ভালোবাসার ইমারত (১৩)

ভালোবাসার ইমারত (১৩)
——————– রমিত আজাদ

সিলেট ক্যাডেট কলেজের ‘কলেজ পতাকা’ আমি আনুষ্ঠানিক প্যারেডে বহন করেছিলাম পুরো একটি বছর। মাসে অন্ততপক্ষে গড়ে তিনটি এমন প্যারেড হলে বারো মাসে ছত্রিশ-টি প্যারেডে আমি তা বহন করেছিলাম, যা আমার জন্য ছিলো অত্যন্ত আনন্দের ও গৌরবের। সেই কলেজের ইমারতগুলোর সাথে আমার হৃদ্যতা ছিলো ঐ পতাকার মতই। তাছাড়া ঐ ইমারতের একটি কুঠুরীতে আমি এবং ‘কলেজ পতাকা’ একসাথে কাটিয়েছিলাম পুরো একটি বছর!

যা বলছিলাম, কলেজ ক্যাম্পাসে ভূমিকম্পের কথা!
কলেজ হাইজগুলোতে লাইটস আউট হয় রাত সাড়ে দশটায়। ঐরাতে লাইটস আউটের কাছাকাছি সময় হয়েছিলো ভূমিকম্প-টা। আমাদের ব্যাচের আমিনুর রেজা তার নিজ রুমে খাটের উপর উঠে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলো, হঠাৎ সে ফীল করলো যে তার পিঠের সাথে দেয়ালটা দুলছে। তার মাথায় চিন্তা খেলে গেলো, ‘এটা কেমন কথা? বেড়ার ঘর হলে কথা ছিলো যে, ওপাশ থেকে কেউ ঠেলছে, কিন্তু এত শক্ত দেয়াল কে ঠেলবে? ঐ একই রুমে থাকা নুরুজ্জামান বললো, “এগুলো সব কি হচ্ছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!” বলতে বলতেই সে টের পেয়ে গেলো ঘটনা কি! সাথে সাথে একলাফ দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে মাঠে চলে গেলো। পিছনে পিছনে ছুটলো রেজা। রেজা-নুরুজ্জামান-দের হাউজটা ছিলো তিতুমীর হাউজ অর্থাৎ বিশাল ইমারতের একতলায়। তাই উনারা এক লাফেই পাশের মাঠে চলে গেলেন। ইতিমধ্যে চারিদিকে শোর উঠে গেলো! দোতলা ও তিনতলা থেকে সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে নামতে শুরু করলো। কেউ কেউ ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলো।

তিনতলায় ছিলো আমাদের ব্যাচের এক্স। তিনি তখন মশারী টানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ব্যাপক হৈচৈতে তার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে যায়। খুব হতচকিত হয়ে যায় সে! যখন সে বুজতে পারে যে ভূমিকম্প হচ্ছে, তখন দৌড়ে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এই পর্যায়ে খেয়াল হলো যে, সে মাত্র একটি আন্ডারপ্যান্ট পড়ে ঘুমিয়েছে! রূপকথার সেই রাজার মত, এই পড়ে তো আর বাইরে যাওয়া যায় না! আবার প্যান্ট/পায়জামা পড়ার সময়ও নাই। ঘটনার বিহ্বলতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো সে, তারপর ফট করে খাটের নীচে ঢুকে গেলো!!!

ভূমিকম্প হওয়ার সময় তিতুমীর হাউজের হাউজ মাস্টার কঠোর শিক্ষক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যার হাউজ অফিসেই ছিলেন। ভূমিকম্পের সময় তিনিও হাউজের পাশের মাঠে নেমে আসেন। আমাদের ব্যাচের ‘ম’-ও ঘুম থেকে উঠে জানের মায়ায় হাউজ থেকে মাঠে নেমে এসেছিলো। তিনতলার এক্স-এর সাথে ‘ম’-এর পার্থক্য ছিলো যে, ‘ম’ ঘুমিয়েছিলো লুঙ্গী পড়ে। এদিকে ক্যাডেট কলেজে লুঙ্গী পরিধানে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। জানের মায়ায় যখন কেউ দৌড় দেয় তখন কি আর লুঙ্গী-অলুঙ্গী খেয়াল থাকে! যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে মাথা ঠান্ডা হলো, তখন সবাই নিজেতে ফিরে এলো। আস্তে আস্তে মাঠের মধ্যে যে যার জ্ঞানে ফিরে এলো। এ সময় ‘ম’ আবিষ্কার করলো যে, সে লুঙ্গী পরিহিত অবস্থায় এক্কেবারে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যারের পাশেই দাঁড়ানো! কিছুটা ঘাবড়ে গেলো ‘ম’। অন্য সময় হলে এই নিয়ে একদফা হৈ-চৈ করে ফেলতেন স্যার। কিন্তু উদভ্রান্ত এই পরিস্থিতিতে স্যার নিজেও খেয়াল করলেন না যে উনার পাশেই কোন ক্যাডেট লুঙ্গী পড়ে দাঁড়িয়ে আছে!

ভূমিকম্পের পরদিন আমাদের ব্যাচের মাহতাব (বর্তমানে তিনি নামজাদা পাইলট) এলো আমার কাছে। ওর সাথে কয়েকদিন যাবৎ আমার মনোমালিন্য চলছিলো। কথা বলাবলি বন্ধ ছিলো। ও যখন আমার পাশে এসে বসলো, আমি একটু অবাকই হলাম! মাহতাব আস্তে আস্তে বলতে শুরু করলো, “বুঝলি বন্ধু। এই দুনিয়া আসলে কিছুই না। গতকাল যখন ভূমিকম্প হলো, জানের মায়ায় যে যেদিকে পারে ছুটেছে! ভূমিকম্প আমাদের বুঝিয়ে দিলো, দুনিয়া হলো দুইদিনের কখন যে কোন দিক থেকে ডাক আসে কেউ বলতে পারেনা! বন্ধু আয় আমরা ঝগড়া মিটিয়ে ফেলি।” ওর সেইদিনকার বোধ ও ভালোবাসার কথা সারাজীবন মনে রেখেছি।

এরপর কলেজে অনুষ্ঠিত একটি উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় ফিফথ ব্যাচের ক্যাডেট ফতেহ আবদুল্লাহ্‌ ভাইয়ের টপিক পড়েছিলো, ‘সেদিনের ভূমিকম্প’। মনে আছে যে, ভূমিকম্পে সংঘটিত সবগুলো হাস্যরসকর ঘটনা ফতেহ ভাই বেশ মজা করে বর্ণনা করেছিলেন বক্তৃতায়, আমরা সবাই বেশ আমোদ পেয়েছিলাম। হতাহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। কেউ আহতও হয়নি! ইউজুয়ালী এই ধরনের ভয়াল ঘটনা পরে মুখে মুখে রূপ নেয় মজাদার বর্ণনায়। ঐ ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছিলো!

পরবর্তি ভূমিকম্পটি হয়েছিলো ১৯৮৮ সালে। তা ছিলো আরো ভয়াবহ! আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের ১৯৮৮ সালের বহুল প্রচলিত সংবাদ ছিলো ‘৮৮-র বন্যা। কিন্তু বন্যার আগে আগে একটা কলিজা কাঁপানো ভূমিকম্পও হয়েছিলো বাংলাদেশে, যা আজ বিসৃত হয়ে গিয়েছে! এই সিরিজের পরবর্তি পর্বে ১৯৮৮ সালের সেই কলিজা কাঁপানো ভূমিকম্প সম্পর্কে লিখবো।

(চলবে)
—————————————————
রচনাতারিখ: ৬ই নভেম্বর, ২০১৯
সময়: রাত ১টা ৪৫মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.