E = mc^2 -এর পিছনের নায়ক-নায়িকারা – পর্ব ১

E = mc^2 -এর পিছনের নায়ক-নায়িকারা – পর্ব ১
——————————- ড. রমিত আজাদ

আলবার্ট আইনস্টাইনের সাঁড়া জাগানো E = mc^2 একদিনের ফসল বা একজনার কাজের ফলাফল নয়। আইনস্টাইন চূড়ান্ত সমাধানটি করেছিলেন, কাজ চলছিলো কয়েক শতাব্দি ধরে। প্রকৃতির যে কোন আইনই মহান সৃষ্টিকর্তার তৈরী। আমরা মরণশীল মানুষেরা কোন প্রকৃতির আইন তৈরী করিনা, তাকে আবিষ্কার করি মাত্র। জ্ঞানী পিথাগোরাস বলেছিলেন ‘ইশ্বর একজন গণিতবিদ’, কারন মহাজ্ঞানী কপিলের মত তিনিও মনে করতেন, মহাবিশ্বের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে যৌক্তিক গণিত। কপিল-পিথাগোরাস-এর পর মানবজাতি পার হয়েছে আরো কয়েক হাজার বছর। এখন আমরা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি যে, যেকোন প্রাকৃতিক ঘটনা/প্রতিভাসেরই একটি গাণিতিক প্রকাশ রয়েছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটে গাণিতিকভাবেই ঘটে। যিনি প্রাকৃতিক আইনটি আবিষ্কার করেন সাধারণত তাঁর নামেই ঐ আইনটির নামকরন হয়। এভাবেই আলবার্ট আইনস্টাইন কর্তৃক আবিষ্কৃত ভর-শক্তির সংরক্ষণ নীতির জটিল প্রাকৃতিক রহস্যটির গাণিতিক রূপ হলো E = mc^2। তবে এর পিছনে অবদান আইনস্টাইনের একার নয়। ঐ টাইমলাইনে দাঁড়ালে একে একে অনেকের নামই পাওয়া যাবে। প্রথমেই আসবে আইনস্টাইনের প্রথম স্ত্রী মিলেভা মারিক-এর নাম, যিনি আইনস্টাইনের পাশে থেকে কেবল মোরাল সাপোর্টই যোগাননি বরং তাঁর পুরো কাজেরই আইডিয়া এবং গাণিতিক সমাধানও করে দিয়েছিলেন। আসবে ল্যাভয়সিয়ে, ম্যাক্সওয়েল, মাইকেল ফ্যারাডে, ইবনে বাজ্জাহ, আবুল বারাকাত আল-বাগদাদী, আল বিরুণী, বিজ্ঞানের প্রমুখ নায়কের নাম। আজকের এই লেখায় উল্লেখ করবো E = mc^2 -এর পিছনের এমনই একজনার নাম, যিনি নায়ক ছিলেন না, ছিলেন নায়িকা। নাম তাঁর ‘এমিলি দু শাত্লে’।

সেটা ১৭২২ সালের কথা। তখনকার ফ্রান্সে জানা ছিলোনা গতিকে কি করে কোয়ান্টিফাই করা যায়। প্রকৃতির ঘটনাবলীতে বর্গের ধারনা তেমন একটা ছিলোনা। এই ধারনাটি তারা পায় অসচরাচর উৎস থেকে। তিনি হলেন রাজ দরবারের সদস্য লুঁই নিকোলাই-এর কন্যা এমিলি। সৌন্দর্যের জন্য খ্যাতি ছিলো তাঁর, তবে রূপের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তায়ও তিনি ছিলেন অসাধারণ। ফ্রান্সের পদার্থবিজ্ঞানে তিনি ব্যাপক অবদান রাখেন। স্যার আইজাক নিউটনের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘প্রিন্সিপিয়া’-র ফরাসী অনুবাদ তিনিই করেছিলেন। যা আজও ফ্রান্সে পঠিত হচ্ছে। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও ভাষাবিদ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ফ্রান্সে তখনও নারী স্বাধীনতা আসেনি। উনিশ বছর বয়সে উনার বিবাহ হয় একজন ফরাসী জেনারেল-এর সাথে। এবং তাদের ঘরে জন্ম নেয় তিন সন্তান। পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। তেইশ বছর বয়সে তিনি সেই সময়কার নামজাদা ফরাসী গণিতবিদ Moreau de Maupertuis-এর কাছ থেকে উচ্চতর গণিত শেখেন। অল্পবয়সী সুন্দরী ছাত্রীকে তিনি আগ্রহভরে যত্ন সহকারে গণিত শিখিয়েছিলেন। ধারনা করা হয় যে, তাদের মধ্যে লিটল রোমান্স ছিলো।

এরপর এমিলি প্রেমে পড়েন খ্যাতিমান ফরাসী কবি ও দার্শনিক ভল্টেয়ার-এর। ফরাসীর অগ্নিপুরুষ খ্যাত ভল্টেয়ার রাজা ও ক্যাথলিক চার্চের সমালোচনা করার জন্য দু’দুবার অন্তরীন ও নির্বাসিত হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে তিনি কিছুকাল কাটিয়েছিলেন এই নির্বাসিত জীবনে। সেখান থেকে তিনি ফিরে আসেন স্যার আইজাক নিউটনের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে। ফ্রান্সে ফিরে তিনি আবার রাজাকে অপমান করেন। তারপর গ্রেফতার এড়ানোর জন্য এমিলির আশ্রয় নেন। এমিলি ভল্টেয়ারকে তাঁর কান্ট্রিহাউজে লুকিয়ে রাখেন। প্যারিস থেকে অনেক দূরের এই বাড়ীতে এমিলি ও ভল্টেয়ার বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির একটি প্রাসাদ গড়ে তোলেন। দীর্ঘকাল এমিলি সেখানে ভল্টেয়ারের সাথে বসবাস করেন স্বামীর বর্তমানেই। এই বিষয়ে এমিলির স্বামী ছিলেন সহনশীল অথবা সেই সময়ের ফ্রান্সের অভিজাত মহলে এটাই ছিলো রীতি। সেই সময়ে রচিত ভল্টেয়ারের সাহিত্যে এমিলির প্রভাব রয়েছে, এটা ভল্টেয়ার নিজেই স্বীকার করেছেন। ১৭৩৮ সালের Paris Academy prize contest-এ ভল্টেয়ার ও এমিলি দুজনেই অংশ নেন। এ্যাকাডেমী কর্তৃক এমিলির প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি ছিলো a research on the science of fire । এভাবে এমিলিই হন প্রথম ফরাসী রমনী যার লেখা Paris Academy-তে প্রকাশিত হয়েছে।

এমিলি তার কাছের মানুষদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছিলেন। কিন্তু তার পাশাপশি তিনি নিজের আইডিয়াও বিকশিত করেছিলেন। স্যার আইজাক নিউটনের চিন্তায় খুঁত আছে এমন চিন্তা করার সাহসও এমিলি দেখিয়েছিলেন। ইউরোপে ভরবেগের ধারনা তখন মোটামুটি প্রতীত হয়েছিলো। কিন্তু শক্তি (energy)-র ধারনা তখনও সুস্পষ্ট ছিলোনা।

স্যার আইজাক নিউটনের সমসাময়ীক ফরাসী দার্শনিক ও গণিতবিদ ছিলেন গটফ্রীড লেইবনিজ। লেইবনিজ বলেছিলেনযে, গতিশীল কায়ার মধ্যে একটা inner spirit আছে। তার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘ভিস ভিভা’। অনেকে তাঁর এই প্রস্তাব পছন্দ না করলেও, লেইবনিজ বিশ্বাস করতেন যে, কোন কায়ার শক্তির পরিমান হবে তার ভর ও বেগের বর্গের গুনফলের সমান। উল্লেখ্য যে এই বর্গ বিষয়টি বাস্তব থেকে গণিতে প্রবেশ করেছিলো সেই প্রাচীন কালেই। পিথাগোরাসের বিখ্যাত উপপাদ্যেও বর্গ বিষয়টি রয়েছে। এমিলি বিষয়টি বোঝার জন্য, ইতিপূর্বে করা Willem’s Gravesande-র একটি পরীক্ষার পুনরাবৃত্তি করেন। একটি বলকে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে ফেলে দেয়া হচ্ছে নরম কাদার উপর, কাদার ডিফর্মেশন দেখে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বলের গতিশক্তি তার বেগের বর্গের সমানুপাতিক। নিউটনের মতো ভল্টেয়ারও বিশ্বাস করতেন যে গতিশক্তি হবে বেগের সমানুপাতিক। তাই এমিলির সাথে ভল্টেয়ারের দ্বিমত দেখা দিলো। এমিলি বললেন, “তুমি ভাবছ যে তিমি নিউটনকে বুঝতে পারছো, কিন্তু তুমি লেইবনিজ-এর মত করে ভাবতেই পারছো না। তুমি এটার সমালোচনা করো, ওটার সমালোচনা করো। নিজে কিছু আবিষ্কার করতে কি পেরেছ?” উত্তরে ভল্টেয়ার বলেছিলেন, “আমি তোমাকে আবিষ্কার করেছি।” যাহোক এমিলি পরীক্ষার দ্বারা প্রমান করলেন যে নিউটন নয়, নেইবনিজই সঠিক। উনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, “আপনি কি মনে করেন যে এই সময়ে এ্যাকাডেমী আপনার মতামত মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত?” উত্তরে এমিলি বলেছিলেন যে, “দেরী করার কোন কারন তো দেখছি না, সত্য বলার জন্য কোন রাইট টাইম নাই”। এমিলির কাজ প্রকাশিত হওয়ার পর তা বিতর্ক উসকে দিয়েছিলো। ভল্টেয়ার বলেছিলেন যে, “এমিলি অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন কিন্তু উনার সবচাইতে বড় দোষ ছিলো যে, তিনি ছিলেন একজন নারী”।

স্যার নিউটন ভরবেগের নিত্যতার কথা বলেছিলেন, কিন্তু এমিলি সেটাকে এক্সটেন্ড করে শক্তির নিত্যতার কথাও বললেন।

এমিলির পরবর্তি প্রেম ছিলো বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ মারকি দ সাত লামবার্ত। এমিলি তখন চল্লিশোর্ধ। এই পর্যায়ে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। বিয়াল্লিশ বছর বয়সে গর্ভধারন সেই সময়ে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণই ছিলো। ১৭৪৯ সালে তিনি চতুর্থ সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু সাত দিনের মাথায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।

এমিলি একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন যে, কোন কায়ার গতিশক্তি তার বেগের বর্গের ফাংশন। এটাকে পুরোপুরি গ্রহন করতে ইউরোপবাসীর সময় লেগেছিলো আরো একশত বছর (১৮৪৯ সাল)। এটাকে ‘জাস্ট ইন টাইম’ বলা যায় আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্য, যিনি শক্তির পাশাপশি ভরকেও নিয়ে এলেন, আর ঐ একই কাতারে দাঁড়ালো আলোর বেগের বর্গ।

(ব্লগে লেখা মানে নিজেকে জাহির করা নয়। বরং নিজে যা জানতে পেরেছি তা অন্যদের সাথে শেয়ার করা। আমার লেখায় যদি কোন তথ্যবিভ্রাট থেকে থাকে সূত্র উল্লেখপূর্বক জানাবেন, সংশোধন করে নেব। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা কাম্য)

২৭ শে অক্টোবর,
রাত ১টা (০১০০ ঘন্টা)
ঢাকা, বাংলাদেশ

তথ্যসূত্র:
https://en.wikipedia.org/wiki/%C3%89milie_du_Ch%C3%A2telet#Relationship_with_Voltaire

http://www.bhu-bha.com/2015_11_01_archive.html?view=classic
http://kamrulcox.blogspot.com/2013/01/emilie-du-chatelet.html

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.