আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ২

আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ২
—————————————————- রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ইন্টারনেটে খোঁজ করলাম তানিয়া-কে। পেয়ে গেলাম।
মেসেজ পাঠালাম, “কেমন আছো তানিয়া? যুদ্ধ শুরু হয়েছে শুনলাম। খুবই দুঃসংবাদ! খারকোভে কেমন আছো তোমরা?” মেসেজ সেন্ট হলো বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩২ মিনিটে, ২৪শে ফেব্রুয়ারী, ২০২২ সাল। আমি উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিলাম, কি উত্তর আসে, বা আদৌ কোন উত্তর আসে কিনা। অবশেষে প্রতিক্ষিত উত্তর পেলাম বিকাল৩টা ৩৯ মিনিটে। তানিয়া লিখেছে, “হ্যাঁ, পরিস্থিতি ভালো নয়। আমরা গ্রামে চলে গিয়েছি।” যাক একদিক থেকে মনটা শান্ত হলো, তানিয়া ভালো ও সুস্থ আছে। বুকের উপর থেকে একটা ভার নেমে গেলো।

যুদ্ধের সাথে গ্রাম এবং গ্রামের সাথে আশ্রয়ের সম্পর্কটা বোধহয় ওতপ্রোত। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও শুনেছি, দলে দলে লোকজন শহর ছেড়ে গ্রামে ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। যে কোন যুদ্ধেই বোধহয় প্রথম আক্রান্ত হয় শহরগুলো। আর সেই সময়ে শহরবাসীরা প্রাণভয়ে পালিয়ে যায় গ্রামে। কেউ যায় নিজের পিতৃপুরুষদের ভিটায়, কেউ আশ্রয় নেয় আত্মীয়-স্বজন এমনকি অপরিচিতেরও বাড়ীতে। স্কুল জীবনে ‘মাটির কোলে’ নামক একটা টেলিভিশন সিরিজ দেখেছিলাম। নোবেল বিজয়ী লেখিকা পার্ল এস বাক (Pearl S. Buck) এর কালজয়ী উপন্যাস ‘দি গুড আর্থ’-এর অনুবাদ ও ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিলো বিটিভি সিরিয়ালটি। তারিক আনাম, কবরী, ফখরুল হাসান বৈরাগী ও অন্যান্যদের অনবদ্য অভিনয় সকলের হৃদয় জয় করেছিলো। সেই উপন্যাস বা নাটকের থিম সং ছিলো, ‘ওরে আমার সোনার সবুজ গ্রাম, তোমার মাটির কোলে আবার ফিরে আসিলাম।’

২৪শে ফেব্রুয়ারী, সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে আমি তানিয়াকে একটা ভয়েস কল দিলাম। প্রায় সাত মিনিট কথা হলো ওর সাথে। কথাগুলো নিম্নরূপ –
আমি: কেমন আছো তানিয়া।
তানিয়া: সবমিলিয়ে ভালো নয়। তবে ব্যাক্তিগত শারিরীকভাবে আমি এখনো ভালো আছি।
আমি: তুমি তো খারকোভ ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছ তাই না?
তানিয়া: হ্যাঁ। আমি সীমান্তে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই খারকোভ ছেড়ে গ্রামে চলে এসেছি।
আমি: ভালো। আমাদের বাকি বন্ধু-বান্ধবরা কেমন আছে?
তানিয়া: ঠিক ঠিকভাবে বলতে পারবো না। এমন পরিস্থিতিতে তো কোন দিকবিদিক জ্ঞান থাকে না। তবে আমাদের অনেকেই খারকোভ নগরীতেই রয়ে গিয়েছে।
আমি: ওরা আগে আগেই শহর ছেড়ে চলে গেলো না কেন?
তানিয়া: (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) আমি গ্রামের মেয়ে। আমার তো যাওয়ার বা আশ্রয় নেয়ার একটা জায়গা আছে। অনেকের তো শহর ছেড়ে যাওয়ারও জায়গা নাই।
তারপর তানিয়া একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, “আমি শহর ছাড়ার সময় অনেককেই ডেকেছি। আমার সাথে যেতে বলেছি। পরেও অনেক-কে বলেছি যে, তারা চাইলে খারকোভ ছেড়ে আমার বাড়ীতে চলে আসতে পারে। আমি এখনও তাদেরকে আমার বাড়ীতে আতিথ্য দিতে প্রস্তুত আছি।”
আমি মনে মনে ভাবলাম, এটাই প্রকৃত বন্ধু। বিপদে বন্ধুর পরিচয়।
আমি: এখন কি অবস্থা খারকোভ-এর?
তানিয়া: আমি যতদূর জানি, সৈন্যরা খারকোভ শহর ঘিরে রেখেছে।
আমি: কোন সৈন্যরা? ইউক্রেনিয় সৈন্যরা?
তানিয়া: না। রুশ সৈন্যরা।
আমি: রুশরা খারকোভ পর্যন্ত চলে এসেছে?
তানিয়া: হ্যাঁ চলে এসেছে তো। এখন তারা খারকোভ শহরকে ঘিরে রেখেছে। কাউকে বের হতে দিচ্ছে না, কাউকে ঢুকতেও দিচ্ছে না।
আমি: বলো কি? এতো ভয়াবহ!
তানিয়া: হ্যাঁ, ভয়ংকরই তো! এখন চাইলেও কেউ আর শহর থেকে বের হয়ে দূরে কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিতে পারবে না।
আমি: এরকমভাবে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে, তাও এই একবিংশ শতাব্দীতে; তা আমি ভাবতেও পারিনি।
তানিয়া: কেউই ভাবতে পারেনি! আমরা ভাবলাম যে, আমরা সিভিলাইজড মানুষ; যুদ্ধ করবো কেন? অথচ ঐ ভয়ংকর ঘটনাটাই ঘটলো!
আমি: এত দূর থেকে আমার তো করার তেমন কিছুই নাই। তোমাদের জন্য শুধু দোয়াই করতে পারি।
তানিয়া: তাই করো। এটাও তো একটা কিছু। দোয়াও তো কাজে লাগে।
আমি: ঠিকআছে, তাই করবো। তোমাদের শুভ কামনা করছি। ভালো থেকো। আমি আবার যোগাযোগ করবো।
তানিয়া: ধন্যবাদ। এবারের মত বিদায়।

তানিয়ার সাথে ফোনালাপ শেষ করে আমার সাগরিকা-র কথা মনে পড়লো। কোথায় আছে সাগরিকা? খারকোভ শহরের তো ও স্থায়ী বাসিন্দা। গ্রামে-গঞ্জে ওর কোন নিকট আত্মীয় আছে বলে তো শুনিনি কখনো। তাহলে ও বা ওর পরিবার এই ভয়া ব হ বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিবে? খারকোভ শহর থেকে কিছু দূরে ওদের একটা সামার হাউজ আছে। বাংলো, বাগান, পানি, ইলেকট্রিসিটি, ফায়ারপ্লেস সবই আছে। ওরা সেখানে গিয়ে আপাতত আশ্রয় নিতে পারে। তবে পুরো খারকোভ শহরই যদি সৈন্যরা ঘিরে রাখে ও কাউকে বের হতে না দেয়, তাহলে সাগরিকা যাবে কোথায়? কত বড় ঝুঁকি ও বিপদের মধ্যে তারা আছে, ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠছে!

(চলবে)

(বাংলাদেশী ও বিদেশী বন্ধুদের মনে যা কিছু প্রশ্ন ও সাজেশন আছে করতে পারেন। সম্ভব হলে গল্পের মাধ্যমে প্রশ্নগুলির উত্তর দিবো)

রচনাতারিখ: ০৮ই মার্চ, ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৫টা ৩২ মিনিট

Unhappy New Year 2022 (2)
——————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.