রেইনা ১, ২ ও ৩ :একটি প্রেমের গল্প

রেইনা ১, ২ ও ৩ :একটি প্রেমের গল্প

———–ডঃ রমিত আজাদ

রেইনা ১

কবরস্থানের খুব কাছেই হোষ্টেলটি। এই বিষয়টি আমার ভালো লাগেনি। জর্জিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দয্য অপূর্ব। এর রাজধানী ‘তিবিলিসি’। মানুষের হাতে গড়া নিখুঁত পুরাতন ও আধনিক দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট আর বিধাতার হাতে গড়া মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য এই দু’য়ের সমন্বয়ে শহরটি হয়ে উঠেছে অপরূপ। বিদেশে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে আসা। তারই একটি রিপাবলিক জর্জিয়া পার্বত্য অঞ্চল, ঠিক …। মস্কো থেকে চার রাত্রি, তিন দিনের ট্রেন ভ্রমন শেষে তিবিলিসি শহরে পৌঁছানোর পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যখন আমাদের রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে শহরের সড়ক বেয়ে নিয়ে যাচ্ছিল শহরের এক প্রান্তে থাকা বাগেবী ষ্টুডেন্টস্ টাউনের দিকে, বাসের জানালা দিয়ে দু’পাশের শহরের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ বেয়ে বাস যখন পৌঁছাল শহরের এক প্রান্তে। হঠাৎ করেই শুরু হলো কবরস্থান। খুব পরিচ্ছন্ন, টিপ-টপ, সাজানো-গোছানো হলেও কবরস্থান কবরস্থানই। কবরস্থান শব্দটির সাথে নিস্তদ্ধতার গভীর সম্পর্ক। যেখানে জীবন নাই, তাই কোন গতিও নাই। গতিহীনতা আর শব্দহীনতার নিস্তদ্ধতা। কবরস্থান শেষ হতে না হতেই ফুটে উঠল ’বাগেবী ষ্টুডেন্ডস্ টাউন। এদেশে গাড়ী চলে রাস্তার ডান দিক দিয়ে। ডানে মোড় নিয়ে বাসটি ঢুকে গেল ষ্টুডেন্টস্ টাউনে। রাস্তার ডানে ষ্টুডেন্টস্ টাউন বামে পাহাড়ী বন। সত্যিই চমৎকার। কিন্তু কবরস্থানের খুব কাছে বলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। যদিও জীবন আর মৃত্যূ খুব কাছাকাছি, তারপরেও যতক্ষন জীবিত আছি মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে ইচ্ছা হয় না। ষ্টুডেন্টস্ টাউনটা শহরের বাইরে বলে, ট্রান্সপোর্টের সামান্য সমস্যা হয়। সিটি সার্ভিসের বাসগুলো প্রায় সবই শহরের শেষে এসে যায়, অর্থাৎ কবরস্থানটাই তাদের সীমানা। কেবল একটি নান্বারের বাস এবং একটি নাম্বারের মাইক্রোবাস ষ্টুডেন্টস্ টাউন পর্যন্ত যায়। শহর থেকে ফেরার পথে কখনো এই দু’টা ট্রান্সপোর্ট না পাওয়া গেলে, যে কোন বাস বা ট্রলিবাসে চড়ে শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আসা যায়। এরপর বাকী পথটুকু পাহাড়ের মধ্যে উপভোগ করতে করতে হেঁটে হেঁটেই চলে আসা যায়। কিন্তু আজ একটু সমস্যা হয়ে গেলে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ট্রলিবাস থেকে নেমে বুঝতে পারলাম আমি একাই এই বাস ষ্টপেজে নেমেছি। আশে-পাশেও কাউকে দেখতে পেলাম না। এদেশে এম্নিতেই মানুষ কম, এই মুহুর্তে আমার মনে হলো, এদেশে বোধ হয় কোন মানুষই নেই। এখান থেকে হেটে আমাকে হোষ্টেলে যেতে হবে। ঠিক করবস্থানের পাশ দিয়ে। ভাবতেই গাটা ছমছম করে উঠল। ভুত আমি কখনো দেখিনি, তারপরেও ভুতের ভয় মনে ঠিকই আছে। কোন লেখক যেন বলেছিলেন যে, ভূতকে অ¯বীকার করা যায় কিন্তু ভুতের ভয়টাকে অ¯বীকার করা যায় না। মোক্ষম বলেছেন, উনিও বোধ হয় আমার মত ভুতের ভয় পেতেন। আমি এখন ভাবছি, আমাকে এখন হোষ্টেলে ফিরতে হবে। বাস ষ্টপেজে তো আর রাত কাটানো যাবে না। হোষ্টেলে বন্ধু-বান্ধবেরা হয়তো এতখনে দুশ্চিন্তা করছে। সবচাইতে বেশী অস্থির হয়ে উঠছে রেইনা, আমার বিদেশিনী বান্ধবী। কি আর করা, বাস ষ্টপেজ ছেড়ে হোষ্টেলের দিকে হাট্তে শুরু করলাম। দু’তিন মিনিট পরেই হাতের ডানে কবরস্থান শুরু হলো। গা ছমছম করছে বা পাশে ঘন পাহাড়ী বন আর ডানপাশে কবরস্থান তার মধ্যে দিয়ে হেটে চলছি আমি একা। মনে মনে দোয়া-দরূদ পড়ছি আর চোখ-কান খোলা রেখে চলছি। চোখ-কান বন্ধ থাকলেই বোধ হয় ভালো হতো। কিন্তু তাতো আর হবার না। কানতো প্রকৃতিগত ভাবেই খোলা থাকে আর চোখ বন্ধ রাখলে চলা যাবে না। মিনিট পাঁচেক চলার পর যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হীম হয়ে গেল। একটি কবরের কাছে কালো একটি ছায়া মুর্তি নড়ে উঠল। থমকে গেলাম। কি করব বুছে উঠতে পারছি না। এখনই কি মুর্ছা যাব ? হঠাৎ করে ছায়া-মুর্তিটি স্পষ্ট রুশ ভাষায় বলে উঠল, “হে যুবা তোর কাছে সিগারেট হইবে ?” মনে প্রাণ ফিরে পেলাম। কবর থেকে উঠে আসা অশরীরি কিছু নয়। একেবারে রক্ত-মাংসের মানুষ। সন্ধ্যায় নির্জন কবরস্থানে ও করছে টা কি ? টলতে টলতে ও আমার দিকে এগিয়ে এলো, কথা বলার সময় শুনেছি ওর কন্ঠস্বরও জড়ানো ছিল। মাতাল! এবার বুঝলাম, মদ খেয়ে চুড় হয়ে কবরস্থানে বসে আছে। দিন-রাতের জ্ঞানও বোধ হয় এই মুহূতে নেই। তাকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে এবার অন্য ভয় ধরে বসল। ব্যাটা না আবার আমার উপর চড়াও হয়। মদ খেলে তো আর কান্ডজ্ঞান থাকে না। মাতাল অবস্থায় ভাই ভাইকে, স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা করেছে এমন তো হর হামেশাই শোনা যায়। ইসলাম ধর্মে মদ্যপান শুধু শুধু হারাম করা হয় নি। আমার কাছাকাছি এসে আরেকবার জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল “তোর কাছে সিগারেট হইবে?” আমি উত্তর দিলাম, “না আমি সিগারেট খাই না”। ওহ, তুইতো বিদেশী দেখিতেছি, সিগারেট খাস না কেন? যোগী সাধক নাকি! ” যা ভেবেছিলাম তাই, ওর কন্ঠস্বর এগ্রেসিভ, যে কোন মূহুর্তে মারমূখী হয়ে উঠতে পারে। রুশ বা জর্জিয়ানরা দীর্ঘকায়, আমার তিনগুন তো হবেই। এর সাথে হাতাহাতি শুরু হলে রক্ষা নাই । কোন কিছু ঘটার আগেই ঝেড়ে দৌড় দিলাম। পিছন থেকে ও ডাকছে, কি কি যেন বলছে কিন্তু টলায়মান পা নিয়ে আমার পিছনে পিছনে আসতে পারলো না। কিছু দূর এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার আমার কাছে ¯পষ্ট হলো ম্ত না, জীবিত মানুষই ভয়ংকর। হোষ্টেলে ফিরে দেখলাম সবাই মোটামুটি চিন্তিত। রেইনা উৎকন্ঠিত হয়ে আমার রুমে এসে বসেছিল। আমার রুমমেট সাইফুল আর বিদ্যুৎ তাকে অভয় দিচ্ছিল। আমাকে দেখে ওর মুখে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। ‘তুমি ফিরিয়াছ।’
ঃ হ্যাঁ
ঃ কোন সমস্যা হয় নাই তো ?
ঃ উঁ, কিছুটা। না, তেমন কিছুনা । তোমাকে পরে বলব।

রেইনা দক্ষিণ আমেরিকার মেয়ে। দেশের নাম বলিভিয়া। ছোট-খাট গড়নের, কিন্তু অদ্ভূত সুন্দরী। গায়ের রঙ ইউরোপীয়ানদের মত সাদা নয় আবার আমাদের মত শ্যামবর্ণও নয় এই দু’য়ের মাঝামাঝি। দীঘল চুলের রঙ কালো। আমার আগে ধারণা ছিল বিদেশী মেয়েরা লম¦া চুল রাখেনা, বিদেশে এসে ধারণা পাল্টেছে। অনেক মেয়েরই বেশ লম্বা চুল আছে। রেইনা এমন একজন। চোখ দু’টো বেশ বড় বড়। ও আমাকে বলেছে বাড়ীতে ওর ভাই-বোনরা ওকে বলত গরুর চোখী। আমি হেসে বলেছি, তাই নাকি এরকম কথা তো আমাদের দেশেও প্রচলিত আছে। আমি জানিনা ওর রূপের প্রশংসা আমি খুব বাড়িয়ে বলছি কি না। তবে ও যে মন কেড়ে নেয়ার মত সুন্দরী এই বিষয়ে সবাই আমার সাথে একমত হয়েছে। তবে ওর রূপ যে আমাকে আকৃষ্ট করেছে ব্যাপারটা সেরকম নয়। ওর মনই আমার মন কেড়েছে। দেশে থাকতে একটা গান শুনতাম ‘এ মন শুধু মন ছুঁয়েছে’। রেইনার সাথে পরিচিত হওয়ার পর গানটির মর্ম বুঝতে পেরেছি।

বিদেশীনিদের মন যে এত সুন্দর হয় তা আগে ধারনা করতে পারিনি। দেশে থাকতে মনে হতো আবেগ, অনুভুতি, ভালোবাসা এগুলো কেবল বাঙালীদেরই আছে, বড়জোর ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের । আমার সে ভুল ভেঙেছে। মানবীয় আবেগ অনুভুতি কোন ভৌগলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়। ওকে প্রথম দেখেছিলাম মস্কোর একটি রেলওয়ে ষ্টেশনে। সারা পুথিবীর ছেলে-মেয়েরা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে আসে। প্রথম ল্যান্ড করে মস্কোতে । দু’একদিন মস্কোতে থাকতে হয়। তারপর মস্কো থেকে তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়। সারা সোভিয়েত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন শহরে। মস্কো বিশাল নগরী এখানে ৮/১০ টি রেলষ্টেশন আছে। এই ষ্টেশন গুলো থেকে ট্রেনে চেপে বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীরা চলে যায় তাদের গন্তব্যে। মস্কোতে যখন দ্বিতীয় দিন কাটাচ্ছি, দু’জন রুশ মেয়ে এসে আমাকে জানালো, “আজ রাতের ট্রেনে তোমাকে তিবিলিসি যেতে হবে।” দেশে থাকতে শুনেছিলাম যে, রুশরা ইংরেজী জানেনা, আমার ধারনাা ভুল ছিল, এই দু’টি মেয়ে চমৎকার ইংরেজী বলে। সন্ধ্যা আটটার দিকে একটি বাস এসে হোটেল থেকে আমাকে তুলে নিল। আমার সাথে আরো কয়েকজন বাংলাদেশী ছিল। দু’জন ছাত্রী আর চারজন ছাত্র। সুমন নামে আরেকজন সিনিয়র ছাত্র আমাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের সাথে বাসে চড়ে ষ্টেশনে এসে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিলেন। আমাদের এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি খোঁজ-খবর করে এলেন, আমাদের ট্রেন কখন কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। এ সময় আমার চোখে পড়ল কিছুদূরে বাঙালী মেয়েদের মতই দেখতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়ানো। ওই মেয়েটিরই দেশী হবে হয়তো। এমসয় সুমন ভাই এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে কথা বললেন। ফিরে এসে বললেন ঐ মেয়েটি তোমদের সাথেই তিবিলিসি যাবে, ওর সাথে ওর দেশী আর কেউ নেই। তোমরা ওকে দেখে রেখ। আমি বললাম, “আর ঐ ভদ্রলোক ?” সুমন ভাই বললেন উনি ওদের এ্যাম্বেসীর, ওকে ষ্টেশনে পৌঁছে দিতে এসেছেন। ষ্টেশনটি বিশাল আকৃতির এবং বেশ ঝকঝকে । আমরা ঘুরে ফিরে দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। এরমধ্যেই বারবার আমার চোখ যাচ্ছিল ঐ মেয়েটির দিকে। কেন এমন হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম না। ও কি এমনি রূপসী, যার থেকে চোখ ফেরানো যায় না । মনে তো হয় না। তারপরেও কেন এমন হচ্ছে ? একটা গানের কলি মনে পড়ল ‘হঠাৎ দেখে চমকে. নির্বাক হয়ে গেছি থমকে, মনে হলো তুমি যেন অনেক দিনের চেনা।’ এই পৃথিবীতে কত মেয়েই তো আছে, তারপরেও একটি মেয়েকে দেখামাত্রই অনেক দিনের চেনা মনে হবে কেন ? আধুনিক চিকিৎসা শা¯ত্র বলে এই দু’জনের হরমোন লেভেলে কিছু একটা কোইনসাইড করে, ফলে এরকম হয়। হবে হয়তোবা। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়তো এমনই । আবার না হলেই বা কি? সবকিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতেই হবে এমন তো কোন কথা নেই।

রাত দশটার দিকে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে সুমন ভাই খুঁজে-খাজে আমাদের সঠিক ট্রেনে, সঠিক ট্রেনটিতে তুলে দিয়েছিলেন। রুশদের অনেকেই চমৎকার ইংরেজী বলে, কিন্তু বেশীরভাগই ইংরেজী বলতে পারেনা। প্রথমে অবাক হয়েছিলাম, প্রাক্তন বৃটিশ শাসিত দেশে থেকে ধারনা হয়েছে। শিক্ষিত মানুষ মাত্রেই ইংরেজী জানবে। ভালো ইংরেজী জানা তো শিক্ষারই একটি ইন্ডিকেটর । বিদেশে এসে এই ভুল ভেঙেছে। উন্নত সবগুলো দেশেই তাদের মাতৃভাষায়ই শিক্ষা প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি তারা অন্যান্য বিদেশী ভাষাও শিখে থাকে। রাশিয়ার স্কুলগুলোতে বিদেশী ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামুলক, তবে অপশোন থাকে। ইংরেজী, জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ষ্প্যানিশ এইগুলোর যে কোন একটি বেছে নিতে হয়। ফলে কেউ জানে ইংরেজী, কেউ জার্মান, কেউ ফ্রেঞ্চ বা ষ্প্যানিশ জানে। আমরা যেহেতু তখনো রুশ ভাষা জানতাম না, তাই সুমন ভাই আমাদের সাথে থেকে সবরকম সাহায্য করে একবারে ট্রেনে তুলে দিলেন। উনি পুরো কাজটি করেছিলেন একেবারে নিঃস্বার্থে। এই দূরদেশে একদল বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীর যেন কোন কষ্ট না হয় সেই উদ্দেশ্যে তিনি তা করেছিলেন । আমি ট্রেনে উঠে উনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছলাম। এই দূরদেশে এমন একজন হৃদয়বান বাংলাদেশীকে দেখে মন ভরে গিয়েছিল। কম্পার্টমেন্টে উঠে দেখলাম চারটি টিকিট একটি বার্থের, বাকী চারটি টিকিট, চারটি ভিন্ন ভিন্ন বার্থের। এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল। আমাদের সাথের মেয়ে তিনজনার জন্য দায়িত্ববোধ জেগে উঠল। বললাম, “ওরা তিনজন এক বার্থে থাকুক।” আর সালমান নামে আমাদের মধ্যে একজন ছিল, মাত্র দু’দিন হলো বিদেশে এসেছি এর মধ্যেই ও হোম সিকনেস ফীল করে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, সালমানকে ওদের সাথে দিলাম। সাইফুল খুব লম্বা-চওড়া, প্রায় রুশদের মতই, পাহাড়াদার হিসাবে ওকে পাশের বার্থেই দিলাম। আমি আর বিদ্যুৎ একটু দূরের বার্থ দু’টিকে স্থান নিলাম। ট্রেন ঘন্টাখানেক চলার পর মন খারাপ হয়ে গেল। আমার বার্থে যারা ছিলেন তারা ভালোই ছিলেন। তারপরেও আস্তে আস্তে এসে সালমানদের বার্থে এসে ঢুকলাম ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে, আবার নিজের বার্থে এসে ঘুমাবো। আমি ওদের বার্থে ঢুকে দেখি সাইফুল আর বিদ্যুৎ আগে থেকেই ওখানে বসে আছে। সবার মনেই এক্ অবস্থা। মনে হচ্ছিল এই ট্রেনটা জুড়ে সব্ইা আমাদের পর, সবাই ভিন জগতের মানুষ। কেবল আমরা সাত জনই একে অপরের আপন। হঠাৎ করে রেইনার দিকে নজর পড়ল। আরে আমরা তো তাও ছয়জন একই দেশের, ও তো একেবারেই একা। ওর কথা ভেবে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। তবে ওর মুখভাব দেখে মনে হচ্ছিল না যে ওর মন ততটা খারাপ। বুঝলাম বেশ শক্ত মেয়ে, ওর সাথে কথা বলতে চাইলাম। কথা বলতে গিয়ে কথা আটকে গেল। কোন ভাষায় কথা বলব ওর সাথে ? এদের ভাষা কি ? ও কি ইংরেজী বুঝবে ? আমি তো এর বাইরে কোন বিদেশী ভাষা জানিনা। কাছে এগুতে গিয়েও এগুতে পারব না। ভাষার ব্যবধান খুব বড় ব্যবধান, আমাদের মধ্যে সেই ব্যবধান আছে। নানা জাতির ভাষা বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাইবেলে একটি কাহিনী বর্ণিত আছে ঃ এক সময় মানব জাতির একটিই ভাষা ছিল। তারা একবার ঠিক করল, একটি উচু টাওয়ার তৈরী করে ইশ্বরের কাছে পৌছে যাবে। যখন তারা টাওয়ারটি তৈরী করে কাজ কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে গেলে, ইশ্বর তখন টাওয়ারটি ভেঙে দিলেন আর মানবজাতিকে নানা ভাষা তথা নানা জাতিতে বিভক্ত করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিলেন, যাতে তারা খুব সহজে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। কাহিনীটির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার ক্ষমতা আমার নেই, তবে ভাষাগত পার্থক্য যে জাতিতে জাতিতে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি করেছে, তা ঐ মুহুর্তে তো বটেই, পরবর্তী জীবনেও বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।

রেইনার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা কবিতা লিখে ফেললাম

সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে
শত বছরের নিস্তদ্ধতা এসে বলে গেল,
ধ্বনিরা জাগ্রত হও,
কোলাহলময় উৎসবের রাতে
প্রেয়সীর চোখে জমে থাকা জলে
জ্যোৎস্নার আলো জ্বলে উঠে বলে
প্রেমিক তুমি স্থবিরতা ভেঙে, চঞ্চল হয়ে ওঠো।

রেইনা হঠাৎ করে বলে উঠল, “ওয়ান্ট টু সে সামথিং ?” এবার আমি চমকে উঠলাম, বললাম, “ ডু ইউ স্পীক ইংশিল ?”, ও বলল “ইয়েস, এ লিট্ল বিট”। জানলাম, ওদের ভাষা ষ্প্যানিশ। ও ভাঙা ভাঙা ইংলিশ ও ভাঙা ভাঙা রুশ বলতে পারে। ভাঙা ভাঙা রুশ আমিও বলতে পারতাম। রাশিয়ায় আসব জেনে, রাশান কালচারাল সেন্টার থেকে ছোটখাট একটা কোর্স করে কিছু কিছু শব্দ, কিছু বাক্য শিখে নিয়েছিলাম। সেই ভাঙা রুশ আর কাজ চালানোর মত ইংরেজী এই দিয়ে ওর সাথে কথোপকথন চালাচ্ছিলাম। এ এক অদ্ভূত খেলায় আমরা মেতে উঠলাম। হৃদয়ের টানে ভাষার ব্যবধান মুছে ফেলতে চাচ্ছিলাম। মস্কো থেকে তিবিলিসি দীর্ঘ রেলপথ। আগে বই-পত্রে পড়েছি পৃথিবীর দীর্ঘমত রেলপথ রাশিয়ার ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে। আমরা যে লাইনের উপর দিয়ে যাচ্ছিলাম এটা ‘ ট্রান্স ককেশিয়ান রেলওয়ে ’। চার রাত তিন দিন এ’্ রেলপথে ছিলাম। আমার জীবনে এটাই ছিল দীর্ঘতম ট্রেন ভ্রমণ। ট্রেনের দু’পাশের দৃশ্য ছিল চমৎকার। আমাকে সাইফুল বলেছিল যে, সে শুনেছে ট্রেন কৃষ্ণ সাগরের পাশ দিয়ে যাবে। এটা শুনে আমার উৎসাহ ভীষণ বেড়ে গেল। এই কৃষ্ণ সাগরের বর্ণনা ভূগোলে পড়েছি, পড়েছি বিভিন্ন গল্প-সাহিত্যে, এখন চোখের সামনেই দেখতে পাব !

মস্কো থেকে তিবিলিসি পর্য›ত দীর্ঘ রেলপথে সময় কাটছিল রেইনার সাথে কথা বলে । জানলাম দেশে ওদের বাবা-মা ও ছয় ভাই-বোন নিয়ে বড় পরিবার। ওর বাবা-মা সন্তানদের পড়ালেখার বিষয়ে ভীষণ উৎসাহী। ওর বড় ভাইও রাশিয়াতে পড়ালেখা করেছেন। ওর বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার । পরবর্তিতে রেইনার কাছ থেকে জেনেছিলাম, যে ওর বাবার আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি ওদের দেশের একজন কম্যুনিষ্ট নেতা। তিনিও বছর দুই রাশিয়াতে কাটিয়েছিলেন। কম্যূনিষ্ট আদর্শে এত বেশী উজ্জীবিত ছিলেন যে, ছেলে-মেয়েদের রাশিয়ায় পড়তে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকেও কম্যূনিষ্ট আদর্শে গড়ে তোলা। আমার ঐ বয়সে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ, দর্শন আমি ভালো বুঝতাম না। যা বুঝতাম তা যৎসামান্য। তারপরেও মনে করতাম অনেক জানি, অনেক বুঝি। এটা বোধ হয় বয়সের দোষ। আরেকটি বিষয় আমার মনে বদ্ধমূল হয়েছিল, সেটি হলো ‘জাতীয়তাবাদ’ । এই জাতীয়তাবাদী চিন্তা-ভাবনার দ্বারা আমি এত বেশী প্রভাবিত ছিলাম যে তা অনেক সময় ফ্যাসিবাদের পর্যায়ে চলে যেত । বইয়ে পড়েছিলাম যে, এডলফ হিটলার মনে করতেন, ‘রাষ্ট্রের জন্য মানুষ, মানুষের জন্য রাষ্ট্র নয়’। আমার কাছে মনে হয়েছিল, হিটলার ঠিকই বলেছেন। যে দেশটায় আমার জন্ম , যে দেশটার আলো-বাতাসে আমি বড় হয়েছি, সেই দেশের জন্য কাজ করার চাইতে বড় কর্তব্য আর কি হয়ে পারে ? সে দেশের জন্য যদি জীবন দিতে পারি, এর চাইতে বড় সম্মান আর কিসে হতে পারে ? পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দর্শনের ক্লাসগুলোতে আমার চিন্তা-ভাবনার ক্রটি বুঝতে পেরেছিলাম।

রাতে সমস্যায় পড়লাম। আমরা সাতজন এক বার্থে। বার্থে সীট আছে চারটি। আমরা ঘুমাবো কি করে ? আমাদের মধ্যে সাইফুল ছিল সবচাইতে বেশী লম্বা-চওড়া। লম্বায় প্রায় ছ’ফুট। সুঠাম দেহের বাংলাদেশীরা সাধারণত মাস্তান স্বভাবের হয়, কিন্তু সাইফুল মোটেও সেরকম নয়, অত্যন্ত নম্র-ভদ্র। দু’তিন দিনের পরিচয়েই ওকে ভালো লেগে গেল। ও বলল, “ আমার সীট তো পাশেই বার্থেই, আমি ওখানেই ঘুমাই ”। ওকে, একটা সমাধান পাওয়া গেল। বাকী ছ’জনের এ্যারেঞ্জমেন্ট কিভাবে করা যায় ? বিদ্যুৎ বলল, “ অত কিছু বুঝি না, আমার ঘুম পাইছে, আমি সালমানের পাশে ঘুমাই ”। এই বলে বার্থের উপরের সীটে সালমানের পাশে গুয়ে পড়ল। বাংলাদেশী মেয়ে দু’জন লিজা আর আফসানা ঠিক করল ওরা দু’জন এক সীটে ঘুমাবে। বাকী রইলাম আমি আর রেইনা। আমরা দু’জন কে কোথায় ঘুমাবো? তাকিয়ে দেখলাম লিজা আর আফসানা মুখ টিপে হাসছে। আমিই সমস্যার সমাধান করে দিলাম। সীটটাা যেহেতু রেইনার, অতএব ও ঐ সীটেই ঘুমাবে, আর আমি ওর পায়ের কাছে বসে থাকব। আফসানা বলল, “কতগুলো রাত পায়ের কাছে বসে কাটাবে ?” সবাই কোরাসে হেসে উঠল। বেশ লজ্জা লেগে গেল। রেইনা কিছু বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকালো। আমি চুপ করে রইলাম।

বসে বসে ঘুমিয়ে, প্রথম রাতটা পার করলাম। রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। বার্থের মধ্যে সবাই বেশ নির্বিঘেœ ঘুমাচ্ছিল। রেইনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘুমন্ত একটি লিস্পাপ মুখশ্রী। যতবার ওর দিকে তাকাছিলাম ততবারই মন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। অনেকের মনে হতে পারে রাতের আলো-আধারীতে একটি রূপসী মেয়ের পাশে বসে আমার মধ্যে কামণা জাগ্রত হতে পারে। কিন্তু এমন কোন অনুভুতিই আমার হয়নি। বিন্দুমাত্রও না । আমার হৃদয়টাকে যদি ফুলের সাথে তুলনা করি, তবে যা হচ্ছিল তাকে বলা যায়, ফুলের পাঁপড়িতে আন্দোলন।

সকালে উঠে সবাই ক্ষুধার্ত । একটি গ্রামের ষ্টেশনে ট্রেনটি থামলে আমরা দুধ, রুটি আর কিছু ফলমূল কিনলাম। লিজা আর আফসানাকে দেখেছি সব সময়ই ছেলেদের উপর ডিপেনডেন্ট। কিছু লাগলে বলছে, এটা করে দাওনা, ওটা করে দাওনা। কিছু কিনতে চাইলে বলছে, এটা কিনে দাওনা, ওটা কিনে দাওনা। রেইনাকে দেখালাম সেরকম নয়। ওর কাজ ও নিজেই করে নিচ্ছে। কিছু কিনতে চাইলে ফেরিওয়ালা ডেকে নিজেই দরদাম করে কিনে নিচ্ছে। বুঝলাম এই মেয়ে স্বাবলম্বী, নিজের ভার নিজেই নিতে পারে। পরে বুঝতে পেরছিলাম সাউথ এ্যামেরিকান বা ইউরোপীয়ান মেয়েরা এরকমই হয়। ব্রেকফাষ্টে ফলমূল যা খাচ্ছিলাম তার প্রায় সবই অপরিচিত, ব্ল্যাক বেরী, পিচ, রাস্প বেরী, চেরী, ইত্যাদি। এতকাল কেবল এদের নাম শুনেছি, এই প্রথম স্বাদ গ্রহণ করলাম। খেতে খেতে খাবার প্রসঙ্গে আলাপ হলো। জানতে পারলাম ওদের দেশে আম, কলা, পেঁপে, জাম্বুরা, কমলা ইত্যাদি আছে। ওদের প্রধান খাদ্য ভুট্টা আর আলু। ওর কাছ থেকেই প্রথম জানলাম আলুর জন্মভুমি বলিভিয়া এবং পেরু। ভুট্টাও ওখানেই প্রথম আবাদ হয়। মরিচের জন্ম ভুমিও ঐ দুটি দেশ। পরবর্তিতে জানতে পেরেছিলাম নানা ধরনের ফল-মূল, শাক-সবজী, শস্য আমেরিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ-এশিয়ায় এসেছিল। চকলেটের জন্মস্থানও বলিভিয়া, ইনকারা প্রথম এই মিষ্টান্নটি তৈরী করে। ইন্কা, হ্যা ইন্কাদের সম্পর্কে বইয়ে পড়েছি। দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে উন্নত জাতি ছিল ওরা। ষ্প্যানিশরা আমেরিকায় প্রবেশের পর ইনকাদের সভ্যতা দেখে বি¯ি¥ত হয়েছিল। ইন্কাদের কেবল একটি জিনিসেরই অভাব ছিল, সেটি হলো আগ্নেয়াস্ত্র। এই আগ্নেয়াস্ত্রের অভাবেই তারা আগ্রাসী ষ্প্যানিশদের কাছ পরাজিত হয়েছিল। বেচারা ইন্কাদের কি দোষ দেব ? আগ্নেয়াস্ত্র থাকা সত্ত্বেত্ত তো আমরা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলাম। আমাদের সভ্যতা তো ইংরেজদের চাইতে বহুগুন উন্নত ছিল। এ কারনেই আমাদের নেতা সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, “ এ কথা সত্য যে ইংরেজদের পাশবিক শক্তির কাছে আমরা হার মানতে বাধ্য হয়েছি কিন্তু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যাগত গুনাগুন বিচার করলে আমরা কোন অংশেই তাদের চাইতে কম নই। ” তৃতীয় দিন সকালে লিজা হৈ চৈ করে সবাইকে ডাকতে লাগলো , ও বার্থের বাইরে করিডোরে জানালার পাশে দাড়িয়েছিল। সবাই ছুটে গেলাম। অদ্ভুদ সুন্দর দৃশ্য। ব্ল্যাক সী (কৃষ্ণ সাগর) ! খুব ধীর গতিতে ট্রেন যাচ্ছে সাগরের তীর ঘেসে, আর আমরা জানালা দিয়ে দেখ্ছি দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির অপূর্ব সৌন্দর্য্য। ব্ল্যাক সী আসলেই ব্ল্যাক। ট্রেনের জানালা দিয়ে পানির রঙ কালো মনে হচ্ছিল। পানির উপরে হালকা কূয়াশা ছিল। যে বিষয়টি আমাদের একটু লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল তা হলো সাগর তীরে সবাই বিকিনি পরিহিত। আমরা বাংলাদেশী ছেলে-মেয়েরা সব একসাথে দাড়িয়ে ছিলাম, এরকম দৃশ্য দেখে তো অভ্যস্ত নই। আফসানা বলেই বসল, “ লজ্জার দৃশ্য ”।

দ্বীতিয় রাতে বসে বসে ঘুমাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। মাঝরাতের দিকে একবার ঘুম ভেঙে গেলে, রেইনা উঠে বসল। আমাকে প্রশ্ন করল, “ বসে বসে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হচ্ছে ?” আমি চুপ করে রইলাম। হ্যা না কোন কিছু বলাই ঠিক হবে না ভেবে। রেইনা বলল, “ তুমি আমার পাশে শুতে পারো ”। আমি চমকে উঠলাম। বলে কি ও ! এই ভরা বার্থে এতগুলো তরুন-তরুনীর মধ্যে আমরা দু’জন যদি পাশা-পাশি শুই, পরিস্থিতি কেমন হবে! “ তবে এক শর্তে ,” রেইনা বলল।
ঃ কি শর্ত ?
ঃ আমার যেখানে পা, তোমাকে সেখানে মাথা দিতে হবে, আর তোমার পা থাকবে আমার মাথার কাছে।
মনে মনে ভাবলাম বেশ ভালো বুদ্ধি বার করেছে তো। আমার কষ্টটা কমানো হলো, আবার আমাদের মধ্যে ব্যবধানও রইল। এভাবেই আমরা বাকী রাতগুলো কাটিয়ে ছিলাম। চতুর্থ দিনে আমরা জর্জিয়ার কাজধানী তিবিলিসি এসে পৌছালাম। আমাদের মালপত্র সবকিছু নিয়ে আমরা এক ঝাঁক পাখীর মত কল-কাকলী করতে করতে ট্রেন থেকে নেমে এলাম। হঠাৎ করে, অত্যন্ত সুদর্শন ও প্রীতিকর একজন ব্যক্তি এসে স্পষ্ট ইংরেজীতে প্রশ্ন করলেন “ আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ ?”
ঃ ইয়েস ।
ঃ আই এ্যাম সাশা, দ্যা ডেপুটি ডীন অব ইয়ার ফ্যাকাল্টি।
ভদ্রলোককে প্রথম দর্শনেই সবার ভালো লেগেছিল। একটি মাইক্রোবাসে করে তিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন বাগেবী ষ্টুডেন্টস্ টাউনে। এখানেই আছে তিবিলিসি ষ্টেট ইউনিভার্সিটির রাশান ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ফ্যাকালটি।

আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম। আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল লম্বা একটি ঘুমের। তারপরেও ’সাশা‘ আমাদের নিয়ে গেলেন ফ্যাকালটির অফিস রুমে। রেজিষ্ট্রেশনের প্রয়োজনে। আমাদের সাথে তিনি চোস্ত ইংরেজীতে কথা বলাইলেন। হঠাৎ করে উনার চোখ গেল রেইনার দিকে।
ঃ ইউ আর নট ফ্রম বাংলাদেশ, আই গেজ।
ঃ নো ! বলিভিয়া।
ঃ ও !
এরপর সাশা চট করে ষ্প্যানিশ বলতে শুরু করলেন। রেইনার সাথে কথাপোকথন ষ্প্যানিশ ভাষায়ই চালালেন। আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। লোকটা ষ্প্যানিশও জানে। পরবর্তিতে জেনেছিলাম, তিনি সবগুলো ইউরোপীয়ান ভাষাইই জানেন।

কিছুক্ষনের মধ্যে রুম বন্টন হয়ে গেল। নাতাশা নামের অদ্ভুদ সুন্দরী এক ম্যাডাম আমাদের হোষ্টেলে নিয়ে গিয়ে রুম দেখিয়ে দিলেন। ম্যাডামকে দেখলাম ইংরেজী ও ষ্প্যানিশ দুটোতেই খুব পারদর্শী। আমরা বাংলাদেশীরা রুম পেলাম দোতালায়। রেইনা পেল তিনতলায়, পরে বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলাদেশী ও ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্ধানিত ছিল দোতলা, আর দক্ষিণ আমেরিকানদের জন্য তিন তলা। দীর্ঘ ক্লান্তিকর ট্রেন জার্নির পর, হোষ্টেল এসে হাপ ছেড়ে বাঁচলাম সত্যি, কিন্তু ঐ চারদিনের মধুময়তা কিছুতেই কাটছিল না। মনে বারবার উকি দিচ্ছিল সেই বার্থ, সেই ভোর, সেই ভাঙা-ভাঙা ইংরেজী আর রুশে আলাপন।

পরদিন সন্ধ্যাবেলা বসেছিলাম হোষ্টেল সামনের বেলকুনিতে। এই বেলকুনিটির একটি বিশেষত্ব ছিল। বাগেবী যেহেতু শহরের একপাশে, এখান থেকে দূরে পাহাড়ের ঢালে বিশাল শহরের একাংশ দেখা যায়। সন্ধ্যা বেলায় বিশাল বিশাল দালানগুলোর জানালায় যখন আলো জ্বলে উঠে তখন মনে হয় যেন পাহাড়ের ঢালে হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলছে। আর এই দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না। আমার মত আরো অনেকেই ব্যালকুনিতে বসে ঐ দৃশ্য উপভোগ করছিল। এত সৌন্দর্য্য সত্ত্বেও আমার মন বারবার ছুটে যাচ্ছিল রেইনার কাছে হঠাৎ পাশ থেকে লিজা বলে উঠল “এতই যখন মন খারাপ তখন তিনতলা থেকে ঘুরে এলেই পারো।” ও যদিও আমার মনের কথা ধরতে পেরেছিল। তারপরেও বিরক্তি লাগলো মনে হলো এ আমার একান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপে করা । এ সময় তিনতলার ব্যালকুনিতে হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। চেনা হাসির শব্দ হৃদয় উদে¦ল করে গেল। একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, ‘মেয়েটিকে দেখলে যদি বুকে ধুকধুকানি হয়, বুঝবেন মেয়েটিকে আপনি ভালোবাসেন, আমার বুকে সেই ধুুুকধুকানি শুনতে úেলাম । তাহলে কি আমি ওকে ভালোবাসি ?

সম্মোহিতের মতো সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে গেলাম। রেইনা ওর বান্ধবীদের নিয়ে গল্প করছিল। আমাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড নিস্তদ্ধ হয়ে গেল। আমার বুকে তখন প্রশান্ত মহাসাগরের আলোড়ন। সামনে জ্বলা হাজারো প্রদীপের আলোর পটভুমিতে দাড়ানো রূপসী রেইনাকে মনে হচ্ছিল রোমঞ্চিত হৃদয়ের পসারিনী। আমাকে দেখে ওর বান্ধবীরা চলে গেল। বিদেশীদের ভদ্রতাবোধ এদিক থেকে অনেক বেশী। বুঝতে পেরেছিল, এই দু’জনকে নিভৃতে থাকতে দেয়া প্রয়োজন। এরপর আমরা দু’জন হাত ধরাধরি করে ঐ আলো-আধারী বেলকুনীতে বসে, হাজার প্রদীপ জ্বলা দূরের তিবিলিসি শহরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করেছি। কথায় কথায়, রোমাঞ্চ আবেগে কখন যে মাঝরাত পার হয়ে গিয়েছে টেরই পাইনি।

এর পর থেকে আমাদের ঘনিষ্টতা বাড়তেই থাকে। আমরা দু’জন দুই বিষয়ে উপর পড়ালেখা করতে এসেছিলাম। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং আর ও বায়োকেমিষ্ট্রি। তাই ফ্যাকাল্টিতে আমাদের গ্র“প ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এখানে আট-নয় জন নিয়ে একটা গ্র“প হয়। এক গ্র“পের একজন টিচার থাকেন। আমার টিচার ছিলেন মায়া তুখারিলি। তুখোর শিক্ষিকা হিসাবে তার নামডাক ছিল। সকাল নয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমাদের ক্লাস ছিল। মাঝে মাঝে ব্রেক হতো, ব্রেক টাইমে রেইনা আমার কাছে আসতো, আমরা এক সাথে কফি খেতে যেতাম। একদিন ম্যাডাম মায়া আমাকে বললেন, “বিদেশীনি বান্ধবী তোমার।” আমি লাজুক হাসলাম। মায়া ম্যাডাম বললেন “ক্লাসের আলাপ-আলোচনায় যা বুঝতি পারি, তোমার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ফিলিং খুব বেশী। তাছাড়া তুমি তোমার সংস্কৃতির প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত। আমি বললাম “জ¦ী আপনার মূল্যায়ন সঠিক। তিনি বললেন, “সেই তোমারই বিদেশীনি বান্ধবী, এটা কন্ট্রডিকশন নয় কি ?” আমি কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। আসলে আমার মনেও প্রশ্নটি বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। ম্যাডামই প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে দিলেন, “হৃদয়ের উচ্ছাস কোন বাধাই মানে না ”।

আমার সাথে মেলামেশা করতে করতে আমাদের সাথের অন্যান্য বাংলাদেশীদের সাথেও ওর সখ্যতা গড়ে উঠল। ও আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দিত। রমজানের সময় একবার ইফতার পার্টির আয়োজন করলাম। ওকে বললাম, মাথায় কাপড় দিয়ে আসতে হবে কিন্তু। ও প্রথমে বলল, “উহু ! পারব না।” ইফতারের সময় দেখলাম ঠিকই মাথায় স্কার্ফ বেধে এসেছে। সাউথ আমেরকিানরা ইউরোপীয়ানদের মতই পোশাক-আশাক পড়ে। প্যান্ট-শাট, স্কার্ট-টপস ইত্যাদি। ওদের স্থানীয় কিছু পোশাক-আশাক আছে, তবে সেগুলো ওরা পড়ে বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে। প্যান্ট-শার্ট আর মাথায় স্কার্ফ পরিহিত রেইনাকে চমৎকার লাগছিল। আমি ওকে প্রশ্ন করলাম, “তোমার কি স্কার্ফ মাথায় অ¯¡স্তি লাগছে ?” ও বলল, “মোটেও না, আমরা তো এই পোশাকেই চার্চে যাই।” এরপর ও আমাকে আস্তে আস্তে বলল, “তোমাদের মেয়েরা যে শাড়ী পড়ে, ঐ পোশাকটি কিন্তু চমৎকার ! আমার খুব ইচ্ছা হয় শাড়ী পড়তে।”

ইতিমধ্যে মাস ছয়েক পেরিয়ে গেছে। রুশ ভাষা অনেকখানি রপ্ত করে এনেছি। এখন আমাদের কমন ল্যাংগুয়েজ রুশ। খুব ঠেকে গেলে ইংরেজী বলতাম। ও বলত, “ইংরেজী বলিতেছ আমিতো উহাও খুব ভালো পারিনা ।” আমি বলতাম, “তাও যা বল যথেষ্ট ভালো। আমাদের বাংলাদেশীদের অনেকে কিন্তু তোমার চাইতে অনেক খারাপ ইংরেজী বলে”। রেইনা হাসল, কিছু বলল না। বিদেশীরা ভদ্র হয়, সহজে মানুষের মনে কষ্ট দিতে চায়না। আমরা বাংলাদেশীরা মনে করি যে, আমরা খুব ভালো ইংরেজী জানি। বিষয়টি মোটেও সে রকম না, মোটামুটি ভালো ইংরেজী বলতে পারে এমন লোক হাতে গোনা। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ গুলোত উচু মানের ইংরেজী তো দূরের কথা, স্পোকেন ইংলিশ শেখানোর মতও ভালো শিক্ষক নেই। সেরকম কোন রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপও নেই। ছাত্রদের দোষ দেয়া যাবে না, তাদের যা শেখানো হয়, তারা তাই শেখে। রাশিয়াতে একটা কথা প্রচলিত আছে, খারাপ ছাত্র হয় না, খারাপ শিক্ষক হয়। ষ্প্যনিশ ও ইংরেজী ভাষা কাছাকাছি। আসলে ®প্যনিসের রুট হলো ল্যাটিন ভাষা, আবার ইংরেজীর রুট জার্মান ভাষা হলেও সেখানে পঞ্চাশ পারসেন্ট ল্যাটিন শব্দ আছে। তাই ইংরেজী রেইনা দ্রুত ধরতে পারত। সমস্যা হতো কেবল ইংরেজী বানান নিয়ে। ষ্প্যানিশ ভাষায় যেমন উচ্চারণ, লেখ্য রূপটাও ঠিক তেমনি। রুশ ভাষাতেও তাই। কিন্তু ইংরেজীতে বলি এক, আর লিখি আরেক। বাংলা ভাষায়ও ঐ একই জাতীয় বানান সমস্যা। ছেলে-বেলায় তো ভীষন সমস্যা হতো। চেষ্টা করতাম লজিকাল চিন্তা করতে, কিন্তু বাংলা বানানে কোন লজিক নেই। তিনটি শ এর উচ্চারণ একই রকম, ‘শ’ এর মত, অথচ লেখা হয় নানা ভাবে। দন্ত ‘স’ এর উচ্চারন ল্যাটিন ‘ঝ’ এর মত হওয়া ঊচিৎ, অথচ তার উচ্চারণ কখনো ‘ঝ’ কখন ‘শ’। আমাকে একবার একজন বললেন, যে ‘স’ এর উচ্চারন সবসময়ই ‘শ’ এর মত হওয়া উচিৎ, আমরা ‘সালাম’ (ঝধষধস) বলি, এটা ভুল, বলা উচিৎ ‘শালাম’। আমি বললাম, ’আপনার সাথে একমত হতে পারছি না। মানুষের নাম সালাহউদ্দিন (ঝধষধযঁফফরহ) হবে, না শালাউদ্দিন হবে ? একথা শুনে উনি চুপ করে গেলেন।

ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছয়মাস পেরিয়ে গেল। প্রথম সেমিষ্টার শেষ হলো। আমার ও রেইনার দু’জনের ফলাফলই চমৎকার হয়েছিল। এদেশের গ্রেডিং সিষ্টেমে তিনটি গ্রেড আছে ‘সেটিসফেকটরি’, ‘গুড’ , ‘এক্সিলেন্ট’ । আমরা দু’জনেই এক্সিলেন্ট গ্রেড পেয়েছিলাম। বাংলাদেশে পারসেন্ট পদ্ধতিতে পড়ালেখা করে অভ্যস্ত ছিলাম। তাই প্রথম প্রথম গ্রেডিং সিষ্টেম মেনে নিতে পারতাম না। পরে বুঝতে পেরেছিলাম সিষ্টেমটি কত চমৎকার । যাহোক আমাদের ভালো ফলাফল দেখে, বন্ধু-বান্ধব ধরল পার্টি দিতে হবে। ঠিক আছে, এক সন্ধ্যায় একটি বড় কেক আর কিছু স্ন্যাকসের আয়োজন করলাম। সবাই জড়ো হলো। এবার কেক কাটার পালা। কেক কে কাটবে ? আমি বললাম, রেইনা কাটুক, নারীর অগ্রাধিকার। রেইনা আমাকে বলল, “তুমিই কাটো না।” এবার সবাই মিটিমিটি হেসে বলল, দু’জন একসাথে কাটো। শেষ পর্যন্ত তাই হলো লাজুক হেসে একটি ছুরিতে দু’জনে হাত রেখে একসাথে কেক কাটলাম খুব হৈ চৈ আর আনন্দ হয়েছিল ঐ সন্ধ্যায়।

রাতের দিকে হোষ্টেলের সামনের ব্যালকুনিতে রেইনাকে দেখলাম খুব মনমরা হয়ে বসে আছে। আমি তখনও বেশ উৎফুল্ল। ওকে বললাম। কি ব্যাপার হঠাৎ এত বিমর্ষ কেন? ও খুব ভার গলায় বলল, “তুমি কি বুঝতে পারছ পরিস্থিতি কত জটিল হয়ে গিয়েছে ?”
ঃ কি রকম ?
ঃ আমাদের ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ হতে আর মাত্র এক সেমিষ্টার বাকী।
ঃ তা তো জানিই।
ঃ তুমি বুঝতে পারছ না।
ঃ কি ?
ঃ আর এক সেমিষ্টার পর আমরা দু’জন দু’জায়গায় চলে যাব।
বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার শরীর দিয়ে। সত্যিই তো ! এতদিন তো একথা ভাবিনি। এটা তো ল্যাংগুয়েজ কোর্স। এখানকার নিয়ম অনুযায়ী, ল্যাংগুয়েজ কোর্সের পর যার যার সাবজেক্ট অনুযায়ী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। আমাদের দু’জনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে যেহেতু আমাদের দু’জনের সাবজেক্ট ভিন্ন ভিন্ন, তাই আমাদের দু’জনকে দুই বিশ্

ramit_1345341295_1-Naino_Mein_Badra_Chhaye_-_Mera_Saaya__720p_HD_Song__-_YouTube.mp4.part_snapshot_01.03__2012.08.16_11.47.32_

রেইনা (২)

ইংরেজীতে একটি শব্দ আছে ‘কোইনসিডেন্স’- এর বাংলা অনুবাদ ’ কাকতালীয়’। অর্থাৎ কাক এসে তাল গাছের উপর বসল, আর সাথে সাথে একটি তাল পরে গেল। এর মানে কি এই যে কাক এসে গাছের উপর বসল বলেই তালটা পরে গেল? নাকি তালটা পরবে জেনেই কাকটা এসে বসেছিল? আসলে দুটোর কোনটাই না। কাক কাকের মত এসে বসেছে, তাল তালের মত পরেছে। তবে ঘটনা দু’টো বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটেছে একই সাথে। এ জন্যই এই ভাবে ঘটে যাওয়া দু’টো সমকালীন ঘটনাকে বলা হয় কাকতালীয়।
থিওরী অফ প্রোবাবিলিটির অংক পড়াতে গেলে তাসের কিছু অংক চলে আসে। ক্লাসরূমে ছাত্র যেমন থাকে ছাত্রীরাও থাকে। ছাত্ররা ৫২টি তাসের সাথে পরিচিত। ছাত্রীরা নয়। তাই ছাত্রীদের তাসগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। আমি বললাম, “আপনারা ছাত্রীরা তো তাস খেলতে পারেননা, তাই তাসের সাথে পরিচিতও নয়, আমি আপনাদের তাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি”।” হঠাৎ একজন ছাত্রী বলে উঠল,”আমি তাস খেলতে পারি”।” সাথে সাথে আরো কয়েকজন ছাত্রী তার সাথে সুর মেলালো। আমি অবাক হলাম। যুগ তাহলে পাল্টেছে। এখন অনেক বাঙ্গালী মেয়েও তাস খেলতে পারে।
আমার বহু বছর আগের এশটি মুখচ্ছবি মনে পড়ল, ‘রেইনা’’। হ্যাঁ রেইনাও তাস খেলতে পারতো।

আজ থেকে একুশ বছর আগে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়ায় ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছাত্র ছিলাম, তখন দক্ষিণ আমেরিকার মেয়ে রেইনা ছিল আমার বান্ধবী। দারুন সুন্দরী আর অসম্ভব বুদ্ধিমতি এই মেয়েটি তাস খেলতে পারতো তুখোর। ল্যাংগুয়েজ কোর্সের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা শেষে বিশ দিনের মত ছুটি ছিল। ক্লাস যেহেতু নেই তাই কাজের কাজ কিছুই নেই। দিনের বেলায় শহরের পার্কগুলোতে ঘুরতাম। শহরে পার্ক অনেকগুলো। প্রতিটি পার্কই অপূর্ব। শহরটাতে অপরূপ পার্কগুলো সেই সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুনে। এমনিতেই সোভিয়েতদের রুচিবোধ প্রশংসনী। তাছাড়া স্থাপত্যশিল্পে একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ‘রাশান কনস্ট্রাকটিভিজম’ ১৯১৩ সালের দিক থেকে এর শুরু। রুশরা প্রতিটি ভবন নির্মাণ করতে শুরু করে এমন এক অদ্ভুদ স্থাপত্য শৈলীতে যে এক একটা ভবন দেখতে হয় এক একটি ভাস্কর্য্যের মত। দিনের বেলায় আমাদের নগরীর এসব সৌন্দর্য্য দেখেই কাটতো। আর রাতে কোন কাজই থাকত না। কোন কোন রুমে চলত জমিয়ে আড্ডা আর কোন কোন রূমে চলত তাসের আসর। রেইনা তাস বেশ ভালো খেরত। তবে আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় স্পেকট্রাম খেলাটি ও জানত না। খুব সম্ভবত: ওদের দেশে খেলাটির প্রচলন নেই। আমি ওকে শিখিয়ে দিলাম। দু’ একদিনের মধ্যেই দেখলাম ওর কোন জুড়ি নেই। আসরে বসলে একের পর এক গেম ওই জিতে যাচ্ছে। অনেকে বলত, “তোমর বান্ধবীকে জুয়াড় আসরে বসালে, ও সবাইকে ফতুর করে ছাড়বে”।” “না ভাই জুয়াখেলার মধ্যে নেই আনন্দের জন্য খেলি”, আমি বলতাম। আর রেইনা বলত’ জীবনটিই একটা জুয়া খেলা, ভাগ্য আর বুদ্ধির সমন্বয় সাধনের অবিরাম ক্রিড়া”।

সেমিস্টার ব্রেকের ছুটি শেষ হয় এমন সময়ে ভাবলাম বড় একটা আনন্দানুষ্ঠান করা দরকার। কি করা যায়? কি করা যায়? ঠিক করলাম পিকনিক করব। সিনিয়রদের কানে কথাটা যেতে তারা হা হা করে হাসলেন বললেন, বাংলাদেশে পিকনিক হয় শীতকালে। আর এদেশে হয় গ্রীষ্মকালে। তাওতো ভালো জার্জিয়া, তুহীন শীত নয়। মস্কোতে গিয়ে দেখ মাইনাস দশ / পনের টেমপ্যারেচার। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আর আমরা সবাই ১৮/১৯ বছরের টগবগে তরুন-তরুনী ঐ বয়সের উদ্দামতায় কোন বাঁধাই বাঁধা থাকে না। যেমন ভেবেছি তেমনই করব। পিকনিক করব। ঘটা করে মিটিং করলাম। বাজেট ঠিক করলাম। দশ রুবল করে চাঁদা ঠিক করা হলো। এবার প্রশ্ন উঠল, শুধু কি আমরাই যাব? গেস্ট নেয়া যাবে না? একজন বলল ইন্ডিয়ান বাঙালী মেয়ে শর্মিলাকে নেয়া উচিত, ওতো আমাদেরই একজন। আবার দু’ একজন বলল হোক বাঙালী, ইন্ডিয়ান তো। কিছুক্ষণ বাক-বিতন্ডার পর ঠিক হলো ওকে নেয়া হবে। এরপর বান্ধবী প্রসঙ্গ। সবাই আমার দিকে তাকালো। লিজা বলল, ”বান্ধবী এ্যালাউ করা উচিত”। অনেকেই হেসে উঠল। এরপর ঠিক করা হলো কেউ যদি বান্ধবী নিতে চায়, নেয়া যাবে। আর অনেকে ঠাট্টা করে বলল, “আর তোমরা বাঙালী মেয়েরা যদি বন্ধু নিতে চাও নিতে পারবে”।” বেশ কয়েকদিন যাবৎ পিকনিকের যোগাড়-যন্ত্র হলো। টাকা-পয়সা সংগ্রহ করা, প্লান-প্রোগ্রাম করা। কাকে কি দায়িত্ব দেয়া হবে ঠিক করা হলো। আমার আর রেইনার দায়িত্ব পড়ল টাকা-পয়সা সংগ্রহ ও বাজেট নিয়ন্ত্রন। নাসিমকে দেয়া হলো বাজারের দায়িত্ব। পিকনিকের আগের দিন ওর হাতে একশত রুবল দিয়ে বাজারে পাঠালাম। ওর সাথে আরো তিনজন গেল। শক্ড হলাম ও ফিরে আসার পর। সন্ধ্যার দিকে ওরা ফিরে এলো। চেহারা দেখে মনে হলো বিধ্বস্ত অবস্থা। প্রশ্ন করলাম, “কি হয়েছে?”নাসিম উত্তর দিল, “বাজেট ফেল করেছে।” “সেকি বাজেট ফেল করবে কেন?” এদেশে সবই তো চুলচেড়া হিসেব করা। প্রতিটি জিনিসের দামই তো আজ বহু বছর ধরে ফিক্সড । নাসিম বলল, ” মুরগীর মাংস ও দামী অনেক খাবারের আইটেমই দোকানে পাওয়া যায়নি। আমরা নিরূপায় হয়ে বাজারে যাই। আর সেখানে সব কিছুর দাম দুই থেকে তিনগুন। ” আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এরকম একটা ঘটনা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটতে পারে আমরা কখনো ভাবতেই পারিনি। আসলে ঐ ছিল সোভিয়েত অর্থনৈতিক সংকটের শুরু।

নির্দিষ্ট দিনে গেলাম পিকনিকে। দিনটি ছিল রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন কমুনিষ্ট পার্টি যদিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে ধর্মহীনতার বিষবাস্প, কিন্তু ঐ সমাজতন্ত্রের আলখেল্লায় খ্রীষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা কিছুটা হলেও ছিল। তাই খ্রীষ্টানদের পবিত্র দিন রবিবারই ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। মুসলিম প্রধান রিপাবলিকগুলোকেও ঐ নিয়ম মেনে চলতে হতো।

পিকনিক স্পট আগে থেকে সিলেক্ট করা ছিল। শহরের বাইরে পাহাড়ে ঘেরা একটি ঝকঝকে পাহাড়ী হ্রদ।ক্ষেত্রফলে বিশাল বলে ওরা তার নাম দিয়েছে ”তিবিলিস্কোয়ে মোরে” অর্থাৎ তিবিলিসির সাগর। তিনটি ট্যাক্সি ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম হ্রদের উদ্দেশ্যে। আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলেন বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক। তিনি প্রশ্ন করলেন, ” তিবিলিসি সাগর কেন? বেড়াতে যাবে?” উত্তর দিলাম , ”জ্বী”
“এটা কি ওখানে বেড়াতে যাওয়ার সিজন? ওখানে যেতে হয় গ্রীষ্মকালে।”
“আমরা তো আগে কখনো যাইনি। অনেক শুনেছি ঐ হ্রদের সৌন্দর্যের কথা। ছুটি পেলাম যাই ঘুরে আসি।”
আনন্দ করতে পারবে বলে মনে হয় না। বৃদ্ধের মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো।
খুব মন খারাপ করছে। হয়তো ভাবছে আহা বেচারারা একটা আনন্দের জায়গায় যাচ্ছে, নিরানন্দ সময়ে।

আমাদের তখন কাঁচা বয়স। অত কিছু কি আর ভাবি। গাড়ী শহর ছাড়িয়ে বাইরে আসতেই অপরূপ প্রকৃতির শোভায় মন ভরে গেল। উচুঁ উচুঁ পর্বত আর তার গায়ে থরে থরে গাছ। রেইনাকে প্রশ্ন করলাম, কেমন দেখছ? ও মৃদু হেসে বলল,
ঃ তোমরা সমতল ভূমির মানুষ তাই তোমাদের জন্য এই দৃশ্য দুর্লভ। আমার কাছে কিন্তু নতুন কিছুই না। আমার বাড়ী আন্ডিজ পর্বতমালার উপর। ককেশাস পবর্তমালার চাইতেও অনেক উচুঁতে। তবে পার্থক্য এই যে, এখানেকার পাহাড়গুলো বন-বনানিতে ছেয়ে সবুজ। আর আমাদের পর্বতগুলো বৃক্ষহীন, কঠিন পাথরের শক্ত ভিতে একেবারেই রুক্ষ।

বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার লক্ষ্য করল আমরা রুশ ও ইংরেজী মেশানো ভাষায় লক্ষ্য করছি। প্রশ্ন করল
ঃ তোমার বান্ধবী কি, তোমার দেশী নয়।
ঃ না।
ঃ তুমি কোন দেশের।
ঃ বাংলাদেশ।
ঃ তোমার বান্ধবী?
ঃ বলিভিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা।
ঃ ও আচ্ছা, ’ ইন্ডিয়াংকা।
রশীরা ’ ইন্ডিয়াংকা বলতে নেটিভ অ্যামেরিকানদের বোঝে। আর ভারতীয়দের বলে ‘ইন্দুস’’।
কিছুক্ষণ পর ‘তিবিলিস্কোয়ে মোরে’ এসে পৌঁছালাম। আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে নয়ানাভীরাম হ্রদটির দিকে তাকিয়ে আছি, আর এদিকে বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার আক্ষেপ করে বলছে, “দেখতো কান্ড, সবকিছু বন্ধ, একটি জনমানবও নেই। শীতকালে কেউ এখানে আসে?”

আমাদের অন্যান্য বন্ধুরা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। আমাদের দেখে হৈ চৈ করে ছুটে এলো। বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার অবাক বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, কি অদ্ভুত এই তারুণ্য। শীত হোক শৈত্য হোক তারুণ্যের উম্মত্ততার কাছে কোন বাধাঁই বাঁধা নয়।

যদিও ঠান্ডায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। তারপরেও হৈ হুল্লোড়, হাসি- আনন্দের মধ্যে দিয়ে চমৎকার কেটেছিল দিনটি।শুধুই কি চমৎকার? বিশেষণ বোধ হয় কম ব্যবহার করলাম। তারুণ্যের উচ্ছাস, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, রেইনার মিষ্টি চোখের তীব্র আর্কষণ সবকিছুর সমন্বিত রূপই তো সৃষ্টি করেছিল মনে রাখার মত দিনগুলি।

চেংগিস খান আর তৈমূর লং এর রাজ্য জয়ের নামে রক্তের হোলি খেলা, পিউরিটানিষ্ট প্রোটেষ্টান্টদের সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস, পলাশীর ট্রাজেডির পরপরই ভয়াবহ দূর্ভিক্ষে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ আফ্রিকার মুক্ত বণভূমি থেকে ধরে নিয়ে এসে আমেরিকার খাচা বন্দি করা শত শত কালো মানুষদের হাহাকার। পৃথিবীর উপর দিয়ে দুঃস্বপ্নের মত বয়ে যাওয়া দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব, এই সবই ভালোবাসাহীনতার কাহিনী। কিন্তু, তার পরেও পৃথিবীতে ভালোবাসা আছে। গ্রীস ও ট্রয়ের নিষ্ঠুর যুদ্ধে মধ্যেও একিলিস ও ব্রিসেইস এর মধ্যে প্রেম হয়েছিল।

আমার ও রেইনার দু’জনেরই তখন কাঁচা বয়স। ম্যাচুরিটি বলতে যা বোঝায় সেটা তখনও আসেনি। পরবর্তি জীবনে বুঝতে পেরেছিলাম, ম্যাচিউরড্ মানব-মানবীর সম্পর্কের মধ্যে ডোমিনেটিং হয় দেহের তাপ। আর ঐ বয়সে আমাদের দু’জনার সম্পর্কের মধ্যে ছিল হৃদয়ের উত্তাপ।
কিছুদিন পরের কথা। আফসানার জন্মদিন। আমরা আগে থেকেই জানতাম। বিদেশ – বিভূঁয়ে, এই প্রথম ও পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজনহীন জন্মদিন পালন করবে। ওর মনে যেন কোন কষ্ট না হয আমরা সেই চেষ্টাই করব।

আপনজনদের অভাব যেন ও বুঝতে না পারে সেই প্রচেষ্টাই থাকবে আমাদের। শীত গড়িয়ে তখন বসন্ত আসবে আসবে করছে। শীত আর বসন্তের পার্থক্য কতটুকু বাংলাদেশে এটা বোঝা যায় না। ইউরোপে এই ব্যবধান তীব্র। শীতে যেখানে পুরো দেশট বরফে ঢেকে যায়, পাহাড়-নদী, গাছপালা এমনকি মানবকুলও তুহীন শীতে জমাট বেধে যায়। বসন্তে সেখানে বাতাসের উষ্ণতা, কোকিলের কন্ঠের মতই সুমধুর হয়ে ওঠে। পত্র-পল্লবহীন গাছগুলোর নেড়া ডালপালা থেকে একটু একটু করে কিষলয় উঁকি দিতে থাকে। সেই সবুজের মমতার ছোঁয়া মানুষের মনকে যে কতটুকু উৎফুল্ল করে তুলতে পারে, ইউরোপে বসন্ত না কাটালে তা কখনোই হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। আমরা বাংলাদেশীরা ভাগ্যবান চির সবুজ দেশে আমাদের জন্ম। যারা কোনদিনই শৈত্যপ্রবাহের ইউরোপ অথবা রুক্ষ মরুভূমির মধ্রপ্রাচ্য দেখেনি, সবুজের রিক্ততার বেদনা তারা কোনদিনই বুঝতে পারবে না। তাই আমরা গাছের মর্যাদা বুঝিনা। বিনা কষ্টে, বিনা খরচে পাওয়া বৃক্ষরাজির ধ্বংষযজ্ঞে আমাদের উৎসাহের ভাটা পরে না। যাহোক, বসন্তের উৎফুল্লতায় আমরা মহা আনন্দে আফসানার জন্মদিনের উৎসবের যোগার-যন্ত্র শুরু করলাম সকাল থেকেই। কেউ বাজার করল, কেউ রান্না করল, কেউ ঘর সাজালো। সবার এত মমতা দেখে, অভিমানী আফসানাও আনন্দে কেঁদে ফেলল, “তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো!” আসলে বিদেশের মাটিতে আসলে সবাই সবার খুব আপন হয়ে যায়। আমি আফসানাকে বললাম, “কেক কাটার অনুষ্ঠানে রাজকূমারীর মত সেজে হাজির হয়ো”। আফসানা কপট হেসে বলল,
ঃ তোমার বান্ধবী রেইনার মতো সুন্দরীতো আর আমি নই। রাজকূমারী সাজব কি করে?
ঃ আফসানা, যার হৃদয়ে তুমি আছো, তার কাছে তুমি কেবল রাজকূমারীই নও একেবারে মনের রাণী।
ঃ উপহাস করোনা তো। আমি এখনও কারো মনের রাণী নই।
ঃ তুমি তো জান এদেশে বাংলাদেশী ছাত্রী কম। তাই ছাত্রদের সব সময়ই নজর থাকে জুনিয়র ছাত্রীদের দিকে।
ঃ না, থাকে না। তোমরা বাংলাদেশী ছাত্ররা বড় ত্যাঁদোর, তাকাও কেবল বিদেশীনিদের দিকে।

আমি একটু দমে গেলাম। আমি জানি, শুধু বাংলাদেশী না, অন্যান্য দেশের ছাত্রদের মধ্যেও এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখেছি, দেশী মেয়ে তো দেশেই কত আছে। বিদেশে যতদিন আছি, ততোদিন বিদেশীনিদের সান্নিধ্যই উপভোগ করি। তবে আমি তো সেই দৃষ্টি দিয়ে রেইনার দিকে তাকাইনি। আফসানা কি তা বোঝে না? আফসানা বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারলো।
ঃ থাক থাক মন খারাপ করোনা। আমি তোমাকে মিন্ করছি না। এবার বলতো কি পড়লে আমাকে ভালো লাগবে?
ঃ শাড়ী। বাঙালী মেয়েদের শাড়ীতেই সব চাইতে সুন্দর মানায়।
সন্ধ্যার দিকে বেশ আয়োজন হলে।

হোষ্টেলে ’ ইন্টারক্লুব’ নামে একটা জায়গা আছে এর অর্থ ক্লাব বলা যায়। আমরা বাংলাদেশী বাঙালীরা তো ছিলামই, তাছাড়া কিছু ইন্ডিয়ান এবং আফসানার গ্রুপমেইট অন্যান্য বিদেশীরাও ছিল। ইন্টারক্লুবে কিছু জর্জিয়ান ও রুশ মেয়ে ছিল, তাঁরা ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ছাত্রী। আমাদের ভাষা শিক্ষায় সাহায্য করতেন তাঁরা। তাঁরাও এসেছিলেন আফসানার জন্মদিনে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল এইভাবে। সন্ধ্যার দিকে সবাই উপস্থিত হলাম ইন্টারক্লুবে। একটু পরে যার জন্য এই সব আয়োজন সেই আফসানা প্রবেশ করল ক্লাবের দরজা দিয়ে। ওর সাজ-পোষাক হঠাৎ করেই যেন সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। নীল রঙের উপর নানান কারুকাজ খচিত চমৎকার একটি শাড়ী পড়েছে আফসানা। আফসানাকে আগে আমরা নানা পোষাকে দেখেছি। ইউরোপীয় সমাজের প্রভাব ও আবহাওয়ার কারণে আধুনিক পোষাকেই ওকে দেখেছি বেশী। মাঝে মাঝে সালোয়ার-কামিসেও দেখেছি। কিন্তু শাড়ীতে দেখলাম এই প্রথম। আমার কথাই ঠিক মনে হলো। বাঙালী মেয়েদের শাড়ীতেই সব চাইতে বেশী মানায়।

ঃ চমৎকার তোমাদের এই পোষাকটি!
আমার পাশ থেকে বলে উঠল রেইনা।
ঃ তাই?
ঃ হ্যাঁ। এই পোষাকে একজন নারীকে, নারী বলেই মনে হয়।
ওর দিকে তাকালাম আমি, চমৎকার বলেছো তো। এরকম ভাবে তো কখনো ভাবিনি। তাইতো নারী নারীর মত হবে, পুরুষ পুরুষের মত হবে। নারী পরবে নারীর পোষাক। পুরুষ পরবে পুরুষের পোষাক। নারী যদি পুরুষের পোষাকই ব্যবহার করতে শুরু করে আর পুরুষের মত খাটো করে চুল ছাটে, তবে কি নারীর কমনীয়তা তার মধ্যে থেকে হারিয়ে যাবে না? নারী পুরুষে পার্থক্যই যদি না থাকে তবে নারী পুরুষের আকর্ষনই বা থাকবে কি করে।

রেইনার শিরায় কয়েক হাজার বছরের পুরাতন সভ্যতার স্রষ্টা ইনকাদের রক্ত আর মুখে স্প্যানিশ ভাষা। বৃটিশ শাসনের ইতিহাস পড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি চাপা ক্রোধ আমার মনে সবসময়ই জ্বলত। রেইনাকে বলতাম, ” সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষা তোমাদের মুখে কেন? ওটাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারো না?” রেইনা হেসে বলত, ”মানুষ অপরাধ করে, ভাষা অপরাধ করে না। ভাষার উপর রাগ রাখতে নেই। সব ভাষাতেই রচিত হয়েছে শ্বাশত অনুভূতির কাব্য। ফর ইওর বেটার ইনফরমেশন, আমি কেচুয়া ভাষাও পারি”। কেচুয়া বলিভিয়ার প্রাচীন ভাষা।
আমাদের মধ্যে কথপোকথন হতো বিদেশী ভাষায় কিন্তু আমরা এত বেশী ঘনিষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম আর আমাদের আলোচনার গভীরতা এত বেশী হয়ে গিয়েছিল যে মাঝে মাঝে মনে হতো ওর মুখে যেন বাংলা কথাই শুনছি। আফসানার অভিযোগ কতটুকু সত্যি, আমরা দেশিনীদের নিয়ে উচ্ছাস করি না, আর বিদেশিনীদের নিয়ে উন্মত্ত হয়ে যাই। দেশের বাইরে এসে, অর্ধেক পৃথিবীর মানুষের সান্নিধ্যে এসে একটি সত্য আমি উপলদ্ধি করতে পেরেছি – দেশ-বিদেশ আমাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি ও ক্ষমতা লিপ্সার অস্বস্তিকর সৃষ্টি মাত্র। পৃথিবী নামক এই গ্রহটির সমগ্রটাই আমাদের দেশ। মানব-মানবীর বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলো ও হৃদয়- বোধে জাতি-ধর্ম-বর্ণের বাধা পেরিয়ে অভিন্ন ও এক সত্তায় লীন।

বাগেবী স্টুডেন্টস টাউনের ডরমিটরির তিনতলায় ব্যালকনি থেকে ককেশাসের ঢালে ঢালে গড়ে ওঠা তিবিলিসি শহরের অসংখ্য বাতির তীব্র আলোর ঝলমলানি স্বপ্নপূরী রচনা করে। সেই স্বপ্নপূরীর সামনে আমরা একে অপরের হাত ধরে বসে থাকি। রেইনা কবিতা ভালোবাসে, মাঝে মাঝে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু কবিতা আমাকে শোনায়। আমি বেশী ভালোবাসি গান, তই আমার গানের কলি মনে পড়ে, কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে, রাতের নির্জনে .. .. .। নারীদেহের রূপ লাবণ্য যদি নিখুঁত ও পরিমিত হয়। যে কোন পুরুষই তখন সেই সৌন্দর্য্যরে তপ্ত মাধুর্য অনুভব করতে চায়। মেয়েরা তাদের সহজাত দৃষ্টি – বুদ্ধি দিয়ে সেদিক থেকে সাবধানী থাকে। তবে এ সবই পরিণত বয়সের দাবী। আমাদের দু’জনের কেউই তখনো পরিণত নই। রুশরা প্ল্যাসিড, বড় শান্ত। কিন্তু সাউথ আমেরিকানরা উচ্ছল।

রাত তখন গভীর। ডরমিটরির করিডোরে লাইট্স আউট হয়ে গেছে অনেক আগেই। বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতের আকাশের তারাগুলো সরে সরে নতুন দৃশ্যপট রচনা করছে। ডরমিটরির ব্যালকনির সেই স্বপ্নপূরীর আলো-আঁধারীর রহস্যময়তার মধ্যে মুখোমুখী বসে আছি আমরা দু’জন। রেইনা পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাঁকিয়ে। সেই দৃষ্টির গভীরে দেখলাম; এতদিনকার বয়ে যাওয়া ঝড় যেন থেমে যাওয়ার আশংকায় আছে। সেই আশংকা তখনো আমাকে ছোঁয়নি। আমি ভাবছি আমার সামনে একটি পূর্ণ প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া অথবা তিবিলিসির পার্ক-পাবেদী (ভিক্টরি পার্ক) তে দেখা নাম না জানা ম্যাজেন্টা রঙের পুস্প।
ঃ তুমি কি উদ্বিগ্ন নও?
রেইনা প্রশ্ন করল।
ঃ কিসের উদ্বেগ?
ঃ বসন্ত গড়িয়ে এখন গ্রীস্মকাল চলে এসেছে।
ঃ ভালো কথা বসন্তের পরে, গ্রীস্ম তো আসবেই।
ঃ তুমি বুঝতে পারছ না। আমাদের ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ হওয়ার পথে।
আচমকা বজ্রপাত হলো আমার বুকে।

জুন মাসে দ্বিতীয় সেমিস্টারের শেষ।
কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা হয় এই মাসে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলাম মনযোগ দিয়ে। রেইনাও খুব খাটাখাটনি করল। পরীক্ষার ফলাফল দু’জনেরই শুভ হলো। দু’জনই এক্সিলেন্ট গ্রেড পেলাম। পরীক্ষার ফলাফল সেলিব্রেট করার জন্য বেশ একটা হৈ চৈ। যাদের ফল ভালো হয়েছে তারা তো অবশ্যই খুশী। যাদের ফল মোটামুটি তারাও দুঃখিত নয়। ল্যাংগুয়েজ কোর্সে পাশ করাটাই বড় কথা। পাশ করতে পারলেই, তুমি সুযোগ পাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কোর্সে পড়ার। যা আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। ছোট বেলায়, বড় বোনের হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। তিনি তখন সেখানকার ছাত্রী ছিলেন। অপরাজেয় বাংলার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে মাথা নত না করা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হাটতাম আর ভাবতাম, কবে ছাত্র হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হাটতে পারব?

 

রেইনা (৩)

জুন মাসে তিবিলিসিতে পূর্ণ গ্রীস্মকাল। একেবারেই গরম, অনেকটা বাংলাদেশের মতই গরম। আবার দিনের দৈর্ঘ্যও বিশাল। সন্ধ্যা হয় রাত দশটা/সাড়ে দশটায়। রাত বলে ভুল হচ্ছে, বিকাল দশটা বলতে হবে। ‘ইভিনিং’ শব্দটির অর্থ এখন বুঝতে পারছি। দুপুর দুটা-তিনটা থেকে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত ইভিনিং। বাংলার মত ‘বিকাল’ ও ‘সন্ধ্যা’ আলাদা আলাদা শব্দ নেই। আর সূর্য ডুবে গেলেই শুরু হয় রাত। সামারে ঘোরাঘুরি করার জন্য ইভিনিংটা চমৎকার। চারটা থেকে দশটা অবধি ছয় ছয়টি ঘন্টা, বেশ দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করা যায়।

এই সময় আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলাম। আকাশে সাদা সাদা কি যেন উড়ছে। কিছু গায়ে এসে পড়লে দেখলাম, তুলার মত লাগে। ঢাকাতে কোন এক কালে এই রকম কিছু দেখতাম, কোথা থেকে যেন তুলার মত কিছু উড়ে উড়ে আসত। কোন গাছ-টাছ থেকে হবে হয়তো। এখানে ঐ জিনিস উড়ছে ব্যাপক ভাবে। পানামার খোরকে এসে ইন্টারক্লুবের নাতাশাকে জিজ্ঞেস করে, “এগুলো কি? স্নো?”।
নাতাশা উত্তর দিল
ঃ স্নোর মতই লাগে।
ঃ গ্রীস্মকালীন স্নো!
খোরকে রসিকতা করে বলল।
আসলে এগুলো টোপল নামে এক ধরনের গাছের ফুল থেকে বের হয়। সারা শহর জুড়ে এই গাছগুলি সারি করে লাগানো আছে। এই নিয়ে একটি মিথ প্রচলিত আছে। রাশিয়ার কোন এক রাণী স্নো ফল দেখতে খুব পছন্দ করত, তাই জারকে বলেছিল, “আমি গ্রীস্মকালেও স্নো দেখতে চাই। তুমি তো রাজা, পারবে আমার জন্য গ্রীস্মকালেও স্নো ফলের ব্যবস্থা করতে?” প্রিয়তমার আবদার রাখতে পুরুষ কি না পারে? জারের মন হয়তো তখন বলছিল, “তোমার জন্য বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে পারি, একশ আটটি নীল পদ্ম।” যাহোক রাজা নানা চিন্তা করে এই বুদ্ধি বের করলেন। হুকুম দিয়ে দিলেন, ‘সারা দেশ জুড়ে টোপল গাছ লাগিয়ে দাও’। গ্রীস্মকালেও রাণী দেখলেন স্নো ফল। প্রসন্ন হলো রাজার হৃদয়।

এই স্নো ফলের কথা বলতে গিয়ে আমার আরেকটি কথা মনে পড়ল। তখন জানুয়ারী মাস। অবিরাম তুষারপাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগেবী ক্যাম্পাস ও আশেপাশের উঁচুনীচু পাহাড়ী পথ যোজনব্যাপী শুভ্রতায় আচ্ছন্ন হয়েছে। তুষারপাতের প্রথম দিকে পেঁজা তুলার মত ঝরঝরে স্নো বলে পথ ভালোই থাকে। তুষার মারিয়ে যাচ্ছি এই ভেবে হাটতেও ভালো লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা শক্ত বরফে পরিণত হয়। পথ হয়ে যায় পিচ্ছিল আর চলাও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এদেশীয়রা জন্ম থেকেই এই পথে হেটে অভ্যস্ত, তাই তাদের অসুবিধা অত একটা হয়না। তারপরেও দুয়েক সময় দেখি ওদেরকে পিছলে পড়ে যেতে। একবার একজনকে দেখলাম বেশ কোট টাই, ওভারকোট হ্যাট ভারিক্কী বেশভূষা নিয়েছে, তার হাতে আবার ধরানো ছিল, একটা জ্বলন্ত তামাকের পাইপ, যা তার ভার আরো বাড়িয়েছে। হাটছিলও নবাবী চালে, হাটতে হাটতে চোখের পলকে হঠাৎই উল্টে পড়ে একেবারে রাস্তায় শুয়ে পড়ল। ঘটনাটি দুঃখজনক নি:সন্দেহে কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তে তার নাকানি-চুবানি অবস্থা দেখে আমি হাসি আটকাতে পারলাম না। যেখানে ওদেরই এই অবস্থা সেখানে আমাদের অবস্থা তো আরো করুণ। রেইনা বলিভিয়ার যে এলাকায় থাকে (আন্ডিজ পর্বতমালার উপরে), সেখানে কিছুটা বরফ পড়ে। তাই ওর অভ্যাস আছে। আমি জর্জিয়ায় এসেই প্রথম বরফ দেখলাম। একদিন ও আর আমি হেটে এ্যাকাডেমিক বিল্ডিং থেকে হোস্টেলের দিকে যাচ্ছি, ঐ পিচ্ছিল পথে অনেক সাবধানে হাটছিলাম, সামনে একটা ঢালু যায়গায় এসে তাল সামলাতে না পেরে পা হঠাৎ পিছলে গেল। শুনেছিলাম এরকম আকস্মিক পরিস্থিতিতে মস্তিস্ক কাজ করেনা, স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নেয়। আমার স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নিল রেইনাকে আঁকড়ে ধরার। বেচারী আর সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। আমার সাথে সাথে হুরমুড় করে পড়ে গেল মেয়েলী মিষ্টি সুগন্ধের রোমাঞ্চকের অনুভবে বুঝতে পারলাম, রেইনা একেবার আমার গায়ের উপরেই। সেই মুহুর্তে আমি কি সব চাইতে বেশী অনুভব করেছিলাম, দেহমনের তাপ? না মোটেও না যেটা অনুভব করেছিলাম সেটা হৃদয়ের উত্তাপ।

এখানে শীতকালটা প্রচন্ড ঠান্ডা। বাংলাদেশের শীতের সাথে কোনক্রমেই তুলনা হয়না। প্রিয় গায়ক ভূপেন হাজারিকার একটি গানে শুনেছিলাম, ‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়…..।’ হা হা হা, ভুপেন সোভিয়েত ইউনিয়নে আসলে বুঝতেন শীত কাকে বলে, বাঘ শুধু না বাঘের দাদা পরদাদাও পালিয়ে যাবে। মোটামুটিভাবে নভেম্বরের মাঝের দিকে শীত শুরু হলো, এরপর থেকে শীতের তীব্রতা শুধু বেড়েছেই, ডিসেম্বর, জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, মার্চের শেষ দিক পর্যন্তও ঠান্ডা ছিল। এপ্রিলে উষ্ণতা আসতে শুরু করল। পৃথিবীর এ অংশটা এরকমই। শীত সহজে বিদায় নিতে চায়না। রাশিয়া, ইউক্রেণে আরো খারাপ অবস্থা, মধ্য এপ্রিলে অথবা মে মাসের শেষেও এখানে তুষারপাত হয়। শীতকালের আরেকটি সমস্যা হলো দিনের দৈর্ঘ্য খুব কম। চারটা-পাচটার দিকেই সন্ধ্যা হয়ে যায়।

যাহোক সেই অসহনীয় শীত কেটে যখন গ্রীস্মকাল এলো আমরা গরমের দেশের মানুষেরা হাপ ছেড়ে বাচলাম।এই সামারে তিবিলিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা ট্রেডিশন আছে। বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান না করে সবাই মিলে একটা অনুষ্ঠান করে। এর কারণ কয়েকটি, প্রথমতঃ আলাদা আলাদা করে প্রতিটি দেশের ছেলেমেয়ের সংখ্যা কম, দ্বিতীয়তঃ ওদের সবার ভাষা এক – স্প্যানিশ। আবার তাদের ধর্মও এক। এই ধর্মের উপর ভিত্তি করেই তো সংস্কৃতির একটা মেজর অংশ গড়ে ওঠে। ওদের কালচারে পার্থক্য যে লেই তা নয়, তবে অমিলের চাইতে মিলটাই বেশী। আরবরাও সব দেশ মিলে একটা অনুষ্ঠান করে, ল্যটিনদের মত ঐ একই কারণে।

ইন্ডিয়ান আর আমরা বাংলাদেশীরা একসাথে অনুষ্ঠান কখনো করতে পারিনি। করতে চাইওনি। এটা সম্ভবও না। আমাদের সংস্কৃতিতে মিলের চাইতে অমিলটাই বেশী। আমাদের ভাষা এক নয়, ধর্মও এক নয়। এবার আমাদের তোড়জোড় খুব বেশী ছিল, উঠেপড়ে লেগেছিলাম, একটা ভালো অনুষ্ঠান উপহার দিতেই হবে। আমাদের তোরজোড়টা ইন্ডিয়ানরা টের পেয়ে যায়। ওদের পক্ষ থেকে একবার অফার দিল একসাথে অনুষঠান করার। আমরা স্ট্রেইটওয়ে নিষেধ করে দিলাম। মাথা খারাপ, ওদের সাথে অনুষ্ঠান করতে যাব কোন দুঃখে। আগেই বলেছি, ওদের আর আমাদের ভাষা ভিন্ন, একসাথে অনুষ্ঠেন করলে হিন্দির প্রভাব বেশী থাকবে। বাংলা গান-টান হয়তো একটা দুটা হবে। ফলে হিন্দির মাঝে বাংলা হারিয়েই যাবে। তাছাড়া ওদের নাচ-গানে হিন্দু ফিলোসোফির প্রভাব থাকে, আমাদের সংস্কৃতিতে তা নেই। সুতরাং ওদের সাথে অনুষ্ঠান করলে আমাদের আর নিজস্ব সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হবে না।

তার কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস কম্যুনিটির নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়। যে সভাপতি হয় তার নাম কেকে। রুবেল এসে আমাকে বলল, “ঐ যে মোচওয়ালা সিনিয়র ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টটা আছে না, ও আজ গিয়েছিল আমার ম্যডামকে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে। আমি শুনে বললাম,
: ও আচ্ছা, কেকে গিয়েছিল।
: ও একাই গিয়েছিল।
রুবেলের উত্তর।
: হু কেকে।
: ও একাই।
: ঐ তো, বুঝলাম কেকে গিয়েছিল।
আমি আবার জোর দিয়ে বললাম। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রুবেল বলল।
: ও একাই তো গিয়েছিল।
: আরে দূর। আমি কোন প্রশ্ন করছি না। ওর নামই কেকে।
: ও তাই বলো,
হাসিতে ফেটে পড়ল রুবেল।

ভারতের অনুষ্ঠান হয়ে গেল, খুব সুন্দর হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এম্নিতেই ভারত বলতে অজ্ঞান (আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, ভারত এমন একটা দেশ যে, রাশিয়া ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই, আবার রাশিয়া এমন একটা দেশ যে ভারত ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই)। হিন্দি সিনেমা তখন সোভিয়েতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। আসলে অন্যান্য দেশের ছবি, এখানে দেখানো হতো কম। আর হিন্দি ছবি ও তার অভিনেতা অভিনেত্রিদের হাইলাইট করা হতো বেশী। বয়স্কদের দেখেছি এখনো রাজকাপুর রাজকাপুর করে। লোক ঝুঁকে পড়েছিল ওদের অনুষ্ঠানে। তার এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশের অনুষ্ঠান, আমরা শপথ করলাম যে করেই হোক ওদের চাইতে ভালো করতে হবে। ভারতের সাথে আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা।

ভারতের অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে আমাদের আরো ভালো করতে হবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে, এই মটো নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। প্রস্তুতি অবশ্য আগে থেকেই নিচ্ছিলাম, এবার গতি ও উদ্যম বাড়ি্যে দিলাম। একসময় সমুদ্র পাড়ি দেয়া ভারতীয়দের (অথবা হিন্দুদের) জন্য পাপ ছিল, এখন সমুদ্র পাড়ি দেয়ায় আমাদের চাইতে তাদের উৎসাহই বেশী। ভারতের ছাত্র-ছাত্রী অনেক। একটা অনুষ্ঠানের জন্য নাচ-গান-বাজনা ইত্যাদি সবকিছুর পারফর্মারই তারা পেয়ে যায়। আবার ভারতীয়দের মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক। আমাদের ছাত্রী প্রায় নেইই। ল্যাংগুয়েজ কোর্সে চারজন ছাত্রী এবং সিনিয়রদের মধ্যে একজন, এই পাঁচজনই সম্বল।

একটা কালচারাল ফাংশনে ছাত্রীরা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে। ইন্ডিয়ানরা করেছিলোও তাই। অনেক ছাত্রী নাচের পারফর্মার ছিল। একটা ফ্যাশন শোও তারা করেছে। আবার রিসিপশনে তারা অতিথিদের ঢোকার পথে দুদিকে পাঁচজন পাঁচজন দশজন ছাত্রীকে বিভিন্ন রাজ্যের জাতীয় পোশাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। শুনিতা নামে গুজরাটি একটা মেয়ে, গুজরাটি ঢংয়ে (আমাদের মত করে শাড়ি তারা পরেনা, ঢংটা ভিন্ন) শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব সুন্দর লাগছিল।

আমাকে রেইনা বলল
ঃ ওদের ফ্যাশন শো তোমার কেমন লাগছিল?
ঃ ভালোইতো।
ঃ আমার ভালো লাগেনি
ঃ কেন?
ঃ তোমার কি মনে হয়নি, এখানে নারীদের অসম্মান করা হয়েছে?
ঃ কেন এমন মনে করছ?
ঃ আমি দেশে থাকতে ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখতাম।ওদের কিছু কিছু কাহিনী হৃদয়স্পর্শী সত্যি, কিন্তু তারপরেও সিনেমাগুলোর মধ্যে এমন কিছু উপাদান থাকে যা একেবারেই নোংরা।
ঃ যেমন?
ঃ ওদের নাচগুলো একেবারেই অশ্লীল। ওরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এটা করে।
ঃ বিষয়টা নিয়ে আমি আসলে আগে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি, আমাকে একটু বুঝিয়ে বল।
ঃ নারীদেহের উপস্থাপনাটা এমন যৌন আবেদনময়ী কেন হবে বলতো? এসব দেখে শুনে মনে হতে পারে, নারী মানেই নির্লজ্জ্ব ও রতিসর্বস্ব। কেন কোন সংযত ও মিতশ্রী রমনীর কথা তোমরা ভাবতে পারনা? নারী নিজেকে কখন বেশী সন্মানিত বোধ করে? সৌন্দর্যের নামে যখন নারীদেহকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে? কেউ যখন মন প্রাণ সঁপে দিয়ে নারীকে একটি ফুল উপহার দেয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে, না কি যখন তাকে কেউ প্রেমহীন সেক্স প্রস্তাব দেয় তখন। কখন নারীর দেহমন পুলকিত হয়, যখন মুগ্ধ নয়নে তার দিকে চেয়ে বলে, “তুমি অপূর্ব! নাকি, যখন লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ইউ আর সো সেক্সি!”

আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য ঠিক করা হলো দুয়েক জনকে মস্কো থেকে আনা হবে। উনারা তিবিলিসিরই, ল্যাংগুয়েজ কোর্সটা তিবিলিসিতে পরে মস্কো চলে গি্যেছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সানন্দে মস্কো চলে আসেন। তাদের আনন্দ ছিল অনেকটা নেটিভ শহরে ফেরার আনন্দের মতো। সাথে করে নিয়ে এলেন ওলগা কিরিলোভনা নামে একজন রুশ ম্যডামকে। গান-বাজনায় অদ্ভুত পারদর্শী তিনি। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশীয় সঙ্গিতগুলো তিনি সহজেই তুলতে পারেন যে কোন বাদ্যযন্ত্রে। উনার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গিয়েছে, এখনো অবিবাহিতা। অবিবাহিতা নারী রুশদের মধ্যে কম দেখা যায়, প্রায় না থাকার মতই। তাহলে তিনি অবিবাহিতা রইলেন কেন? উনার সম্পর্কে গুজব আছে, ছাত্রীজীবনে উনার একজন ইন্ডিয়ান অথবা বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে প্রেম ছিল। ছেলেটি পাশ করার পর দেশে ফিরে যায়। উনাদের আর বিয়ে হয়নি। সেই থেকে একাই আছেন ওলগা কিরিলোভনা। প্রেমের জন্য এত ত্যাগ এই যুগে কমই দেখা যায়।

মূল ঘটনা সম্ভবত: অন্য জায়গায় ছিল। সে সময় সোভিয়েতদের ভিন জাতি বিবাহে প্রচন্ড জটিলতা ছিল। আইনি জটিলতা এর মধ্যে একটি। বিবাহের পর দম্পতি কোথায় থাকবে, এটা একটা ভাইটাল কোশ্চেন ছিল। অনেক পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন হেলসিংকির কনভেনশন মেনে নেয়। সেই কনভেনশন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রাস্ট্রের নাগরীকদের মধ্যে বিবাহ হলে, দম্পতি তাদের পছন্দ অনুযায়ী দুই দেশের যে কোন একটি দেশেই থাকার আইনগত অধিকার রাখে। এত গেল আইনের কথা। সমাজ কি দৃষ্টিতে দেখছে? সোভিয়েত সমাজে ভীন দেশী বিবাহকে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখা হত। এছাড়া তথাকথিত কম্যুনিষ্ট আদর্শ অনুযায়ী, এটাকে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হুসাবে নেয়া হত। অনেক সময় সেই নারী অথবা পুরুষকে রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার দায়েও অভিযুক্ত করা হতো। এই সম্পর্কিত অনেক করুণ কাহিনীও শোনা যায়। আবার সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও পরবর্তিতে রাষ্ট্রনায়ক, জোসেফ স্তালিন-এরই মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল এক ভারতীয়র সাথে।

আমরা প্রানান্ত চেষ্টা করতে লাগলাম অনুষ্ঠান সফল করার জন্য। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল দর্শক হবে না। ইন্ডিয়া নাম শুনতেই তো পাগল, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে, বাংলাদেশের নাম শুনে অমন হুমড়ি খাওয়ার কিছু নাই। সবাই নানা প্ল্যান প্রোগ্রাম করছে , কি করে লোক বাড়ানো যায়। আমি বললাম, “ঘাবড়াবেন না, ডিসেম্বরে ল্যাংগুয়েজ কোর্সের প্রোগ্রামে আমরা যত ভালো পারফর্ম করেছি, তাতা আমাদের অনেক শুনাম হয়েছে। ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সব বিদেশীদের নিয়ে আসতে পারব।” একজন সিনিয়র আমাকে বললেন, “তোমার উপর আমাদের অনেক আশা, ভালো করে যাদু দেখাবে, তাক লাগিয়ে দেবে, সবাইকে।” সবাই আমার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো। আমি যাদু দেখানোর আশ্বাস দি্যেছি। আমার সাথে থাকবে রুবেল আর দোলন।

আরেকজন বলল, “আমাদের গানও সুন্দর হবে, লোক শুনে তারিফ করবে দেখবেন।” সেলিম ভাই বললেন, “আরে ধুর! আমাদের ভাষা স্প্যানিশের মত মিষ্টি মধুর নয়। তাই গান সিলেক্ট করার ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।” আমার তখন মনে পড়ল হিণ্দুস্থানী রমেশের কথা, “বেঙ্গলী ল্যাংগুয়েজ ইজ ভেরী সুইট! আমাদের ভারতের জাতীয় সঙ্গিতটাতো বাংলাতেই।”

আমার দিকে একজন তাকিয়ে বলল, “ল্যাটিনদের লাম্বাদা, নাচটাওতো দেয়া যায়, ভীষণ দর্শক মাতাবে।” সে সময় লাম্বাদা নামে একটি গান পুরো ইউরোপে প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। জর্জিয়াতেও তার ঢেউ এসে লেগেছিল। আমার মনে আছে বাংলাদেশের ঘরে-বাইরে, চায়ের দোকানে, এখানে-সেখানে তখন একটা গান বাজত – ‘চিরদিনই তুমি যে আমার, যুগে যুগে আমি তোমারই।’ এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা ঠাট্টা করে একে জাতীয় সঙ্গীত বলতে শুরু করছিলাম। সেরকম লাম্বাদাও জর্জিয়ায় আনাচে-কানাচে একবারে জাতীয় সঙ্গীতের মত বাজতে শুরু করছিল। এর মূল কারণ ছিল দুটি, প্রথমত গানটির সুর ও তাল খুব মন কাড়া ছিল, দ্বিতীয়তঃ এর সাথে নাচটি ছিল প্রচন্ড যৌন আবেদনময়ী। একটি যুগল নাচটি নাচত, সেখানে মেয়েটির পোষাক ছিল একেবারেই সংক্ষিপ্ত। একপাশ থেকে আরেকপাশ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে মেয়েটি নাচত বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আবেদনের ঝড় তুলে। লাম্বাদা বলতে সেই সময়ে যদিও আমরা ঐ গানটিকে বুঝতাম আসলে লাম্বাদা একটি পুরাতন নাচের স্টাইল। “Chorando se foi” (which means: the one who left crying) গানটির সাথে সেই পুরাতন নাচের স্টাইলটিই ব্যবহার করা হয়। আমি রেইনাকে একবার বলেছিলাম
ঃ ব্রাজিলিয়ান এই গানটি কিন্তু চমৎকার!
ঃ ব্রাজিলিয়ান?
ঃ কেন, আমি কি ভুল জানি?
ঃ শুধু তুমি না, সারা পৃথিবীই ভুল জানে।
ঃ তাহলে?
ঃ গানটি বলিভিয়ান।
ঃ বলিভিয়ান?
ঃ হ্যাঁ, বলিভিয়ার একটি গানের গ্রুপ গানটি প্রথম গেয়েছিল। পরে ব্রাজিলিয়ানরা এটা অনুকরণ করে আর তাল একটু দ্রুত করে দেয়। তারপর থেকে পুরো পৃথিবীই মনে করছে এটা ব্রাজিলিয়ান গান।

সবাই মিলে ঠিক করল এই নাচটি অনুষ্ঠানে ইনক্লুড করা হবে। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ চলে এলো। আমরা ভাড়া করেছিলাম নগরীর নামজাদা একটি অডিটোরিয়াম। আমাদের সাথে বাজনায় সহযোগিতা করার জন্য জর্জিয়ার একটি গানের গ্রুপকে ভাড়া করা হয়েছিল। সকাল থেকেই আমরা অডিটোরিয়ামে রিহার্সাল, হল গুছানো ইত্যাদি নানা কাজে লেগে গেলাম। এত কিছুর পরও আমাদের একটু ভয় ভয় হচ্ছিল, দর্শক হবে তো? সেলিম ভাই হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়ে বললেন দর্শকের অভাব হবেনা। পুরো বার এসে উপস্থিত হবে।
আমি কানে কানে এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, “বার মানে, সেলিম ভাই কি বলতে চাচ্ছেন?”
ঃ আরে জানোই তো, সেলিম ভাই শুরায় আসক্ত।
ঃ সে তো জানিই। সাকীতেও অরুচী নেই।
ঃ সিটি সেন্টারের একটি বারে, নিয়মিত পান করেন। সেখানকার সবাই উনার বন্ধু।

“বুঝলে, আমি ওদেরকে বলে এসেছি তুমি মানুষ শূণ্যে তোলার যাদু দেখাবে। শুনে তো ওদের তাক লেগে গি্যেছে। আবার লাম্বাদা নাচ হবে। এই সব শুনে বারশুদ্ধ সব, দল বেধে রেডী হচ্ছে আসার জন্য। আমাদের আশা ভাঙবে না কিন্তু সন্মান রাখতেই হবে।” বললেন সেলিম ভাই।

বিকালের দিকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায়র ঘন্টাখানেক আগেও লোকজন খুব কম দেখলাম। আমার দু’একজন ঘনিষ্ট আরব, ল্যাটিন বন্ধু-বান্ধব ছিল, তারা এসে উপস্থিত। জিজ্ঞাসা করলাম, “বাকীরা, বাকীরা কি আসবে না?”
ঃ আরে আসবে আসবে সবাই আসবে। এখনওতো এক ঘন্টা বাকী।
রেইনা এসে উপস্থিত হলো, পয়তাল্লিস মিনিট আগে। অপূর্ব সাজে সেজেছে, একেবারে সাক্ষাৎ পরী। আমার বান্ধবী বলে বলছি না। সাজগোজের অদ্ভুত কৌশল জানে ও। যেকোন পোষাকের সাথেই মানানসই সব গয়নাগাটি মেক আপ, ইত্যাদি। সাথে নিয়ে এসেছে একগাদা ফুল।
ঃ ফুল? ফুল কেন?
ঃ বারে, তোমাকে দিতে হবেনা?
ঃ আমাকে হঠাৎ ফুল?
ঃ ওমা তুমি যাদু দেখাবে না!
ঃ ও, আচ্ছা।
বুঝলাম পারফর্মেন্সের পর স্টেজে উঠেই ফুল দেয়ার একটা রীতি আছে। আমাদের দেশে এই রীতি তখনও দেখিনি।
ঃ তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? পারফর্মেন্সের ভয়ে?
ঃ না না, আমার পারফর্মেন্সের ব্যাপারে আমি সব সময়ই কনফিডেন্ট।
ঃ তাহলে?
ঃ বাংলাদেশের কোন নাম ডাক নেই, দর্শক হবে কিনা তাই ভাবছি।
ঃ উহু, নিজের দেশকে এতো ছোট ভেবোনা। আমি ইতিহাস পড়ে দেখেছি, তোমাদের কালচারাল হেরিটেজ খুব স্ট্রং। শুধু ইংরেজ শাসনামলের কারণে, তোমাদের একটা বড় ইন্টারাপশন হয়েছে। এখন তো তোমাদের দেশ স্বাধীন। সেটা রিকভার করার চেষ্টা কর।
আমি মনে মনে ভাবছি, বুকের রক্ত ঢেলে দেশ আমরা স্বাধীন করেছি সত্য, কিন্তু দেশ গঠনে কতটুকু এগুতে পেরেছি সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
ঃ চিন্তা করোনা। আমি দেখে এসেছি ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সবাই রেডী হচ্ছে, সবাই আসবে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম সত্যিই বানের পানির মত মানুষ আসতে শুরু করল। একটা সময় আর জায়গা হচ্ছিল না, অনেকেই অডিটোরিয়ামের মাঝখানের সিঁড়ীতে বসে গেল।

অনুষ্ঠান অদ্ভুত সুন্দর হয়েছিল সেদিন। চারিদিকে প্রশংসার ঢেউ উঠেছিল। আমার যাদুও ব্যাপক প্রশংসা পেল। গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলেছিল, “ইস ফাংশন মে সবসে আচ্ছা থা তেরা যাদুকা খেল।” এই ধীর শান্ত ভারতীয় রূপসীর আমার প্রতি দুর্বলতা ছিল, আমি জানতাম। আর রেইনা একগাদা ফুল নিয়ে মঞ্চে উঠে এসে সবার সামনেই আমার গালে চুমু খেয়ে সবাইকে অবাক করে দি্যেছিল।

আরেকটি কথা বারবার বলছিল (সেটা সে আগেও বলেছে) শাড়ী পড়ে তোমাদের মেয়েরা যখন হাটছিল পরীর মত লাগছিল। অদ্ভুত সুন্দর তোমাদের এই পোষাকটি।
ঃ তুমি শাড়ী পড়বে?
ঃ হু, কিন্ত পাবো কোথায়?
ঃ ঠিক আছে আমি দেশে গেলে এনে দেব।

তার এক সপ্তাহ পরে হলো ল্যাটিন আমেরিকানদের অনুষ্ঠান। সালসা, মিরেঙ্গে, বাচাটা, ট্যাঙ্গো, রুম্বা, সাম্বা, মুরালিজম আর কার্নিভালের মহাদেশ ল্যাটিন আমেরিকা। ওরাও খুব সুন্দর করেছিল। রেইনা গিটার বাজিয়েছিল। খুব সুন্দর গিটার বাজায় ও। ওর গিটারের সুরের মূর্ছনায় আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন পাহাড়ী ঝর্নার গায়ে ঝরে ঝরে পড়ছে সোনালী ফুল। মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনেছিল পুরো হল। আলিশা বলেছিল তোমরা দুজন তো শহর মাতিয়ে দিলে দেখছি।

ল্যাটিন আমেরিকানরা নাচতে গাইতে খুব পছন্দ করে। ডিসকোতে আমি নাচতাম না, সংকোচ হতো। রেইনা চমৎকার নাচে। নাচের আসরে মাঝে মাঝে স্লো মিউজিক হয়। ছেলে-মেয়েরা তখন যুগলবন্দি হয়ে স্লো ডান্স করে। সব সাউথ আমেরিকান ছেলে-মেয়েরাই স্লো ডান্স করে, এর সাথে অশ্লীলতার কোন সম্পর্ক নেই । এটা ওদের কালচারেররই একটা পার্ট। ভব্যতা রেখেই ওরা এটা করত। আমি লক্ষ্য করলাম , রেইনা যখন ডিসকোতে যায় তখন ও ইন্ডিভিজুয়ালি নাচে, স্লো ডান্স করে না। একদিন প্রশ্ন করলাম
ঃ তুমি স্লো ডান্স কর না কেন?
ঃ উহু করব না। নিজের বন্ধুর সামনে অন্যের বাহুপাশে কোনদিন আবদ্ধ হব না।

ভিনদেশে এসে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষদের কাছ থেকে দেখে আমার গভীর বোধ জন্মেছে – দেশ-বিদেশ আমাদের খন্ড দৃষ্টি ও বাস্তব বোধের অস্বস্তিকর সৃষ্টি মাত্র। এই মাটির পৃথিবীর পুরোটাই আমার দেশ। রঙে, রূপে, রম্যতায় নানা ভিন্নতা সত্ত্বেও হৃদয়বোধে ও মানবিক অনুভবে সকল মানব-মানবীই অভিন্ন।

এদিকে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। বলিভিয়া এই টুনার্মেন্টে অংশগ্রহনকারী দেশ ছিল। বাংলাদেশ তখন ফুটবল তো দূরের কথা কোন খেলাতেই বিশ্বকাপ খেলেনা। রেইনা অবশ্যই বলিভিয়ার সমর্থক। বাঙলাদেশ যেহেতু খেলেনা তাই আমরা যেই দেশটিতে আছি অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক হলাম।

পরিক্ষার রেজাল্টের পর কে কোন শহর পাবে এটা নিয়ে নানা হৈ চৈ হচ্ছিল। সাধারনতঃ এটা রেজাল্টের উপর নির্ভর করে। যাদের রেজাল্ট ভালো তাদের ভালো শহরগুলোতে দেয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কলেবরে একটি মহাদেশের মতই বিশাল। তার শহরের সংখ্যার কোন ইয়ত্তা নেই। রিপাবলিকই তো পনেরটা। সেই পনেরটি রিপাবলিকের আবার পনেরটি রাজধানী। গতানুগতিকভাবেই সবাইই মস্কো যেতে চায়, রাজধানী, দেশের কেন্দ্র সবরকম সুযোগ সুবিধাই অনেক বেশী। এশিয়ান সিটি যেমন তাসখন্দ, বাকু, আশগাবাদ ইত্যাদিতে কেউ যেতে চায়না। বলে ওখানে কিছু নেই। এই কিছু নেই বলতে একেবারে কিছি নেই তা নয়। এর যেকোনটিই আমাদের ঢাকার চাইতে বহু গুনে উন্নত। আসলে সবার লক্ষ্য ইউরোপ। অগ্রসর সংস্কৃতি। অপেক্ষাকৃত কম উন্নত, কনজারভেটিভ এশিয়া কেউ চুজ করতে চায়না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে মস্কোর পর আসে লেনিনগ্রাদ (বর্তমান নাম সাংক্ত পিতেরবুর্গ বা ইংরেজী উচ্চারণে সেন্ট পিটার্সবার্গ), ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, ইউক্রেনের পুরাতন রাজধানী খারকভ, বিলোরাশিয়ার রাজধানী মিনস্ক, ইত্যাদি। অনেকে একটু এগিয়ে গিয়ে মস্কোর চাইতেও বেশী প্রেফারেন্স দেয় তিনটি বাল্টিক প্রজাতন্ত্র লাটভিয়া, লিথুনিয়া এবং এস্থোনিয়ার রাজধানী যাথাক্রমে রিগা, ভিলনুস ও তাল্লিন। কারণ অনেকে মনে করেন সংস্কৃতিগত দিক থেকে তারা রুশদের চাইতে উন্নত। আবার ছেলেরা মুচকি হেসে আকর্ষণের কারণ হিসাবে বলে, ওখানকার মেয়েরা অনেক বেশী সুন্দরী আর অনেক বেশী খোলামেলা।

আমি শহর নিয়ে অতো মাথা ঘামাইনি। ভাবলাম কি হবে মস্কো গিয়ে? প্রচন্ড ঠান্ডা, অত ঠান্ডা আমি সইতে পারব না। আর রাজনীতির হাওয়া বদলের ক্রাইসিসের ছোঁয়ায় জিনিস-পত্রের দামও আকাশ ছোঁয়া। আমাকে ডেপুটি ডীন ডেকে বললেন, “তুমি ভালো ছাত্র ছিলে, তাই তোমাকে চয়েস দিচ্ছি, তোমার সাবজেক্টওয়ালাদের জন্য দুটো শহর আমার হাতে আছে, তিবিলিসি ও খারকভ। তুমি কোনটা বেছে নেবে?” তিবিলিসি শহরে একটা বছর কেটে গেছে। শহরটা আমার দেখা তাই তার প্রতি আমার আর কোন ফ্যসিনেশন ছিল না। ভাবলাম এই দেশের আরেকটা শহর দেখি।
রেইনা ভালো ছাত্রী হওয়ার পরও, মস্কোতে সীট না থাকার না কারণে ওর মস্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হলোনা। ওকে কিয়েভে সীট দেয়া হলো।
ঃ এখন কি করবে? কিয়েভে যাবে? তুমি তো মস্কো যেতে চাইছিলে।
ঃ আমি অত সহজে হার মানার মানুষ না। ব্যবস্থা একটা করবই।
বলল রেইনা।

জুনের শেষে অনেকেই হোস্টেল ছাড়তে শুরু করল। এটা ঠিক একেবারে চলে যাওয়া না। সামার ভ্যাকেশন কাটাতে বাইরে যাওয়া। বেশীরভাগই যাচ্ছে নিজ নিজ দেশে। মাত্র এক বছর আগে দেশ থেকে এসেছে, তাই দেশের প্রতি টান সবারই বেশী। অন্যদিকে, সিনিয়রদের দেখতাম ভ্যাকেশনগুলো কাটাতো ওয়েস্ট ইউরোপের কোন দেশে, মাঝে মধ্যে সিঙ্গাপুরে। আমাদের ল্যংগুয়েজ কোর্সওয়ালাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন ইউরোপের কোথাও গেল। জুলাই-আগস্ট এই দুমাসের জন্য বাইরে যাওয়া তারপর আবার সবাই ফিরে আসব এই হোস্টেলে। সাত-আট দিনের জন্য। এরপর একবারে চলে যাব, যে যার নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে। আমি সামার ভ্যাকেশন কাটাতে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম আর রেইনা ঠিক করল স্পেনে যাবে।ওদের কাছে স্পেনটা অনেকটা আমাদের কাছে ইংল্যান্ডের মত।ছুটিতে দেশে যাওয়ার আনন্দে অনেক উৎফুল্ল ছিলাম। রেইনা সামারে ওর দেশে যাবেনা। ঠিক করেছে স্পেন যাবে। সামার টাইমটাতে রাশ খুব বেশী থাকায়, প্লেনের টিকিট পাওয়া খুব ঝামেলার ব্যাপার। তাছাড়া ওখান থেকে একটা এয়ারলাইন্সই তখন মস্কো থেকে ঢাকা আসত – বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারলাইন্স ‘এরোফ্লট’। দেশে থাকতে এই এয়ারলাইন্সটির অনেক বদনাম শুনলেও আমি নিজের অভিজ্ঞতায় সেরকম কিছু দেখিনি, বরং তার ফ্লাইং ল্যান্ডিং খুবই স্মুথ। তাছাড়া তখন পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল রূটে এরোফ্লটের একটিও দুর্ঘটনা ছিল না। তিবিলিসি থেকে প্লেনে চড়ে মস্কো এলাম। মাত্র দুঘন্টার পথ। মাত্র বলছি, আসলে দূরত্ব তো অনেক। ট্রেনে যেখানে লেগেছিল তিনদিন চার রাত্রি, বিজ্ঞানের অপর উপহার প্লেনের কল্যাণে, সেই দুরত্ব কমে এসে হলো দুই ঘন্টা। বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাধারণ কর্ম যাযাবরের দৃষ্টিপাতে পড়েছিলাম, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। আমি এই উক্তির সাথে একমত হতে পারিনা। ট্রেন ও প্লেন দুটোই বিজ্ঞানের অবদান। আর বিজ্ঞানের কল্যাণেই আবেগ প্রকাশ করার সুযোগ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যাহোক মস্কো এসে মাত্র একদিন ছিলাম, কোথাও আর বের হয়নি। বিশাল মস্কো শহরে অনেকগুলো এয়ারপোর্ট, যতদূর জানি ছয়টি। তিবিলিসি থেকে এসে নামলাম ভ্নুকোভা এয়ারপোর্টে। তবে এই এয়ারপোর্ট থেকে প্লেন ঢাকা যাবেনা। তাই সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম, শেরমিতোভা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে এসে এই এয়ারপোর্টেই প্রথম ল্যান্ড করেছিলাম। ভ্নুকোভা থেকে শেরমিতোভা আসার পথে নতুন অগ্রহ নিয়ে মস্কো দেখছিলাম। গ্র্যান্ড সিটি। তার বিশালত্ব অল্পতে বর্নণা করা যাবেনা। ঢাকার মানিক মিয়া এ্যভেনিউকে এক সময় খুব চওড়া মনে হতো আমার কাছে। মস্কোর সব রাস্তাই সেরকম এবং অনেক রাস্তা আবার তার দ্বিগুনেরও বেশী চওড়া। দুপাশের দালান কোঠাও অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। যেতে যেতে এক যায়গায় দেখলাম সুউচ্চ ধাতব স্তম্ভের উপর, বিশাল এক ধাতব মুর্তি। পুরো ভাস্কর্যটা দেখে মনে উর্ধবগামী কোন অতিমানব। আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারকে প্রশ্ন করলাম, “এটা কার মুর্তি?” ট্যাক্সি ড্রাইভার উত্তর দিল, “ইউরি গ্যাগারিন”। ওহ! এইতো সেই গ্যাগারিন, পৃথিবীর প্রথম নভোচারী।

মস্কো থেকে প্লেনে চড়ে রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। বারো ঘন্টা জার্নির পর (মাঝখানে দুবাইয়ে কিছু সময়ের জন্য হল্ট করেছিলাম), যখন ঢাকা এসে পৌছেছিলাম মনে হচ্ছিল আমি আমার আপন ডেরায়, নিজের ঘরে ফিরে এসেছি। স্পষ্ট মনে আছে, প্লেন থেকে নেমেই মাটি ছুঁয়ে চুমু খেয়েছিলাম।

দেশে এসে ডায়েরিতে লিখেছিলাম, ‘এখানে আসার পর আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছি। ওখানে যাওয়ার পর পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে বা প্রভাবে নিজের অনেক বিশ্বাস এবং নীতির প্েতি নিজেরই অনেক সন্দেহ জেগেছিল। কিন্তু দেশের শান্তিময় পরিবেশ আমার সন্দেহগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলেছে। আপাতঃ ঝলমলে প্রতিচ্যের প্রতি সবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ আছে। প্রতিচ্যের কাছে তার এই ঝলমলানির কতটুকু মূল্য আছে জানিনা, কিন্তু আমাদের কাছে তা অর্থহীন। আসলে প্রাচ্যের হয়ে প্রতিচ্যের অনুসরণ করতে যাওয়াটা নিছক বোকামী, এতে নিজেকেই জলান্জলী দেয়া হয়।’
অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি সেদিন ঠিক লিখিনি। এক বৎসের বসবাস একটি দেশকে জানার জন্য যথেষ্ট নয়।

দেশ থেকে ফিরে এলাম তিবিলিসিতে। রেইনা তখনও স্পেন থেকে ফেরেনি। আমি ওর জন্য কিছু উপ হার দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম, অপেক্ষায় ছিলাম ও আসলেই দেব। হঠাৎ আমার মনে হলো, ‘রেইনার জন্য একটা শাড়ীতো আনলাম না। এত কিছু আনলাম, আর শাড়ী আনার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম!

ও স্পেন থেকে যেদিন ফিরে এলো। অনেকদিন পর ওকে দেখে আমার মন ভরে উঠল। চেয়ে চেয়ে এত দেখেও যেন সাধ মেটে না শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। মুক্তার মত দাতগুলি ঝিলিক দি্যে ওঠে।
বার্চ পাতার মর্মর ধ্বনির মতই মিষ্টি ও মুখর। তার লাবণ্য ও দিপ্তি-সৌরভে মন নেষায় নিমেষে রঙিন হয়ে ওঠে।
ঃ রেইনা, তুমি কয়েকদিন দেরী করে এলে মনে হয়?
ঃ হ্যাঁ তাই।
ঃ মস্কোতে হল্ট করেছিলে?
ঃ ঠিক ধরেছ।
ঃ কেন?
ঃ সারপ্রাইজ।
ঃ কি সারপ্রাইজ?
ঃ আমি মস্কো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির অনুমতি পেয়েছি।
ঃ বাহ্, বেশতো! কি করে পেলে?
ঃ বললাম না আমি হার মানব না। আমি ওখানে ডীনের সাথে দেখা করি। আমার আগ্রহ দেখে তিনি, ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্যাস, টিকে গেলাম।
সাবাস, মেয়ে সাবাস। পরাজিত হবার জন্য মানুষ হয়ে জন্ম হয়নি।

পর মুহূর্তে আমার মনে হলো। এরপর কি? আমাদের মধ্যে অনেক বাধা। ধর্ম বাধা, সংস্কৃতি বাধা, এমনকি আমরা নিজেরাই বাধা। আমাদের প্রেমের জন্ম হয়েছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা তো মোছার নয়। আমরা কোন চূড়ান্ত পরিণতি চাইনি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি কি? বিবাহ? এই চূড়ান্ত পরিণতির ব্যপারে আমরা কেউই সচেতন ছিলাম না। আমি কি ভাবব? এই অল্প কয়েকদিনের পাওয়াতেও স্বস্তি সার্থকতা আছে। চির ও চিরন্তন করে মানুষ মানুষকে পেতে পারেনা। এই অল্পকালকেই সেই চিরকাল ভাবব।টেপ রেকর্ডারে তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের রোমান্টিক অথচ বিরহের গান বাজছে, ‘প্রেম চিরদিন দূরে দূরে এক হয়ে থাকনা, মিললেই তো ফুরিয়ে যাবে।’

আজ বিদায়ের আগের রাত। রেইনা আমার রূমে এসেছে। সেই রাতে হঠাৎ করেই ঝড় হলো। ঝরের রাত্রি। বাইরে বাতাসের প্রচন্ড দাপাদাপি। আকাশে মেঘ তেমন ছিল না, কেবল বাতাসটাই বেশী। প্রসস্ত কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছি গাছের মাথাগুলো বাতাসের ঝাপটায় কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই তো অভিসারের রাত্রি। এই রাত্রটিতে কি আমরা একবার আমাদের দেহ-মনের উত্তাপ গ্রহন করতে পারিনা? সুন্দর প্রসন্ন মূর্তি – বয়স কম বলে উম্যানস ক্লাসিকাল বিউটি এখনো আসেনি, অর্থাৎ সেটাকে বর্ষার ভরা নদী বলা চলবে না। কিন্তু কিছুটা চাঞ্চল্য কিছুটা সৌম্য, সে এক ভিন্ন সৌন্দর্য্য। নারীর সৌন্দর্য্যের বয়স ভেদে তারতম্য তো হবেই।
প্রসস্ত জানালা দিয়ে বাইরের ঝড়ের তান্ডবে ছেয়ে যাওয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন পাহাড়টিকে খুব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমার রূমে বাজছে রেইনার প্রিয় মোসার্টের মিউজিক, গভীর আবেগ আর দরদ ভরা সে সঙ্গীত। মোসার্ট চরম দুঃখ আর হতাশার মুহূর্তে অনন্য সুর বন্দনার রূপ দি্যেছিলেন। সেই ক্ষণ যেন আমার সামনেও উপস্থিত হয়েছে। এই মিউজিকের মোলায়েম ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে আমার খুব স্লো ডান্স করতে ইচ্ছে হলো। আমি রেইনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ও আবেশে আমার বাহুপাশে চলে এলো। পরস্পর পরস্পরের নিবীড় বাহুবন্ধনে আমরা অনেকক্ষণ নেচেছিলাম।

কি আশ্চর্য্য অতল রেইনার কালো জোড়া চোখের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টির গহীন অরণ্যে ঝড় চলছে, নারী-পুরুষ সান্নিধ্যের সেই চীরকালীন ঝড়। গভীর দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। কারো মুখেই কোন কথা নেই। কথার শেষ আছে কিন্তু অনুভূতি অতলস্পর্শী, সুদুর প্রসারী। তাই মুখের ভাষায় কথা না বলে, বললাম চোখের ভাষায়। রেইনা মনের ভাষা দি্যে সেটা পড়তে পারল। ওর ললাটে গালে আমি চুমু খেয়েছি অনেকবার। ওর ওষ্ঠ স্পর্শ এখনো পাইনি, চাইওনি। আজ মন আবেগ-দীপ্তি দিয়ে তাই চাইল। আমি আমার মুখটা ওর মুখের কাছাকাছি আনতেই, ও আগের মত ওর গাল অথবা ললাট নয় ঠোটটিই বাড়িয়ে দিল।আমার কম্পিত ঠোট দুটি রাখলাম ঐ সূর্য-পক্ক ঠোটে. নারীর ঠোটে এই প্রথম ঠোট রাখা। কেমন মৃদু কোমল সে স্পর্শ। ‘অধরের কানে যেন অধরের ভাষা’. জর্জিয়ার পাহাড়ে দেখা দুস্প্রাপ্য একটি নীলচে বেগুনী বুনো ফুলের পাঁপড়ি স্পর্শ সুখের অপেক্ষায় । আমি সমস্ত মন উজাড় করে গভীর আবেগে ওকে আলিঙ্গন করলাম।

বিদায়ের শেষ মুহূর্তে হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়ব, সেই ভয়ে কেই কারো মুখের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলাম না। রেইনা সাহসী শক্ত মেয়ে, ওর বুকের ভিতর অশ্রুর নদী বয়ে গেলেও বাইরের চোখে বারি ঝরবে না, এমনটিই ধরে নিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই যেন বাধ ভেঙে গেল। রেইনা অঝোর ধারায় কাঁদছে। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম, “কেদোনা রেইনা”। আমি বললাম। পিছন থেকে গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলল, “ওকে ধর”। দুহাত দিয়ে মুখখানি তুলে শিশির-ভেজা কামিনী ফুলের দিকে অপলক চেয়ে রইলাম। সমস্ত আবেগ-আনন্দ, বেদনা-দুঃখ দিয়ে বহু জোড়া কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে ওর মুখের দিকে সকাতর চেয়ে রইলাম। রেইনার মুখটি বেলা শেষের আকাশের মত ম্লান ও রক্তিম হয়ে উঠল।

এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমি আর গেলাম না, আবেগ ধরে রাখতে পারব না ভেবে। আমার কাশ্মিরী বন্ধু এজাজ একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে এলো। আমাকে বলল, “তুমি থাক, আমি ওকে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়ে আসি।” রেইনা, এজাজ আর পেরুর কার্লা গাড়ীতে উঠল। বুড়ো জর্জিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার আমার দিকে, একবার রেইনার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু আঁচ করতে পারল। আমাকে বলল, “চিন্তা করনা, আমি ঠিকমতো পৌছে দেব।” মৃদু একটা শব্দ করে স্টার্ট নিল রাশান ভলগা। স্থীর গাড়ী গতিশীল হয়ে উঠল, তারপর ককেশাস পাহাড় আর সবুজ বনের পটভূমিতে ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এটাই বোধহয় আমাদের শেষ দেখা। “মন খারাপ করোনা এটাই জীবন।” কোন ফাকে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফসানা, খেয়ালই করিনি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আফসানার পরনে আজও চমৎকার নীল শাড়ী। আগের মতই সুন্দর লাগছিল ওকে শাড়ীতে। আর রেইনা? রেইনা চলে গেছে। শাড়ী পরা এ জীবনে তো তার আর হলোনা!

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.