প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৮

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৮
—————————– ড. রমিত আজাদ

ক্ষমতার সাথে যৌনতার সম্পর্ক পুরানো। পৌরাণিক কাহিনী যতগুলোই আছে তার সবগুলোই ক্ষমতার লড়াই নিয়ে, কিন্তু এর মধ্যে একটিও নেই যেখানে যৌনতা অনুপস্থিত। গ্রীক মিথলজি ইলিয়াড-এ তো রীতিমত দেব-দেবীদের মধ্যে কাম রতি সবই দেখানো হয়েছে। শুধু তাই নয় অমর দেব-দেবীদের সাথে মরণশীল মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে, আর তাদের সেই সংশ্লেষ-এর ফলাফল হিসাবে যারা বিশ্বজগতে আবির্ভুত হয়েছে তাদেরকে বলা হয় demigod অথবা minor deity। এরকম একজন demigod-এর নাম হলো ‘হেলেন অব ট্রয়’। যিনি ছিলেন দেবরাজ জিউসের ও রূপসী মানবী লিডা-র কন্যা। কথিত আছে যে, যদিও লিডা তখন রাজা টিনডেরিয়াসের বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন কিন্তু দেবরাজ জিউসের নজরে পড়া লিডা জিউস কর্তৃক প্রলুব্ধ হয় ও তাদের অবৈধ যৌন সম্পর্কের ফলাফল হয় অপরূপা রূপবতী হেলেন। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখা এই হেলেনের রূপের কথা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। আকৃষ্ট হতে থাকে অগনিত পুরুষ। তবে আকৃষ্ট হলেই তো হবে না, নারীর রূপ-সৌন্দর্য যেকোন পুরুষের জন্য নয়, সেই রুপ-সুধা ভোগের সৌভাগ্য হয় কেবল শক্তিমান বা ক্ষমতাবান পুরুষদের। প্রথমে এই রূপ-সৌন্দর্যের অধিকারি হন মাইসেনিয়ান স্পারটা-র রাজা মেনেলাউস। তবে তাও দীর্ঘকাল স্থায়ী হতে পারেনি। হেলেনের চাইতে বয়সে অনেক বড় মেনেলাউস সম্ভবতঃ দৈহিক ও মানসিক কোনভাবেই সুখী করতে পারেনি হেলেনকে। তাই তরুণী হেলেন মেনেলাউসকে ভালোবাসতে পারেনি। এই কারণেই বেশিরভাগ সময়-ই উদাসীন থাকতো রূপসী হেলেন। তার মন-চোখ-কায়া খুঁজতো অন্য এক পুরুষকে। অবশেষে একদিন হেলেন খুঁজে পেলো তার কাঙ্খিত পুরুষকে। স্পার্টায় আগমন ঘটে এক রূপবান পুরুষের। ট্রয়ের রাজপুত্র এই যুবকের নাম ছিলো প্যারিস। প্যারিসের রূপ-সৌন্দর্য্য হেলেনের প্রতি তার আসক্তি আবেগ-অনুভূতি সবকিছু হেলেনকে বিমোহিত করে। নৈতিকতা ও স্বামীর প্রতাপের কথা ভেবে প্রথমে পিছিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে প্যারিসের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে রূপসী হেলেন। আসলে নারীর জীবনে পুরুষের ক্ষমতা-প্রভাব-প্রতিপত্তি-ই সবটুকু নয়। যৌনতা এমনই সন্মোহক যে তা রাজার প্রতাপকেও অগ্রাহ্য করে। দেব ও মানবের সন্মিলিত ফসল হেলেনের সর্বগ্রাসী রূপই ছিলো দশ বৎসর স্থায়ী গ্রিস ও ট্রয়ের যুদ্ধের মূল কারণ।

যৌনতা ও ক্ষমতার সংমিশ্রণে প্রাচ্য দেশীয় পৌরাণিক কাহিনীও কম যায়না। মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও রয়েছে দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী-র কাহিনী। পুরাণে তার রূপ-সৌন্দর্য্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘তখন যজ্ঞবেদী থেকে এক কুমারীও উৎপন্ন হলেন যিনি পাঞ্চালী নামে পরিচিতা হলেন । তিনি সৌভাগ্যশালিনী, সুদর্শনা এবং কৃষ্ণ আয়তচক্ষুযুক্তা । তিনি শ্যামাঙ্গী, পদ্মপলাশাক্ষী, কুঞ্চিত ঘনকালো কেশবতী এবং তাম্রবর্ণ নখ, সুন্দর ভ্রূ ও স্তনযুক্তা । তিনি মানুষের শরীরে সাক্ষাৎ দেবী । তাঁর নীলপদ্মের ন্যায় অঙ্গসৌরভ একক্রোশ দূরেও অনুভূত হয় । তিনি পরম সুন্দর রুপধারিণী এবং সমগ্র বিশ্বে তুলনাহীনা । এই দেবরূপিনী কন্যা দেব, দানব ও যক্ষেরও আকাঙ্ক্ষিত।’ সহস্র পুরুষের বাসনা পরম কাঙ্ক্ষিত এই রূপসীকে পুরুষের অভিষঙ্গিত করার উদ্ধেশ্যে আয়োজিত হয়েছিলো স্বয়ম্বর সভা নামক এক কঠিন প্রতিযোগিতার। অত্র অঞ্চলে বহিরাগত আর্যকুল কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এক জুলুমের নাম হলো বর্ণভেদ প্রথা, ঐ ভেদাভেদের সুবিধাভোগী একটি অংশ হলো শাসক শ্রেণী ক্ষত্রিয়-রা। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী এই ক্ষত্রিয়দের মধ্যে কেউ সেই প্রতিযোগিতায় পাশ করতে পারেনি। তবে ভাগ্য কর্তৃক চিরবিড়ম্বিত কর্ণ এই কাজ সম্পাদন করতে পারতেন কিন্তু তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেলে দ্রৌপদী উচ্চস্বরে বলে উঠে, “আমি সূতজাতীয়কে বরণ করব না।” এতে আমৃত্যু নিজের দুর্ভাগ্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামকারী কর্ণ ক্রোধে সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে স্পন্দমান ধনু ত্যাগ করেন । যেজন্য ধৃষ্টদ্যুম্ন পিতার অনুমতি নিয়ে সকল বর্ণের পুরুষকে আমন্ত্রণ জানান। অবশেষে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশী অর্জুন এই কাজ সম্পন্ন করে রূপসী দ্রৌপদীকে লাভ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে কর্ণ ও অর্জুন দুজনই ছিলেন দেব ও মানবীর যৌন সম্পর্কের ফলাফল। এবং তারা ছিলো একই মায়ের দুই পুত্র। যাহোক, অসম ও অনেকটাই পাতানো প্রতিযোগিতায় জিতে দ্রৌপদি-কে লাভ করে বাসায় ফিরে যখন ভীম মা কুন্তীকে তারা কী এনেছে তা দেখার জন্য বলেন কুন্তী তখন অজ্ঞাতসারে তাঁদের বলেন তাঁরা যা এনেছে নিজেদের মানে পাঁচ ভাইদের মধ্যে ভাগ করে নিতে এজন্য দ্রৌপদীকে পঞ্চস্বামী গ্রহণ করতে হয়। মিথ অনুযায়ী, দ্রৌপদী তাঁর পূর্বজন্মে পতি লাভের জন্য তপস্যা করছিলেন এমন সময় মহাদেব তাঁকে বর দিতে আসেন । দ্রৌপদী এ সময় পাঁচ বার “পতিং দেহি” বলেন যার অর্থ ‘পতি দিন’। তখন মহাদেব তথাস্তু বলেন। এজন্য পরবর্তী জন্মে তাঁর পাঁচজন স্বামী হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ট শতকের আশ্বিন মাসের কোন একদিনে আম্রপালী-র নিমন্ত্রন গ্রহন করেছিলেন তথাগত বুদ্ধ।
অনেকের চোখেমুখে বিস্ময়ের চিহ্ন গভীর হয়ে উঠছিলো – আম্রপালী বৈশালী নগরের সুন্দরী ‘রূপাজীবা’ (royal courtesan); তার আতিথ্য বরণ করবেন তথাগত বুদ্ধ? রাজসিংহাসন ছেড়ে ধুলিমলিন পথে নেমে আসা অহিংস বাণী প্রচারক মহামতি বুদ্ধ ‘রূপাজীবা’ নগরবধু-কেও মানুষের আসনেই বসিয়েছিলেন। কোন কোন ভিক্ষু আছে যারা অহোরাত্র বুদ্ধের অহিংস মন্ত্র জপ করেও মানবিক হৃদয়ের অধিকারী হতে পারেনি। এদিকে মহামতি বুদ্ধ তখনকার রাজাজ্ঞার বিরুদ্ধে গিয়েও আম্রপালির আমন্ত্রণ গ্রহন করেছিলেন। কে এই আম্রপালির? কেন সে নগরবধু হয়েছিলো?

আম্রপালীর পিতা-মাতার কোন পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাঁকে আম্রবাগিচার একটি আম গাছের নিচে কুড়িয়ে পাওয়া গিয়েছিল। তাই তার নাম দেয়া হয়েছিলো আমের পাতা বা ‘আম্রপালি’। পুরাণে বর্ণিত হেলেন বা দ্রৌপদীর মতই লক্ষণীয় এক রূপসী ছিলেন বাস্তব জগতের আম্রপালী। তাঁর রূপ লাবণ্যে মোহিত হয়ে বৈশালীর অনেক শক্তিমান ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব তাঁর সাহচর্য কামনা করেন। তবে সেই সাহচর্য কামনায় কোন পবিত্রতা ছিলোনা। আম্রপালীর কায়াভোগের জন্য রাজপুরুষগন হয়ে ওঠেছিলো লালায়িত। কিন্তু কার হবেন আম্রপালি? কোন পুরুষের বাহুলগ্না হবেন তিনি? এক শক্তিমান পুরুষ যদি তাকে পায়, আরেক শক্তিমান পুরুষ তা মেনে নেবে না। আম্রপালি-র অধিকার নিয়ে পুরুষে পুরুষে সংঘাত শুরু হয়ে যেতে পারে, যেমনটি ঘটেছিলো হেলেন-এর বেলায়। তাই সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে রাষ্ট্রের নির্দেশেই আম্রপালি-কে হতে হয়েছিল বৈশালীর নগরবধূ। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়া আম্রপালির সৌন্দর্যের কথা একদিন কর্ণগোচর হয় পার্শ্ববর্তী শত্রুরাজ্য মগধার রাজা পরাক্রমশালী বিম্বিসারের। আম্রপালির রূপের নেশায় বিম্বিসার বৈশালী আক্রমন করে বসেন। আক্রমন করে তিনি যুদ্ধ ময়দানের দায়িত্ব অন্যদের হাতে দিয়ে নিজে শরণার্থীর বেশে আম্রপালীর গৃহে আশ্রয় নেন। তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, আকর্ষনীয় মুখের গড়ন, মনোহর ভ্রু-যুগল, চিত্তগ্র্রাহী আয়ত নয়ন, যৌবনবতী লাবণ্যপূর্ণ কোমল শরীরের অধিকারিনী আম্রপালী-কে দেখে প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যান রাজপুরুষ বিম্বিসার। যদিপ আম্রপালির শরীরের খাঁজে খাঁজে ইতিমধ্যেই সঞ্চিত হয়েছে রাজপুরুষগণের লালসা ও সম্ভোগসুখের অস্তর্নিহিত চিহ্ন, তদুপরী, কেবল তার কায়া সৌন্দর্য্যকে উপভোগই নয় বরং তার মনও জয় করতে চাইলেন বিম্বিসার। শক্তিমান পুরুষ বিম্বিসার একজন সুদক্ষ সংগীতজ্ঞও ছিলেন। অপরূপা নৃত্যশিল্পি ও সঙ্গীতানূরাগী আম্রপালির মন দ্রুতই জয় করে নেন রাজা বিম্বিসার। এটা সম্ভবত বীরের প্রতি নারী অদম্য আকর্ষন বোধ নয়। তথাকথিত বীর তো আম্রপালী ইতিপূর্বেও অনেকবার দেখেছে। হতে পারে সেই প্রমোদ ভবনে সেদিন এক মন আরেক মনকে ছুঁয়েছিলো। ডুবে যান তাঁরা পরস্পরের প্রেমে। তবে একসময় বিম্বিসারকে চলে যেতে হয় আম্রপালিকে ছেড়ে, (সে আরেক কাহিনী)। পরবর্তীতে আম্রপালীর গর্ভে বিম্বিসারের এক পুত্রের জন্ম হয়েছিলো। রাজপুত্রের মাতা, রাজার মনের নারী হয়েও রাজ্যের রাণী হতে পারেননি তিনি। রূপাজীবা আম্রপালি নগরবধুই রয়ে গেলেন।

ফরাসি যুবক এভারিস্ত গালোয়া (Évariste Galois) ছিলেন সেই গণিতবিদ যিনি প্রতিষ্ঠা আধুনিক গণিতের অন্যতম শাখা গ্রুপ থিওরী। ১৮১১ সালে জন্ম নেয়া এই তরুণ সেইসময়ের খ্যাতিমান গণিতবিদ কশি-র বরাবর পত্র লিখে জানান যে, তিনি প্রমাণ করেছেন যে, পঞ্চম বা তার বেশি মাত্রার পলিনমিয়ালের সাধারণ সমাধান মূলকের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আবিষ্কারটি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি যে উপায়ে প্রমাণ করেন সেই উপায়টি। স্কুল জীবনেই তিনি গণিতে এমনই মজে গিয়েছিলেন যে স্কুলশিক্ষকরা তাকে আর কিছুই শিখাতে পারছিলো, গালোয়া শিক্ষকদের চাইতেও বেশী জানতে শুরু করেন। ১৮২৮ সালে তিনি École Polytechnique নামক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন। এটা ছিলো গনিতের জন্য ততকালীন ফ্রান্সের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান । এরই মধ্যে তিনি পড়ে ফেলেছেন Adrien Marie Legendre’ এর Éléments de Géométrie, Joseph Louis Lagrangeএর Réflexions sur la résolution algébrique des équations (এটি পরবর্তিতে তাকে ইকুয়েশন থিওরীতে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে), Leçons sur le calcul des fonctions ইত্যাদি । কিন্তু মৌখিক পরিক্ষায় গিয়ে তিনি পরীক্ষকদের কোন প্রশ্নের উত্তরেই সন্তুষ্ট করতে পারলেন না । আসলে তিনি তাদেরকে উত্তর এমন অল্পকথায় ব্যাখ্যা ছাড়া দিয়েছিলেন যে কেউ তা বুঝতে পারে নি । ফলে তিনি École Polytechnique তে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি অপেক্ষাকৃত নিম্ন র্যাংকিং এর বিশ্ববিদ্যালয় l’École préparatoire তে ভর্তি হন সেই বছর। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ গ্যালোয়া তার সমস্ত জিদ যেন ঢেলে দেন গনিতের উপরে । তুমুল উৎসাহে মেতে ওঠেন ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত আর পঞ্চঘাত সমীকরনে । ১৮২৯ সালে তার প্রথম গবেষণা পত্র প্রকাশ হয় Annales de mathematiquesএ continuous fraction এর উপরে । অনেক পরিশ্রম করে দুইটি রিসার্চ পেপার তৈরি করে জমা দেন Academy of Sciences-এ । তখন Academy of Sciences এর প্রধান ছিলেন বিখ্যাত গনিতবিদ কশি (Augustin Louis Cauchy)। তিনি পেপার দুটির নিজেই সুপারিশ করেছিলেন, একই সাথে তিনি গ্যালোয়ার কাছে পেপার দুটি ফেরত পাঠান পুনর্বিন্যাস ও ব্যাখ্যা করে লেখা জন্য। বছর ঘুরতেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গ্যালোয়ার বাবা আত্মহত্যা করেন। পিতাকে সমাধিস্থ করে গ্যালোয়া ফিরে যান প্যারিসে। সেখানে অসমাপ্ত কাজ শেষ করে তার গবেষণাপত্র দুটি জমা দিলেন একাডেমির সেক্রেটারি আরেক খ্যাতিমান ব্যাক্তি স্যার জোসেফ ফুরিয়ারের কাছে। কিন্তু সেবার গ্যালোয়া পুরস্কার পান নি । পুরস্কার ঘোষনার কিছু দিন আগে ফুরিয়ার মারা যান এবং গ্যালোয়া-র পেপার যে জমা হয়েছে এমন কোন ডকুমেন্টের অস্তিত্বই ছিল না । ফলে রাজনৈতিক কারনে গালোয়ার পেপার গায়েব হয়েছে বলে তার সন্দেহ হল । এই সন্দেহ পুরোপুরি বাস্তবে প্রমানিত হল যখন তার পরে ১৮৩০ সালে একাধিক গবেষণা পত্র একাডেমি অফ সায়েন্স ফেরত পাঠালো অযৌক্তিক ও খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে। সে বছর গ্যালোয়া মোট ৩টি গবেষনা পত্র প্রকাশ করেন, যার মধ্যে একটি বিখ্যাত Galois theory-এর ভিত্তি গড়ে দেয়, অন্য দুইটি ছিল আধুনিক উপায়ে সমিকরনের মুল নির্ণয় সম্পর্কিত এবং নাম্বার থিওরি নিয়ে। শেষোক্তটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারন সসীম ক্ষেত্র (finite field) এর ধারণা প্রথম এখানে পাওয়া যায়। সে বছর গ্যালোয়া তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টরকে গালিগালাজ করে একটি প্রতিবেদন লেখেন। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডিরেক্টর ছিলেন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক। সুতরাং গালোয়াকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পর তিনি যেন পুরোই উচ্ছন্নে গেলেন। বছর ঘুরতেই মদ আর সন্ত্রাস তার নিত্যসঙ্গী। কখনও চাকু হাতে সম্রাটকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন খোলা রাস্তায়, তো সাথে সাথেই গ্রেফতার। ছাড়া পেয়ে আবার নিষিদ্ধ ন্যাশনাল গার্ডের পোশাক পরে রাস্তায় বের হলে তার জেল হয়ে যায় । এক মাস পর গ্যালোয়া জেল থেকে ছাড়া পান। আর এরপরই ঘটে সেই ঘটনা যা প্রতিটি পুরুষ জীবনেই ঘটতে বাধ্য। প্রেমের বন্ধনে বাধা পরে গালোয়ার মন। তার প্রণয়িনী হন প্যারিসের বিখ্যাত এক ডাক্তারের মেয়ে স্টাফানি ফেলিসি। কিছুদিন পর তার প্রনয়ের খবর রটে গেলো চতুর্দিকে। প্রয়সী স্টাফানি ফেলিসি আবার বাকদত্তা ছিলো প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে পেশ্চু ডি’হেরবিনভিল-এর। স্টেফানির পাণিপ্রার্থী পুরুষ পেশ্চু এই ঘটনায় প্রবল ক্রোধান্বিত হলো। সেই সময়ে এক নারীমনের দুই দাবীদার পুরুষ হলে তার মিমাংসার পথ ছিলো একটিই – ডুয়েল। বন্দুক দিয়ে লড়াই করো, একজন মরবে আর একজন বাঁচবে। দু’জনের কিছুতেই বেঁচে থাকা চলবে না। যে বেঁচে থাকবে কেবল তারই বাহুলগ্না হবে সেই নারী। তাই অপমানের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে পেশ্চু শুটিং ডুয়েলের চ্যালেঞ্জ দেন গ্যালোয়াকে। এই চ্যালেঞ্জ ফিরিয়ে দেয়া কোন পৌরুষের কাজ ছিলো না সেই জমানায়। তাই প্রেমিকার কাছে নিজের প্রেমের মান রাখতে ডুয়েলের প্রস্তাব গ্রহন করলো গালোয়া। তবে কাঁচা বয়সের গালোয়া বুঝতে পেরেছিলো যে, ডুয়েলে তার জিত হবে না। ডুয়েলের আগের রাতে (১৮৩২ সাল) নিজের মৃত্যু সম্পর্কে গ্যালোয়া এতই নিশ্চিত ছিলেন যে সারারাত জেগে তার থিওরেমগুলো লিখে ফেলেন। তার সে রাতের কাজের মধ্যে দিয়ে আলোর মুখ দেখে আধুনিক গণিতের এক অনন্য শাখা ‘গ্রুপ থিওরি’। সাথে একটি চিঠি লিখেন যে, পরদিন যদি ডুয়েলে তার মৃত্যু হয়, তাহলে যেন তার কাজগুলোকে ইউরোপের বড় বড় গনিতবিদদের কাছে পৌছে দেয়া হয়। পরদিন,৩০মে, ১৮৩২, ডুয়েলে গ্যালোয়াকে নিখুঁত নিশানায় ভুলুন্ঠিত করে পেশ্চু। ৩১মে মাত্র বিশ বৎসর বয়সে মৃত্যু হয় আধুনিক গণিতের জগতের এই অসামান্য প্রতিভা এভারিস্ত গ্যালোয়া-র। কিন্তু মাত্র একরাতে গ্যালোয়া যা লিখছিলেন তার মর্ম উদ্ধার করতে গণিতের তারকা গাউস ও জ্যাকোবি-দের অনেক গলদঘর্ম হতে হয়েছে। গ্যালোয়ার মৃত্যুর ১৪ বছর পর, ১৮৪৬ সালে লিউভিল সেই কাগজগুলো থেকে যে থিওরি উদ্ধার করেন তা তিনি গ্যালোয়ার থিওরি নামে প্রকাশ করেন । তার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ‘গ্যালোয়া থিওরি’ এবং ‘গ্রুপ থিওরি’, যা কিনা Abstract Algebra এর দুটি প্রধান শাখা। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রও জেল-জুলুমও যাকে হত্যা করতে পারেনি, সেই বেপোরোয়া সাহসী তরুণটির মৃত্যুর কারণ হলো স্টেফানির রূপ। যদিনা সেই প্রেম, যদিনা সেই রূপের মোহ, আমরা হয়তোবা উপহার পেতাম আরো অনেক সমীকরণ, আরো অনেক ‘গালোয়ার থিওরী’, আধুনিক গণিতের জগৎ হয়তো আরো অনেক বেশী ঝলমলে হতো!

কিছু কিছু রমণী এতটা রূপবতী না হলে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো। রূপসীর রূপ কি সুখের ঠিকানা না দুঃখের উৎস?
—XXX—

জান্নাত: স্যার।
আমি: কি?
জান্নাত: কাজের বাইরে একটা কথা বলি?
আমি: বলেন।
জান্নাত: আপনার লেখা গল্প ও কবিতাগুলো আমার খুব ভালো লাগে।
অফিসে কাজের টেবিলে বসে ছিলাম আমি। রিফার্বিসড ইকুয়েপমেন্টের বিজনেস সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র এসেছে আমেরিকা থেকে। সেগুলো চেক করছিলাম। আমাদের অফিসে ইন্টার্নি করতে আসা জান্নাতকে সাথে নিয়ে আমি কাগজগুলো দেখছিলাম আর ওকে কিছু ইনফর্মেশন দিচ্ছিলাম। কাগজ থেকে মুখ তুলে এবার ওর দিকে তাকালাম আমি।
আমি: কোথায় পড়লেন আপনি এগুলো?
জান্নাত: জ্বী। ফেসবুকে, ব্লগে।
আমি: আই সি! আপনাকে ওগুলোর খোঁজ কে দিলো?
জান্নাত: জ্বী, অফিসের সবাই-ই তো জানে।
আমি: সবাই জানে?
জান্নাত: স্যার এটা আইসিটি-র যুগ। এখন আর কোন কিছু গোপন থাকেনা। ইন্টারেস্টিং কোন কিছু হলে খুব দ্রুতই ভাইরাল হয়ে যায়। আমাদের জেনারেশনে বিষয়টি আরো প্রকট। আমরা দিনের কিছু সময় থাকি বাস্তব জগতে কিছু সময় থাকি ভার্চুয়াল জগতে। ইদানিং এটা ফিফটি হতে শুরু করেছে।
আমি: ও। হ্যাঁ আমি দেখেছি সবার হাতে হাতেই ট্যাব অথবা চওড়া স্ক্রীনের মোবাইল। কিছুক্ষণ পরপর ঐদিকে তাকায়।
জান্নাত: স্যার, আপনার ঐ প্রেমের গল্পটি কিন্তু খুব সুন্দর হয়েছে।
আমি: কোনটি?
জান্নাত: ঐ যে, একটা মালেশিয়ান মেয়েকে নিয়ে লেখা।
আমি: ও।
জান্নাত: স্যার একটা প্রশ্ন করি?
আমি: কি প্রশ্ন?
জান্নাত: প্রশ্নটা করতে খুব ভয় লাগছে। আপনি বয়সে আমার চাইতে অনেক বড়, তারপর আবার আমার বস।
আমি: কথা তোলার সাহস যখন করে ফেলেছেন, তখন প্রশ্নটা করেই ফেলেন।
আমি মেয়েটির দিকে আরেকটু মনযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলাম। আগেই দেখেছি মেয়েটি হিজাবী, এবং খুব নম্র-ভদ্র, পারিবারিক পরিচয়ও ভালো। মেয়েটি অশালীন কিছু বলবে এমন মনে করিনা। তারপরেও ও সাহস করেছে প্রেমের গল্প নিয়ে তার বসকে প্রশ্ন করার। বিষয়টা মনে মনে বোঝার চেষ্টা করলাম। এমন হতে পারে এই জেনারেশটা এমন, তারা বড়দের সাথে অত পার্থক্য রাখেনা। এমনও হতে পারে যে কাঁচা বয়সের মেয়ে, প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে কৌতুহল চেপে রাখতে পারছে না। হিজাবী হোক আর মর্ডান হোক, মেয়ে তো!
আমি: জান্নাত। এটা অফিস, এখানে কিছু ডেকোরাম মেনে চলতে হয়।
জান্নাত: স্যার, আমি কি তাহলে প্রশ্নটা করবো না?
আমার মনে হলো মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আমি ওকে চুপসে দিয়েছি। ও তো এখনো ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, ওর মনে তো অনেক কৌতুহল থাকবে। ওর কৌতুহলকে থামিয়ে দেয়া উচিৎ নয়। আমি নিজেই তো বিদেশে থাকতে জীবনের একটা সময় অধ্যাপনা করেছি। আমার বিষয়টা কন্সিডার করা উচিৎ।
আমি: ওকে আপনি প্রশ্ন করুন, তবে একটা শর্ত।
জান্নাত: কি শর্ত স্যার?
আমি: আপনি আমাদের আলোচনার কথা অফিসের কাউকে বলবেন না।
জান্নাত: ওকে স্যার (এবার ওর চোখে হাসি দেখতে পেলাম)। আমি জানতে চাচ্ছিলাম, এইগুলো কি আপনার ব্যাক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা?
এবার আমি হেসে ফেললাম।
আমি: আমি খ্যাতিমান কোন লেখক নই। আধুনিক যুগের ব্লগ ফেসবুকের সুযোগ নিয়ে মনের আনন্দে কিছু লিখি।
জান্নাত: জ্বী। কিন্তু এত জীবন্ত যেন আপনার জীবনেরই ঘটনা।
আমি: বিষয়টা হলো। যখন লিখি সেখানে কল্পনা থাকে আবার বাস্তবতাও থাকে। আপনার ‘ইমপ্রেশনিজম’ সম্পর্কে ধারনা আছে?
জান্নাত: ‘ইমপ্রেশনিজম’? এটা কি স্যার?
আমি: ওয়েল। এই সম্পর্কে তাহলে কিছু বলি। (রিভলভিং চেয়ারটায় একটু হেলান দিয়ে, তেরছা ভঙ্গিতে বসে) আচ্ছা কাজ তো অনেক হলো, একটা বিরতি নেয়া যাক। আমরা একটু কফি খাই আর আলাপ করি।
পিয়নকে বলতে দু’কাপ ধুমায়িত কফি আর কিছু বিস্কিট চলে এলো। এ’ যুগের কর্পোরেট বসদের কাছেও ছোট ছোট ‘আলাদিনের প্রদীপ’ থাকে সেখানে ঘষা দিলে অনেক কিছু পাওয়া যায়।

আমি: ইমপ্রেশনিজ্ম এর একটা অপ্রচলিত বাংলা নাম আছে ‘অন্তর্মুদ্রাবাদ’। বাই দ্যা বাই। আপনি ইজম শব্দের অর্থ বোঝেন?
জান্নাত: না স্যার।
আমি: না মানে? ফিউডালিজম, ক্যাপিটালিজম, সোসালিজম, কম্যুনিজম ইত্যাদি শব্দ শোনেননি?
আমার দিকে অনেকটাই করুন চোখে তাকালো জান্নাত। আমি অনেকটাই অবাক হলাম। আমাদের সময় রাজনৈতিক আলোচনা ছিলো সরগরম। সেই আলোচনায় ঐ শব্দগুলোতো ছিলো নিত্যসঙ্গী। তবে কি এ যুগের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতি নিয়ে অত মাথা ঘামায় না?
আমি: যাহোক। ইজম মানে ‘মতবাদ’। এরকম একটা ইজম হলো ইমপ্রেশনিজ্ম। তবে এটা কোন রাজনৈতিক মতবাদ নয়। ঊনবিংশ শতকে শুরু হওয়া একটি চিত্রকলা আন্দোলন। জানেনতো আজ যেমন হাতে হাতে সেলফী, একসময় মানে এই আমার ছোটবেলাতেই, ক্যামেরা ছিলো অতি দামী ও রেয়ার একটা জিনিস।
জান্নাত: জ্বী, আম্মু বলেছে। তাছাড়া সেই ক্যামেরাতেও মাত্র ছত্রিশ রিলের ফিল্ম থাকতো তাই ছবি তোলাও হতো মেপে মেপে।
আমি: রাইট। আর তারও আগে তো ক্যামেরাই ছিলো না।
জান্নাত: তা তো অবশ্যই।
আমি: কিন্তু সময়কে মানুষ সবসময়ই ধরে রাখতে চাইতো। তা সময়তো আর ধরে রাখা যায়না। তাই সেই সময়টাকে ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চাইতো যেন ভবিষ্যতে দাঁড়িয়ে অতীতে তাকানো যায়।
জান্নাত: জ্বী, আমি বুঝতে পেরেছি। মানে তখন ছবি এঁকে রাখতো।
আমি: রাইট। কিন্তু তারা চাইতো ছবিটা যেন অবিকল বাস্তবের মত হয়। তো একেবারে বাস্তবের মতো তো আর হয়না। তাই যতটুকু সম্ভব। এই কারণে চিত্রকরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো কার আঁকা ছবিতে কে কতটুকু ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে যে, ছবিটা দেখলে মনে হবে এটা বাস্তব। দরেন একটা নদীর তীরে একটা বন, সেই বনে দু’টি পাখী। চিত্রকররা ঐসব ছবি এত নিঁখুত করার চেষ্টা করতো যেন দেখতে একেবারে রিয়েল মনে হয়।

জান্নাত: জ্বী। আমি মিউজিয়ামে এইরকম কিছু ছবি দেখেছি। আর ইন্টারনেটেও দেখেছি। একেবারে রিয়েলের মত লাগে। মনে হয় যেন টিভি স্ক্রীনে দৃশ্য দেখছি।
আমি: রাইট। কিন্তু মানুষের একটা স্বভাব আছে, সেটা হলো বোরিং বোধ করা। মানে কোন কিছু করতে করতে বা দেখতে দেখতে একঘেয়ে হয়ে যাওয়া।
জান্নাত: জ্বী, এটা আছে।
আমি: তারপর দেখা যায়, একঘেয়ে হয়ে গেলে একটা ভালো জিনিসও আর ভালো লাগেনা।
জান্নাত: আমি একসময় নারিকেলের নাড়ু খুব পছন্দ করতাম। একবার একসাথে অনেক বেশী খেলাম, এত বেশী খেলাম যে ওটার উপর থেকে আমার স্বাদ উঠে গেলো। এখন আর আমার কাছে নারিকেলের নাড়ু আর ভালো লাগেনা।
আমি: হা হা হা। ভালো উদাহরণ দিয়েছেন। একটা বাংলা গান আছে, ‘যদি সারাক্ষণ থাকতাম সামনেই, আমি দেখতাম আর আমার দাম নেই। জেনো মাঝে মাঝে আড়ালে না হারালে, ঐ মন কি অমন মনে রাখতো?’
গানের কলিগুলো শুনে আমার দিকে কেমন চোখে যেন তাকালো জান্নাত।
আমি: হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। তা ঐ ফটোগ্রাফী টাইপ ছবি দেখে দেখে মানুষের মন একসময় ক্লান্ত হয়ে এলো, ওটা একঘেয়ে হয়ে গেলো। মানুষের মন তাই নতুন কিছু চাইছিলো।
জান্নাত: চিত্রকর্মে বাস্তবের চাইতে আর নতুন কি হতে পারে?
আমি: সেটাই বলছি। ১৮৬০-এর দশকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কিছু তরুণ চিত্রশিল্পী তাদের আঁকা ছবি প্রদর্শনীর জন্য নিজেরাই ব্যবস্থা করেছিল। সেই প্রদর্শনীর একটি তৈলরঙ ছবি দেখে সবাই মুখ টিপে টিপে হাসছিলো। ক্লোদ মনে (Claude Monet) নামে একজন শিল্পি ওটা এঁকেছিলেন। একটি নদীর বুকে কিছু জলযান আর তার পটভূমিতে সূর্যাস্ত হচ্ছে। বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই, মনে হচ্ছে রঙ সব লেপ্টে লেপ্টে দেয়া হয়েছে। আঁচরগুলোও অসাবধানী, এবরো-থেবরো।
জান্নাত: ঢাকার এক্সিবিশনগুলোতে তো এরকরম ছবি দেখা যায়, এদিক ওদিক রঙ লেপ্টে দেয়া, সবাই মর্ডান আর্ট বলে।
আমি: ওরকমই। তবে ওভাবে উড়িয়ে দেয়ার বিষয় নয়। বিষয়টা অনেক গভীর।
জান্নাত: (বিনীত হয়ে) আমি তো অত বুঝিনা। আপনি বুঝিয়ে বলুন।
আমি: ক্লোদ মনে-র আঁকা ঐ ছিত্রকর্মটির নাম ছিলো ইমপ্রেসিওঁ, সোলেই লেভঁ (Impression, soleil levant)। চিত্র সমালোচক লুই ল্যরোয়া এই ছবির নেতিবাচক সমালোচনা করেছিলেন এবং ছবি আঁকার এই ধরণটিকে ব্যাঙ্গ করে “ইমপ্রেসিওঁ” নামে ডেকেছিলেন। Le Charivari পতিক্রায় শব্দটি প্রকাশিত হওয়ার পর সবাই ধরণটিকে এ নামেই ডাকতে শুরু করে। পরবর্তিতে এটি একটি আন্দোলনে রূপ নেয় এবং তারই নাম হয় ইমপ্রেশনিজ্ম’।
জান্নাত: কিন্তু ধরনতি কি ছিলো। উনাদের লজিকটাই বা কি ছিলো?
আমি: ইমপ্রেশনিজ্মের মূল কথা হল বাস্তবতার নিরিখেই ছবি আঁকতে হবে এমন কোন কথা নেই। কারণ বাস্তব প্রাকৃতিক দৃশ্য বা এ ধরনের অনেক কিছু নিয়েই ছবি আঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব দৃশ্য শিল্পীর মনে যে অণুরণন জাগায় তাকে তার নিজের কল্পনায় ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমেও ছবি আঁকা যেতে পারে। এভাবেই সম্পূর্ণ ভিন্নধর্ম ছবি আঁকা শুরু করেন প্যারিসের গুটিকতক তরুণ শিল্পী।
জান্নাত: এটাকে কি আমরা বাংলা সাহিত্যের ত্রিশোত্তর কবিদের আন্দোলনের সাথে তুলনা করতে পারি? যারা রবীন্দ্রনাথের প্রভাব মুক্ত হয়ে ভিন্নধর্মী কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন?
আমি: বাহ! সাহিত্যের ব্যাপারে আপনি তো ভালোই জ্ঞান রাখেন।
জান্নাত: (সলাজ হেসে) ইউনিভার্সিটিতে আমাদের একজন স্যার আছে, তিনি ম্যাথমেটিক্সের পাশাপাশি আমাদেরকে সাহিত্য, ফিলোসফি, রাজনীতি অনেক কিছু নিয়ে কথা বলেন ও জ্ঞান দেন।
আমি: ভালো তো। এ যুগেও এরকম শিক্ষক আছে?
জান্নাত: (একটু মন খারাপ করে) কেন থাকবে না? আমাদের স্যার অনেক কিছু জানেন।
আমি: ওয়েল। আমি যা বলছিলাম, তাদের ছবির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল উজ্জ্বলভাবে ব্রাশের ব্যবহার, উন্মুক্ত কম্পোজিশন, আলো এবং এর পরিবর্তনশীল মানের উপর গুরুত্ব প্রয়োগ, খুব সাধারণ বিষয়বস্তু, মানুষের অবধারণ ও অভিজ্ঞতা ফুটিয়ে তোলার জন্য চলনের ব্যবহার এবং ভিন্নরকম ভিজ্যুয়াল দৃষ্টিকোণ।
জান্নাত: এভাবে সম্পুর্ণ নতুন একটা শাখা তৈরী হলো তাইনা?
আমি: ঠিক তাই। চিত্রশিল্পে ইমপ্রেশনিজমের উত্থান ঘটার পর শিল্পের অন্যান্য শাখায় একই ধরনের আন্দোলনের সূচনা ঘটে। এর মধ্যে আছে ইম্প্রেশনিস্ট সঙ্গীত এবং ইমপ্রেশনিস্ট সাহিত্য। শুধু ঊনবিংশ শতকের সেই সময়ের ছবিগুলোই নয়, বর্তমানে যেকোন সময়ে ঐ ভঙ্গিতে আঁকা ছবিকেই ইমপ্রেশনিজমের কাতারে ফেলা হয়।
জান্নাত: বুঝলাম। কিন্তু আপনি আপনার গল্পের কথা বলতে গিয়ে ইমপ্রেশনিজমের কথা টানলেন কেন?
আমি: সেটাই। আপনি জানতে চেয়েছিলেন যে, আমার লেখা গল্পগুলো আমার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া কিনা? তাইতো?
জান্নাত: জ্বী।
আমি: আমার লেখা গল্পগুলো ফটোগ্রাফী নয়, ওগুলো ইমপ্রেশনিস্ট তৈলচিত্র। এবার বুঝতে পেরেছেন?
জান্নাত: (আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে) জ্বী, বুঝলাম। কিছুটা বাস্তবের রঙ, কিছুটা কল্পনার রঙ আপনার তুলিতে তুলে আপনি ক্যানভাসে গল্পের ছবি আঁকেন। তাইতো?

আমার তৃষ্ণার্ত হৃৎ খোঁজে ফুলেল বাসর অলৌকিক কুজ্ঝটিকায়,
বৈরী বসন্তের অস্থির অনিল তল্লাশে মাতাল মহুয়ার ঘ্রান।
কতটি উষ্ণ বসন্ত, কতটি হিমেল হেমন্ত পিছু ফেলে,
প্রতীক্ষায় গিয়েছে কেটে নিরন্তর,
প্রিয়তমা, তুমি কি মেটাবে তৃষ্ণা এই তৃষিতের?
নিশিথের মায়াবী অম্বরে,
যেমন তাঁড়িয়ে অশুভ আঁধার ঝরায় জোৎস্না চন্দ্রিমার,
ভুলিয়া দূরত্বের অন্তর, খুলিয়া মনের দুয়ার।
——————— রমিত আজাদ

(চলবে)

তারিখ: ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৬
সময়: রাত ৮ টা ৪৫ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.