বাংলা সাহিত্যে ডিগ্রী ও সাহিত্যে ডিগ্রীবিহীন বড় সাহিত্যিক

বাংলা সাহিত্যে ডিগ্রী ও সাহিত্যে ডিগ্রীবিহীন বড় সাহিত্যিক:
———————— রমিত আজাদ

বাংলা সাহিত্য বিভাগ থেকে পাশ করে বড় সাহিত্যিক হয়েছেন এরকম উদাহরণ কম। বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের বেশীরভাগই অন্যান্য সাবজেক্টে পাশ করা, কেউ কেউ কোন পাশই করেননি। এবার স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে এই সাবজেক্টে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রী-র সার্থকতা কতটুকু?

আসুন দেখি পার্সেন্টেজের বিষয়টি। বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের মধ্যে বাংলা সাহিত্যে পাশ করে দিকপাল হয়েছেন এটার পার্সেন্টেজ কম। আমি বাংলা সাহিত্যের কিছু দিকপালের নাম উল্লেখ করছি। প্যারিচাঁদ মিত্র, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়, হাসন রাজা, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, সুকুমার রায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, হুমায়ুন আহমেদ, সৈয়দ মুজতবা আলী, সুকান্ত ভট্টাচার্য, হুমায়ুন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বনফুল, শামসুর রাহমান, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, সত্যজিত্ রায়, হুমায়ুন আহমেদ, শওকত ওসমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবুল মনসুর আহমেদ, রফিক আজাদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হেলাল হাফিজ, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, প্রমুখ। যাদের বেশীরভাগই বাংলা সাহিত্য বিভাগ থেকে পাশ করা নন।

কেউ কেউ আছেন ইংরেজী বিভাগের।
বুদ্ধদেব বসু ইংরেজি বিভাগ থেকে পাশ করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম. এ. ডিগ্রি লাভ করেন। শামসুর রাহমান ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তবে পাশ করেননি। সৈয়দ শামসুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তবে পরবর্তীতে স্নাতক পাসের আগেই ১৯৫৬ সনে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন।

বিষয়টি হলো, ইংরেজী বিভাগে মূলত: ইংরেজী সাহিত্যই পড়ানো হয় (যতদূর জানি)। আমার এক মেধাবী আত্মীয়া ইংরেজী বিভাগ থেকে পাশ করেছেন, উনাকে একবার অনুরোধ করেছিলাম আমার একটি পেপারের (ফিজিক্সের উপর) ইংরেজীটা একটু চেক করে দিতে। তিনি পেপারটি হাতে নিয়ে কিছুদূর পড়ে বললেন, “আমি লিটারেচারের লোক, ফিজিক্সে বা বিজ্ঞানে ভাষাটি কেমন হবে ভালো আইডিয়া নাই।” (বাগাড়ম্বর না করে তিনি সত্যি কথা বলার মত গুন তিনি রেখেছিলেন বলে ধন্যবাদ)।

এখানেই আমার প্রশ্ন, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ উনারা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন ঠিকই তবে ইংরেজীর, বাংলার নন। আমার কথা বাংলা সাহিত্যের ডিগ্রীর সার্থকতা নিয়ে। ইংরেজী সাহিত্যে পড়ে উনারা সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞান পেয়েছিলেন অবশ্যই, তবে সেই জ্ঞান বাংলা সাহিত্যে কাজে লাগিয়েছিলেন, ইংরেজী সাহিত্যে উনাদের বড় কোন অবদানের কথা শুনিনি। সুতরাং আবারও ঐ একই প্রশ্ন চলে আসে।

আহমেদ ছফা বাংলা বিভাগে পড়ালেখা করেছিলেন তবে শেষ করেননি পরে পাসকোর্সে পাশ করেন।

পক্ষান্তরে বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও চমৎকার সাহিত্য রচনা করেছেন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, সুকুমার রায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), রাজশেখর বসু, হুমায়ুন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, প্রমুখ।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব-এর উপর পিএইচডি সৈয়দ মুজতবা আলী আমাদের উপহার দিয়েছেন কালজয়ী সব সাহিত্য।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মাহমুদ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের উচ্চশিক্ষা নেই।

বাংলা কবিতার দিকপাল সুকান্ত ভট্টাচার্য অকাল মৃত্যুবরণ করে উচ্চশিক্ষার সময়ই পাননি।

লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, হাসন রাজা উনারা কিছু পাশ করেননি।

এখান থেকে সম্ভবত এই উপসংহার টানা যায়না যে, সাহিত্য প্রতিভার সাথে বাংলা সাহিত্যে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রীর প্রত্যক্ষ কোন সম্পর্ক নাই।

তারিখ: ২০শে এপ্রিল, ২০১৭
সময়: দুপুর ১ টা।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.