ভালোবাসার ইমারত (১৪)

ভালোবাসার ইমারত (১৪)
——————– রমিত আজাদ

আমরা কি একা?
আমাকে একবার এক মুরুব্বী বলেছিলেন যে, “এই দুনিয়ায় আমরা প্রত্যেকেই একা। একটা মিছিলে হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মানুষ থাকে; বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে যেন সবাই সবার, আসলে কি তাই? ঐ অত বড় মিছিলেও প্রত্যেকেই একা।” কথাটা আমার মনে খুব দাগ কেটেছিলো। এই নিয়ে এখনো মাঝে মাঝে ভাবি! এদিকে, একটি বিশাল ইমারতে থাকতাম আমরা তিনশত জন। ওখানে আমরা প্রত্যেকেই কি একা ছিলাম? এই কিছুদিন যাবৎ, আমার ভিন্নরকম মনে হচ্ছে। ইমারতগুলো ভাঙা হবে বলে যখন ঘোষণা দেয়া হলো, সাথে সাথেই সকলে মিলে ইমারত ও কলেজকে ঘিরে নানাভাবে যার যার আবেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে; জেগে উঠেছে অদ্ভুত এক ভাবপ্রবণতা! রি-ইউনিয়নের দিন যতই ঘনাচ্ছে উথলে উথলে উঠছে সবার আবেগ! মনে হচ্ছে, ওর কথাই আমার কথা, আমার কথাই ওর কথা! সবাই মিলে যেন হয়ে উঠেছে ‘এক পতাকার রঙ’! আর একজন উপরওয়ালাতো রয়েছেনই, যিনি গহীন জঙ্গলে, কিংবা সুউচ্চ পর্বতেও পাঠিয়ে দেন লৌকিক-অলৌকিক সব সাহায্য। না, আমরা একা নই!

১৯৮৮ সালের ভূমিকম্প:
ভূমিকম্পটি হয়েছিলো ১৯৮৮ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী। সিলেট পাহাড়ী অঞ্চল, তাই ভূমিকম্পপ্রবণ। আমার জীবনে দেখা এটাই ছিলো সবচাইতে বড় ভূমিকম্প! ছিলো ওয়ার্কিং ডে, তাই রাতে স্বভাবতই ক্যাডেট কলেজে চলছিলো প্রেপ ক্লাস। ডিনারের পর, মানে সন্ধ্যা সাড়ে আট-টার পর আমরা দ্বিতীয় প্রেপ ক্লাস করছিলাম। ক্যাডেটরা সবাই ছিলাম এ্যাকাডেমিক ব্লকে ক্লাসরুমগুলিতে। ক্লাসরুমে আমি বসতাম প্রথম সারিতে, দরজার কাছাকাছি। এসময় আমাদের ক্লাসের হাসিখুশী বন্ধু মোর্শেদ দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছিলো। হঠাৎ শুনি পিছনে আওয়াজ। পিছনে ফিরে তাকালাম। দেখি সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দরজা দিয়ে পালাচ্ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝতে পারলাম না। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সবার দেখাদেখি আমিও দৌড়াতে লাগলাম। দরজা পার হয়ে করিডোরে এসে শুনি পিছন থেকে তানভীর রকিব চিৎকার করছে, “ভূমিকম্প, ভূমিকম্প!!!” ভয়ে আত্মা উড়ে গেলো! করিডোর পার হয়ে মাঠে গিয়ে নামলাম। করিডোরের রেলিং পার হয়েছি ডিঙ্গিয়ে না লাফিয়ে কিচ্ছু মনে নাই, জানের মায়ায় এমনই উদভ্রান্ত ছিলাম। এরকম বিপজ্জনকভাবে রেলিং পার হলে পা ভাঙ্গার কথা, উপরওয়ালা বাঁচিয়েছিলেন সেদিন! তারপর নিজেকে আবিষ্কার করলাম যে, যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি সেটা মাঠ ঠিক নয়; এ্যাকাডেমিক ব্লক ও অডিটোরিয়ামের মাঝখানের এক চিলতে জায়গা। হায় কপাল! আশ্রয় নিতে ছুটলাম এমন এক জায়গায় যা অধিকতর বিপজ্জনক। এখন দালান-কোঠা ভেঙ্গে পড়লে চারদিক থেকেই আমার মাথার উপর পড়বে। বাঁচার কোন আশা আর থাকবে না! এত বিশাল ক্যাম্পাসে এত এত খোলা জায়গা থাকতে আমি কিনা ছুটলাম ঐদিকে!!??

এরকম পরিস্থিতিতে সম্বিৎ ফিরে পেতে সময় লাগে। যখন সম্বিৎ ফিরে পেলাম, তখন দেখলাম আমার চারদিকে আরো অনেকেই আছে। সবাই হয়তো আমার মতই ভাবছে আমরা পরিমরি করে এই চিপায় ঢুকলাম কেন! একজন দৌড়ে বড় মাঠের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো; তাকে আবার অন্যরা ঠেকালো, “এখন দৌড়াদৌড়ি করিস না, হঠাৎ আবার কম্পন হলে!” এদিকে দু’একজনকে দেখলাম দোতলায় সানশেডের উপর দাঁড়িয়ে! সিঁড়ি দিয়ে নামারও সাহস হয়নি। একজন ভয়ে উপর থেকে লাফ দিতে চাইলো। এবার আরেক ঝক্কি! লাফ দিতে গিয়ে ও যদি আহত হয়! ছেলেটি আমাকে ভালো মানতো। আমি চিৎকার করে বললাম, “লাফ দিস না!” তারপর কেউ একজন ওকে উপর থেকে নীচে নামিয়ে আনলো। কিন্তু ও অনেকক্ষণ সাইকোলজিকালি শংকিত ছিলো!
আসলে নিজেরাই বুঝতে পারছিলাম না যে, কি করতে হবে! তখন আমরা ছিলাম ক্লাস টুয়েলভে মানে সিনিয়র মোস্ট। সব দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে।

কিছুক্ষণ পর স্যাররা ছুটে এলেন। উনাদের নিজ নিজ পরিবার আছে, ছোটছোট ছেলেমেয়েরা সেখানে আছে, তারপরেও উনারা আমাদের যত্ন করতেই ছুটে এলেন। ব্যাচেলর শিক্ষকরা সবার আগে ছুটে এসেছিলেন। এমনকি কলেজের একমাত্র ম্যাডাম জনাবা মুনিরা পারভীনও এলেন। উনাদের পরপর এলেন বৃদ্ধ প্রিন্সিপাল স্যার অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, এবং অপর বৃদ্ধ ভাইস-প্রিন্সিপাল স্যার অধ্যাপক আবুল আশরাফ নূর। এলেন এ্যাডজুটেন্ট স্যার মেধাবী মেজর আমীন। আমাকে বললেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে, দোতলায় কাউকে রাখা যাবে না। সবাইকে নীচতলায় নামিয়ে আনতে হবে। শুধু ক্লাস ইলেভেন দোতলায় থাকবে, কারণ ওরা বড়। ক্লাস সেভেন ও এইটকে নিতে হবে অডিটোরিয়ামে। ক্লাস নাইন কম্বাইন্ড ক্লাসে, ইত্যাদি। আমি ছুটাছুটি করে দ্রুত সব নির্দেশ পালন করলাম। আমার সাথে ছুটলো আমাদের ব্যাচের কলেজ প্রিফেক্ট মাহবুবুল ওয়াদুদ ও অন্যান্য প্রিফেক্টরা। ছোটদের সফলভাবে স্থানান্তর করার পর, ক্লাস ইলেভেন-এর কয়েকজন এলো (মারুফ তাদের মধ্যে ছিলো মনে আছে)। দুষ্টামীর ছলে হাসি হাসি মুখে বলে, “সবাই নীচে নামলো, আমরা কেন দোতলায় থাকবো?!” দাঁড়িয়ে ছিলেন সহজ সরল শিক্ষক জনাব রিয়াজউদ্দীন প্রামাণিক স্যার। ওদের আবদার শুনে স্যার কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। বললেন, “তোমরা তো বড়!” ওরা দুষ্টুমীর হাসি মুখে নিয়ে বলে, “ভয় পাইছি স্যার! ভয় পাইছি!” স্যার এবার অসহায় দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। প্রিন্সিপালের নির্দেশ ছাড়া তিনি কি অনুমতি দিবেন তাই ভাবছিলেন! পরিস্থিতি এম্নিতেই নাজুক! আমি সাহস করে বললাম, “ঠিক আছে স্যার, ওরা যখন ভয় পেয়েছে তাহলে নীচে নামুক। অনুমতি দেন স্যার।” স্যার জানতে চাইলেন কোন রুমে ওদেরকে জায়গা দেয়া যায়? আমি একটা জায়গা খুঁজে বের করলাম। ব্যাস ওরা হইহই করে নেমে গেলো। ওদের দেখে মনে হলো যে, ভূমিকম্পে ওরা ভয় পায়নি, আমোদ পেয়েছে।

কম্বাইন্ড ক্লাসে আমাকে রাখা হলো, জুনিয়রদের শান্ত করতে। আমি কি বলবো বুঝতে না পেরে ওদেরকে ভূমিকম্প কি, কেন হয়, ইত্যাদি বিষয়ে বলে ব্যাস্ত রাখলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম যে, ভূমিকম্পটি স্থায়ী হয়েছিলো মাত্র ৩৮ সেকেন্ড।

প্রেপ ক্লাসের টাইম শেষ হলে, আমরা হাউজে ডরমিটরিতে ফিরে গেলাম। কারো মুখে তেমন কোন কথা ছিলো না। আশ্চর্য্য বিষয় হলো, ঐ রাতটা ছিলো ভীষন থমথমে! একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও শব্দ করেনি একটা পাখিও ডাকেনি। ১৯৮৬ সালের ভূমিকম্পে যেমন কয়েকদিন আগে থেকে দিনের বেলায় শিয়াল ডাকছিলো, এবারও কয়েকদিন আগে থেকেই দিনের বেলায় শিয়াল ডাকছিলো। তখনই কেউ কেউ বলছিলো, ‘ভূমিকম্প হবে!’ প্রকৃতির কি এক খেয়াল। ভূমিকম্প-এর পূর্বাভাস দেয়ার মত কোন যন্ত্র মানুষের হাতে নেই, তাই প্রকৃতি তার কিছু জন্তু-প্রাণীর মাধ্যমে আগাম জানিয়ে দেয় ভূমিকম্প-এর সংবাদ।

সব ক্যাডেট খুব আতংকে ও উদ্বেগে বিছানায় গিয়েছিলো। দুশ্চিন্তায় কারো ঘুম হওয়ার কথা না! সবাই যার যার রুমে শুয়ে পড়ার পর রফিক কায়সার স্যার আমাকে বললেন, “শোন রমিত, এই দালানগুলোর স্ট্রাকচার খুব শক্ত। সহজে ভেঙ্গে পড়বে না! যদি রাতে আবার কম্পন হয়, তুমি করবে কি, সকলকে একত্রিত করে লাইন করে নীচে নামিয়ে মাঠে নিয়ে যাবে। কোন প্যানিক যেন না হয়। কি পারবে না?” আমি সুবোধ বালকের মত মাথা ঝুঁকিয়ে বললাম, “জ্বী স্যার, অবশ্যই পারবো।” এদিকে মনে মনে ভাবছি, ‘স্যার, ভূমিকম্প হলে জানের মায়ায়, ওরা যাবে কৈ আর আমি যাবো কৈ!!!’

যাহোক রাত এগারোটার দিকে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে বলে হলে। আমি দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে ওয়াচ করছিলাম। ভাবছিলাম আজ রাতে আমার ঘুমানো চলবে না। যদি আবার কিছু হয়! নজর রাখতে হবে, দায়িত্ব বলে কথা! করিডোরে আমি যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিলাম ঠিক তার উল্টা দিকে বিশাল ইমারতের একতলায় দাঁড়িয়ে ছিলো আমাদের ব্যাচের অপর একজন। আধো অন্ধকারে তাকে দেখা যাচ্ছিলো। সেখানে থেকে সে কম্পিত কন্ঠে আমাকে ডাকলো। আমি প্রথমটায় ভাবলাম ও হয়তো ঠাট্টা করছে! এত সাহসী ও দীর্ঘদেহী মানুষের তো এতটা ঘাবড়ানোর কথা না! পরে বুঝলাম, না সে সত্যিই শংকিত! এবার আমি অবাকই হলাম। আসলে হিউম্যান সাইকোলজি খুব মারাত্মক একটা জিনিস! পরিস্থিতি একটা মানুষকে বেমালুম বদলে দেয়! আমি দোতলা থেকে নীচে নেমে গিয়ে ওকে সাহস যোগালাম। আসলে ভয় আমি কারো চাইতে কম পাইনি, কিন্তু ঐদিনকার পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়েছিলো, দায়িত্ব পালন করাটাই বড়, এর জন্য প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে!

এই ভূমিকম্প আতংক পরবর্তি আরো কয়েকদিন ছিলো! ঐ কয়েকদিনের জমজমাট আলোচনা ছিলো, সামনে আরো বড় ভূমিকম্প আসতে পারে কারণ এটা নস্ট্রাদেমুস-এর ভবিষ্যদ্বাণী। তখন একটা মার্কিন ফিল্ম খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো, কোন এক ইউরোপীয় জ্যোতিষী নাকি কি সব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত! সবই নাকি মিলেছে! এই হলিউডি ফিল্মের নাম, ‘দ্যা ম্যান হু স টুমরো (নস্ট্রাদেমুস)’।

যাহোক, রফিক কায়সার স্যারের কথা এই কয়দিন বারবার মনে পড়ছে, “এই দালানগুলোর স্ট্রাকচার খুব শক্ত। সহজে ভেঙ্গে পড়বে না!” তাইতো শত ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প কোন কিছুই তো ইমারতগুলিকে ভাঙ্গতে পারেনি! তীব্র ভূকম্পনেও তারা টিকে ছিলো।ইমারতগুলো আমাদেরকে আগলে রেখেছিলো মায়ের মত। আমাদের দিয়েছিলো সুরক্ষা। আজ আমরাই তাদেরকে ভাঙতে যাচ্ছি!!!

যুগে যুগে দার্শনিকেরা বলে এসেছেন যে, রাজপ্রাসাদই দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু। আমরা যেই ইমারতগুলোতে থাকতাম সেই সময়ের হিসাবে তা রাজপ্রাসাদই ছিলো। তবে আমাদের শিক্ষকেরা আমাদেরকে কোন দুর্নীতি শেখাননি, যা শিখানোর চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন তা সুনীতিই ছিলো। তাঁরা সব সময়ই বলতেন, “দেশের মানুষের টাকায় তোমরা পড়ালেখা করছো, এটা মনে রেখে ভবিষ্যতে দেশের মানুষের সেবা করার চেষ্টা করবে।” এই পৃথিবীতে অনেক খ্যাতিমান ব্যাক্তিরই জন্ম হয়েছিলো রাজপ্রাসাদে, কিন্তু তাঁরা শান্তিপূর্ণ ও নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য রাজপ্রাসাদের দুর্নীতি থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে এনেছিলেন। উনারা প্রাজ্ঞ ব্যাক্তি ছিলেন। কেউ কেউ প্রাসাদ থেকে ধুলিমলিন পথে নেমে এসে সাধারণ মানুষদের সাথে মিশে গিয়ে তাদেরকে এনলাইটেন করেছিলেন। সেটাই ছিলো প্রজ্ঞা! দরিদ্র দেশের দরিদ্র জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে অধ্যায়ন করা এক্স-ক্যাডেটদের দায়িত্ব হতে হবে দেশের আপামর জনসাধারণের সাথে মিশে গিয়ে তাদেরকে এনলাইটেন করা।

আলোক মানে প্রজ্ঞা, আলোক মানে সত্য, আলোক মানে মঙ্গল; আমরা ‘আলোকের অভিসারী’!
(চলবে)
—————————————————
রচনাতারিখ: ৬ই নভেম্বর, ২০১৯
সময়: রাত ৯টা ১৪ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.