১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা সমস্যা ও জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের বীরত্ব

১৯৭৮ সালের রোহিঙ্গা সমস্যা ও জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের বীরত্ব
————————————————————— ড. রমিত আজাদ

১৯৭৪ সালে the government promulgated the Emergency Immigration Act-এর আওতায় বার্মার সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল ‘নে উইন’ রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়, এবং তাদেরকে বিদেশী বলে অভিহিত করে। এই সালে বার্মার নামের সাথে যুক্ত হয় সোসালিস্ট রিপাবলিক। এই রিপাবলিকে আরাকান-কে কোন স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৭৮ সালে আরাকানে সংঘটিত হয় ভয়াবহ বিপর্যয়। বিদেশী হটানোর নামে বার্মা সরকার ঘটায় অপারেশন ‘নাগা মিন’ নামে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর একটি বর্বরোচিত হামলা।

১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের অকুতোভয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বীরত্বের সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলা করেন। বার্মার সেনাবাহিনীর ‘নাগা মিন’ (‘ড্রাগন রাজা’) অপারেশনের ফলে প্রায় দুই লক্ষ (২০০,০০০) রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। সৈন্যদের হামলায় মৃত্যু হয় আনুমানিক চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গার। সরকারিভাবে এই অভিযানের অজুহাত ছিল প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যে সব বিদেশী অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বর্বরোচিত এই সেনা অভিযান সরাসরি বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলছিল যার ফলে ব্যাপক হত্যার ঘটনা ঘটে।

সেই সময়ে বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বিচিত্রা’-য় একটি কভার স্টোরি হয়েছিলো, ‘মানুষ আইতে আছে – নাফ নদীর বানের লাহান’। হঠাৎ করেই লক্ষ লক্ষ মানুষ নৌকা, সাম্পান, কলাগাছের ভেলা ইত্যাদিতে চড়ে নাফ নদী পারি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। অনেক মানুষ দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চলের পথ বেয়ে পায়ে হেটে বাংলাদেশে আসে। সকলেই ‘নাগামিন’ অপারেশনের হাত থেকে বাঁচার জন্য পালিয়ে আসে অতিথিপরায়ন দয়ালু বাংলাদেশের শ্যামল ছাঁয়ায়।

তদানিন্তন বাংলাদেশ সরকার সাথে সাথেই মানবিক দায়িত্ব পালন শুরু করে। তারা শরণার্থীদের সাহায্যে সীমান্তের কাছাকাছি ১৩ টি ক্যাম্প নির্মান করে। সেখানে শতকরা পঞ্চাশ ভাগের নীচেই ছিলো শিশু (১৫ বছরের কম বয়ষ্ক)। এই কাজে বাংলাদেশ পূর্ণ মনযোগ দেয়। রাতারাতি বাসস্থান নির্মিত হয় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। গঠন করা হয় national coordination council যার প্রধান ছিলেন Cabinet Secretary ।

বাংলাদেশের তদানিন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বীরত্বের সাথে এই সমস্যা মোকাবেলা করেন। উনার হাতকে শক্তিশালী করেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক শামসুল হক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ-বার্মার সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি গ্রহন করেন ও একইসাথে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করেন। তিনি বলেছিলেন যে, বার্মার সরকার অবৈধ ও অমানবিকভাবে বার্মিজ মুসলিমদেরকে দেশছাড়া করছে। অপরপক্ষে বার্মার সরকার বলছিলো যে, যাদেরকে বিতারিত করা হয়েছে তারা অবৈধভাবে বার্মায় বসবাসরত বাংলাদেশী নাগরিক।

বাংলাদেশের সদিচ্ছা ও স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসির বদৌলতে বার্মা সরকার বাধ্য হয় শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে। ১৯৭৮ সালেই প্রথম ব্যাচে ফেরত নেয়া হয় ৫৮ জন শরণার্থী। বার্মার সিনিয়র কিছু মন্ত্রীও এসময় রিফুজী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করে ও repatriation process-কে তদারকী করেন, এই প্রকল্পের নাম তারা দেন ‘the Hintha project’।

চূড়ান্তভাবে ১৯৭৮ সালের ৬ ই জুন দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার আওতায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই বার্মায় ফিরিয়ে নেয়া হয় (সর্বশেষ যে ব্যাচটি বার্মায় ফিরে যায় তাদের কাছে বার্মায় ইতিপূর্বে বসবাসের কোন সাপোর্টিং ডকুমেন্টই ছিলো না)।

বার্মার রাষ্ট্রপতি জেনারেল নে উইন বাধ্য হন বাংলাদেশ সফর করতে ও দুই লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে। অবাক হতে হয় যে isolationist বার্মার গোপনতাপূর্ণ নেতা জেনারেল নে উইন দু’দুবার বাংলাদেশ সফর করেন (১৯৭৯ সালে ও ১৯৮০ সালে)। এই কূটনৈতিক সাফল্য এতটাই ছিলো যে, পত্রিকা Economist লিখেছিলো:

“Was it a miracle or mirage that Burma and Bangladesh produced a month ago in the name of tidy instant settlement of their refugee problem? A month later, all details of the planned repatriation scheme still secret, the second (‘Mirage’) looks rather more likely”. (Burma and Bangladesh, August 12, 1978)

এই মহতি কাজে জোড়ালো ভূমিকা রেখেছিলো জাতিসংঘ, ইউ.এন.এইচ.সি.আর, সৌদি আরব, লিবিয়া ও ওয়ার্লড মুসলিম লীগ।

সেই সময়ের জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

তারিখ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
সময়: গভীর রাত ০২টা ১৪ মিনিট

তথ্যসূত্র:
http://www.burmalibrary.org/docs14/Kei_Nemoto-Rohingya.pdf

Alaol’s unfortunate children and Bengali nationalistic chivalry


http://www.burmalibrary.org/docs3/challenges_to_democratization_in_burma_chapter2.pdf

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.