ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ এমদাদ আলী এডভোকেট এম.এল.এ (১৮৯৩-১৯৭৭)

ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ এমদাদ আলী এডভোকেট এম.এল.এ (১৮৯৩-১৯৭৭):

মোহাম্মদ এমদাদ আলী এডভোকেট পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার কালিশুরি/কাছিপাড়া ইউনিয়নের পাতিলাপাড়া গ্রামে ১৮৯৩ সালের ১০জানুয়ারী এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মৌলবি ওয়াসিম উদ্দিন হাওলাদার ছিলেন একজন গৃহস্থ্য কৃষক। মাতা মোসাম্মৎ নূর-ই-হাসিনা বেগম তৎকালীন রক্ষনশীল পরিবারে থেকেও ঐ গ্রামে নারী শিক্ষার পথিকৃত ছিলেন। নারী শিক্ষা প্রসারে তিনি বাড়ীতে একটি মক্তব খুলেছিলেন ।

আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা,দেশপ্রেমিক,আত্মবিশ্বাসী,অকুতভয় সৈনিক ছিলেন মোহাম্মদ এমদাদ আলী। জ্ঞান,গড়িমা,ধৈর্য্য,মেধা,প্রজ্ঞা,অধ্যবসায়,সততা,দুরদর্শীতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত্য উঁচুস্তরের অসাধারন ব্যাক্তিত্ব। “শিক্ষার কোন বয়স নেই,শেখার কোন শেষ নেই ”এ প্রতিপাদ্যটির যথার্থতা তিনি নিজেকে দিয়েই প্রমান করেন। শৈশব থেকেই লেখাপড়ার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। তেলে সলতে জ¦ালানো কুপিবাতি-হেরিকেনের আলোতে বই পড়ে, মাটির দোয়াতে গুলানো কালিতে বাঁশের কঞ্চির কলম দিয়ে তালপাতায় লিখে ,রাস্তা না থাকায় বর্ষাকালে পানিগামছা পরিধান করে তাল গছের ডোঙ্গায় চড়ে হাওড়-বিলের মধ্য দিয়ে ৬/৭ মাইল দুরের পাঠশালায় পড়ালেখা করতেন। নরমাল পাশ করে প্রথমে শিক্ষকতা পরে পটুয়াখালীতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তিনি পটুয়াখালীর প্রথম দিকের মোক্তার । জনৈক হিন্দু উকিল তাকে মোক্তার হিসেবে হেয় জ্ঞান করায় উকিল হওয়ার অদম্য আগ্রহ জাগে তার মনে। সন্তানদের সাথে পুনরায় পড়াশুনা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ,এলএলবি এবং এডভোকেটশীপ পাশ করেন এবং বরিশাল ও পটুয়াখালীতে দীর্ঘ ৪৮বছর আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে স্বনামধন্য এডভোকেট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি উকিল হওয়ায় পাতিলাপাড়ায় তার গ্রামের বাড়ীর নামকরণ হয় উকিল বাড়ী। এলাকাবাসীর কাছে আজও সুপরিচিত।

তিনি পটুয়াখালী আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনেও তিনি পটুয়াখালীতে সাহসী নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনের সময় স্থানীয় গোপন বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পটুয়াখালী শহরের বড় জামে মসজিদ মহল্লায় তার বাসভবনে অনুষ্ঠিত হতো। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন তার তিন কন্যা কলাপাড়া বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এ.এন আনোয়ারা বেগম (প্রয়াত), গার্লস গাইডের সংগঠক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি জেবুননেছা করিম (প্রয়াত) এবং ডা.কামরুন নেছা (প্রয়াত)। এদের মধ্যে ডা.কামরুন নেছা ১৯৫২ সালে ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিলেন এবং ঢাকায় মিছিল করে গেফতার হলে ১৮দিন হাজতবাসের পর মুক্তিলাভ করেন।

১৯৫২ সালের ২২ফেব্রুয়ারী পটুয়াখালীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট,শহরে সর্বাত্মক শান্তিপূর্ন হরতাল পালিত হয়। ঢাকায় মিছিলে গুলি হয়েছে এই সংবাদে শহরে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারী করলে তা উপেক্ষা করে ২৩ ফেব্রুয়ারী পটুয়াখালী জুবিলী স্কুল মাঠে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি। সভায় ঢাকায় গুলিবিদ্ধ ছাত্রের রক্তমাখা জামা প্রদর্শন করে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আশরাফ। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন,খন্দকার আবদুল খালেক, আলী আশরাফ, এটিএম ওবায়দুল্লাহ, বিডি হাবিবুল্লাহ, এবিএম আবদুল লতিফ, এডভোকেট গোলাম আহাদ চৌধুরী। সভার শেষে শহরের সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভ মিছিল। আন্দোলনের অংশ নেয় পটুয়াখালীর সাথে ঢাকার যোগসূত্র রক্ষা করতেন বাউফলের কৃতি সন্তান এবিএম আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আশরাফ।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি বাউফল-পটুয়াখালী নির্বচনী এলাকা থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বাউফলের রামনগর নিবাসী মুসলিম লীগের খান বাহাদুর আক্রাম আলী খান। ঐ সময়ে পার্লামেন্টে তিনিই প্রথম পটুয়াখালীর রাবনাবাদ চ্যানেলে(বর্তমান পায়রা বন্দর এলাকা) একটি সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠার দাবী তুলে জোরালো বক্তব্য রাখেন। আজ তা বাস্তবায়ন হতে চলছে। তারই অবদানে বগা-কাছিপাড়া-ছিটকা-কালিশুরি-বাহেরচর সড়কসহ এলাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নির্মিত হয়। তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি পটুয়াখালী বারের সভাপতি ও পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক নাগরিক দ্বায়িত্ব পালন করেন। দেশপ্রেমের ব্যপারে তিনি কখনো আপোষ করেননি। পরিবারের সদস্যদেরও একই চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নেয়ায় হামলা নির্য়াতন হয়রানির শিকার হয় তার পরিবার।

খুলনায় সেজো মেয়ে ভাষাসংগ্রামী জেবুন্নেছা করিমের বাড়িটি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করতে দেয়ায় পাকহানাদার দ্বারা আক্রান্ত হয়। তখন তিনি সন্তানদের নিয়ে কোনক্রমে পালিয়ে পটুয়াখালী আসেন। ঢাকায় মেজো মেয়ে সানিয়া হকের বাসায়ও তখন কয়েক দফা তল্লাশী হামলা হয়। যুদ্ধে নির্যাতিত হয় পুত্র আফজাল ইমাম। পরিবারের সকলেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে সকলেই কোন না কোনভাবে দেশসবা দিয়ে আসছেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকার পাশাপাশি জীবন সংগ্রামেও নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন এমএলএ মোহাম্মদ এমদাদ আলী এডভোকেট। ১৯৭৭ সালের ২৫ নভেম্বর পটুয়াখালী শহরের মসজিদ মহল্লায় নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন। পাতিলাপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।

তিনি ৬ কন্যা ও ৫ পুত্র সন্তানের জনক । তার কন্যারা সকলেই উচ্চ শিক্ষিত ও মেধাবী। কন্যারা: ভাষা সংগ্রামী এএন আনোয়ারা বেগম বিএবিএড শিক্ষিকা (প্রয়াত), বেগম সানিয়া হক আর্টিষ্ট (স্বামী পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’-র নিউজ এডিটর ও প্রতিষ্ঠাতা মোজাম্মেল হক ১৯৬৫ সালে কায়রোতে বিমান দূর্ঘটনায় নিহত হন), ভাষা সংগ্রামী এডভোকেট জেবুন নেছা করিম গার্লস গাইড সংগঠক (প্রয়াত), ভাষা সংগ্রামী ডা. কামরুন নেছা এমবিবিএস (প্রয়াত), ফরিদা খানম এমএ (স্বামী বজলুর রহমান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক), ইসমত আরা এমএঅনার্স (প্রধান শিক্ষিকা)। পুত্রগন হলেন ফরহাদ ইমাম (প্রয়াত), আফজাল ইমাম (ব্যবসায়ী), সৈয়দ এনায়েতুর রহমান (পটুয়াখালীর বিশিষ্ট সাংবাদিক), সৈয়দ ইনামুর রহমান (ব্যবসায়ী), আলহাজ সৈয়দ এরশাদুর রহমান (ব্যবসায়ী)। তারাও সুশিক্ষিত ও সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত।

নাতী-নাতনীসহ পরিবারের নতুন প্রজন্মের সদস্যরাও তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, চেতনা ও আদর্শের গর্বিত অংশীদার হয়ে দেশ সেবায় অনন্য অবদান রাখছেন।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.