বয়েজ স্কুল ক্যাডেট কলেজের নাটকে নারী চরিত্র

বয়েজ স্কুল ক্যাডেট কলেজের নাটকে নারী চরিত্র:
—————————————– রমিত আজাদ

কয়েক দশক আগের কথা। সিলেট ক্যাডেট কলেজের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সংযোজিত হলো নাট্য প্রতিযোগিতা। কলেজে যেহেতু কোন মেয়ে নাই তাই এমন নাটক খুঁজে বের করা হলো যেখানে কোন নারী চরিত্র নাই। তিন হাউজ তিনটি নারী চরিত্রবিহীন নাটক করলো। এভাবে প্রথম বছরটা গেলো। কিন্তু দ্বিতীয় বছরে দেখা গেলো সংকট! নারী চরিত্র নাই এমন নতুন নাটক খুঁজে বের করা মুশকিল হলো। আমাদের হাউজের হাউস মাস্টার শ্রদ্ধেয় জনাব কুদ্দুস স্যার একটা সুন্দর নাটকের স্ক্রীপ্ট নিয়ে এলেন, কিন্তু সমস্যা দেখা গেলো নারী চরিত্র নিয়ে। সেখানে দুইটি নারী চরিত্র আছে। এই দুটি রোলে প্লে করবে কে? আমি মিমমিন করে বললাম, “স্যার বাইরে থেকে অভিনেত্রী নিয়ে আসা যাবে না? কর্তৃপক্ষ এলাউ করবে না?” স্যার বললেন, “ক্যান, তোমরা পারবা না?” আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। স্যার বলতে চাইছেন কি? তারপর খোলাসা হলো, স্যার চাইছেন আমাদের মধ্য থেকেই কেউ নারী সেজে নাটক করুক! এবার বিপত্তি বাধলো! কতরকম ভাবনা! কে নারী সাজতে চাইবে? কোন পুরুষ চায় নারী হতে? যদি কেউ সেজেই ফেলে নারী, তারপর তার বাকী জীবনটা কি হেল হয়ে যাবে না? সবাই কি তাকে ক্ষ্যাপাবে না? কেউ যদি নারী সাজেই তাহলে, ছেলে মার্কা মেয়ে দেখতে বেখাপ্পা লাগবে না? ইত্যাদি। এর মধ্যে একদিন হাউজ মাস্টার স্যার আমাদের একদল-কে নিয়ে বসলেন। চমৎকার ভালো মানুষ নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক চাইলেন আমরা নাটকে ভালো করি, হাউজ পুরষ্কার জিতুক। স্যার আমাদেরকে মনের মাধুরী মিশিয়ে নাটকটির কাহিনী বর্ণনা করলেন। আমরা দেখলাম যে নাটক চমৎকার, ঠিকভাবে করতে পারলে নির্ঘাত পুরষ্কার জিতবো আমরা! কিন্তু প্রশ্ন একটাই, নারী চরিত্র নিয়ে কি করি? কাকে গিয়ে অনুরোধ করবো নারী সাজতে? যদি সাহস করে কাউকে বলেই ফেলি, তারপর কি কথা শুনতে হয় তার জবাবে কে জানে? তার চাইতে চুপ করে থাকাই উত্তম মনে করলাম। এরমধ্যে একদিন এলেন তরুণ শিক্ষক জনাব বদরুদ্দোজা স্যার (মরহুম)। তিনি নিজেও এক্স-ক্যাডেট, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ; আবার সেখানকার শিক্ষকও ছিলেন। স্যার আমাদের মন বুঝতেন। তাই আমাদের সরাসরি কিছু না বলে পরোক্ষভাবে কনভিন্স করার চেষ্টা করলেন। হাউজে এসে গল্প জুড়ে দিলেন, উনাদের সময়কার নাটকের গল্প, তারপর তিনি যখন রাজশাহী-তে শিক্ষক ছিলেন সেই সময়কার নাটকের গল্প। তারপর বললেন, “তোমরা যেই নাটকটি করতে চাইছো, এই নাটকটিই মঞ্চস্থ হয়েছিলো রাজশাহীতে।” আমরা বললাম, “কি বলেন স্যার? তা নারী চরিত্রের কি হয়েছিলো? নারী কোথায় পেয়েছিলেন?” স্যার বললেন, “ক্যাডেটরাই নারী সেজে অভিনয় করেছিলো।” আমাদের চোখ তো কপালে, “বলেন কি স্যার? কে সাজলো নারী?!” স্যার তারপর এমন একজনার নাম বললেন, যা শুনে আমরা একেবারেই হতবাক! ধরি তিনি ‘মিস্টার এক্স’। কলেজগুলোতে ‘মিস্টার এক্স’ ভাইয়ের তখন অনেক নাম-ডাক। শুনেছি তিনি প্রখর মেধাবী একজন অল-রাউন্ডার ক্যাডেট। তিনি আমাদের কাছে আদর্শ। (বর্তমানে তিনি একজন বাঘা সামরিক কর্মকর্তা) সেই তিনিই কিনা নারী সেজে অভিনয় করেছিলেন!
এবার আমরা ভাবতে শুরু করলাম। নাহ, নারী সাজা যায় তাহলে। এটা তো নিছক অভিনয়! শিল্পের স্বার্থে তো কত সেক্রিফাইসই করা যায়। দুইএকদিন, যাওয়ার পর আমাদের মধ্য থেকে দুইজন রাজী হলেন। তারা নিজ থেকেই বললেন যে, তারা নারী চরিত্রে অভিনয় করতে রাজী আছেন। আমরা তাদের সাধুবাদ জানালাম। উল্লেখ্য যে তারা কেউই ইতিপূর্বে কখনো নাটক করেননি!

তারপর আর কি? হাউজ মাস্টার স্যারের কাছে নিয়ে এলাম উনাদের দুজনকে। “স্যার, এই যে, উনারা দুজন মেয়ে সেজে অভিনয় করবে।” স্যার বললেন, “ভালো ভালো। তা বা হাত-টাত নাড়াইতে পারবা তো?” আমরা আবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম, মানে কি এই কথার? স্যার বললেন, “মেয়েরা কিন্তু বাঁ হাত নাড়ায় বেশি।” স্যারের কথা শুনে আমরা হেসে ফেললাম। আমি বললাম, “নাটকের মধ্যে বেশি বেশি করে বাঁ হাত নাড়াবি বুঝলি?” আমার কথা শুনে সবাই সমস্বরে হেসে উঠলো। এরপর চললো শুধু ধুমছে রিহার্সাল।

নাটক মঞ্চায়নের নির্দিষ্ট দিনে আমি মেক-আপ রূমে একটু দেরীতে ঢুকলাম। ঢুকেই অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। রূপসী দুই নারী সেখানে চুল ঠিক করছে, শাড়ীর আঁচল সামলাচ্ছে! যতদূর মনে পড়ে, একজনার পরনে ছিলো লাল রঙের শাড়ী, আরেকজনার পড়নে ছিলো নীল রঙের শাড়ী। আমি প্রথমে থমকে গেলাম, তারপর ঝট করে বেরিয়ে আসলাম। যেখানে নারী ড্রেস ঠিক করছে সেখানে থাকা তো ঠিক না! পর মুহূর্তেই আমার মনে পড়লো; আরে, উনারা তাহারা নয় তো? আবার ভিতরে ঢুকলাম, ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, তাহারাই! এবার মেক-আপ ম্যানের প্রশংসা না করে পারলাম না। (মেক-আপ ম্যানও যোগাড় করেছিলেন, জনাব বদরুদ্দোজা স্যার)। মেক-আপের যাদুতে পুরুষকে রূপসী নারী বানিয়ে ফেলেছে! আমাকে দেখে তারা ঝলমলে হাসি দিলেন। আমিও হাসলাম, অভিনেতা কলাকুশলীরা সবাই হাসলো। এরপর নাটকের পালা, সারা কলেজ অপেক্ষা করছিলো, দুই নায়িকার নাটকে নারীরূপী বয় ক্যাডেটদের অভিনয় দেখতে। জোর দিয়ে বলছি, সেদিন দুজনারই অভিনয় হয়েছিলো অনবদ্য, প্রাণবন্ত! যা পুরো কলেজের দর্শকদের মনে চিরকালের জন্য স্থান করে নিয়েছিলো। ঐ নাটকে আমরা পুরষ্কার পেয়েছিলাম। আর সিলেট ক্যাডেট কলেজে এরপর থেকে আর কেউ নাটকের নারী চরিত্রে অভিনয় করতে আপত্তি জানায় নি। শিল্পের এত অনুরাগ! আর যে দুজন সাহস করে পথ দেখিয়েছিলেন তাদেরকে স্যালুট!!!

———————————————————————————————————————-
অনুজ মিরাজ উল আলমের একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখলাম।

তারিখ: ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১৭
সময়: রাত ১টা ২৩ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.