ভালোবাসার ইমারত (৬)

ভালোবাসার ইমারত (৬)
——————– রমিত আজাদ

কলেজের ইমারতগুলোর ছাদ ছিলো রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া। ছাদে ওঠা ছিলো নিষেধ। কারণ-টা খুব ক্লিয়ার, ছাদ বিপজ্জনক, কিশোররা ছাদে উঠে পড়ে যেতে পারে, তাই ছাদে ওঠা নিষেধ। সমস্যা হলো যে নিষেধাজ্ঞার প্রতিই মানুষের আকর্ষণ থাকে সবচাইতে বেশী। আমাদেরও ঐ প্রবণতা ছিলো। আমি বহুবারই ইমারতগুলোর ছাদে উঠেছি। একেবারে প্রথমবার উঠেছিলাম একজনার অনুরোধে বা প্রায় আদেশে। রেজিমেন্টাল লাইফ ক্যাডেট কলেজে সিনিয়রের কথা মানেই আদেশ। কিন্তু শর্ত হলো, সিনিয়রকে বৈধ আদেশ দিতে হবে। এক সন্ধ্যারাতে আমাকে একজন সিনিয়র ভাই বললেন, “তোমাকে সিক্রেটলি একটা কথা বলি। কারো সাথে শেয়ার করবে না। আমরা ফ্রেন্ডরা আজ রাতে ছাদে ঘুমাবো। একটা এ্যাডভেঞ্চার আর কি! তোমার কাজ হবে খুব ভোরে, আমাদেরকে ডেকে তোলা। যাতে পিটিতে যেতে দেরী না হয়। বুঝলে?” আমি বুঝলাম, তিনি আমাকে ট্রাস্ট করেই এই দায়িত্বটা দিচ্ছেন। তিনি ছিলেন স্বয়ং কলেজ প্রিফেক্ট। পুরো কথাটা তিনি বলেছিলেন আদেশের সুরে নয়, অনুরোধের সুরে। কলেজ প্রিফেক্ট আদেশের সুরেই বলতে পারতেন, কিন্তু ছাদে ঘুমানো ও ওঠা যেহেতু আইনি নয় তাই তিনিও অনুরোধের সুরেই বলেছিলেন। সেই রাতে আমার ঘুম ভালো হলো না, দু’টা কারণে; এক – উনার দেয়া দায়িত্বটা পালন করতে হবে, তাই সময় মত জাগতে হবে, দুই – অশরীরি আত্মার গল্প শুনে শংকিত ছিলাম বিশেষত ছাদের ব্যাপারে (ছাদে নাকি অনেকেই অনেক কিছু দেখেছে!) সেই ছাদেই আমাকে উঠতে হবে তাও ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

সেই ভোররাতে আমি জেগেছিলাম। জেগে ভাবছিলাম, ছাদের দরজায় তো তালা লাগানো থাকার কথা, খোলা পাবো কি? যাহোক আপাতত আমাকে যা বলা হয়েছে তাই করি। আমি ঐ ঘোর অন্ধকারে গুটিগুটি পায়ে মেইন সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলাম, দেখলাম দরজায় কোন তালা নেই, খোলা। কেন খোলা? সেই প্রশ্নটাও মাথায় আসলো। যাহোক, অনুরোধ রাখতে হবে। আমি মাত্র বারো/তেরো বৎসর বয়সের কিশোর, প্রবল ভয় নিয়ে ছাদে উঠলাম। তাকিয়ে দেখলাম চতুর্দিকে ঘন অন্ধকার! পূব দিকে টিচার্স কোয়ার্টারগুলো দেখা যাচ্ছে, পশ্চিম দিকে সুউচ্চ পাহাড়, গাঢ় অন্ধকার। প্রায় এইচ শেইপড ইমারতের ছাদে অনেকগুলি উইং, উনারা কোথায় আছেন কে জানে? আশা ছিলো উনারা পূবদিকের উইংয়ে থাকবেন। ঐদিকে ক্যাম্পাসের রাস্তা, সামান্য আলোও আছে, তাই ভয় কম। আমি উইংটির এদিক ওদিক গেলাম, নাহ্‌ জন-মনিষ্যির চিহ্ন মাত্র নেই! গা ছম ছম করে উঠলো! তাহলে কি এবার আমাকে পশ্চিম দিকের উইংয়ে যেতে হবে? ওরে বাবা, ঐদিকে পাহাড়, ঐদিকে গণকবর! আমাকে যদি এখন ভুতে ধরে?! যাহোক তারপরেও অনুরোধে ঢেকি গেলার জন্য ঐদিকে গেলাম পশ্চিম উইং-এর কাছাকাছি আসতেই শিয়াল বা কোন একটা বন্যপ্রাণী চিৎকার দিয়ে উঠলো, আমার আত্মা কেঁপে উঠলো! উঁকি দিয়ে ওখানেও কাউকে দেখতে না পেয়ে, দ্রুত ওদিকের সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম, এদিকটাতেও দরজা খোলা ছিলো! সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমার শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছিলো!

পরবর্তিতে ঐ ছাদে ভুতের সন্ধানে আমি আরো কয়েকবার উঠেছিলাম। এর মধ্যে একবারের অভিজ্ঞতা ছিলো ভয় আর হাসি মিশ্রিত। ঐ যে মাথার উপরে সিলিং-এ একটা রহস্যময় শব্দের কথা বলেছিলাম। সেটার রহস্যভেদ করার চেষ্টা করতাম। একরাতে লাইটস আউটের পর আনুমানিক রাত বারোটা হতে পারে, করিডোর দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি আর আমাদের ব্যাচের ‘ক’। সাহসী হিসাবে ‘ক’-এর অনেক নামডাক আছে। তিনি দৈহিক গড়নে বেশ বলশালী! যেকোন কাজে এ্যাডভেঞ্চারে তার অনেক সাহস। সেই রাতে হঠাৎ করে আমাদের রুমের বাইরে করিডোরের সিলিং-এ শুনতে পেলাম রহস্যময় শব্দটি। আমি ‘ক’-কে বললাম, “শব্দ শুনতে পাচ্ছিস? এই শব্দটার কথাই তোকে বলেছিলাম কিন্তু!” ও কান পেতে শব্দটা শুনে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো। আমি বললাম, “চল ছাদে যাই। শব্দটা ওখান থেকে হচ্ছে কিনা বোঝার চেষ্টা করি।” আমি যাওয়ার জন্য মুভ করতেই, ‘ক’ অস্থির হয়ে গেলো। ওর চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়ের ছাপ। আমাকে বললো, “না যাসনে।” সদা-সর্বত্র সাহসী মানুষের এহেন আচরণ দেখে আমি তো অবাক। মনে মনে ভেবেছিলাম, ওকে সাথে নিয়ে গেলে একটা জোর পাবো, এখন তো দেখি উল্টা। আমি গোয়ার্তুমি করে বললাম, “আচ্ছা তুই থাক, আমি একাই যাবো।” ‘ক’ খপ করে আমার হাত ধরে ফেললো। বললো, “না যাবি না।” আমি বললাম, “কেন?” ও বললো, “ওদের চিনিস না?! ওরা অশরীরি। তোকে ধরে ধপ করে ফেলে দেবে!” সেদিন মনে মনে খুব হাসি পেয়েছিলো, সাহসী মানুষের ভুতের ভয় দেখে। ম্যাচিয়ুরড লাইফে এসে বুঝেছিলাম, প্রতিটি মানুষই কিছু না কিছু ভয় পায়! কেউ ভুত ভয় পায়, কেউ সাপ ভয় পায়, কেউ ভয় পায় সামান্য তেলাপোকা-কে! আমি পরবর্তিতেও দেশে-বিদেশে অনেক ভয়াবহতার মুখোমুখি হয়েছি, হোলিগানের পাল্লায় পড়েছি, মস্কোর নির্জন এলাকায় লোডেড গানসহ একদল ইউনিফর্মধারীর পাল্লায়ও পড়েছিলাম, যারা অনেক সময় ভয়ংকর হয়ে উঠতো! তবে সবগুলি পরিস্থিতিতেই মাথা ঠান্ডা রেখে ট্যাকেল করেছি। তারপরেও কোন না কোন ভয় মনের মধ্যে কাজ করে। ভয়-টা মানুষের মনে অন্তর্নিহিত।

মাঝে মাঝে শীতকালে কোন এক ছুটির দিনে আমাদের ছাদে ওঠা এলাউ করা হতো। উদ্দেশ্য ছিলো, আমাদের বিছানার ম্যাট্রেসগুলো রোদে দেয়া যাতে ফাংগাস কেটে যায়। ঐদিন ছাদে খুব হৈচৈ আনন্দ হতো। একদিন আমার রুমমেইট অষ্টম ব্যাচের আবদুল্লাহ (বর্তমানে বৈমানিক) বুদ্ধি দিলো, “চলেন ভাইয়া, কম্বলগুলাও ছাদে রোদে দেই। সারাদিন তাপে গরম হবে, তারপর রাতে আরামের ঘুম হবে।” যেই কথা সেই কাজ। কম্বলের তাপে আরামেই ঘুমিয়েছিলাম ঐ রাতে।

একাডেমিক ব্লকের ছাদটা নিয়েও অনেক গল্প প্রচলিত ছিলো। কলেজ বিউগলারকে ঐ ছাদে উঠে ভোর বেলার রিভেলি (Reveille)-র বিউগল বাজাতে হতো। একবার গপ্পো শুনলাম যে, বিউগলার ছাদে ওঠার পর কোন এক অশরীরি তার গলা চেপে ধরেছিলো! আমি গিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি ভাই, কিভাবে ঘটলো ঘটনা? কে গলা চেপে ধরলো? টের পেলেন কিভাবে?” সে কিছুই উত্তর দেয় না। শুধু বিব্রত অনুভূতিতে তাকিয়ে থাকে! যাহোক একটু সিনিয়র ও লায়েক হওয়ার পর আমিও মাঝে মাঝে একাডেমিক ব্লকের ছাদে উঠতাম। তবে আমাকে কেউ গলা চেপে ধরেনি! ইমারতগুলোর ছাদগুলোর সাথে আমার ভাব ছিলো, তাদেরকে আমি চিরকাল মনে রাখবো। আমার সবচাইতে প্রিয় ছাদ ছিলো, লাইব্রেরীর পাশের ছাদটা। ওখান দাঁড়িয়ে দূরে জয়ন্তিয়া পর্বত দেখা যেত। নীচে সবুজ পাহাড় ও বনানী তার পিছনে সুউচ্চ নীলচে জয়ন্তিয়া পর্বত আর তার উপরে সাদা সাদা মেঘ, ও তার উপরে গাঢ় নীল আকাশ। প্রকৃতি ও তার রঙের মিতালীতে এত অপূর্ব দৃশ্য, আমি আমার জীবনে কম দেখেছি। আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ সুন্দর দৃশ্যগুলোর মধ্যে ঐটি একটি।

(চলবে)
—————————————————–
রচনাতারিখ: ১০ই অক্টোবর, ২০১৯
সময়: দুপুর ১টা ৪৬ মিনিট
——————————————————–

অট্টালিকা হাতছানি দেয়, হাতছানি দেয় ইমারত,
দেখবি উঠে আমার ছাদে, নিসর্গ মা’র সু-সম্পদ?
সাক্ষী থাকে চন্দ্র-তারা, সাক্ষী থাকে সূর্যালোক,
নীড়-ভবনে ছড়িয়ে থাকে মাধুর্যেরই স্বপ্নলোক!

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.