প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৯

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ৯
—————————– ড. রমিত আজাদ

আমি: কাজী নজরুল ইসলাম এত সুন্দর সুন্দর গান কি করে লিখতেন?
তানিয়া: তুমি তো নজরুল ভক্ত!
আমি: তুমি নও?
তানিয়া: আমিও। তোমার তো মনে থাকার কথা।
আমি: হ্যাঁ মনে আছে। একসময় তুমি আমাকে নজরুল গীতি শোনাতে।
তানিয়া: কি কি গান শোনাতাম মনে আছে?
এবার আমি চুপ মেরে গেলাম। আমার অবশ্যই মনে আছে, কিন্তু ওকে সেই গানের লাইন বলা কি ঠিক হবে? কাটা ঘাঁয়ে নুনের ছিটা হবে!
‘আমায় নহে গো, ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান।
বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান?
চাঁদেরে কে চায় জ্যোছনা সবাই যাচে,
গীত শেষে বীণা পড়ে থাকে ধূলি মাঝে।

তুমি বুঝিবে না, বুঝিবে না,
আলো দিতে কত পোড়ে কত প্রদীপের প্রাণ।
শুধু ভালোবাসো মোর গান।‘

আমার জীবনে অনেক বনের পাখীই এসেছিলো। আমি সত্যিই তাদের চিনে রাখিনি। চিনে রাখার প্রয়োজন মনে করিনি, তৃষ্ণা মেটার পর তাদেরকে আর প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু তানিয়া তো আমার জীবনে নাম পরিচয়হীন কোন বনের পাখী ছিলো না। তানিয়া কি সেটা জানে বা বোঝে? প্যারাসাইকোলজি নিয়ে পড়তে গিয়ে পড়েছিলাম যে, মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স আছে, ঐ সেন্স থেকে তারা অনেক কিছুই জানতে ও বুঝতে পারে।

তানিয়া: ফোনটা রাখি। আমি ঘুমুতে যাবো।
আজ কথা দীর্ঘায়িত হলো না। বোধহয় আমার মত ওরও হঠাৎ খারাপ লেগে উঠেছে। আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
আমি: ওকে। আরেকদিন কথা হবে তা হলে।
তানিয়া: তুমি এখন কি করবে?
আমি: আমিও ঘুমুবো। তবে তার আগে একটা গান শুনবো।
তানিয়া: কোন গানটা?
আমি একটু বিব্রত হলাম। ইদানিং একটা গান আমার খুব ভালো লাগতে শুরু করেছে। নজরুল গীতি, মোটামুটি অপ্রচলিত। ইউটিউবে হঠাৎ করে পেয়ে গিয়েছি। গানটি শোনার পর আমার মন ছেয়ে গেলো। মনে হলো যেন অবিকল আমার মনের কথা বলছে। তানিয়াকে কি গানটার কথা বলা ঠিক হবে?
তানিয়া: কই বললে না?
আমি: একটা নজরুল গীতি।
তানিয়া: লিংকটা দাও একসাথে শুনি।
আমি একটু ইতস্তত করে, লিংকটা দিলাম।
চাঁদেরও মতো নীরবে এসো প্রিয় নিশিথ রাতে,
ঘুম হয়ে পরশও দিয়ো হে প্রিয় নয়ন পাতে।
এসো প্রিয় নিশিথ রাতে।
তব তরে বাহিরও দুয়ারে মম,
খুলিবে না আর এই জনমে প্রিয়তম।
মনেরও দুয়ার খুলি গোপনে এসো,
বিজড়িত রহিয়ো স্মৃতিরও সাথে।

—XXX—

তুষার: বল নজরুলের মত এত সুন্দর গান কেউ লিখতে পেরেছে বল? আহা কি কথা কি সুর! ঐ যে গানটা ‘আমায় নহে গো ভালোবাসো শুধু, ভালোবাসো মোর গান।
আমার মনে স্ট্রাইক করলো। মাত্র গতরাতেই এই গানটা নিয়ে কথা হচ্ছিলো। আজ সকালে তুষার আবার এই গানটার কথাই তুললো। এটা কি কো-ইনসিডেন্স না কি অদৃশ্য জগৎ থেকে আমার জন্য পাঠানো একটা পানিশমেন্ট?
তুষার: গানের অন্তরাটা দেখ
‘যে কাটা লতার আখিঁজল ফুল হয়ে উঠে ফুটে
ফুল নিয়ে তার দিয়েছো কি কিছু শূন্য পত্র পুটে?
সবাই তৃষ্ণা মেটায় নদীরও জলে
কি তৃষা জাগে সে নদীরও হিয়া তলে।…
বেদনার মহাসাগরেরও কাছে…
করো করো সন্ধান,
ভালোবাসো মোর গান।‘

……………..। আহা!
তুষার: আচ্ছা, কাজী নজরুল ইসলাম যে এত সুন্দর সুন্দর প্রেমের গান লিখতেন। নিজে প্রেম না করলে তো আর সেই অনুভূতি হয়না, আর অনুভূতি না থাকলে এত আবেগের গানও লেখা সম্ভব নয়। উনার প্রেমের ব্যাপারে কিছু কি জানিস?

আমি: উনার প্রথম প্রেমটার ব্যাপারে কিছু জানি।
তুষার: উনার প্রেম কি একটাই ছিলো।
আমি: উনার তো পরে আরেকবার বিয়ে হয়েছিলো প্রমিলা দেবীর সাথে। সেই ঘরেরই তো ছেলে অনিরূদ্ধ আর সব্যসাচী।
তুষার: ও হ্যাঁ, তাইতো। উনারই তো নাতনী খিলখিল কাজী আর মিষ্টি কাজী। তা এই দুটোই? আ কি আরো ছিলো।
আমি: ফজিলাতুন্নেসা নামে আরেকজনার কথা শোনা যায়।
তুষার: ওরেব্বাস! এত্তোগুলা!
আমি: বা বা বা! এত্তোগুলা! নিজে কত্তগুলা প্রেম করেছ, ভুলে গেছো?
তুষার: (আমতা আমতা করে) না মানে, হ্যাঁ, আমিওতো কত্তগুলা।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে প্রতিশোধমূলক ভঙ্গিতে।
তুষার: ওহ! আমার দোষ ধরছো! আর নিজে কত্তগুলা প্রেম করেছ, সেই হিসাবে রাখতে পেরেছে? না কি এখন হিসাবই হারিয়ে ফেলেছ?
আমি: দোস্ত, তুই আমিতো সাধারণ মানুষ। মহামানবদের কথা ভাবোতো? জুলিয়াস সিজারের বৌ ছিলো চারজন তাদের মধ্যে একজন ইতিহাসের সেই বিখ্যাত সুন্দরী ক্লিওপেট্রা। এছাড়া আরো দুজন প্রেমিকার কথাও শোনা যায়, যাদের একজনার নাম সার্ভেলিয়া (Servilia)।
তুষার: সার্ভেলিয়া-র নামটা বিশেষভাবে উল্লেখ করলি কেন?
আমি: ব্রুটাস-এর নাম জানিস?
তুষার: জানি। সিজার-এর মূল হত্যাকারী। সিনেটর-রা একের পর এক সিজার-কে ছুড়িকাঘাত করে যাচ্ছিলো। এক পর্যায়ে সিনেটর ব্রুটাস যখন উম্মুক্ত ছুঁড়ি সিজার-এর বুকে বিধিয়ে দিয়েছিলো, সিজার বিস্মিত হয়ে বলেছিলো, “ইউ ঠু ব্রুটাস!’
আমি: রাইট। এই ব্রুটাস-এর মাতাই ছিলো সার্ভেলিয়া।
তুষার আমার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বললো।
তুষার: তুই কি বলতে চাস?
আমি: ব্রুটাস আসলে সিজারেরই ছেলে ছিলো।
তুষার: (চোখ কপালে তুলে) বলিস কি? নিজ ছেলের হাতে মৃত্যু!
আমি: হুম বন্ধু।
তুষার: বিষয়টা জানা ছিলো না। ভেরি স্যাড!
আমি: ইহার নাম ক্ষমতা ও রাজনীতি। যুগে যুগে এইই হয়ে আসছে।
তুষার: আসলে সম্রাট শাসক এরা তো ঐ কিসিমেরই হয়। নেপোলিয়নেরও বৌ ও প্রেমিকা ছিলো। কিন্তু মহাপুরুষরা?
আমি: মহাপুরুষরাও তাই। মহাজ্ঞানী সক্রেটিসের ছিলো দুই বৌ জানথিপি আর মিরতো (Myrto)। এরিস্টটলের ছিলো দুই বৌ।
তুষার: পাশ্চাত্যে বোধহয় বরাবরই এমন ছিলো। আমাদের প্রাচ্যে?
আমি: প্রাচ্যের মহামানব মহাজ্ঞানী অতীশ দীপঙ্করের ছিলো পাঁচজন স্ত্রী।
তুষার: থাক আর বলতে হবেনা। এমন উদাহরণ অগনিত। আমি বুঝতে পেরেছি।
আমি: আসলে, এই পৃথিবীতে এমন পুরুষ খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে যে পলিগেমিস্ট নয়। সেটার ইনটেনসিটি-র কমবেশী হয় এই আরকি!

তুষার: ওয়েল এখন কাজী নজরুল ইসলামের প্রেমের কথা বল।
আমি: প্রথম প্রেমটার ব্যাপারে একবার পড়েছিলাম।
তুষার: বল তাহলে।
আমি: উনার প্রথম প্রেম ছিলেন নার্গিস।
তুষার: আমাদের কুমিল্লা-র মেয়ে না?
আমি: রাইট।
তুষার: উনি তো কোলকাতায় থাকতেন। সেখান থেকে এত দূরে কুমিল্লায় প্রেম!
আমি: সেটাই কাহিনী। একটা কথা আছে না, ‘মরণ থাকে যেখানে, নাও ভাড়া করে যায় সেখানে।’ তেমনি ‘প্রেম থাকে যেখানে, নাও ভাড়া করে যায় সেখানে।’
তুষার: হা হা হা। রাইট আমাদের কোকিলকন্ঠি গায়িকা শত তরুণের স্বপ্ন রুনা লায়লাও তো জাভেদ কাইজারের প্রেমে পড়েছিলেন সুদুর আমেরিকায় গিয়ে। যাহোক এখন নজরুল নার্গিস প্রেম-এর কথা বল।
আমি: উনার আসল নামটি ছিলো সৈয়দা আসার খানম, নার্গিস নামটি নজরুলেরই দেয়া, ফার্সি ভাষায় যার অর্থ গুল্ম একটি ফুলের নামও নার্গিস।

তিনি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে ছিলেন। তার মামা আলী আকবর খানের সাথে নজরুলে পরিচয় কলকাতায় ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে। আলী আকবর খান সম্রাট বাবরের জীবনী নিয়ে একটা নাটক লিখেছিলেন এবং টুকটাক পুস্তিকা লিখতেন ও প্রকাশ করতেন। সেই সব পুস্তিকায় আলী আকবর খান রচিত কিছু কবিতাও থাকত। তার সেসব হাস্যকর কবিতা দেখে নজরুল নিজে “লিচু চোর” কবিতাটি আলী আকবর খানকে লিখে দেন। আলী আকবর খান বুঝে গেলেন, ইনিই তিনি যাকে দিয়ে তার কাজ হবে। নজরুলকে হাতে রাখলেই আলী আকবরের প্রকাশনা ব্যবসা জমজমাট হবে। নজরুল-এর সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ানোর জন্য তিনি নজরুলকে নিজ বাড়ীতে দাও্য়াত দিলেন। কোলকাতা থেকে কুমিল্লা সেই সময়ের হিসাবে বহু বহু দূরের দেশ। কিন্তু ভ্রমণবিলাসী নজরুল এতে না দমে বরং আগ্রহীই হলেন অনেক বেশী। তাছাড়া নজরুল তখন সবে নবযুগ পত্রিকার কাজে ইস্তফা দিয়েছেন। হাতে অখণ্ড অবসর। সহজেই তিনি রাজি হয়েছিলেন। ১৯২১ সালের মার্চে নজরুল আলী আকবর খানের সাথে নিজ বন্ধুদের কিছু না জানিয়েই কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ছাড়ার অনেককাল পর এটাই ছিল নজরুলের পুনরায় পূর্ববঙ্গ যাত্রা। যাবার পথে তিনি “নিরুদ্দেশ যাত্রা” কবিতাটি লেখেন। কলকাতা থেকে রেলে চড়ে চট্টগ্রাম মেইলে কুমিল্লা এসেছিলেন তাঁরা। পল্টনফেরত বিশ্বযোদ্ধা নজরুল ইতিমধ্যেই কবি হিসাবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। তাই দৌলতপুরে উনাকে সবাই বরণ করে নিয়েছিলো আপন ছেলের মত। নজরুলকে উষ্ণ অভ্যর্থনার জন্য তোরণও নির্মান করা হয়েছিলো। প্রতিভাবান উচ্ছল চঞ্চল নজরুল তাঁর কবিতা-গান-গল্প দিয়ে অতি দ্রুতই ছেলে-বুড়ো সবার মন জয় করে নেন। আলী আকবর খানের বোন আসমাতুন্নেসার বিয়ে হয়েছিল খাঁ বাড়ির পাশেই। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থাকায় আসমাতুন্নেসা তার ভাইয়ের বাড়িতে তেমন সমাদর পেতেন না। আসমাতুন্নেসার স্বামী মুন্শী আবদুল খালেক একটি মেয়ে রেখেই মৃত্যুবরণ করেন। সেই মেয়েটিই আমাদের আলোচ্য সৈয়দা আসার খানম নার্গিস।

আলী আকবর খান চেয়েছিলেন বাড়ীর কোন একটি মেয়ের সাথে নজরুলের বিয়ে দিয়ে তাঁকে স্থায়ী বাধনে বাঁধতে। উদ্দেশ্য নজরুলের লেখা বইগুলো প্রকাশ করে তিনি ধনী হতে পারবেন। বাড়ীর কয়েকটি মেয়েকে দেখিয়েছিলেনও নজরুলকে। কিন্তু তাদের মধ্যে নজরুল খুঁজে পাননি তাঁর মনের রাণীকে। এর মধ্যে ঐ বাড়ীতে একটি বিয়ের সাঁনাই বেজে উঠলো। আলী আকবর খান-এর বড় ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে। সেই বিয়েতে আসলেন ভাগনি সৈয়দা আসার খানম। বিয়ের আসরে তিনি গানও গাইলেন। রূপবতি ষোড়শী আসার খানম-এর কন্ঠে সুরের মূর্ছনায় নজরুল মুগ্ধ হলেন।

সেই রাতে ভরা পূর্ণিমার উথাল-পাথাল জ্যোৎস্নায় পুকুর পারে বাঁশি হাতে ঝাঁকড়া চুলের বাবরী দোলানো নজরুল-কে দেখে নার্গিসও বাধা পড়ে গেলেন কঠিন প্রেমের বাঁধনে। আমরা জানি নজরুলের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, ইত্যাদি, অথচ নার্গিসের সাথে কবির আলোচনার সূত্রপাত কবির বাঁশি বাজানো নিয়ে। দুই তরুণ-তরুণী-র পূর্বরাগ শুরু হয়েছিলো এইভাবে,
“গত রাত্রে আপনি কি বাঁশি বাজিয়েছিলেন? আমি শুনেছি।” নজরুলের সুহূদ ও অভিভাবক কমরেড মুজফ্ফর আহমদের মতে, ‘এইভাবে হলো তাঁদের পরিচয়ের সূত্রপাত’। সেই পরিচয় প্রেমে গড়াল। সৈয়দা আসার খানমের ডাক নাম ছিল দুবি বা দুবরাজ। নজরুল তাঁর নাম পাল্টে রাখলেন ‘নার্গিস’। একদিন বলেছিলেন, ‘এমন ফুলের মতো যার সৌন্দর্য, তার এই নাম কে রেখেছে? আজ থেকে তোমার নাম নার্গিস।’ সেই থেকে নার্গিস নামটা স্থায়ী হয়ে গেল আসার খানমের জীবনে। আর প্রেম ও বিরহে এই নাম অমর হয়ে রইল নজরুলের গানে ও কবিতায়।

তুষার: বুঝলাম। দুজনেরই তখন কাঁচা বয়স। নজরুলের বাইশ আর নার্গিসের ষোল। দুজন দুজনার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়াটাই স্বাভাবিক। তা এর পরিনতি কি হয়েছিলো?
আমি: পরিনতি মিলনাত্মক হয়নি বিরহাত্মখ হয়েছিলো।
তুষার: প্রেমের পরিনতি তো ঐ দুটোই, হয় মিলন নয়, বিচ্ছেদ। ফুটবল খেলার মত ড্র তো হয়না কখনো।
আমি: হা হা হা। ভালৈ বলেছিস। আমার জীবনে প্রথম স্টেডিয়ামে গিয়ে ফুটবল খেলা যেটা দেখেছিলাম সেটা ছিলো আবাহনী-মোহামেডানের খেলা। ছোট্ট আমি, গিয়েছিলাম আমার চাচার হাত ধরে। উনি ছিলেন মোহামেডানের সাপোর্টার, আর আমি কিছু না বুঝেই আবাহনীর সাপোর্টার। তারপর তুমুল উত্তজনাময় খেলাটি শেষ হয়েছিলো ড্র দিয়ে। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন। না চাচা, না আমি কেউই হারলো না, কেউই জিতলো না।
তুষার: হা হা। এখন নজরুল-নার্গিসের বিষয়টি বল।
আমি: প্রেম গড়িয়েছিল পরিণয় পর্যন্ত। শোনা যায়, বিয়ের ব্যাপারে নজরুলেরই তাড়া ছিল বেশি। তাঁর পীড়াপীড়িতেই ১৯২১ সালের ১৭ জুন শুক্রবার রাতে বিয়ের তারিখ ধার্য হয়। বিয়ে উপলক্ষে খাঁ-বাড়িতে হয়েছিল বিশাল উৎসব। বিয়েতে স্থানীয় জমিদারসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এসেছিলেন। বিয়ের দিনই কী এক কারণে নজরুলের সঙ্গে মতান্তর হয় আলী আকবরের। অনেকের ধারণা, বিয়ের দেনমোহর ২৫ হাজার টাকা ধার্য করায় বিরোধের সৃষ্টি, আবার অনেকের মতে, কাবিননামায় স্থায়ীভাবে কুমিল্লায় বসবাস করতে হবে, এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল বলেই ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন নজরুল, বাঁধনহীন নজরুল ঐ শর্ত মানতে রাজী হননি। ক্ষুব্ধ নজরুল বিয়ের রাত শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিয়েছিলেন কুমিল্লা থেকে। ক্রন্দনরতা নববধূকে বলে এসেছিলেন, শ্রাবণ মাসে পরিবারের লোকজন নিয়ে এসে তুলে নিয়ে যাবেন তাঁকে। এরপর বারবার শ্রাবণ ফিরে এসেছে, কিন্তু নার্গিসের কাছে ‘সে’ ফিরে আসেনি।
তুষার: (চোখ কপালে তুলে) বলিস কি? বিয়ের পরই চলে গেলেন? আর এলেন না। নার্গিস কি উনার জন্য অপেক্ষা করেননি?
আমি: অবশ্যই করেছেন। নজরুলের লেখা একটি গান আছে, ‘শাওন আসিল ফিরে, সে ফিরে এল না বরষা ফুরায়ে গেল, আশা তবু গেল না। ধানী রং ঘাঘরীর মেঘ রং ওড়না পড়িতে আমারে মাগো অনুরোধ কোরোনা।’ খুব সম্ভবত এই ঘটনাটি নিয়েই ঐ গানটি লেখা।
তুষার: প্রিয়ার মনে আঘাতও দিলেন, আবার গানও লিখলেন!
আমি: প্রেম বিষয়টাই বোধহয় এমন রহস্যময়। শুধু ঐ একটি গান নয়, কবি তার ছায়ানট; পূবের হাওয়া; চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে রচনা করেন। ছায়ানটের মোট ৫০ টি কবিতার মধ্যে “বেদনা অভিমান’; “অবেলায়”; “হার মানা হার”; “অনাদৃতা”; “হারামনি”; মানস বধু; বিদায় বেলায়; পাপড়ি খেলা; ও বিধূর পথিক সহ মোট নয়টি কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে লেখেন।
তুষার: তারপর নজরুলের জীবনে কি হলো সেটা তো আমরা জানিই। কিন্তু নার্গিসের জীবনে কি ঘটেছিলো?
আমি: মাত্র দুই মাসের প্রেম ও এক দিনের পরিণয়ের সুখ অথবা দুখ স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘ সতের বছরের অসহনীয় অপেক্ষার অনেক বিনিদ্র রাত কেটেছে নার্গিসের।
তুষার: জানি সেসময় একজন নারীর পক্ষে, দূরদেশের একজন পুরুষের সাথে যোগাযোগ করা খুবই কঠিন ছিলো। কিন্তু তারপরেও মন জানতে চায় যে, নার্গিস কি কখনো সেই চেষ্টা করেছিলেন?
আমি: হ্যাঁ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে নজরুলকে নার্গিস একটা চিঠি লেখেন। চিঠি প্রাপ্তির সময় সেখানে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। নজরুল তাকেই চিঠি পড়তে বলেন। চিঠি পড়া শেষে শৈলজানন্দ নজরুলকে উত্তর লিখতে বলেন। নজরুল উত্তরে একটি গান লিখে দেন।
‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।’
তুষার: এই গানটি খুব কষ্টের রে!
আমি: তারপর একদিন শোকের তীব্রতা কমে এলে, ১৭ বছর পর ১৯৩৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিয়ে হয় তাঁর।
তুষার: ওয়েট। নার্গিস-নজরুলের বিয়ে হয়েছিলো। নজরুল নার্গিসকে ছেড়ে চলে যায় কিন্তু সেই বিয়ে তো ভাঙেনি, তাহলে নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়ে হয় কিভাবে?
আমি: যতদূর জানি, নজরুলের সাথে নার্গিসের আর একবার দেখা হয়েছিলো দীর্ঘ পনের বছর পরে। তখন তাদের আনুষ্ঠানিক বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।
তুষার: ও। এখন ক্লিয়ার। তারপর?
আমি: সেই বিয়ের সংবাদ নজরুলের কানে পৌঁছায়, তখন তিনি ‘পথ চলিতে যদি চকিতে কভু দেখা হয় পরানপ্রিয়’ গানটি লিখে পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল একটি চিরকুট, তাতে লেখা ছিল, ‘জীবনে তোমাকে পেয়ে হারালাম, তাই মরণে পাব এই বিশ্বাস ও সান্ত্বনা নিয়ে বেঁচে থাকব।’

‘কোন এক সন্ধ্যায়, হাজার আতশবাঁজি আর সানাইয়ের সুরে,
তোমায় নিয়ে গেছে, আমার কাছ থেকে, দূরে বহু দূরে।’

(চলবে)

তারিখ: ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৬। ঢাকা
সময়: রাত ৯টা ১৫ মিনিট।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১। ইমরান চৌধুরি
২। http://www.somewhereinblog.net/blog/onujibblog/28847941
৩। http://www.prothom-alo.com/we-are/article/223885/%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AE-%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A6%BF

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.