প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৭

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৭
————————- ড. রমিত আজাদ

পিয়ন: ছোট স্যার আপনাকে সালাম দিছেন।
আমি: ওকে, আসছি।
সকাল সকাল সালাম জানালো? গুরুত্বপূর্ণ কোন কথা আছে বোধহয়।

আমি: আসতে পারি?
তুষার: আরে ব্যাটা, আমার রূমে আসতে আবার তোর পার্মিশন লাগে?
আমি: শত হলেও তুই আমার boss।
তুষার: তুই এখন চেয়ারে বস। কথা আছে। বাই দ্যা বাই। এত সকাল সকাল এলি কিভাবে? ধানমন্ডির ওদিকে তো ভীষণ জ্যাম!
আমি: আমি আজ ধানমন্ডি থেকে আসিনি।
তুষার: (আমার দিকে তাকিয়ে চেহারায় কৌতুকের হাসির ছাপ নিয়ে) বনানী থেকে? তোর ঐ মনোরঞ্জন এ্যাপার্টমেন্ট থেকে?
আমি: হু।
তুষার: নিউ এ্যাডভেঞ্চার?
আমি: হু।
তুষার: ওকে। নট ব্যাড। মনোরঞ্জনের প্রয়োজন আছে। আগেকার দিনের রাজাবাদশরা হারেম রাখতো কেন জানিস তো?
আমি: জানি, তুই একদিন বলেছিলি।
তুষার: রাইট। একজন শাসকের মনে এক লক্ষ চিন্তা থাকে। এর মধ্যে আশি হাজার চিন্তাই স্ট্রেস-এর। এই কেউ তার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, এই কেউ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, ঐদিকে কেউ বিদ্রোহ করেছে, এইদিকে কেউ তাকে হত্যা করতে চায়; এমন হাজারটা সমস্যায় জর্জরিত থাকতেন একজন শাসক। তাই এইসব স্ট্রেস কমানোর জন্য ঐ একটি জায়গাই ছিলো উত্তম। যৌনতার অনেকগুলো ভালো দিকের একটি হলো তা মনকে প্রফুল্ল করে, বুঝলি।
আমি: না বুঝলে কি আর …………।
তুষার: রাইট, না বুঝলে কি আর তুই গতরাতে বনানীর এ্যাপার্টমেন্টে কাটাতি! গবেষণার ফল বলে, নিয়মিত শারীরিক রোমান্স সত্যিকার ব্যায়ামের মতই সুফল দেয়। শরীর থাকে সচল আর অনেক বেশী কর্মক্ষম। প্রতি মিনিটে শারীরিক রোমান্সে প্রায় পাঁচ ক্যালোরি খরচ হয়। হৃদযন্ত্রের ও অন্যান্য অঙ্গের কর্মক্ষমতাও হয় উন্নত। রোমান্স ব্যথাও উপশম করে, মন হয় চনমনে।
আমি: কে গবেষণা করলো?
তুষার: যেই করুক। পশ্চিমা বিশ্বে তো সবকিছু নিয়েই গবেষণা হয়। শারীরিক রোমান্স নিয়েও হয়।
আমি: আমাদের প্রাচ্যের বিশ্বও কম যায়না। ‘কামসূত্র’ পড়িস নি?
তুষার: (হেসে ফেলে) হ্যাঁ পড়েছি। রাইট ইউ আর। পশ্চিমারা তো এই বিষয়ে ‘কামসূত্র’-কেই গুরু মানে। একবার এক বিয়ের অনুষ্ঠানে হয়েছি কি জানিস? মজার ঘটনা!
আমি: বল।
তুষার: বাঙালী ছেলের সাথে এ্যামেরিকান মেয়ের বিয়ে। অনুষ্ঠানে টোস্ট দিতে উঠে অনেকে অনেক শুভ কামনা করছে বর-বধুর। একজন দাঁড়িয়ে বললো, “আমি জানি, আপনাদের অঞ্চলে ‘কামসূত্র’ বলে একটা শাস্ত্র আছে। আমি কামনা করছি, আপনাদের জুটি ঐ সূত্র ব্যবহার করে, চরম সুখ ও আনন্দ লাভ করতে পারবে”।
আমি হা হা করে হেসে ফেলে বললাম,
আমি: পশ্চিমে তো বিয়ের আগেই ঐ সূত্র ব্যবহার করা শুরু হয়। হয়তো বাঙালী ঐ ছেলেটি সেই সূত্রের এমনই সফল ব্যবহার করেছিলো যে মেয়েটি তার পুরষ্কার স্বরূপ ছেলেটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো।
এবার তুষার হো হো করে হেসে উঠলো।
আমি: তুই কি বলতে আমাকে ডেকেছিলি?
তুষার: (আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে) নারায়নগঞ্জে একটা বিশেষ জায়গা ছিলো, নাম জানিস?
আমি হেসে ফেললাম।
আমি: তুই টানবাজারের কথা বলতে চাচ্ছিস তো?
তুষার: ঠিক ধরেছিস! ওটা কেন করা হয়েছিলো জানিস?
আমি: তুই-ই বল।
তুষার: ওখানে জুট সিটি-টা ছিলো। যাকে বলা হতো প্রাচ্যের ডান্ডি। (হঠাৎ কথার প্রসঙ্গে পাল্টে তুষার প্রশ্ন করলো) আচ্ছা ওটাকে প্রাচ্যের ডান্ডি কেন বলা হতো রে?
আমি: হিস্ট্রী। ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে অনেক ইন্ডাস্ট্রী ছিলো, যেখানে জুট প্রসেস হতো। আমাদের দেশ থেকে যেত কাঁচামাল, আর ওখানে ইন্ডাস্ট্রীতে তা প্রসেস হয়ে আবার আমাদের দেশেই বিক্রী হতো। আমাদের জিনিসই আমাদেরকে কিনতে হতো চড়া দামে।
তুষার: আমাদের দেশে আমরা মিল ইন্ডাস্ট্রী করতে পারলাম না কেন?
আমি: কারণ আমরা তখন পরাধীন ছিলাম। পলাশীর ট্রাজেডির আগে, আমাদের দেশেও শিল্প ছিলো। সেটা ছিলো ব্যাপক, সেই সময়ের অনেক ইতিহাসবিদই লিখেছিলেন যে, ‘বাংলা যত না কৃষিপ্রধান তার চাইতে অনেক বেশি শিল্পপ্রধান’। এই বিষয়ে আমরা তখন ছিলাম ভীষণ লিবারেল।
তুষার: কোন অর্থে?
আমি: আমরা কোন কিছু ঠেকিয়ে রাখতাম না। পৃথিবীর যেকোন দেশ, যেকোন প্রান্ত থেকে যত রকম প্রযুক্তি আছে, বিজ্ঞান আছে, দর্শন আছে, সাহিত্য আছে, সংস্কৃতি আছে, সবকিছুই আমরা অবাধে প্রবেশ করতে দিতাম আমাদের দেশে। আমাদের নীতি ছিলো একটিই – জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-সাহিত্য-সংস্কৃতি এককথায় মানবীয় গুনাবলীর যতকিছু আছে তা কখনো ভূগোলের বাধা মানেনা। কোন কৃত্রিম রাজনৈতিক সীমারেখা দিয়ে তা বেধে রাখা যাবেনা।
তুষার: তাহলে আমরা সে সময় অনেক উদার ছিলাম রে!
আমি: তাই তো আমাদের সংস্কৃতি এতো উন্নত ছিলো। এই উদারতাই আমাদের সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছিলো।
তুষার: বাংলা ভাষায় কয়েক হাজার ফার্সী শব্দ আছে তাই না?
আমি: রাইট।
তুষার: এতে তো আমাদের ভাষার কোন ক্ষতি হয়নি বরং উল্টো বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়েছে।
আমি: তাই তো। তোর কি মনে পড়ে? খুব সম্ভবত ১৯৮৮ সালের কথা, জাপানের সম্রাট তখন হিরোহিতো, তিনি বলেছিলেন, “আমার প্রয়োজনীয় পণ্যটি আমি বিশ্বের যেকোন দেশ থেকে কিনবো’।
তুষার: রাইট। আমি বিদেশে যাওয়ার আগে একটা ডিনার দিয়েছিলাম তোদের জন্য, শান্তিনগরের চাই-লুং চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। আমরা সেখানে আলোচনার ছলে এই নিয়ে কিছু তর্ক করেছিলাম।
আমি: বিদেশে গেলাম ১৯৮৯ সালে, বাংলাদেশে তখন আমরা একটি মাত্র টিভি চ্যানেল দেখে অভ্যস্ত ছিলাম যার নাম বিটিভি (এরশাদের অতিদূরদৃষ্টিতার বদৌলতে বিটিভি ‘খ’ চ্যানেলটিও তখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে)। সেখানে বিদেশী অনুষ্ঠান বলতে মেজরিটিই ছিলো মার্কীন সিরিয়াল আর সপ্তাহান্তে একটি মার্কীন ম্যুভি অব দ্যা উইক। আমেরিকা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন দেশ বা তার সংস্কৃতি আছে বলেই আমাদের মনে হতো না। অবশ্য ইতিমধ্যে ভিসিআর নামক প্রযুক্তিটি চলে আসায় চাকচিক্যময় বোম্বাই ছবির বাজার সরগরম হয়ে পড়ে বাংলাদেশে। এমন একটি দেশে পড়তে গিয়েছিলাম, যাদের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুতা আছে বলেই জানতাম। অথচ সেই দেশের ন্যাশনাল টিভিতেই দেখলাম আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, জাপান, ইতালী, চীন মেক্সিকো থেকে শুরু করে পৃথিবীর বহু দেশেরই ফিল্ম ও অনুষ্ঠান দেখানো হতো তাও আবার রুশ ভাষায় অনুবাদ ও ডাবিং করে। একেই বলে উদারতা। এভাবে আখেরে তারা নিজ দেশের সংস্কৃতিকেই উন্নত করেছিলো। তবে যেকোন ক্ষেত্রেই আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, কোনটা সংস্কৃতি ও কোনটা অপসংস্কৃতি।
তুষার: অথচ এখন একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবি উঠেপড়ে লেগেছে এই উদারতার বিরূদ্ধে!
আমি: এ জন্যেই দিন দিন আমাদের সংস্কৃতির দৈন্য বাড়ছে।
তুষার: তুই ঠিক ধরেছিস। তা এখন ঐ নারায়ণগঞ্জের জুট সিটির বিষয়টি বল। তোর তো আবার সব বিষয়েই অনেক পড়া লেখা!
আমি: ইংরেজরা এদেশে প্রবেশ করেছিলো অসৎ উদ্দেশ্যে। তাদের শ্যেণদৃষ্টি ছিলো এই বাংলার বিপুল অর্থ-সম্পদের দিকে। পুরোটা দখল করতে পারলে তাদের কপাল খুলে যাবে এটা তারা ভালোই বুঝতো। তারপর এক গভীর ষড়যন্ত্র করে তারা বাংলা দখল করে নেয়। পলাশীর সেই সকরুণ ইতিহাস তুইও জানিস আমিও জানি।
তুষার: তারপর?
আমি: এরপর বিপূল অর্থভান্ডার তাদের দখলে চলে আসে। শুরু করে তারা ব্যাপক লুটতরাজ। তাদের এই কাজে সাহায্য করে দেশীয় মীরজাফরেরা। জগৎ শেঠের নাম শুনেছিস না?
তুষার: হু। মাড়োয়াড়ী ব্যবসায়ী ছিলো। আমাদের নবাবের কল্যাণে অনেক টাকা-পয়সা করেছিলো।
আমি: শুধু তাই নয়। তার একটি ব্যাংকও ছিলো।
তুষার: ব্যাংক? সেই আমলে ব্যাংক?
আমি: জ্বী বন্ধু। ব্যাংক। আমাদের অনেক ইতিহাসই সাধারণ মানুষের কাছে লুক্কায়িত আছে।
তুষার: হুম।
আমি: জগৎ শেঠ সেই ব্যাংক ব্যবহার করে লুটেরা ইংরেজদের কালো টাকা সাদা করতো। ইংল্যান্ডে সেই অর্থ পাচারে সাহায্য করতো জগৎ শেঠের এই ব্যাংক।
তুষার: শুয়োরের বাচ্চা! বেঈমান!
আমি: এখনো এরকম অনেক শুয়োরের বাচ্চা আছে, তাইনা।
তুষার আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো
তুষার: আছে।
সমাজের উপর মহলের সদস্য হিসাবে অনেক খোঁজই সে রাখে।
আমি: এভাবে আমাদের লুন্ঠিত সম্পদের বিনিময়ে ইংল্যান্ডে তারা গড়ে তোলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন বা শিল্প বিপ্লব।
তুষার: আই সি! তার মানে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভ্যুলেশন মিস করেছি!
আমি: রাইট। আমরা যখন পরাধীন হলাম তখন ঐ ইংল্যান্ডে আমাদেরই টাকায় হলো শিল্প বিপ্লব। আমরা সেটা মিস করলাম।
তুষার: ভেরি স্যাড!
আমি: এখন কিন্তু আরেকটা রেভ্যুলেশন চলছে।
তুষার: কি রকম? (আগ্রাহান্বিত হয়ে প্রশ্ন করলো)
আমি: কম্পিউটার রেভ্যুলেশন।
তুষার: আই সি! রাইট ইউ আর। ভেরি রাইট। এখান থেকে কি কনক্লুশন ড্র করা যায়?
আমি: উই মিসড ইন্ডাস্ট্রীয়াল রেভ্যুলেশন, বাট উই শুড নট মিস কম্পিউটার রেভ্যুলেশন।
তুষার: ইয়েস ফ্রেন্ড। বিষয়টা ভাবার মত। যদি এটা আমরা মিস করি, তাহলে আমরা আরো একটা ধাপ পিছিয়ে পড়বো। ঠিক না?
আমি: ঠিক।
তুষার: তাহলে তো আমাদের কিছু করতে হয়।
আমি: কি করবি?
তুষার: ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া ইউ হ্যাভ গিভেন। আমি দেখছি কম্পিউটার লাইনে আমি ব্যবসা-পাতি করতে পারি কিনা। আই শুড থীংক অব ইট সিরিয়াসলি।
আমি: গুড! গো এ্যাহেড। আই এ্যাম উইথ ইউ।
তুষার: থ্যাংকস। তা ঐ যে জুট ইন্ডাস্ট্রীর ব্যাপারে কি যেন বলছিলি?
আমি: একসময় কোলকাতার হুগলীর তীরে ছিলো অসংখ্য জুট ফ্যাক্টরী। পূর্ববাংলা তখন একটা হিন্টারল্যান্ড হিসাবে ব্যবহার হতো। অর্থাৎ কাঁচামাল সর্বরাহ করতো আমাদের কৃষকরা আর তা ইন্ডাস্ট্রীতে ব্যবহৃত হতো কোলকাতার।
তুষার: আই সি! তারপর?
আমি: তারপর ১৯৪৭ সালের বিভাজনে আমরা কোলকাতা পেতে পেতেও পাইনি। কারণ ঐটাই, ওখানে কিছু মিল-ইন্ডাস্ট্রী আছে।
তুষার: রাইট। তখন ওপাশ তো আমাদের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিলো!
আমি: এরপর ৪৭ সালের পর নারায়নগঞ্জ-এ শত শত জুট ইন্ডাস্ট্রী গড়ে ওঠে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।
তুষার: শত শত মিল-ইন্ডাস্ট্রী! মানে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক। তুই ভাবতো, ওদের যাওয়ার একটা জায়গা তো থাকতে হবে।
আমি: কোথায় যাওয়ার?
তুষার: কোথায় আবার? তুই আমি যেভাবে আমাদের স্ট্রেস কমাই। বুঝলি টানবাজার-টা এই কারণেই নারায়ণগঞ্জেই করা হয়েছিলো। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনীর পর, রাতের নিকষ আঁধারে কিছুটা মনোরঞ্জন! এতে শ্রমিক দিনের ক্লান্তি-গ্লানি সব ভুলে পরদিন আবার নব উদ্যমে কাজ করতে যেতে পারতো।
আমি: বাদ দে।
তুষার: বাদ দেয়ার কি আছে? এখানে তো আর তৃতীয় কেউ নেই। তুই আমি বন্ধু মানুষ তাই একটু মন খুলে কথা বলছি। তুই কি মনে করিস না এইগুলা লিগালাইজ হওয়া দরকার?
তুষারের টেবিলের উপর টেলিফোনটা বেজে উঠলো। এই টেলিফোনটা ইন্টারনাল কাজে ব্যবহার করা হয়। তার মানে ভিতর থেকে কেউ ফোন করেছে।
আমি: কেউ আসবে? আমি কি তাহলে উঠবো?
তুষার: আরে না না বস। হ্যাঁ, এখন একজন আসবে। তোকেই আমার দরকার।

“মে আই কাম ইন স্যার?” মিষ্টি রিনরিনে গলায় একজন ভিতরে ঢোকার অনুমতি চাইলো।

তুষার: ইয়েস কাম ইন।

দরজা ঠেলে যে ভিতরে ঢুকলো, সে অতি অল্প বয়ষ্কা একটি মেয়ে। তেইশ বছরের বেশী বয়স হবে না। তার কন্ঠস্বরের মত সেও দেখতে খুব মিষ্টি। তবে মেয়েটি হিজাব করে।

তুষার: বসো।
মেয়েটি ভদ্র সুন্দর ভঙ্গিমায় বসলো।

তুষার: তোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। ওর নাম জান্নাত, আমার এক বন্ধুর কাজিন সিস্টার। ওর অনুরোধেই রাজী হয়েছি।
আমি: আমাদের এখানে চাকুরীতে জয়েন করেছে?
তুষার: চাকুরীর কথা পরে। ও একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে লাস্ট সেমিস্টারে বিবিএ পড়ছে। আমাদের এখানে তিনমাস ইন্টার্নি করবে।
আমি: ও। ভালো।
তুষার: জান্নাত উনি আমাদের এখানকার সেকেন্ডম্যান। আমার পরেই উনার অবস্থান। আমি যখন থাকিনা তখন উনিই অফিস চালান। তোমাকে উনার সাথেই কাজ করতে হবে।
জান্নাত: স্লামালাইকুম।
আমি: ওয়া আলাইকুম সালাম।
তুষার: জান্নাত, তুমি এখন যাও। পনেরো মিনিট পরে স্যারের সাথে দেখা করবে, উনার রূমে। ওকে?
জান্নাত: ওকে, স্যার। থ্যাংক ইউ। স্লামালাইকুম।
চলে গেলো জান্নাত।

আমি: আমাদের এখানে আগে তো কেউ ইন্টার্ণি করে নাই?
তুষার: হ্যাঁ, ওর ভাই খুব রিকোয়েস্ট করলো। বেচারী তা না হলে এ্যাফিলিয়েশন রিপোর্ট তৈরী করতে পারবে না। তাছাড়া দিন পাল্টাচ্ছে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো এখন এই বিষয়ে বেশ এগিয়েছে। ওকে নিয়ে দেখি। যদি সবকিছু ভালো হয় তাহলে আমরা পরবর্তিতে আরো কিছু ইন্টার্নি না হয় নিলাম। কি বলিস?
আমি: ইয়েস, কন্টিনিউয়াস এক্সপেরিমেন্ট মাস্ট বি ডান। তুই কি এই জন্যেই আমাকে ডেকেছিলি? না আরো কথা আছে?
তুষার: আছে আরো কথা। ঐ যে রিফার্বিশড মেডিকেল ইকুয়িপমেন্ট-এর বিজনেসটা। তুই কাগজপত্র সব সই করেছিস?
আমি: পেপার ওয়ার্ক তো সব শেষ।
তুষার: তাহলে এখন অপারেশনাল ওয়ার্ক শুরু করতে হবে।
আমি: আর কিছু?
তুষার: আরিফ আজ রাতে ডিনারে দাওয়াত দিয়েছে।

আরিফও আমাদের ছোটবেলার বন্ধু এখন পুলিশের বড়কর্তা। খুব হাসিখুশি একজন মানুষ। ওকে না জেনে, ওর সাথে কেউ আড্ডায় বসলে বুঝতেই পারবে না যে ও এত বড় পুলিশ অফিসার!
—XXX—

আরিফ: বন্ধু। দেশের কেউ কখনো বিশ্বাস করবে না যে এমন পুলিশও আছে যে খায় না।
আমি: বন্ধু। তোকে আমি চিনি সেই ছোটবেলা থেকে, একজন নীতিবান ও বীর মুক্তিযোদ্ধার ছেলে তুই, তোর পক্ষে অনৈতিক কিছু করা সম্ভব না।
আরিফ: যা পাই তা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলে। বাড়তি দুটি টাকার জন্য বড় ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে একটা দোকান করেছি, তোর ভাবি ওটা দেখে। তাই দিয়ে আর কিছু পাই।
আমি: ভাবি তো ধনীর কন্যা। তাই তোর কাছ থেকে আর তো কিছু চাইবার নেই।
আরিফ: হ্যাঁ এটা আমাকে বাঁচিয়েছে। অনেক মেয়ে তো পুলিশ বিয়েই করে টাকার লোভে।
আমি: বাদ দে। আজ উপলক্ষ কি? আমাদের দাওয়াত দিলি যে?
আরিফ: তুষারটারওতো আসার কথা ছিলো। শেষ মুহুর্তে বাদ দিলো। বৌ নাকি কোথায় যাবে। বৌয়ের সাথে গিয়েছে।
আমি: বাঙালী বৌ হলে এই এক সমস্যা! বাপের বাড়ী, ভাইয়ের বাড়ী, বোনের বাড়ী, চাচার বাড়ী, তাঐ বাড়ী, আরও কত কি!
আরিফ: হা হা হা। বিদেশে তো এইসব নাই না?
আমি: আছে, তবে আমাদের চাইতে কম।
আরিফ: তুষার ব্যাটার তো বিদেশী বৌ ছিলো। তা তো টিকলো না!
আমি: এখন আমরা দুজন কি শুধুই গল্প করার জন্য, না কি কোন উপলক্ষ আছে?
আরিফ: না উপলক্ষ কিছুই না। তুই তো জানিস আমি গ্রামে আমার মরহুম বাবার নামে একটা স্কুল চালাই।
আমি: জানি।
আরিফ: এক ব্যবসায়ী আসবে আজ এই রেস্টুরেন্টে। আমার স্কুলে কিছু ডোনেশন দিবে। আমি ভাবলাম তোরা তো কাছেই আছিস। তাই এই ফাঁকে তোদের সাথেও দেখা করে ফেলি।
আমি: ও।
এর মধ্যে তিনজন ব্যক্তি ঢুকলেন রেস্টুরেন্টে তারপর সরাসরি আমাদের টেবিলে। এদের মধ্যে দু’জন ইয়াং, বয়সে আমাদের কয়েক বছরের ছোট হবে। আরেকজন বয়ষ্ক বয়সে আমাদের চাইতে কয়েক বছরের বড় হবে। তারা তিনজনই এমন ভঙ্গিতে আরিফের সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন যে, যেন আরিফ-এর কোন অমর্যাদা না হয়। আরিফ বললো কামরান বসো।
কামরান নামে যেই ছেলেটির সাথে আরিফ কথা বললো। সে বললো, “আগে পরিচয় করিয়ে দেই ভাইয়া। ইনি সালমান, আর ইনি রহমান। রহমান ভাই সালমানের বড় ভাই ঢাকার এলাকার ‘এক্স-ওয়াই-জেড’ পার্টির নেতা। আগামীতে কমিশনার ইলেকশান করবেন।
আরিফ: ও। ভালো আছেন আপনারা?
জ্বী, ভালো। সমস্বরে উত্তর দিলো তারা।
কামরান ছেলেটিকে আমার পছন্দ হলো কিন্তু, বাকী দুজনের কথাবার্তা চেহারা ছবি কিছুই পছন্দ হলো না। সালমান বসেই বললো, “ভাই কি ড্রিংক খাবেন বলেন?”
আরিফ: ভাই আমি, ড্রিংক করিনা।
সালমান: ও, তাহলে তো ভালো। আমরা আবার ড্রিংক করি। তা আমরা যদি খাই, আপনার আপত্তি নাই তো?
আরিফ: না, ভাই খান। তবে একটু কম খান। আমি এখানে আছি কোন অঘটন যেন না ঘটে, আরকি।
সালমান: না না। আমরা তো খেয়ে অভ্যস্ত। খেতে জানি। কোন অঘটনই ঘটবে না।
এরপর তারা হার্ড ড্রিংক সহ নানা খাবারের অর্ডার দিলো। খেতে খেতে আরিফ জিজ্ঞেস করলো, “ভাই আপনি তো খুব অল্প বয়সেই প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হয়েছেন তা, আপনার সাফল্যের সিক্রেট-টা কি?”
সালমান: এককথায় বলি ভাই, সততা। সততাই আমার সাফল্যের সিক্রেট।
আমি আর আরিফ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। হু হু সততাই তো এত এত টাকার মালিক বানায়। সততাই তো রাজনৈতিক দলের নেতা বানায়!
সালমান: শুনলাম। আপনি গ্রামে একটা স্কুল চালান? তা আমি তো ওখানে কিছু ডোনেট করতে চাই।
আরিফ: জ্বী। যদি করতেন ভালো হতো। আমার মরহুম বাবার নামে ঐ স্কুল, গ্রামের দরিদ্র ছেলে-মেয়েরা পড়ে।
সালমান: এই নিন। বলে একটা প্যাকেট বের করলো।
আরিফ: (আঁতকে উঠে) না ভাই এভাবে আমার হাতে নয়। আপনি আগামীকাল আমাদের ফান্ডে জমা দিন ওখান থেকে আপনাকে রশিদ দিয়ে দেবে।
সালমান: ও। ঠিক আছে।
সালমানের মদ খাওয়ার পরিমান ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করলো।
আরিফ: ভাই এই বয়সে এত মদ খান। এটাতো ঠিক না। আপনার লিভারের ক্ষতি হবে তো!
সালমান: (পেটে হাত দিয়ে) আমার লিভার আছেই কিনা কে জানে? এতদিনে তো কিছুই থাকার কথা না।

আরিফ আমাকে বললো, “তাড়াতাড়ি এখান থেকে কাটি দোস্ত। এদের ভাবগতিক ভালো না।”
আমরা ওখান থেকে দ্রুত বেড়িয়ে পড়লাম।

—XXX—

আমি: আচ্ছা পুলিশে চাকরী করতে তোর কেমন লাগে?
আরিফ: নট গুড।
আমি: কেন?
আরিফ: চাকরীটা ইন্ট্রোভার্ট টাইপের। তারপর পরিবেশটাও অনুকুল নয়।
আমি: এপাশ থেকে তো মনে হয় যে, তোদের অনেক ক্ষমতা।
আরিফ: যার যত ক্ষমতা, তার রিস্কও তত বেশী।
আমি: হু রিস্ক-এর একটা ব্যাপার থেকে যায়।
আরিফ: ধর আমার কাছে একটা ইনফর্মেশন আছে, এটাও কিন্তু একটা রিস্ক!
আমি: তোর ভয় লাগে না?
আরিফ: তোরা তো বিদেশে চলে গেলি। আমি ভর্তি হলাম বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। খালি হাতেই তখন আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেক কিছু। মিছিলে মিটিং-এ তো জান হাতে নিয়েই বের হতাম।
আমি: হ্যাঁ, ঐ মনস্টারের কিছু ঘটনা তো আমি নিজেই দেখে গিয়েছি।
আরিফ: আমার বাবা মোকাবেলা করেছিলেন হানাদারদের। আমাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে বিশ্ববেহায়া নামধারী এক দানবকে।
আমি: তোর মনে পড়ে, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা সবাই। ভাবছিলাম এরশাদ-কে কি কিছুতেই খেদানো যাবেনা? উপায় কি কোনই নাই? তখন একবার তুষার বললো, “এত এত ওঁঝা, কত নাকি তুকতাক জানে, এরশাদ-কে বাণ মারা যায়না?”
আরিফ: হ্যাঁ, ওর আক্ষেপের কথা শুনে সেদিন দুঃখের মধ্যেও হেসে উঠেছিলাম আমরা সবাই।
আমি: বিদেশে যখন পড়তে গেলাম তখনও এরশাদ ক্ষমতায়। ওখানে সিনিয়ররা জানতে চাইলো এরশাদের হাল-হকিকত। তখন তো ইন্টারনেট ছিলোনা। বিদেশে টিভি নিউজে বাংলাদেশের সংবাদ দেখানো হতো খুবই কম। তাই দেশ থেকে কেউ গেলে তার মুখের কথা আর সাথে নিয়ে আসা পত্র-পত্রিকা এই ছিলো দেশের সংবাদ জানার উপায়। এরশাদের উপর ক্ষিপ্ত ছিলো দেশের সিংহভাগ মানুষ। তারপরেও কোন মন্ত্রবলে তিনি টিকে ছিলেন প্রায় নয়টি বছর। বিদেশেও সর্বক্ষণই আমরা বাংলাদেশীরা এরশাদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করতাম।
আরিফ: আর আমরা এখানে তাকে ক্রমাগত ফেইস করছি।
আমি: সেদিন যতদূর মনে পড়ে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের ছয় তারিখ হবে রাতের দিকে শুনলাম অসাধ্য সাধন হয়েছে, এরশাদের পতন হয়েছে, পতন হয়েছে স্বৈরাচারের। সে যে কি উল্লাস আমাদের মধ্যে! ডরমিটরিতে কারো একজনার রূমে অনেকে একসাথে বসে গেলাম, টিভিতে সেই কাঙ্খিত নিউজ দেখার জন্য। অনেকে ভাবছিলো বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র দেশের সংবাদ দেখায়ই কিনা? তারপরেও আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম সুসংবাদটি মিডিয়া মারফত শোনার জন্য। শেষ পর্যন্ত দেখানো হয়েছিলো যে, বাংলাদেশে এরশাদ-এর পতন হয়েছে। করতালিতে ফেটে পড়েছিলাম সবাই। সকলের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিলো, ‘স্বৈরতন্ত্রের পতন হলো, গণতন্ত্র মুক্তি পেলো!’
আরিফ: আমরা যখন শুনলাম যে ডাক্তার মিলন মারা গিয়েছে। গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগলো। সবাই জানের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লাম। পুলিশের বাধা, কার্ফিউ কিছুই মানিনি সেদিন। অবশেষে তার পতন ঘটেছিলো।
আমি: তোদের ধন্যবাদ। এই অসাধ্যা সাধন করার জন্য।
আরিফ: সেই থেকে আর আমি জানের ভয় করিনা।
আমি: মাও সেতুং বলেছিলো ‘পাওয়ার কামস ফ্রম দ্যা বেরেলস অব গান’।
আরিফ: ১৯৯০ সালের ছয়ই ডিসেম্বরে আমি শিখলাম নতুন তত্ত্ব, ‘জনতার শক্তির কাছে দুনিয়াবী আর সকল শক্তিই অচল’।
আমি: ভালো না লাগলে, চাকরীটা ছেড়ে দিলেই তো পারিস।
আরিফ: এ নিয়েও ভাবছি আজকাল।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
আরিফ: ভাগ্যে যা আছে তাই হবে।
আমি: তুই ভাগ্যে বিশ্বাস করিস?
আরিফ: তুই না একসময় পামিস্ট্রি, নিউমেরোলজি কি কি সব চর্চা করতি?
আমি: ওটা সখের বশে ছিলো। কিরো-র জীবনী পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলাম।
আরিফ: ভালো হাত দেখতে পারে এমন কারো সাথে তোর পরিচয় আছে?
আমি: ছিলো, কদিন যাবত দেখছি না।
আরিফ: কোথায় গেল?
আমি: জানিনা।
আরিফ: আরে অফিস কোথায় ছিলো? আগের ঠিকানা দে, আমি পুলিশের লোক, বাকীটা খুঁজে বের করা আমার জন্য অল্প সময়ের ব্যাপার।
আমি: ভাইরে ওরকম ঠিকানা-পাতা-ওয়ালা লোক তো খুঁজে বের করা যায়, আমি যার কথা বলছি, তাকে বসে থাকতে দেখেছি ফুটপাতে।
আরিফ: কি?
আমি: হ্যাঁ, একদিন অফিস থেকে নীচে নেমে দেখি বনানীর ফুটপাতে এক হস্তরেখাবিদ বসে আছে। তার সামনে দুতিনটা বই আর একটা ছোট সাইনবোর্ডে হাতের পাঞ্জার ছবি।
আরিফ: (সরু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে) তারপর?
আমি: আমার একটু আগ্রহ হলো। বললাম, কি ভাই হাত দেখেন নাকি। সে বললো, “জ্বী দেখি।” আমি তারপর তাকে হাত দেখালাম। ও ঠিক ঠিক অনেক কিছু বলে দিলো।
আরিফ: বলিস কি?
আমি: আমিও একটু অবাক হয়েছিলাম। তবে ওকে যাচাই করতে ভুল করিনি, বুঝতে পারলাম।
আরিফ: এমন কি হতে পারেনা, যে ও তোকে সব ভালো ভালো কথা বললো আর তুই খুশি হয়ে গেলি?
আমি: না। ও আমাকে সবকিছু ভালো বলেনি। কিছু নেগেটিভ কথাবার্তাও বলেছে। তারপরে এও বলেছে, “ভালোটা ভালো বললাম, খারাপটা খারাপ বললাম”। যেহেতু আমি ওগুলোর চর্চা একসময় করেছিলাম, ওর কথা আমি সবই ধরতে পেরেছিলাম। ও যে ভালো পামিষ্ট্রি জানে সেটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।
আরিফ: টাউট-বাটপাররা কোট-টাই পড়ে, এয়ার কন্ডিশনড রূমে বসে হাত দেখে টাকা কামাচ্ছে, আর ওরকম একটা জাননেওয়ালা লোক ফুটপাতে বসে থাকে!
আমি: ‘প্যারাডক্স অব লাইফ’ বন্ধু। দুধওয়ালা মানুষের বাড়ী বাড়ী ধর্ণা দেয়, আর মদওয়ালার পিছে পিছে মানুষে ঘোরে! এই দুনিয়ায় ইনসাফ বলে কি কিছু আছে?

—XXX—

আমি: আপনার জন্ম দেশের বাইরে তাইনা?
জান্নাত: আপনি জানেন কি করে স্যার?
আমি: বাহ, আমি আপনার সিভি দেখেছি না!
জান্নাত: ওহ স্যার!
আমি: কি করে হলো এটা?
জান্নাত: আমার আব্বু তখন আরব-আমীরাতে চাকুরী করতেন। সেখানেই আমার জন্ম।
আমি: কি করেন উনি?
জান্নাত: ইঞ্জিনীয়ার।
আমি: ও। আম্মু কি কিছু করেন?
জান্নাত: জ্বী আম্মু ডাক্তার।
আমি: গুড। আপনারা কয় ভাইবোন?
জান্নাত: আমার একটা ছোট ভাই আছে। স্কুলে পড়ে।
আমি: ওয়েল। আমি আপনাকে কিছু কাজ দেব ওগুলো আপনাকে করতে হবে।
জান্নাত: কঠিন কাজ হবে স্যার?
আমি: আমি তা মনে করি না। জাস্ট অভিজ্ঞতার ব্যপার। কিছুদিন কাজ করলেই সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আপনি দেখতে যেমন সুশ্রী, তেমনি ইন্টেলিজেন্টও হবেন আশা করি।
জান্নাত সলাজ হাসলো। হিজাবী হোক আর নন-হিজাবী হোক নিজের রূপের প্রশংসা শুনলে সব মেয়েই খুশী হয়। আফটার অল মেয়ে তো!
জান্নাত: আমি চেষ্টা করবো স্যার।
আমি: ঘাবড়ানোর কিছু নাই। আমি অন্যান্য স্টাফদের বলে দেব, তারা যেন আপনাকে সহযোগীতা করে।
জান্নাত: উনারা হেল্প করবেন আশা করি।
আমি: ট্রাই টু মেক ফ্রেন্ডশীপ উইথ দেম। বাট আই শুড ডিসএ্যাপয়েন্ট ইউ। অতটা আশা করবেন না। এটা কর্পোরেশন। এখানে কেউ কাউকে পারতপক্ষে হেল্প করতে চায়না। দিস ইজ নট ইওর ইউনিভার্সিটি।
জান্নাত: বাংলাদেশে কর্পোরেট এনভার্নমেন্ট কি এরকম?
আমি: নট অনলি বাংলাদেশ। এই ক্ষেত্রে পশ্চিমারাও কম যায়না।

মেয়েটির দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে শান্ত-সৌম্য একটি রূপ মেয়েটির। অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ও বিনয়ী। মনযোগ দিয়ে সব কাজ করবে বোঝাই যাচ্ছে।
—XXX—

জুম্মার নামাজ পড়ে মসজিদের বাইরে বেরিয়ে দেখি, একজন হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। উনাকে কেমন যেমন চেনা চেনা মনে হলো। মনে করার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘকায় সুঠাম দেহের অধিকারী তিনি, শ্যাম বর্ণের গাত্র, যেন এককালে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। মুখ ভর্তি লম্বা দাঁড়ি। পোষাক-আশাক একেবারে ঐ তরিকার! এবার হুজুরকে দেখলাম আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। একটু অবাক হলাম। আমার দিকে হঠাৎ একজন হুজুর এভাবে এগিয়ে আসবেন কেন? হুজুরদের সাথে তো আমার কোন সখ্যতা নেই! উনাকে খুবই চেনা চেনা মনে হচ্ছিলো। উনি কি আমার পূর্বপরিচিত কেউ? এবার উনার মুখ থেকে দাঁড়িটা বাদ দিয়ে চেনার চেষ্টা করলাম। ততক্ষণে তিনি আমার কাছে চলে এসেছেন। এবার চট করে উনাকে চিনে ফেললাম। তিনি যখন আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, আমি উচ্চ কন্ঠে বললাম
আমি: হাসান ভাই?
হুজুর: রাইট। চিনতে পেরেছ তাহলে?
আমি: প্রথমে চিনতে পারিনি, আপনাকে এগিয়ে আসতে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
হুজুর: চিনতে নিশ্চয়ই অনেক মেহনত করতে হয়েছে?
আমি: জ্বীনা। অত মেহনত করতে হয়নি। কল্পনার চোখে আপনার মুখ থেকে লম্বা দাঁড়িটা বাদ দিয়ে দিলাম। ব্যাস সেই পুরাতন চেহারার সাথে মিলিয়ে ফেললাম, আর চিনে ফেললাম।
হুজুর: হা হা হা। তুমি তো আগের মতই শার্প আছো। মাশাআল্লাহ! ফ্রী আছো?
আমি: জ্বী, আজ তো শুক্রবার অফিস বন্ধ। ফ্রীই আছি।
হুজুর: আমাদের আবার উল্টা, শুক্রবারই বেশী ব্যস্ত থাকি। যাহোক, চলো কোথাও বসি কিছু সময়ের জন্য। পুরাতন সুখ-দুঃখের কথা বলবো।
আমি: ওখানে একটা ভালো ক্যাফে আছে। চলুন বসি।

যেতে যেতে ভাবলাম। ভাগ্য মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়। এই হাসান ভাই ছিলেন, আমাদের কলেজের সেরা খেলোয়াড়। মেধাবী ছাত্রও ছিলেন। এইচ.এস.সি. পাশ করার পর ভর্তি হলেন মেরিন এ্যাকাডেমীতে। পাশ করে জাহাজেও গেলেন। তারপরে একটা ঘটনার পর পুরোপুরি পাল্টে গেলেন। ধর্মীয় লাইনে চলে গেলেন। এখন নাকি কোন মসজিদে ইমামতি করেন। কলেজ তকে বের হওয়ার পর উনাকে আর দেখি নাই। সবই শোনা কথা।

হুজুর: তারপর বলো তোমার কথা।
আমি: আমার কথা সামান্য আর মামুলী। আপনি বরং বলুন আপনার চমকপ্রদ কথা।
হুজুর: আমার আবার কি চমকপ্রদ কথা?
আমি: আমি শুনলাম যে, আপনি মেরিন এ্যাকাডেমী পাশ করে জাহাজে চাকরী নিলেন। তারপর একবার আপনার জাহাজে করে আটলান্টিক মহাসাগরে যাওয়ার কথা, হঠাৎ আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তারপর ঐ ভয়েজ বাতিল করতে হলো। তার কয়েকদিন পরে নাকি সংবাদ পেলেন যে ঐ জাহাজটি আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে সব নাবিক মারা গিয়েছে। সেই থেকে আপনার মনে একটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। আপনি ঐ চাকুরী ছেড়ে দিয়ে, আধ্যাত্মিক লাইনে চলে এসেছেন।
হুজুর: (ভীষণ অবাক হয়ে) এইসব বানোয়াট গল্প কারা বানায়?
আমি: (ততোধিক অবাক হয়ে) ঘটনা কি সত্যি নয়?
হুজুর: আলবৎ নয়। আমি কোনদিনই জাহাজে চাকুরী করি নাই।
আমি: তাহলে আপনি হুজুর হলেন কেন?
হুজুর: আরে হুজুর হওয়ার জন্য অলৌকিক ঘটনা ঘটা লাগে নাকি?
আমি: না মানে। আপনার মত তুখোড় খেলোয়ার, মেধাবী ছাত্র, স্মার্ট মানুষ হঠাৎ এই লাইনে যাবে কেন?
হুজুর: আবারো কমাল কি বাত! মেধাবী ছাত্র, স্মার্ট মানুষদের কি হুজুর হওয়ায় নিষেধ আছে নাকি? নাকি তুমি বলতে চাও হুজুররা সব লেভেন্ডিস, মোটেও স্মার্ট নয়!
আমি: (অপ্রস্তুত হয়ে) না মনে তা নয়। কি ঘটেছিলো একটু বলবেন কি?
হুজুর: আমি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু আমার মন গতানুগতিক শিক্ষায় মন বসাতে পারছিলো না। কলেজে থাকতে আমি কিমিয়ায়ে সাআদাত (Kīmyāyé Sa’ādat (The Alchemy of Happiness)) পড়েছিলাম। এছাড়া আরো ইছু ইসলামী বই আমি পড়েছিলাম। ওগুলো আমার মনে গভীর চিন্তার সঞ্চার করে। তাই আমি আর গতানুতিক লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারলাম না। শেষে ওখান থেকে সরে এসে, ধর্মীয় লেখাপড়া শুরু করলাম। ঐ বয়সে আমাকে শিখতে হয়েছে আলিফ বা তা ছা। তারপর ধীরে ধীরে আর সবকিছু।
আমি: আপনি আরবী বলতে পারেন?
হুজুর: অবশ্যই বলতে পারি। লিখতে পড়তেও পারি।
আমি: লেখাপড়া কোথায় করেছেন?
হুজুর: ভারতে। দেওবন্দ-এ।

এরপর আমাদের আরো কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা চলে। জানলাম মালিবাগে একটা মসজিদে ইমামতি করেন তিনি। পাশাপাশি মাদ্রাসায় শিক্ষকতাও করেন। উনার সাথে আলাপ হয়ে মনে মনে খুশিই হলাম। আমাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই এই লাইনে গিয়েছেন। যেই লাইন সম্পর্কে আমার আদৌ কোন ধারনাই নেই। উনার সাথে এতদিন পরে দেখা হয়ে ভালোই হলো, আগ্রহ অনুযায়ী জানা যাবে অনেক কিছুই।
—XXX—

ফেসবুকে অনলাইনে তাকিয়ে দেখলাম তানিয়া লাইনে আছে। গত কয়েকদিন যাবৎ ওর সাথে অনলাইন চ্যাট, টেলিফোনে কথা কোনটাই হয়নি।
আমি ইনবক্সে লিখলাম
আমি: অনলাইনে আছো।
তানিয়া: আছি।
আমি: ফোন করবে?
তানিয়া: ওকে ফোন ধরো।
বেজে উঠলো ফোন নতুন রিংটোনে – ‘কোনা এক সন্ধ্যায় হাজার আতশ-বাজি আর সানাইয়ের সুরে, তোমায় নিয়ে গেছে আমার কাছ থেকে দূরে বহুদূরে’।
আমি: হ্যালো তানিয়া।
তানিয়া: কেমন আছো?
আমি: ভালো। তুমি কেমন আছো।
তানিয়া: কয়েকদিন হারিয়ে গেলে
আমি: (কি উত্তর দিবো ঠিক বুঝতে পারলাম না, কিছুটা বিব্রত হয়ে বললাম) না, মানে অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত ছিলাম।
তানিয়া: তুষার কি তোমার কাধে সব দায়িত্ব দিয়ে গায়ে ফু দিয়ে ঘুরে বেড়ায়?
আমি: না না। ও বাইরে দেশে যায় কেবল কাজ থাকলেই। আর আমার কাঁধে কাজ চাপায় না। ওর কাজ ও করে, আমার কাজ আমি করি।
তানিয়া: তাহলে আর এত ব্যস্ততা কিসের? যাহোক, আমি নিজেও আসলে দেশে ছিলাম না কয়েকদিন।
আমি: তাই? কোথায় গিয়েছিলে?
তানিয়া: সাইপ্রাস।
আমি: বরের সাথে?
তানিয়া: কিসের বরের সাথে? বিয়ের পর প্রথম দিকে ওর সাথে কয়েকটা দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম, তারপর আর নয়।
আমি: (ভাবছি ওকে কি জিজ্ঞেস করবো, “কেন এরকম?” কিন্তু প্রশ্নটা করলাম না, ওর কনজুগাল লাইফের কোন প্রশ্ন আমার তরফ থেকে না করাই ভালো) কেমন বেড়ালে?
তানিয়া: নট ব্যাড। সাইপ্রাসে আমি আগেও কয়েকবার গিয়েছি। আসলে আমার ছেলেটা আবদার করেছিলো তাই ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম বেড়াতে।

আমি: সাইপ্রাসে একবার গিয়েছিলাম আমি। ভালো লেগেছিলো বেশ। গ্রীক দেবী আফ্রোদিতি-র জন্মস্থান ওখানে। আফ্রোদিতি-র একটা মূর্তি কিনেছিলাম ওখান থেকে। মূর্তিটা এখনো আছে আমার সাথে।
তানিয়া: আফ্রোদিতি-র মূর্তি দিয়ে তুমি কি করো? নারী সৌন্দর্যের তুমি কি বোঝ? তুমি তো নার্সিসাসের মতো নিজের রূপ নিয়েই ব্যস্ত।
আমি: (আবারো ঠেস দেয়া কথা! আমতা আমতা করে বললাম) না মানে ………..
তানিয়া: আমার জামাইয়ের সাথে কোন কোন দেশে গিয়েছিলাম জানতে চাইলে না?
আমি: সেটাতো তোমাদের ব্যাপার। আমি আর কি জানতে চাইবো?
তানিয়া: (তানিয়া আমার কথায় কান না দিয়ে) আমরা হানিমুন করতে গিয়েছিলাম দার্জিলিং-এ।
ইলেকট্রিক শক খেলাম আমি। সেই সময় এই দার্জিলিং-এর কথা ওকে বেশ বলতাম আমি। ওকে আরো বলেছিলাম যে, “আমার স্ত্রীকে নিয়ে আমি হানিমুন করতে যেতে চাই দার্জিলিং-এ। দুজনে মিলে মুগ্ধ হয়ে কাঞ্চনজংঘার দৃশ্য দেখবো। আর ভাগ্য যদি ভালো থাকে, আবহাওয়া ভালো থাকলে এভারেস্ট-এর চূড়াটাও দেখা যাবে।

তানিয়া: আমরা যখন দার্জিলিং-এ ছিলাম আবহাওয়া ভালো ছিলো তাই এভারেস্ট-এর চূড়াটা আমরা দেখেছিলাম। আমার স্বামীর মধ্যে ওসব রোমান্টিকতা ছিলো না। আমি একাই মুগ্ধ হয়ে দেখেছি।

এসব কথা তানিয়া আমাকে কেন বলছে? আমার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে? কি আর বলবো। ঘাঁ তো আমিই তৈরী করেছিলাম। এখন নুনের ছিটা কেউ দিলে তো জ্বলবেই।

তানিয়া: আচ্ছা, তুমি পরকীয়া প্রেম সম্পর্কে কি ভাবো?
আবারো আমাকে ভাবালো ওর প্রশ্ন। ওকি আবারো আমাকে ব্যাথা দেয়ার জন্য এই প্রশ্ন করছে? তা কেব হবে। এখন ওর সাথে মার যা হচ্ছে তা তো আর প্রেম নয় যে তাকে পরকীয়া বলবো!
আমি: পরকীয়া বোধহয় যুগ যুগ ধরেই চলছে।
তানিয়া: তুমি কি রবীন্দ্রনাথ-এর সাথে তার ভাবীর প্রেমের কথা বলতে চাও?
আমি: তারও অনেক আগের ঘটনা আছে। ভল্টেয়ার-এমিলির প্রেম।
তানিয়া: ভল্টেয়ার? ফরাসীর অগ্নিপুরুষ?
আমি: হু সেই।
তানিয়া: কি বলো এতবড় সাহিত্যিক-দার্শনিক!
আমি: সেই সময়ে ফ্রান্সের অভিজাত মহলে এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনাই ছিলো।
তানিয়া: এমিলির স্বামীকি জানতো এই পরকীয়ার কথা?
আমি: হ্যাঁ, জানতো। উনার চোখের সামনেই সব হয়েছে।
তানিয়া: কি বিষয় বলতো?
আমি: সেটা ১৭২২ সালের কথা। তখনকার ফ্রান্সে জানা ছিলোনা গতিকে কি করে কোয়ান্টিফাই করা যায়। প্রকৃতির ঘটনাবলীতে বর্গের ধারনা তেমন একটা ছিলোনা। এই ধারনাটি তারা পায় অসচরাচর উৎস থেকে। তিনি হলেন রাজ দরবারের সদস্য লুঁই নিকোলাই-এর কন্যা এমিলি। সৌন্দর্যের জন্য খ্যাতি ছিলো তাঁর, তবে রূপের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তায়ও তিনি ছিলেন অসাধারণ। ফ্রান্সের পদার্থবিজ্ঞানে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। স্যার আইজাক নিউটনের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া’-র ফরাসী অনুবাদ তিনিই করেছিলেন। যা আজও ফ্রান্সে পঠিত হচ্ছে। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও ভাষাবিদ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ফ্রান্সে তখনও নারী স্বাধীনতা আসেনি। উনিশ বছর বয়সে উনার বিবাহ হয় একজন ফরাসী জেনারেল-এর সাথে। এবং তাদের ঘরে জন্ম নেয় তিন সন্তান। পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। তেইশ বছর বয়সে তিনি সেই সময়কার নামজাদা ফরাসী গণিতবিদ Moreau de Maupertuis-এর কাছ থেকে উচ্চতর গণিত শেখেন। অল্পবয়সী সুন্দরী ছাত্রীকে তিনি আগ্রহভরে যত্ন সহকারে গণিত শিখিয়েছিলেন। ধারনা করা হয় যে, তাদের মধ্যে লিটল রোমান্স ছিলো।

এরপর এমিলি প্রেমে পড়েন খ্যাতিমান ফরাসী কবি ও দার্শনিক ভল্টেয়ার-এর। ফরাসীর অগ্নিপুরুষ খ্যাত ভল্টেয়ার রাজা ও ক্যাথলিক চার্চের সমালোচনা করার জন্য দু’দুবার অন্তরীন ও নির্বাসিত হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে তিনি কিছুকাল কাটিয়েছিলেন এই নির্বাসিত জীবনে। সেখান থেকে তিনি ফিরে আসেন স্যার আইজাক নিউটনের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে। ফ্রান্সে ফিরে তিনি আবার রাজাকে অপমান করেন। তারপর গ্রেফতার এড়ানোর জন্য এমিলির আশ্রয় নেন। এমিলি ভল্টেয়ারকে তাঁর কান্ট্রিহাউজে লুকিয়ে রাখেন। প্যারিস থেকে অনেক দূরের এই বাড়ীতে এমিলি ও ভল্টেয়ার বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির একটি প্রাসাদ গড়ে তোলেন। দীর্ঘকাল এমিলি সেখানে ভল্টেয়ারের সাথে বসবাস করেন স্বামীর বর্তমানেই। এই বিষয়ে এমিলির স্বামী ছিলেন সহনশীল অথবা সেই সময়ের ফ্রান্সের অভিজাত মহলে এটাই ছিলো রীতি। সেই সময়ে রচিত ভল্টেয়ারের সাহিত্যে এমিলির প্রভাব রয়েছে, এটা ভল্টেয়ার নিজেই স্বীকার করেছেন। ১৭৩৮ সালের Paris Academy prize contest-এ ভল্টেয়ার ও এমিলি দুজনেই অংশ নেন। এ্যাকাডেমী কর্তৃক এমিলির প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি ছিলো a research on the science of fire । এভাবে এমিলিই হন প্রথম ফরাসী রমনী যার লেখা Paris Academy-তে প্রকাশিত হয়েছে।

এমিলি তার কাছের মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছিলেন। কিন্তু তার পাশাপশি তিনি নিজের আইডিয়াও বিকশিত করেছিলেন। স্যার আইজাক নিউটনের চিন্তায় খুঁত আছে এমন চিন্তা করার সাহসও এমিলি দেখিয়েছিলেন। ইউরোপে ভরবেগের ধারনা তখন মোটামুটি প্রতীত হয়েছিলো। কিন্তু শক্তি (energy)-র ধারনা তখনও সুস্পষ্ট ছিলোনা।

স্যার আইজাক নিউটনের সমসাময়ীক ফরাসী দার্শনিক ও গণিতবিদ ছিলেন গটফ্রীড লেইবনিজ। লেইবনিজ বলেছিলেনযে, গতিশীল কায়ার মধ্যে একটা inner spirit আছে। তার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ভিস ভিভা’। অনেকে তাঁর এই প্রস্তাব পছন্দ না করলেও, লেইবনিজ বিশ্বাস করতেন যে, কোন কায়ার শক্তির পরিমান হবে তার ভর ও বেগের বর্গের গুনফলের সমান। উল্লেখ্য যে এই বর্গ বিষয়টি বাস্তব থেকে গণিতে প্রবেশ করেছিলো সেই প্রাচীন কালেই। পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্যেও বর্গ বিষয়টি রয়েছে। এমিলি বিষয়টি বোঝার জন্য, ইতিপূর্বে করা Willem’s Gravesande-র একটি পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেন। একটি বলকে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে ফেলে দেয়া হচ্ছে নরম কাদার উপর, কাদার ডিফর্মেশন দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বলের গতিশক্তি তার বেগের বর্গের সমানুপাতিক। নিউটনের মতো ভল্টেয়ারও বিশ্বাস করতেন যে গতিশক্তি হবে বেগের সমানুপাতিক। তাই এমিলির সাথে ভল্টেয়ারের দ্বিমত দেখা দিলো। এমিলি বললেন, “তুমি ভাবছ যে তিমি নিউটনকে বুঝতে পারছো, কিন্তু তুমি লেইবনিজ-এর মত করে ভাবতেই পারছো না। তুমি এটার সমালোচনা করো, ওটার সমালোচনা করো। নিজে কিছু আবিষ্কার করতে কি পেরেছ?” উত্তরে ভল্টেয়ার বলেছিলেন, “আমি তোমাকে আবিষ্কার করেছি।” যাহোক এমিলি পরীক্ষার দ্বারা প্রমান করলেন যে নিউটন নয়, লেইবনিজই সঠিক। উনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, “আপনি কি মনে করেন যে এই সময়ে এ্যাকাডেমী আপনার মতামত মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত?” উত্তরে এমিলি বলেছিলেন যে, “দেরী করার কোন কারন তো দেখছি না, সত্য বলার জন্য কোন রাইট টাইম নাই”। এমিলির কাজ প্রকাশিত হওয়ার পর তা বিতর্ক উসকে দিয়েছিলো। ভল্টেয়ার বলেছিলেন যে, “এমিলি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন কিন্তু উনার সবচাইতে বড় দোষ ছিলো যে, তিনি ছিলেন একজন নারী”।

তানিয়া: যথার্থই বলেছিলেন ভল্টেয়ার। আমারো বড় দোষ, আমি একজন নারী।

(চলবে)

চাঁদেরও মতো নীরবে এসো প্রিয় নিশিথ রাতে,
ঘুম হয়ে পরশও দিয়ো হে প্রিয় নয়নো পাতে।
এসো প্রিয় নিশিথ রাতে।
তব তরে বাহিরও দুয়ারে মম,
খুলিবে না আর এই জনমে প্রিয়তম।
মনেরও দুয়ার খুলি গোপনে এসো,
বিজড়িত রহিয়ো স্মৃতিরও সাথে।
—— নজরুল গীতি

তারিখ: ৭ই ডিসেম্বর, ২০১৬ সাল
সময়: সকাল ৪টা ৩২ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.