ওর জামাই কি ওকে …? ব্যাটাকে! আবার আমি থেমে গেলাম। একটা হাইপোথিসিস করা যেতে পারে। ধরলাম ওর জামাই না, আমার সাথে তানিয়ের বিয়ে হয়েছিলো, তাহলে আমার সাথে ওর সাংসারিক জীবন কতটুকু হতে পারতো? প্রচন্ড ক্যারিয়ারিস্ট আমি কতটুকু সময় ওকে দিতে পারতাম?

আমি: (ঠাট্টা করে) তুমি রান্না করতে পারো?
তানিয়া: মিঃ ডাটাবেস তুমি কি ভুলে গেছো?
আমি: না ভুলি নাই। আমি তোমার কাছ থেকে রান্না করা শিখেছিলাম। তিনটি রান্না এখনো মনে আছে, পুডিং বানানো, চটপটি বানানো আর বিরিয়ানী রান্না।
তানিয়া: বানাও এখনো?
আমি: বিদেশে থাকতে খুব কাজে লেগেছিলো তোমার রান্না শিক্ষা। ওখানে তো সব নিজেকেই করতে হতো। এখনো বানাই মাঝে মাঝে। তুমি বানাওনা?
তানিয়া: প্রয়োজন পড়ে না। বাবুর্চীতো আছেই। বানিয়ে কাকে খাওয়াবো বলো?
(আবারও আমার মন খারাপ হলো। তাহলে কি ধরে নেব যে, ওর রান্না-বান্নার প্রতি ওর জামাইয়ের কোন আগ্রহ নেই)
আমি: ও।
তানিয়া: ছেলেটা যখন খেতে চাইতো তখন বানাতাম মাঝে মাঝে। ও তো এখন বড় হয়ে গেছে, তাই ওরও আর এত আগ্রহ নেই।
আমি: ও। গান গাও এখনো?
তানিয়া: কাকে শোনাবো বল?
আমি আবারো চুপ। “আজ একবার গাও, আমি শুনি” একথা ওকে কি বলবো? বোধহয় ঠিক হবে সে অধিকার তো কবেই হারিয়েছি। কি নিয়ে ওর সাথে কথা আগাবো ঠিক ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি একটা কথা ওকে বলতে চাই কিন্তু সাহস সঞ্চয় করতে পারছি না।
আমি: তোমার গত পার্টির ছবি দেখলাম। বেগুনী রঙের শাড়িতে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিলো!
তানিয়া: আমাকে তো তোমার পিংক কালারে দেখতেই বেশী ভালো লাগতো তাইনা?
আমি: তোমার মনে আছে?
তানিয়া: (রেগে উঠে) কেন, মনে থাকবে না কেন? শুধু তুমিই কি ইনটেলিজেন্ট?
আমি: না মান…।
তানিয়া: থাক আর মানে মানে করতে হবে না। যুঁথি আপা তোমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে একসেপ্ট করো।
আমি: তুমি জানো?
তানিয়া: হ্যাঁ।
আমি: কিভাবে?
তানিয়া: উনি তো দেখেছেন যে আমরা মিউচুয়াল ফ্রেন্ড, ঐ দেখে আমার কাছ থেকে জানতে চাইলো যে তুমি দেশে ফিরেছ কিনা। আমি বললাম যে তুমি দেশেই আছো।
একটু বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। কারা মিউচুয়াল ফ্রেন্ড এটা তো স্পষ্ট দেখা যায় ফেসবুকে। এই অপশনটা কোনভাবে বন্ধ করে রাখা যায়না?
আমি: উনার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট না করলে হয়না?
তানিয়া: কেন?
আমি: আমি চাইছিলাম যে, আমাদের সম্পর্কের কথা কেউ না জানুক
(তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো তানিয়া)
তানিয়া: আমাদের মধ্যে আবার কি সম্পর্ক!

ফট করে লাইনটা কেটে দিলো তানিয়া। আবার আমার মন খারাপ হয়ে গেলো। আমার কোন ফ্রীডম নাই ওকে ফোন করার, শুধু ও ফোন করলেই আমি ধরতে পারি। ওর সাথে যোগাযোগের জন্য ওর ফোনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কোন পথ নাই। হায়রে! একসময় আমি ওকে অপেক্ষা করিয়েছিলাম, আজ আমাকে অপেক্ষা করতে হয়। একেই বোধহয় বলে ‘কর্ম’! তুমি মানুষকে যতটা কষ্ট দিয়েছ, বক্রাকার পথ বেয়ে অতটা কষ্টই তোমার কাছে আবার ফিরে আসবে। পৃথিবীটাকে শুধু শুধু গোলাকৃতি করা হয়নি, এটার মিনিংটা আজকে বুঝতে পারলাম।

অফিসের কাজের মাঝে তুষার একবার আমাকে ঢেকে পাঠালো। পিওন এসে বললো, “ছোট সাহেব আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।” আসলে তুষারই বড় সাহেব। পিওনটা বয়ষ্ক, ওর বাবার সময় থেকে আছে। তখন তারা ওর বাবাকে বলতো বড় সাহেব আর তুষারকে বলতো ছোট সাহেব, সেই অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে।
তুষার বাস্তব জীবনে আমার পরম বন্ধু, আর অফিসে আমার বস। আমি অন্যদের সামনে ওকে স্যারই বলি। যদিও ও অনেকবার বলেছে যে স্যার বলার দরকার নেই। তারপরেও আমি স্যারই বলি, কারণ অফিসের ভিতরে অফিস ডেকোরাম মেইনটেইন করা উচিৎ। আজ ওর রুমে ঢুকে দেখলাম, ও একাই বসে আছে। তাই আর স্যার না বলে বন্ধুসুলভ সন্বোধনটাই করলাম।
আমি: কেমন আছিস?
তুষার: ভালো। তুই।
আমি: ভালোই।
তুষার: ভালোই মানে কি পুরোপুরি ভালো নাই?
আমি: বাদ দে। কি জন্যে ডেকেছিলি বল। এ্যাপার্টমেন্ট বিজনেস-এর ঐ প্রবলেমটা নিয়ে?
তুষার: নাহ। ওটা সলভড।
আমি: কি করে করলি?
তুষার: যেভাবে সবাই করে। বাংলাদেশে ঘুষ খায়না এমন আমলা পাওয়া মুশকিল। বেশিরভাগই তো ঘুষ খাওয়ার জন্যই ঐ চাকরীতে ঢোকে। আমরা ব্যবসায়ীরা ওটারই সুযোগ নেই আরকি।
আমি: হু। এখন আমাকে কি জন্যে ডেকেছিস বল?
তুষার: তুই তো মাস্টার্সটা বায়োমেডিকেল ফিজিক্স-এ করেছিলি তাই না?
আমি: রাইট। আমার পিএইচডি-র টপিকও বায়োমেডিকেল ফিজিক্স থেকেই ছিলো।
তুষার: আমি ঠিক করলাম ঐ লাইনে একটা ব্যবসা চালু করবো।
আমি: কি রকম?
তুষার: বিদেশ থেকে মেডিকেল ইকুয়িপমেন্ট ইমপোর্ট করে এনে বিক্রি করবো।
আমি: মেডিকেল ইকুয়িপমেন্ট-এর দাম তো খুব বেশী। ব্যবসাটা আমাদের দেশে চলবে? মার্কেট আছে?
তুষার: আমাদের এখন গ্রোয়িং ইকনোমি। আঠারো কোটি মানুষের দেশ। একবার ভেবে দেখতো, প্রতিদিন সকাল বেলা উঠে কি পরিমান আটা-ময়দা-তেল-নুন-চা-চিনি লাগে। অনেক ইউরোপিয়ান কান্ট্রিতেও এতটা লাগেনা। তুইতো সবসময় বলতি, বাংলাদেশ একসময় অত্যন্ত ধনী সমৃদ্ধিশালী দেশ ছিলো এই সম্পদের লোভেই দরিদ্র কূচক্রী ইংরেজরা আমাদের দেশে ঢুকেছিলো। আমাদের দেশের লুন্ঠিত সম্পদেই তারা ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব করেছিলো।

আমি: হু বলেছিলাম।
তুষার: এখন আমরা স্বাধীন। আমাদের এখন সুযোগ অনেক। ভৌগলিক স্বাধীনতা তোর-আমার বাপ-চাচারা এনে দিয়েছে, এখন আমাদের দায়িত্ব অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্যে কাজ করা।
আমি: তুই বড় ব্যবসায়ী। তোর ব্যবসার জ্ঞানের সাথে তর্ক করবো না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে মেডিকেল ইকুয়িপমেন্ট-এর ক্ষেত্রে তুই আবেগকে প্রাধান্য দিচ্ছিস। অত দাম দিয়ে কটা হসপিটাল-ক্লিনিক ইকুয়িপমেন্ট কিনবে আর কতটাই বা লাভ হবে কোম্পানীর?
তুষার: রাইট। আমি জাত ব্যবসায়ী, বাপের গদিতে বসেছি তাই আবেগ আর ব্যবসাকে এক করে দেখিনা। এক্ষেত্রেও দেখছি না।
আমি: বুঝিয়ে বল।
তুষার: আমি প্রথমেই দামী ইকুয়িপমেন্ট-এর ব্যবসা করবো না।
আমি: তাহলে?
তুষার: আমি যেটা করবো তা হলো রিফার্বিশ ইকুয়িপমেন্ট-এর ব্যবসা। আমেরিকায় খুব কম দামে পাওয়া যায় রিফার্বিশ ইকুয়িপমেন্ট। আমরা ওগুলো এনে ভালো প্রফিট রেখে বিক্রি করতে পারবো। তারপর একদিন যদি মার্কেট রীচ হয়, সেদিন থেকে না হয় ফার্স্ট হ্যান্ড ইকুয়িপমেন্ট-এর ব্যবসাই শুরু করলাম।
আমি: ওয়ান্ডারফুল! নাইস আইডিয়া! আমার মাথায় এটা আসতো না। গুড! একেই বলে জাত ব্যবসায়ী।
তুষার: ওয়েল! বুঝলি তাহলে।
আমি: তা বুঝলাম। এবার ওখানে আমার কাজটা কি হবে তাই বল।
তুষার: আরে এ জন্যেই তো তোকে ডেকেছি। তোর সাবজেক্ট, এখন তুই আমাকে একটা রাফ বিজনেস প্ল্যান করে দে।
আমি: গুড, করে দেবো। বাই দ্যা, বিজনেসটা কি তোর নামে হবে না ভাবীর নামে হবে?
তুষার: (আমির দিকে তাকিয়ে) এটা বলার জন্যও তোকে ডেকেছি। তুই তো জানিস আমার প্রথম বৌ আমেরিকান ছিলো। আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিয়েটা করেছি বাঙালী মেয়েকে। অবভিয়াসলি ওখানে প্রেম ভালোবাসা বলে কিছু ছিলো না। ফর্মাল বিয়ে। ব্যবসার রীতিতে কিছু থাকে বৌ-এর নামে কিছু নিজের নামে এই আরকি।
আমি: তোর মেয়ের নামেও করতে পারিস।
তুষার: মেয়ে তো আর কনস্টান্টলি এখানে থাকে না। আমেরিকায় ওর মায়ের কাছেই থাকে। মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে। আমি এই বিজনেস টা আরেকজনার নামে করতে চাচ্ছি।
আমি: ( আমি হেসে ফেললাম) আরেকজনটা কে? গার্ল-ফ্রেন্ডদের নামে কোম্পানী খুলতে শুরু করবি নাকি। এরকম তো প্রচলন নাই, তুই যদি উদ্বোধন করিস তাহলে নতুন একটা ট্রেন্ড শুরু হবে।
তুষার: হা হা হা। (তুষারও হেসে ফেললো) লিসন, গার্ল-ফ্রেন্ডরা ক্ষণিকের আনন্দের জন্যে। সারাদিন নিরানন্দ ব্যবসাপাতি নিয়ে থাকি। ঘরেও তেমন শান্তি নাই। বাইরেও জ্বালা ঘরেও জ্বালা, তাই প্রাশান্তির জন্যে তৃতীয় পক্ষের কাছে যাওয়া। এই আরকি। হা হা হা। যাহোক এবার কাজের কথায় আসি। কোম্পানীটা আমি তোর নামে খুলবো।
আমি: মানে?
তুষার: তোর নামে মানে তোর নামে। শোন, তুই আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার কোন ভাই নাই। বাবা-মা মরে গেছেন। আত্মীয়-স্বজনরা শুধু আমার কাছ থেকে কত টাকা খসানো যায় এই চিন্তায় মশগুল। আমার সুখ-দুঃখে একমাত্র তুইই পাশে ছিলি। বিদেশ থেকে আসার পর এতগুলো বছর আমার পাশে গাধার খাটুনি খেটেছিস। আমি কি অকৃতজ্ঞ?
আমি: (চুপ করে রইলাম)
তুষার: চুপ করে আছিস কেন আমীন বল।
আমি: (আমি হেসে ফেললাম) ওকে আমীন। এখন প্রফিট নিয়ে কি করবি?
তুষার: প্রফিট শেয়ার করে নেব। তুই কিছু আমি কিছু। ক্লিয়ার?
আমি: ক্লিয়ার।
তুষার: কথা পাক্কা?
আমি: কথা পাক্কা।
তুষার: যাহ, এবার রূমে যা। আমি কিছু কাগজ-পত্র পাঠাচ্ছি।
আমি উঠে দাঁড়িয়েছি এ সময়, তুষার বললো।
তুষার: বাই দ্যা বাই। তানিয়া নামে তোর একটা প্রেমিকা ছিল না?

আমার বুকটা ধড়াস করে উঠলো। ও এখন আবার কি বলে বসে!
আমি: কি হয়েছে।
তুষার: তুই কি ভুলে গেছিস?
আমি: না মানে। মনে আছে। তবে………..।
তুষার: তুই, এই বিষয়ে আলাপ করতে না চাইলে থাক।
আমি: যাক। যা বলতে চাইছিলি বলে ফেল।
তুষার: ওকে দুয়েকদিন আগে দেখলাম, একটা ক্লাবে।
আমি: ব্যাস?
তুষার: হ্যাঁ, এইটুকুই। প্রথমে চিনতে পারিনি। পরে ওর জামাই আমাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলো। ও যখন বললো ওর নাম তানিয়া তখন চিনে ফেলেছি। তোর সাথে কি কোন যোগাযোগ আছে? না থাকলে আমি যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি।

আমি চুপ করে রইলাম। এভাবে একে একে সবাই জেনে ফেলুক আমি চাই না।

তুষার। যাকগে এটা তোর ব্যাপার। লিভ ইট! আমার আমেরিকান বৌ আমাকে লাথি দিয়ে চলে যাবার পর থেকে মেয়েদের উপর আমি ট্রাষ্ট হারিয়ে ফেলেছি। প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু নাইরে!
(চলবে)

তারিখ: ২৭ নভেম্বর, ২০১৬ সাল
সময়: রাত ৯ টা বেজে ৩৩ মিনিট।

কেন আমি ওকে ভুলেযাবো?
———— ড. রমিত আজাদ

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করে, “এখনো ওকে ভুলতে পারলে না?”
আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, “কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?”

আমি তো অভিনয় করিনি, না করেছি প্রতারণা,
আমি তো মিথ্যে বলিনি, না করেছি ছলনা,
এই স্নায়ু শুধু তো স্নায়ু নয়, নয় শুধু প্রাণ-রসায়ন,
এই দেহ শুধু তো দেহ নয়, এখানে আরো আছে মন।

সেই মন থেকেই তো বলেছিলাম, “ভালোবাসি”,
কৃষ্ণচূড়ার বনে ঝড় তুলে, বাজিয়েছিলাম বাঁশী।
ঢেউ আসে ঢেউ যায়, বেলাভূমী সরেনা বরং গড়ে,
দিন আসে দিন যায়, ভালোবাসে কমেনা বরং বাড়ে।

হৃদয়ের ক্ষত, সেও কি বাড়ে? বাড়লে বাড়ুক!
সমস্ত হৃদপিন্ডটাকে ক্ষতবিক্ষত ঝাঁঝরা করুক!

আমার দেহটাকেও দুমরে-মুচড়ে ভেঙে ফেলো,
ভাঙতে ভাঙতে ঋষী কণাদের বর্ণিত
অণু-পরামাণুতে নিয়ে যাও।
কিন্তু আত্মা? তাকে কি ভাঙা যায়?

না।
এই আত্মা সেই আত্মা, যাকে কাটা যায়না, ছেঁড়া যায়না,
আগুনে দহন করা যায় না, বায়ু দ্বারা আর্দ্র করা যায় না।
সেই আত্মায় সত্তা হয়ে মিশে আছে ও,
কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?

Why Should I Forget Her?
———————– Ramit Azad
Many people ask me, “Why can’t you forget her yet?”
I ask the counter, “Why should I forget her at all?”
I did not play-acting, I did not cheat,
I did not lie, did not deceive,
This nerve is not just nerve; it is not only bio-chemistry,
The body is not only the body, there is also heart.
I told you from that heart, “love you”,
I played flutes causing storm over the peacock forest,
Waves come waves go, but there is no erosion of shore,
Days come, days go, and love does not weaken but strengthens.
Do the wounds of the heart increases? Let it increase.
Let tatter the heart, like bullets do with a body,
Break my body into pieces,
Breaking it down into atoms,
The smallest building block
As ancient wise Kanada described,
But the soul? Can it be broken?
Of course not,
“The soul (aatman) cannot be cut, burnt,
suffer any decay or be dried out.”
She is the part of my soul,
Why should I forget her?
(12th August, 2015)

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.