Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা

অনন্ত পথের যাত্রী_রেহানা জাব্বারী বলছি

আমি রেহানা ইরানী বলছি,
কি! অবাক হচ্ছ? চিনতে পারছ না?
হ্যাঁ, অবাক হবারই তো কথা।
তোমরা ভেবেছ,
ওকে পৃথিবী থেকে ছুড়ে ফেলেছি,
সে তো ২৫ অক্টোবর-২০১৪ এর কথা,
ও আবার কেমন করে ফিরে আসবে?

হ্যাঁ, আমি সেই রেহানা জাব্বারি,
আমি সেই রেহানা ইরানী বলছি,
যাকে খুনের দায়ে পৃথিবী থেকে বিদায় করে
তোমরা দুধে ধোয়া তুলসী সেজেছো।

তোমরা পুরুষ, না না, ভুল বলছি
তোমরা অসীম ক্ষমতার মহাপুরুষ,
নারী দেখলেই তোমাদের থাকেনা যে হুঁশ।
আমি কেন তোমাদের উন্মত্ততায় নিজেকে বিলিয়ে দিলাম না!
এটাই তো আমার একমাত্র দোষ।

আমি রেহানা জাব্বারি বলছি,
তোমরা আমাকে যতই ছুড়ে ফেল,
আমি যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবো,
আমি বেঁচে থাকবো ইতিহাসের খাতায়,
আমি বেঁচে থাকবো কবিদের কথায়।
দুনিয়া আমায় ১৯ বছর বাঁচতে দিয়েছে,
এতো নেহায়েত কম নয়!
নিয়তির বিধান তো মানতেই হবে,
অবলার শেষ বানী শুধু রয়ে যাবে,

প্রাণপ্রিয় মা ছোলেহ,
আমি তোমার রেহানা বলছি, এবার শোনো,

আজ জানলাম এবার আমার ‘কিসাস’-এর
সম্মুখীন হওয়ার সময় হয়েছে।
জীবনের শেষ প্রান্তে যে পৌঁছে গিয়েছি,
তা তুমি নিজের মুখে আমাকে জানতে দাওনি,
ভেবে খারাপ লাগছে।
মাগো তোমার কি একবারও মনে হয়নি যে,
এটা আমাকে আগেই জানানো প্রয়োজন ছিল?
তুমি বিমর্ষে ভেঙে পড়েছ,
এতা জেনে নিজেকে আমি খুবি লজ্জিত মনে করছি।
ফাঁসির আদেশ শোনার পর,
তোমার আর বাবার হাতে চুমু খেতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু আমায় চুমু দিতে লিলে না, কেন মা?

দুনিয়া আমাকে ১৯টি বছর বাঁচতে দিয়েছিল,
আমার তো সেই অভিশপ্ত রাতেই মরে যাওয়া উচিত ছিল, তাই না?
আমার মৃতদেহ ছুড়ে ফেলার কথা ছিল শহরের কোনো এক অজ্ঞাত স্থানে।
কয়েকদিন পর মর্গে যা শনাক্ত করার কথা ছিল তোমার।
সঙ্গে এটাও জানতে পারতে যে,
হত্যার আগে আমাকে ধর্ষণও করা হয়েছিল।
আর হত্যাকারীরা?
ওরা তো অবশ্যই ধরা পড়ত না,
কারণ আমাদের না আছে অর্থ, না আছে ক্ষমতা।
তারপর, বাকি জীবনটা অন্তহীন শোক ও নিদারুণ লজ্জায় কাটিয়ে
কয়েক বছর পর তোমারও করুণ সমাধি রচিত হতো।
এটাই যে হওয়ার কথা ছিল, মা।
কিন্তু সে রাতের আকস্মিক আঘাত,
সব কিছু ওলটপালট করে দিল,
শহরের কোনো গলি নয়,
আমার দেহটা প্রথমে ছুড়ে ফেলা হল
এভিন জেলের নিঃসঙ্গ কুঠুরিতে,
আর সেখান থেকে নিস্তব্ধ কবরের মতো কারাগারের এক সেলে।
কিন্তু এ নিয়ে অনুযোগ কর না মা,
এটাই নিয়তির বিধান।
আর তুমি তো জানই, মৃত্যুতেই সব শেষ হয়ে যায় না।
মা, তুমিই তো শিখিয়েছ
সূক্ষ্মদর্শিতা এবং সুশিক্ষার জন্যই আমাদের জন্ম।
তুমি বলেছিলে,
প্রতিটি জন্মে আমাদের কাঁধে এক বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া থাকে।
মাঝে মাঝে লড়াই করতে হয়, সে শিক্ষা তো তোমার থেকেই পেয়েছি, মা।
সেই গল্পটা মনে পড়ছে,
চাবুকের আঘাত সহ্য করতে করতে
একবার প্রতিবাদ জানানোর ফলে আরও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল এক ব্যক্তি।
শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু হয়।
কিন্তু প্রতিবাদ তো সে করেছিল!
মা, আমি তোমার রেহানা বলছি,
আমি শিখেছি, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঐকান্তিকতার প্রয়োজন হয়।
তার জন্য যদি মৃত্যুও আসে, তাকেই মেনে নিতে হয়।
স্কুলে যাওয়ার সময় তুমি শিখিয়েছিলে,
নালিশ ও ঝগড়াঝাটির মাঝেও যেন নিজের নারীসত্তাকে বিসর্জন না দিই।
তোমার মনে আছে মা?
কত যত্ন করেই না মেয়েদের খুঁটিনাটি বিষয় শিখিয়েছিলে আমাদের?
কিন্তু তুমি ভুল জানতে মা।
এই ঘটনার সময় আমার সে সব শিক্ষা একেবারেই কাজে লাগেনি।
আদালতে আমায় এক ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে পেশ করা হয়।
কিন্তু আমি চোখের জল ফেলিনি।
আমি জীবন ভিক্ষাও করিনি।
মা, আমি কাঁদিনি কারণ, আইনের প্রতি আমার অবিচল আস্থা ছিল।
কিন্তু বিচারে বলা হল,
খুনের অভিযোগের মুখেও নাকি আমি নিরুদ্যম!
আচ্ছা মা, আমি তো কোনো দিন একটা মশাও মারিনি।
টিকটিকিদের একটুকুও আঘাত না করে শুঁড় ধরে জানলার বাইরে ফেলে দিয়েছি।
সেই আমিই নাকি মাথা খাটিয়ে মানুষ খুন করেছি!
উল্টো ছোটবেলার ওই কথাগুলো শুনে বিচারপতি বললেন,
আমি নাকি মনে মনে পুরুষালি।
তিনি একবার চেয়েও দেখলেন না,
ঘটনার সময় আমার হাতের লম্বা নখের ওপর কী সুন্দর নেল পালিশের উজ্জ্বল দীপ্তি ছিল,
হাতের তালু ছিল কত তুলতুলে মোলায়েম।
এমন বিচারকের হাত থেকে সুবিচারের আশা অতিবড় আশাবাদীও করতে পারে কি?
তাই তো নারীত্বের পুরস্কার হিসেবে মাথা মুড়িয়ে ১১ দিনের নির্জনবাসের হুকুম দেওয়া হল। দেখেছ মা,
তোমার ছোট্ট রেহানা এই কদিনের মধ্যেই কত বড় হয়ে গিয়েছে?
এবার আমার অন্তিম ইচ্ছেটা বলি শোনো।
কেঁদো না মা, এখন শোকের সময় নয়।
ওরা আমায় ফাঁসি দেওয়ার পর আমার চোখ,
কিডনি, হৃদযন্ত্র, হাড় এবং যা কিছু দরকার,
যেন আর কারো জীবন রক্ষা করতে কাজে লাগানো হয়,
তবে যিনাকেই এসব দেওয়া হবে,
তাকে যেন কখনোই আমার নাম না জানানো হয়।
আমি চাই না এর জন্য আমার সমাধিতে কেউ,
ফুলের তোড়া রেখে আসুক।
এমনকি তুমিও নয়।
আমি চাই না আমার কবরের সামনে বসে দুঃখের বশনে কান্নায় ভেঙে পড় তুমি।
বরং আমার দুঃখের দিনগুলো সব হাওয়ায় ভাসিয়ে দিও।
এই পৃথিবী আমাদের ভালোবাসেনি, চায়নি আমি সুখী হই।
এবার মৃত্যুর আলিঙ্গনে তার পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।

আমি সেই রেহানা ইরানী বলছি,
তোমরা হযরত আ: কাদের জিলনীর নিশ্চয় শুনেছ!
সে এক বড় কাহিনী, ছোট করে বলছি।
একদিন এক লম্পট ভিক্ষুক বেশে জিলানী মাতার ইজ্জত লুটতে প্রস্তুত,
হযরত আ: কাদের জিলনী তখন মায়ের গর্ভে,
জিলনী মাতার গর্ভ থেকে বাঘের আকার ধারণ করে লম্পটকে হত্যা করলেন।
এটাই তো হওয়া উচিত, তাই নয় কি?
তাইলে আমার ইজ্জত বাঁচিয়ে আমি কেন দোষী?
বলতে পার কেন আমার পরলো গলে ফাঁসি?

তবেকি, আমাকে এমন ভাবে প্রমাণ করতে হতো?
হায়েনাটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খাবলে খাবলে তাজা মাংস খেত,
নরম মাংস আর তাজা রক্ত খেয়ে উল্লাস করত,
আর এক সময় আমি নিস্তেজ হয়ে গেলে,
আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে, রক্ত খেকো হায়েনাটা চলে যেতো,
আর তোমরা আমার ফরসেনিক, ডিএনএ ইত্যাদি ইত্যাদি পরীক্ষা করে বলতে,
হ্যাঁ রেহেনাকে ধর্ষণ করেই হত্যা করা হয়েছে।
এমন বিচারের কি প্রয়োজন?

হে বিচারক, না না, শুধু বিচারক নয়,
তোমরা তো মহামহিম পুরুষের জাত,
তোমাদের কাছে বিচার চাওয়া তো মিছে আর্তনাদ।
তোমাদের নিকট নারীর ইজ্জতের কি কোনই মূল্য নাই?
তবে, জেনে রেখ,
তবে সৃষ্টিকর্তার এজলাসে সুবিচার আমি পাবই।
সেখানে দাঁড়িয়ে আমি অভিযোগের আঙ্গুলতুলব
সেই সমস্তপুলিশ অফিসারের দিকে,
বিচারকদের দিকে,
আইনজীবীদের দিকে,
আর তাদের দিকে যারা আমার অধিকার বুটের নিচে পিষে দিয়েছে,
বিচারের নামে মিথ্যা এবং অজ্ঞতার কুহেলিকায় সত্যকেআড়াল করেছে,
একবারও বোঝার চেষ্টা করেনি,
চোখের সামনে যাদেখা যায় সেটাই সর্বদা সত্যি হতে পারে না।

আমার স্নেহপূর্ণ মা সোলেহ,
মনেরেখো, সেই দুনিয়ায় তুমি আর আমি থাকব অভিযোক্তার আসনে,
আর ওরা দাঁড়াবে আসামির কাঠগড়ায়।
দেখিই না, সৃষ্টিকর্তা কী চান!
তবে একটাই আর্জি,
মৃত্যুর হাত ধরে দীর্ঘ যাত্রা শুরুর প্রাক মুহূর্ত পর্যন্ত
তোমায় জড়িয়ে থাকতে চাই,
মাগো!
তোমায় যে খুব খু-উ-ব ভালোবাসি।

ইতি, তোমার রেহেনা, অনন্ত পথের যাত্রী,
ক্ষমা করো অপরাধ, হে মোর ধাত্রী।

মোহাম্মদ সহিদুল ইসলাম
Sahidul77@gmail.com

মন্তব্য করুন..

By মোহাম্মদ সহিদুল ইসলাম

I AM MOHAMMAD SAHIDUL ISLAM (M.COM._MGT._N.U._BD),
1998-2008_ WORKING IN BANGLADESH IN NGO
AS AN ACCOUNTS OFFICER

2009-STILL NOW STAY IN SINGAPORE, WORKING IN
INTERNATIONAL COMPANY
AS A COMPUTER OPERATOR

আমি মোহাম্মদ সহিদুল ইসলাম (এম,কম_ব্যবস্থাপনা-ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি_বাংলাদেশ),
১৯৯৮ হতে ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন এন,জি,ও তে কাজ করেছি

২০০৯ হতে অদ্যাবধি কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে সিঙ্গাপুরের
একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিতে কাজ করছি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.