প্রেমের ধ্রুব চিত্র

প্রেমের ধ্রুব চিত্র
——– রমিত আজাদ

বাইরে সময়টা দুপুর গড়িয়ে বিকেলও হতে পারে, ঘড়ির দিকে তাকায় না কবি। সে করছে অপেক্ষা। জানে, যার জন্য অপেক্ষা করছে, তার আসার কোন সময়সূচি নেই, যদিও সে নির্ধারিত একটা সময় বলে। প্রথম প্রথম ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করতো কবি। তারপর এক সময় বুঝতে পারলো, সে যে সময় দেয় সেই সময়টার জ্ঞান হয়তো তার নেই, অথবা ইচ্ছা করেই সময়ের হেরফের করে সে। কবি যেই আসরে বসে সেই আসরে সাধারণত কেউ ঘড়ির দিকে তাকায় না, আর ইদানিং কবি ছোট্ট যেই আসরটিতে বসতে শুরু করছে সেই আসরের আগে পরে কবিও ঘড়ির দিকে তাকায় না। এটা কবি বুঝে গেছে যে, সময়সূচী না মানলেও, ঐদিন কোন না কোন সময় সে আসবে। বিরক্তিকর এই প্রতিক্ষাটি কখনো কখনো সে উপভোগও করে।

প্রতিক্ষার এই প্রহরে পলিম্যাথ ‘ওমার খৈয়াম’-এর উপর লেবানিজ লেখক আমিন মালৌফ-এর লেখা একটি উপন্যাস পড়ছিলো কবি। যার শুরুতেই আছে একটি দুঃসংবাদ, পন্ডিত ‘ওমার খৈয়াম’-এর লেখা পৃথিবী কাঁপানো বই ‘রুবাইয়াত’-এর মূল কপিটি পড়ে আছে অতলান্তিক মহাসাগরের গভীর তলদেশে। আত্মম্ভরী অর্ণবতরী টাইটানিক-এর কাহিনী আজ পৌরাণিক কাহিনীর মতই চমকপ্রদ। এর সাথে একদিকে যেমন জড়িয়ে আছে অপয়া মমি ‘তুতানখামুন’-এর রোমাঞ্চকর কাহিনী। তেমনি জড়িয়ে আছে ‘ওমার খৈয়াম’-এর অমর গ্রন্থ। হ্যাঁ, কবি ও দার্শনিক খৈয়াম-এর গ্রন্থটি সেদিন ঐ জাহাজেই ছিলো। জাহাজটির সাথে সাথে বইটিও ডুবে যায়। টাইটানিক খুঁজে পাওয়া গেছে অবশেষে ১৯৮৫ সালে। তবে দৈত্যাকৃতির টাইটানিকের বুকে ঘুমিয়ে থাকা জ্ঞানে বিশাল কিন্তু অবয়বে ক্ষুদ্র ‘রুবাইয়াত’-কে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ করেই ঘরে প্রবেশ করে ‘মৃগনয়না’। হ্যাঁ, এই নামটিই ওকে দিয়েছে কবি। প্রকৃতির নিপুন হাতে গড়া বঙ্গের সাজানো বাগিচা সুন্দরবনের অপরূপ নিদর্শন চিত্রা হরিণের মতই মায়াবী ও চঞ্চল তার আঁখি দুটি। তাই ঐ মৃগনয়না নামটিই তাকে মানায়। কবি লক্ষ্য করেছে ইদানিং কক্ষে প্রবেশ করার জন্য কোন অনুমতি নেয়না মৃগনয়না। যেটা আগে সে করতো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে। এটা কবির ভালো লাগতে শুরু করেছে, এর মানে হলো ‘মৃগনয়না’ এখন তাকে কিছুটা হলেও আপন ভাবে।

নরম কৌচে কবির কাছাকাছি বসলো মৃগনয়না। একথা-সেকথার পর কবি ধীরে ধীরে মৃগনয়নার পেলব দেহবল্লরীর এখানে-ওখানে তার হাতের মৃদু পরশ বুলিয়ে দিতে লাগলো। প্রতিটি স্পর্শের পর মৃগনয়না একটু করে সরে যাওয়ার ভঙ্গি করে। তারপর কিছুটা ভর্ৎসনার সুরে বলেই বসলো।
মৃগনয়না: কেন এমন করেন বলেন তো?
কবি: কি করি? (একটু কপট হাসি হেসে)
মৃগনয়না: এই যে এখানে-ওখানে হাত! আপনার হাত দুটোকে সংযত রাখতে পারেন না?
কবি: তোমার ভালো লাগে না?
মৃগনয়না: না। ( অনেকটাই জোর দিয়ে বললো সে)

কবি নিজেকে জুলিয়াস সিজার বা বাদশাহ আকবর মনে করেনা (যাদের হেরেমে জেনানার কোন অভাব ছিলো না) অথবা এই জমানার ফিটজেরাল্ড কেনেডি বা বিল ক্লিনটনও সে হতে পারেনি। তবে রূপসীদের সাথে মাখামাখি তার এই প্রথম নয়। প্রথম যৌবনে যার সূত্রপাত সেই সময় পেরিয়ে কবি এখন চতুর্দশ ছুঁই ছুঁই। তাই রমণীর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে সে জ্ঞান রাখে। মনে মনে মৃদু হাসি হেসে কবি ভাবলো, ‘না না তো বলছো, কিন্তু আসছো তো ঠিকই! বসছো তো হাতের নাগালের মধ্যেই!’

কবি: আমার কথা তোমার একসময় ঠিকই মনে পড়বে।
মৃগনয়না: না। মনে পড়বে না। যদি মনে পড়েও, সেটা ভালো অর্থে মনে পড়বে না।
কবি: কি অর্থে মনে পড়বে তাহলে?
মৃগনয়না: মনে পড়বে একজন লোক ছিলো অশুদ্ধ। সুযোগ পেলেই আমার সাথে ……………। (কথাটা সে শেষ করে না)
কবি: না, আমার কথা ভালো অর্থেই মনে পড়বে।
মৃগনয়না: কি বলেন? এতে ভালো কি আছে?
কবি: মানুষের জীবনটা খুব ছোট্ট। হঠাৎ করেই তারুণ্য চলে যায়। সেই তারুণ্যে যদি এমন কিছু ঘটনা না থাকে যা ভবিষ্যৎে মনে পড়বে তাহলে সেই মাধুর্যহীন নিরানন্দ যৌবনের জন্য একসময় খুব আফসোস হবে!
মৃগনয়না: দরকার নাই কিছু মনে পড়ার।
কবি: আমাকে তখন ঠিকই মনে পড়বে। যখন ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়বে। তখন কফির পেয়ালা হাতে তুমি বেলকুনিতে এসে দাঁড়াবে। দেখবে স্মৃতির পটে আমি ভেসে উঠবো।
মৃগনয়নার চোখদুটি ঝলকে উঠলো
মৃগনয়না: আপনি কি কবিতা লেখেন?
কবি: হ্যাঁ, লিখিতো। তুমি জানো না?
মৃগনয়না: না তো। জানিনা তো। আমি তো জানি আপনি বিজ্ঞানী।
কবি: বিজ্ঞানীরাও কবিতা লেখে। তুমি ওমার খৈয়ামের নাম শুনেছ?
মৃগনয়না: জ্বী না। কে ছিলেন উনি?
কবি মনে কষ্ট পেলো। এই জেনারেশন লেখাপড়া তেমন করেনা। তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই তাদের জ্ঞান নেই।
কবি: তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী ও কবি। তার লেখা বিখ্যাত বইয়ের নাম ……।
মৃগনয়না: থাক উনার বইয়ের নাম জানার দরকার নাই আমার। (কবি তার কথায় আহত হলো) আপনি কি কবিতা লেখেন?

কবি তার লেখা একটা কবিতা দেখালো মৃগনয়না-কে। “এই দেখো, আমার লেখা কবিতা।”

অষ্টাদশীর কষ্ট দেখি
ষষ্ঠ তিথির ভ্রষ্ট জলে।
ফানুস হয়ে, মানুষ ভাসে,
চন্দ্রাবতীর মিষ্ট ছলে।

অষ্টাদশীর গুপ্ত মনে
আর্ত রতির বহ্নি জ্বলে।
কামুক হয়ে, লাজুক হাসে,
প্রভাবতীর ওষ্ঠ কোলে।

অষ্টাদশীর গাত্র ভাজে
মুর্ত রঙ্গের অঙ্গ পলে,
সাগর হয়ে, নাগর আসে,
লজ্জাবতীর হৃদয় দোলে।

মৃগনয়না লাজুক হেসে বললো
মৃগনয়না: এটা কাকে ভেবে লিখেছেন?
কবি: তোমাকে ভেবে। (চট করে বিশ্বাসযোগ্য করে বললো)
মৃগনয়না: উঁহ! আমাকে ভেবে না! মিথ্যে বলছেন।

তারপর তার চিত্রাহরিণের মত মায়াবী আঁখি দুটি মেলে বললো,
মৃগনয়না: আমাকে নিয়ে লেখেন না একটা কবিতা। কাউকে বলবেন না কিন্তু, যে ওটা আমাকে নিয়ে লেখা। প্রকাশ করবেন, সবাই পড়বে, শুধু আমিই জানবো যে কবিতাটি আমাকে নিয়ে লেখা।
কবি: ওককে। আজই লিখবো কবিতাটি।
মৃগনয়না: আমি কবে পাবো?
কবি: কাল।
মৃগনয়না: আচ্ছা, আজ আসি তাহলে।
যাওয়ার আগে কবি আরেকবার তাকে মৃদু সোহাগ করলো। নীরব রইলো মৃগনয়না। রমণীর মনস্তত্ত্বে অভিজ্ঞ কবি বোঝে, অষ্টাদশী তার সোহাগ উপভোগ করে। তবে সে অক্ষত অনূঢ়া, তাই তার এত লাজ!

পরদিন আবারো কবি অপেক্ষা করলো মৃগনয়নার জন্য। ঘড়ি না দেখে অপেক্ষা। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর, একেবারে পড়ন্ত বিকেলে এলো সে।

কবি: এতো দেরী?
মৃগনয়না: সব দিক সামলে আসতে হবে তো। আপনি কি ভেবেছেন? চাইলেই চট করে আসা যায়? আমার হাতে সময় বেশী নেই। দেখি কি কবিতা লিখেছেন আমার জন্য?
কবি একটা ছাপা কাগজ হাতে তুলে দিলো মৃগনয়নার। কাগজটি হাতে নিলো সে। কবি গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে। এই প্রথম তার লেখা একটি কবিতা পড়তে যাচ্ছে এই রূপসী। মৃগনয়না সহসাই কাগজটি ফিরিয়ে দিলো কবির হাতে।
মৃগনয়না: নাহ, আমি পড়বো না। আপনি পড়ুন। আমি শুনি।
কবি: তুমিই পড়ো না।
মৃগনয়না: আপনিই পড়ুন।
রমণীর মনস্তত্ত্বে সিদ্ধহস্ত কবি হঠাৎ একটা ধাক্কা খেলো। এই মনস্তত্ত্বের সাথে আগে তার কখনো সাক্ষাৎ ঘটেনি। নারীমন বড়ই অদ্ভুত!
মৃগনয়না: কই পড়ুন। আমি শুনি।
কবির হঠাৎ খুব লজ্জ্বা লাগলো। কেন যেন এই কবিতা তার পড়ে শোনাতে সংকোচ হলো কবির।
কবি: নাহ তুমিই পড়ো।
মৃগনয়না: আমি পড়বো না। যাই।
বলে উঠে দাঁড়ালো মৃগনয়না।
কবি: কোথায় যাই! (বিস্মিত হলে সে)
মৃগনয়না: বারে বললাম না, আমার সময় নাই।
কবি: তোমাকে নিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে একটা কবিতা লিখলাম, আর তুমি পড়বে না?
মৃগনয়না: নাহ পড়বো না।
এই বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে চলে যেতে লাগলো মৃগনয়না। অপূর্ব ছন্দ তার অষ্টাদশী দেহবল্লরীর চলনে। এই ছন্দ নিয়েই আরেকটি কবিতা রচনা করা যায়।
কিন্তু এটা কি করলো মৃগনয়না? এত সাধ করে সে একটা কবিতা লিখলো। আর সেটাকে ব্যাঙের মত চ্যাপ্টা করে দিলো সে!
রাগে কবিতার কাগজটি কুটিকুটি ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করলো কবির। তারপর হঠাৎ করেই তার রাগ পানি হয়ে গেলো।
নাহ রেখে দেই কাগজটি। কবিতাটি পড়েতে অষ্টাদশী মৃগনয়না আবার ফিরতেও তো পারে।

তারিখ: ৩০শে জুলাই
সময়: রাত ৯টা ২১ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.