ভালোবাসার ইমারত (৩)

ভালোবাসার ইমারত (৩)
——————– রমিত আজাদ

ইমারতের ঐ বিশাল দেহের অভ্যন্তরের শত কুঠুরির একটিতে স্থান পেলাম। আমার সাথে আরো তিনজন মানব সন্তান। জীবনে ঐ প্রথম পরিবারের বাইরে থাকা। পরিবারের বাইরে আরেকটি পরিবার। ঘরের বাইরে আরেকটি ঘর। যা অল্প সময়ের মধ্যেই পরিণত হলো আমাদের ‘সেকেন্ড হোম’-এ।

আমার রুমের জানালা দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য কিছুটা কম দেখা যেত। দালান-কোঠা দেখা যেত বেশী। তবে করিডোরে বেরিয়ে এলেই দেখা যেত, অপূর্ব একটি দৃশ্য! পাহাড় আর আকাশের মন-মিতালী। মন খারাপ হলে, প্রকৃতি প্রেমিক আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঐ নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতাম। ক্যাম্পাসের দেয়ালের ওপাশে পাহাড়ের এক জায়গায় দেখতাম একটা বাঁশের উপর লাল পতাকা টানানো আছে। ঐ খালি জনমানবহীন স্থানে হঠাৎ মাজার টাইপ পতাকা কেন বুঝতাম না! তবে দেয়ালের ঐ জায়গাটা ভাঙা ছিলো, ও ঐ পথে মাঝে মাঝে মানুষের চলাচল দেখতাম। ভাবতাম, ওরা ঐদিকে কোথায় যায়?

ছাত্রাবাস ইমারতটির তিনটি তলার মধ্যে চলাচল নিষিদ্ধ ছিলো। মানে বিনা অনুমতিতে একতলা থেকে আরেকতলায় যাওয়া নিষেধ ছিলো। যদিও তিনটি তলার মধ্যে তিন জায়গায় নানা আকৃতির তিনটি সিঁড়ি ছিলো। কারণ জানতে পেরেছিলাম যে, তিনটি তলায় তিনটি ভিন্ন ভিন্ন হাউজ। ক্যাডেট কলেজীয় আইনে ইন্টার হাউজ ভিজিটিং নিষিদ্ধ! তারপরেও ঐ চলাচল হতো কিছু মাত্রায়। কারণ সেই সময়ে কলেজের ডাইনিং হল ও মসজিদ নির্মিত হয়নি। ইমারত-টির তিনতলায় বিশাল হলরুমে (যেটাকে এখন হাউজের কমনরুম হিসাবে ব্যবহার করা হয়) ছিলো মসজিদ, এবং একতলার বিশাল হলরুমে ছিলো ডাইনিং হল। আর দোতলার হলরুম-টিকে তিনটি হাউজের-ই কমনরুম হিসাবে ব্যবহার করা হতো। এছাড়া তিনটি হাউজেই পৃথক পৃথক টিভি রুম ও স্টাডি রুম ছিলো। ছিলো একটি স্টোর রুম। প্রতিটি তলায় দুই জায়গায় ছিলো গোছলখানা ও শৌচাগার। তবে পিক হাওয়ারে গোছলখানায় স্থান সংকুলানের সমস্যা হতো। প্রয়োজনে কিউ দিতে হতো। এই সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে, পরবর্তিতে একতলার একস্থানে দালানের বাইরে কিছু কল দিয়ে দেয়া হয়েছিলো। ঐ একতলায়ই আবার ডাইনিং হলের একপাশে ছিলো বেকারী। কলেজের ছিলো নিজস্ব পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। প্রথম দিকে সেখানে আসতো পাহাড়ী আয়রনসমৃদ্ধ লাল রঙের খর পানি। তবে পরে সাদা পানির উৎস খুঁজে বের করা হয় ও আয়রন পানি দূর করা হয়। একতলায় একটা আজব টিউবওয়েল ছিলো, যেখান থেকে বিনা চাপেই দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই পানি ঝরতো। আমি প্রথম প্রথম ভাবতাম এতো সুপেয় পানির বিশাল অপচয়! পরে ভূগোল ক্লাসে শ্রদ্ধেয় মাসুদ হাসান স্যার পড়িয়েছিলেন যে, পাহাড়ী এলাকায় এরকম কিছু জায়গা থাকে যেখানে পানির চাপের কারণে আপনা-আপনিই পানি বের হতে থাকে প্রাকৃতিকভাবেই। কারণটিও তিনি ছবি এঁকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। প্রতিটি হাউজেই ছিলো একটি করে হাউজ অফিস। সেখানে বসতেন জনাব হাইজ মাস্টার ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমন্ডলী।

সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ হলো তার অবিরাম বৃষ্টি। আমরা একে বলতাম বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি!!! আকাশ রৌদ্র ঝলমল, বলা নেই কওয়া নেই ঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো! অথবা সেই যে বৃষ্টি শুরু হলো, আর থামার নাম নেই ঝরছে তো ঝরছেই। একটা গান আছে, ‘আষাঢ়-শ্রাবণ মানে নাকো মন, ঝরো ঝরো ঝরো ঝরো ঝরেছে, তোমাকে আমার মনে পড়েছে’। তবে সিলেটের বৃষ্টি শুধু আষাঢ়-শ্রাবণ না, বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, কিছুই বাদ দিতো না, আঝোরে কেবল ঝরতোই! জানলাম পৃথিবীর সবচাইতে বৃষ্টিবহুল স্থান ‘চেরাপুঞ্জী’-র খুব কাছেই অবস্থান সিলেটের। বৃষ্টি নিয়ে আমার কোন অভিযোগ ছিলো না। গানের কথা মত, আমাদের ঐ বয়সে মনে পড়ার মত কেউ ছিলো না, তবে বৃষ্টি কামনা করতাম সকালের দিকে। সকালের দিকে বৃষ্টি হলে মজাই ছিলো, দুই মাইলের বাধ্যতামূলক দৌড়টা থেকে বেঁচে যেতাম। তবে পিটির মাফ ছিলো না, ড্রিলেরও মাফ ছিলো না। তাই অত্যাচার শুরু হতো ইমারতের উপর। হাউজ বা এ্যাকাডেমিক ব্লকের করিডোরেই চলতো পিটি বা প্যারেড। আশ্চর্য্য বিষয় হলো ইমারত এতই চওড়া ছিলো যে, করিডোরের এ’মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত তিনশত ক্যাডেটের দাঁড়ানোর জায়গা হয়ে যেত। আর বৃষ্টি যদি হতো ছুটির দিনে তাহলে তো কথাই নেই, আরামসে ঘুমাতাম ব্রেকফাস্ট পর্যন্ত! বৃষ্টিঘুম দেয়ার আরেকটি সুন্দর সময় ছিলো ছুটির দিনে লাঞ্চের পর। বিশাল ইমারতে শ’ খানেকের বেশী রুম। প্রতিটি কুঠুরীতেই গড়ে তিনজন করে কিশোর-যুবা-রা ঘুমাচ্ছে। পুরো ইমারতটি পরিণত হতো ঘুমপূরীতে!

ক্যাডেট জীবনে রুটিন লাইফ। রুটিন লাইফ নিরানন্দ হয়, পেপে ভাজি দিয়ে ভাত খাওয়ার মত বিস্বাদ! মানুষ সম্ভবত কিছুটা এলোমেলোতা পছন্দ করে! আর পছন্দ করে রহস্য! ভর্তির মাসখানেকের মধ্যেই আমরা সেই রহস্যের সন্ধান পেলাম! শিউরে উঠলাম সবাই! এত টিপটপ ইমারতগুলির মধ্যেও এমন দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে আছে! একটা ঘটনা ঘটে গেলো এক রাত্রে। সেটা মাঝরাত হবে, আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো, স্পষ্ট শুনতে পেলাম একটা বিড়ালের কান্না। আশেপাশে বিড়াল কান্না করতেই পারে, সেটাতো ব্যাপার না। কিন্তু আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম যে, বিড়ালটি আমাদের রুমের জানালা দিয়ে প্রবেশ করলো, তারপর কাঁদতে কাঁদতে রুমের ভিতর দিয়ে হাটতে হাটতে আমার বিছানায় ঠিক আমার মাথার পাশ দিয়ে হেটে গেলো। তারপর করিডোরের পাশের জানালাটা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো!

পরদিন আমাদের রুম লীডার ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ভাইয়া, এই কলেজে কি কেউ মারা গিয়েছে?” তিনি চমকে আমার দিকে তাকালেন। আমার অন্য রুমমেটরাও আমার দিকে তাকালো। মশিয়ুর ভাই বয়সে আমাদের চাইতে মাত্র একবছর বড় হলেও যথেষ্ট ম্যাচিয়ুরড ছিলেন। সম্ভবত তিনি আমাকে আতঙ্কিত করতে চাইলেন না। তাই শান্তভাবে বললেন, “না, তেমন তো কিছু নয়। তবে এটা যখন রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল ছিলো তখন ‘নাদিম তানভীর’ নামে একজন মারা গিয়েছিলো। এইটুকুই, এর বেশী কিছু না।” মশিয়ুর ভাই নিশ্চয়ই মূল ভয়ের বিষয়টি জানতেন, তবুও আমরা ঘাবড়ে যাবো বলে বড় বিষয়টি জানাতে চাইলেন না তিনি। কিন্তু অন্য একজন ঠিকই জানিয়ে দিলেন একদিন। বিছানার উপর আসন পেতে যুৎ মত বসে তিনি বললেন, “তোমরা তো জানোনা, এই ইমারতগুলির মধ্যে ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটেছে!” আমরা ভয় পেয়ে বললাম, কি ঘটেছে? তিনি রহস্য করে বললেন, “হা হা হা! যুদ্ধের সময় এই ইমারত ছিলো, পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্প। এখানেই তো চলতো সব হত্যাকান্ড!” আমরা শিউরে উঠে বললাম, “তারপর?” তিনি আরো ঘনিয়ে বললেন, “তারপর? তারপর নিহতদেরকে মাটিচাপা দেয়া হতো!” আমরা আরও ভয়ে বললাম, “কোথায়?” তিনি বললেন, “ঐ যে তাকাও। লালা পতাকাটা দেখতে পাও।” আমরা তাকালাম, লালা পতাকা তো আগেই দেখেছি। তিনি বললেন, “এম্নি এম্নিই কি আর পতাকা টানানো হয়?! ওর নীচেই আছে গণকবর! ওখানেই সবাইকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। রাতে অনেকেই অনেক কিছু দেখে!” ভয়ে আতঙ্কে আমাদের সর্বাঙ্গ শিউরে উঠলো! তাহলে কি আমরা ভয়ংকর কিছু ইমারতের মধ্যে আছি???!!!
————————————————–
রচনাতারিখ: ৬ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: দুপুর ৩টা ৪১ মিনিট
——————————————————–

দুন্দুভি ঐ যায় শোনা যায়, ইমারতের গাত্রে রে,
ঝঞ্ঝা ঝুঁটি ঝলকে ওঠে অট্টালিকার পাত্রে রে!
কুঁচকাওয়াজের ডংকা বাজে, দুর্গসম নির্মাণে,
কিশোর বুকে শংকা জাগে, বিহ্বলতা নও মনে!

হাতছানি দেয় অট্টালিকা, আয়রে বাছা, আয়রে আয়!
আর কটা দিন থাকবো আমি, আর তো মোরে দেখবি নায়!
আমার বুকে নিরুদ্বেগে, থাকতি ঘুমে অকুতোভয়,
দিন ফুরালো এখন আমার, শেষ দেখাটা দেখবি আয়।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.