বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভারঃ পর্ব-১

— সাকি বিল্লাহ্

সতেরশ শতকের শুরুর দিকের কথা । ইংল্যান্ডে হঠাৎ করেই চা আর চিনির সংকট দেখা দিল । কিছু গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বললেন মস্তিষ্ক সঞ্চালনের জন্য যে বিপুল শক্তির দরকার এবং তা সজীব রাখতে চিনি ও চা এর কোন বিকল্প নেই । বিষয়টা রাজা প্রথম জর্জ কে জানানো হলো । ডাচদের কাছ থেকে অনেক উচ্চদামে চা আর চিনি খরিদ করতে গিয়ে এদিকে রাজ কোষাগার খালি হবার যোগাড় । রাজা তাই সভাসদদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসলেন । সে আলোচনায় সবাই সম্মত হল ব্রিটিশ নাবিকদের কয়েকটা দল ইন্দোনেশিয়া, চীন, আমেরিকা ও ভারতবর্ষে চা ও চিনির জন্য সওদা করবে । এই নাবিকরা মূলত সওদাগর, এরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবসাবানিজ্য করার জন্যই মূলত বন্দরে বন্দরে জাহাজের নোঙ্গর ফেলে ।

ব্রিটিশ, ডাচ, পর্তুগীজ বা ওলন্দাজদের অনেক আগেই কিন্তু বাঙ্গালীরা নাবিক হিসেবে জাহাজে সমুদ্র চষে শেষ করেছে । নিজেদের ইতিহাসটা ভাল করে না জানলে যা হয় আর কি, আমাদের ভিতরই অনেকে মনে করে মীর জাফর আর লর্ডক্লাইভরা আমাদের জন্য আশীর্বাদ, সেই ইংরেজ দালাল লুটেরা বা আমাদের সম্পদ চোরা ব্রিটিশদের শেখানো ইতিহাসটাই এ সকল লোকেরা জনে জনে বলে বেড়াবে যে আমাদের সম্পদ নেই বা আমাদের কোন অতীত গৌরবান্বিত ইতিহাস নেই । মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক,
যা বলছিলাম, আমাদের নাবিক মালয়েশিয়া আর শ্রীলংকাতে ভ্রমন করেছে খ্রীস্টপূর্ব ৪০০ বছর পূর্বে তার মানে প্রায় ২৫০০ বছর আগে । ‘চট্টগ্রাম’ এই উপমহাদেশ সহ সমগ্র বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি পুরাতন বন্দর ও মনুষ্যবসতির আবাসস্থল । প্রস্তর যুগ ও নব্য প্রস্তর যুগের কিছু নিদর্শনও পাওয়া গেছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সে হিসাবে সভ্যতার আলো দেখা বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস ১৫ হাজার বছরেরও বেশি ।
কৃষি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, গ্যাস, তৈল, চুনাপাথর, কয়লা, কঠোর পরিশ্রমী মানুষ আমাদের অন্যতম সম্পদ । এছাড়াও আছে বৃহৎ উপসাগর, বৃহত্তম লোনা পানির বন সুন্দরবন, অন্যতম মিঠাপানির বন রাতারগুল, ৪৬৬ প্রজাতির পাখি, ৬৫০ এর অধিক প্রজাতির মাছ, ২৫০ প্রজাতির সরীসৃপ, কুমীর, হাতি, ময়ূর, ৪ প্রজাতির হরিণ, ৮৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী; সবই এখনও আছে শুধু আমাদের জানার আগ্রহটা কমে গেছে আর কপট দেশপ্রেমিকের সংখ্যাটা বেড়ে গেছে অনেকাংশে ।
এখনকার বাংলাদেশ উন্নত ও ধনী রাস্ট্র হতে হঠাৎ করেই তো আর গরীব ও অথর্ব দেশে নেমে আসেনি একদিনে । এই ভিনদেশী দিল্লীর মোঘল আগ্রাসন আর ইংরেজ দস্যুরাই মূলত আমাদের অধপতনের জন্য দায়ী । দেশটাকেও ৩ ভাগে বিভক্ত করে গেছে এই ব্রিটিশ আর জিন্নাহ-গান্ধীর দালালরা, না হলে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, পূর্ববাংলা, আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপ নিয়ে যে বিশাল বাংলাদেশ হত তা ভারত কিংবা পাকিস্তানের চাইতে অনেক শক্তিশালী একটা বাঙ্গালী জাতিতে বিশ্বে পরিচিত হত । ঐ যে বললাম নিজেদের ইতিহাস না জানলে যা হয় ।
ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ বলতে তখন বাংলাদেশকেই বুঝত কারণ ভারতবর্ষের পুরাতন বন্দর চট্টগ্রাম ও কোলকাতায় তারা ব্যবসার জন্য আসতো । চা ও চিনির জন্য নাতিশীতোষ্ণ কৃষি প্রধান আবহাওয়া দরকার ছিল তাদের । চা ও চিনি, চীনারা সর্বপ্রথম উৎপাদন করেছে বলে ঐতিহাসিকগণের অনেকে মনে করেন । চীনাদের কাছ থেকে আফিমের বিনিময়ে চা কেনা যেত । আফিম উৎপাদনের জন্যও বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষ খুবই ভাল আবহাওয়া ছিল বা এখনও আছে ।
বাংলাদেশের প্রথম দুর্যোগ নেমে আসে দিল্লীর মুঘলদের আগ্রাসনে । মূলত মুঘল বাদশাদের হেয়ালীপনা এবং বাংলার প্রতি বিমাতাস্বরুপ আচড়নই প্রধানত দায়ী । দিল্লীর মুঘল বাদশারাই বাংলাদেশে ইংরেজদের অবাধে ব্যবসা ও সৈন্যদল তৈরীর অনুমতি দিয়েছিল । মুঘল বাদশা আওরঙ্গজেবের কন্যার আগুনে দগ্ধ হওয়ার চিকিৎসা করেছিলেন ইংরেজ ডাক্তার হোপওয়েল অত্যন্ত সফলতার সাথে । বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলাতে অবাধে ব্যবসা করার অনুমতি পেয়ে যায়, একই বছর সুবেদার শায়েস্তা খানের সহযোগীতায় দিল্লীর বাদশার অনুমতি নিয়ে তারা নিজেদের গোলন্দাজবাহিনী ও সৈন্যঘাটি গড়ে তোলে । পরবর্তীতে অন্যান্য মুঘল সুবেদাররা ইংরেজদের পক্ষেই ছিল শুধু সিরাজ উদদোলা ও শায়েস্তা খান তাদের দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরেছিল কিন্তু তাতে শায়েস্তা খান সফল হলেও সিরাজ উদদৌলা হতে পারেননি আমাদের দালালদের দরুন ।

পলাশীর যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে সৈন্য ছিল প্রায় ৬৩ হাজার আর ইংরেজদের পক্ষে ছিল মাত্র ২৭০০ সৈন্য যার ৩০০ ছিল ব্রিটিশ আর বাকি সব নেপালের ভাড়া করা সৈন্য । যেহেতু মীর জাফরের একাই প্রায় ৪৩ হাজার নিজস্ব সৈন্যছিল তাই তার বিস্বাসঘাতকতায় আমাদের ২০০ বছর ব্রিটিশদের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল । ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইতিহাসে তাই পাওয়া যায়, ইংরেজ লর্ড বলেছিলেন যে পরিমান মানুষ দাড়িয়ে পলাশীর যুদ্ধ দেখেছিল তারা যদি একটি করে পাথরও ছুড়ে মারতো তাহলে আমরা পরাজিত হয়ে যেতাম । ধারণারও বাহিরে যে ২১ গুন বেশি সৈন্য থাকা সত্ত্বেও আমরা হেরেছিলাম শুধু দালালদের জন্য । এই দালালচক্র ১৭৫৭, ১৮৫৭, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০, ২০০৯ কিংবা এখনও সক্রিয় আছে । এরা আসলে বাংলাদেশী কিনা সন্দেহ আছে আমার যারা নিজের দেশের ভাল না দেখে ভিনদেশীদের প্রভু মনে করে ।

যা বলছিলাম,
চা, চিনির উৎপাদনের পাশাপাশি ব্রিটিশরা আফিম, নীল উৎপাদন শুরু করে । নীল ও আফিম উৎপাদনে কৃষকদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস জানা যায় দীনবন্ধু মিত্রের নীল দপর্ণ পড়ে । মসলিন, সূতি কিংবা সিল্ক কাপড়ও আমাদের অতীত সম্পদ ছিল । অনেকেই বলে থাকেন আমাদের সম্পদ নেই কারণ তারা হয়ত স্কুলে ইতিহাসের বইটা কখনও ছুঁয়েও দেখেননি বা পড়েছেন শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ।

নবাব সিরাজ উদদৌলার অস্টম বংশ ধরকে বঙ্গবন্ধু পিডিবিতে বড় কর্মকর্তার পদবীতে চাকুরী দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিলেন । উনার ছেলে নবাবের নবম বংশধর জনাব আরেব এর সাথে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছিল বাংলাদেশের রাস্ট্রীয় সম্পদের বিষয়ে । ব্রিটিশরা যখন নবাবকে পরাজিত করে তখন বাংলাদেশের রাস্ট্রীয় কোষাগারে বিপুল পরিমান স্বর্ন, রৌপ্য, তাম্য মুদ্রাসহ বিপুল পরিমান হীরক, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য সম্পদে পূর্ণ প্রায় ২২টির অধিক সিন্দুক ছিল । উল্লেখ্য বাংলার বেশিরভাগ রাজা ও জমিদারগণ সৌখিণ ছিল তাই তাদের সম্পদ বলতে ছিল প্রধানত স্বর্ণালংকার ।
ইবনে বতুতা, গ্রীসের টলেমী বা চীনা পর্যটক ও ইতিহাসবিদদের ভ্রমন কাহিনীতে বাংলার বিশাল সম্পদ ভান্ডারের বর্ণনা আছে । আলেকজান্ডার যখন বাংলা আক্রমন করার পরিকল্পনা করছিল তখন আমাদের রাজার ছিল ২ লাখ পদাতিক সৈন্য, ২০ হাজার অশ্বারোহী ও ৫ হাজার হাতিবাহিনী । উপোরন্তু আমাদের পাল্টা আক্রমনে টিকতে না পেরে আলেকজান্ডারের বিশাল বাহিনী দুটি অংশে ছত্রভঙ্গ হয়ে হিমালয় ও সিল্করোড দিয়ে পলায়ন করে । তড়িঘড়ি করে পালানোর সময় তাদের সে সময়কার হারকিউলিস চিহ্নসমেত মুদ্রা ও ব্যবহার্য অনেক কিছুই যা তারা ফেলে গিয়েছিল তা গঙ্গা অববাহিকায় পাওয়া গিয়েছে । বাংলাদেশে যদি বিপুল সম্পদ নাইবা থাকতো তাহলে তো আলেকজান্ডার বা পর্তুগীজ, আরব, ব্রিটিশরা আমাদের দেশকে লুট করতে আসতো না ।

আলেকজান্ডারের ইতিহাসবিদ টলেমীর ম্যাপ ও বইয়ে বাংলাদেশকে উল্লেখ করা হয়েছে গঙ্গাঋদ্ধি বা গঙ্গাহৃদি হিসেবে । দিওদেরাস এর বইয়ে এই নামের অর্থ করা হয়েছে গঙ্গার সম্পদে ভরপুর যা বর্তমান বাংলাদেশ, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বিস্তৃত ছিল ।
দৈনিক একটা দেশ কখন ২ লাখ সৈন্য আর ৫ হাজার হাতির ভরণপোষণ দিতে পারে যদি বিপুল ধন ও সম্পদে ভরপুর না হয় !
এখনকার জাপান, জার্মানী কিংবা দুবাই এর মত ধনী রাস্ট্রের চাইতে বাংলাদেশ সে সময়ে কোন অংশে কম ছিল বলে মনে হয় না ।
এখনও আমাদের সবকিছুই আছে শুধু নিজেদের মনোভাব উন্নত করতে হবে আর কপট দেশপ্রেমিকদের হাত হতে দেশকে রক্ষা করতে হবে ।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.