আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ৩

আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ৩
—————————————————- রমিত আজাদ

২৪শে ফেব্রুয়ারী, সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে মস্কোতে বসবাসরত কয়েকজন বাংলাদেশী বন্ধুর সাথে ইন্টারনেটে ভয়েস কম্যুনিকেশন করলাম। তারা হড়বর করে কথা বলে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে তাদের কথার ইন্টারসেকশনও হচ্ছিলো। আমি শুধু শুনে গেলাম, কিছু বললাম না। তারা যা বললেন তার সারসংক্ষেপ হলো, ‘রাশিয়ার পক্ষ থেকে এটা একটা ‘শো ডাউন’ ছাড়া আর কিছু নয়। ন্যাটোকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্যই মস্কো এটা করছে। ন্যাটো একটা প্রতারক। তারা এতকাল ধরে কেবল চুক্তি ভঙ্গই করছিলো। ‘

এবার আমি কয়েক দশক পিছনে ফিরে গেলাম। ১৯৯১ সাল, যখন তদানিন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম ও শেষ রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচভের একটি বক্তৃতার সাথে সাথে, বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো কম্যুনিস্ট শাসিত সাম্রাজ্য ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। এর ঠিক বছরখানেক আগেই পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নে সংঘটিত হয়েছিলো একটি রেফারেন্ডম। সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ও বিপক্ষে। সেই সময়ে আমার পরিচিত অনেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে ও ইউক্রেনের স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। তবে ভোট গননা মতে সোভিয়েত-এর বেশিরভাগ মানুষই সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। তাই সেযাত্রা রক্ষা পেয়েছিলো কম্যুনিস্ট শাসিত সোভিয়েত সাম্রাজ্য। কিন্তু তার কয়েকমাস পরেই ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে একটি ব্যার্থ অভ্যুত্থান হয় মস্কো তথা সোভিয়েতে। সেই চিরকালীন হার-জিত-এর মত ঐ ক্ষমতার লড়াইয়ে কম্যুনিস্ট-রা হারে ও ডেমোক্রেটরা জয়ী হয়। আর এরই ফলস্বরূপ ১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। লক্ষ লক্ষ সৈনিক, হাজার হাজার ট্যাংক, শত শত যুদ্ধবিমান, কয়েক শত নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড সবই নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলো। কোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই সেদিন ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’-কে বাঁচাতে পারেনি! আপাততঃ এই বিজয়কে আমেরিকার বিজয়, পশ্চিমাদের বিজয়, পোপ জন পল-এর বিজয় ও সামরিক জোট ন্যাটোর বিজয় হিসাবে দেখা হলো।

কিন্তু তার পরপরই অনেকগুলো প্রশ্ন এসে ভীড় করে দাঁড়ালো। এখন কি হবে? সোভিয়েতের ১৫টি রিপাবলিকের সরকার কারা হবে? জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী হিসাবে দায়িত্ব নেবে কোন দেশ? জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হিসাবে ভেটো ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে রাশিয়া, ইউক্রেইন, বিলোরাশিয়া, কাজাখিস্থান, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, ইত্যাদি ইত্যাদিদের মধ্যে কোন দেশটি? আচ্ছা, সারা পৃথিবীতে কি এখন আরো ১৫টি নিউক্লিয়ার পাওয়ার-এর জন্ম হলো? সোভিয়েতের সবগুলি রিপাবলিক-এই কি পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে? তাই যদি হয়ে থাকে, আর এই নাজুক রাজনৈতিক অবস্থায় যদি কোন একটি দেশ বিগড়ে যায়, তাহলে তা কি বিশ্বের জন্য হুমকীস্বরূপ নয়?

সেই সময় আমার এক ভারতীয় বন্ধু প্রশ্ন করেছিলো, ” সোভিয়েত ভেঙে তো ইউক্রেইন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে গেলো। এখন ইউক্রেন কি জাতিসংঘের সদস্যপদ পাবে?” উত্তরে আমি বলেছিলাম যে, “অনেকেরই হয়তো জানা নাই যে, ইউক্রেইন শুরু থেকেই মানে সেই ১৯৪৫ সাল থেকেই জাতিসংঘের সদস্য। এ ছিলো এক মজার বিষয়! সোভিয়েত ইউনিয়ন-ও জাতিসংঘের সদস্য, আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি রিপাবলিক হয়েও পৃথকভাবে ইউক্রেইন ছিলো জাতিসংঘের সদস্য।”

এদিকে, ইউক্রেনে অনেক রুশ ও রুশভাষী বসবাস করতো, তারা অনেকেই ক্ষুদ্ধ হয়েছিলো এই নতুন পরিবর্তনে। স্বাধীন ইউক্রেনে তারা আর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি। হতে পারে যে, তারা হয়তো নিজেদেরকে আর নিরাপদও ভাবতে পারছিলো না। দুঃখজনকভাবে জাতিগত দাঙ্গারও কিছু কিছু সংবাদ আসছিলো প্রাক্তন সোভিয়েত-এর বিভিন্ন আনাচে-কানাচে থেকে!

এবার আসি ন্যাটো প্রসঙ্গে। এই সামরিক জোট-টি মূলত ছিলো পশ্চিমা পুঁজিবাদি রাষ্ট্রগুলোর। পুঁজিবাদিদের বিশ্ববাজার ও অপরাপর আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার বাহিনী ছিলো এইটি। ইউরোপে এদের ঘাঁটি ও অবস্থান ছিলো পশ্চিম-ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে ও তুরষ্কে। তার মানে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব-ইউরোপকে ঘিরে রেখেছিলো তারা। মারাত্মক সব বিধ্বংসী অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত ছিলো তারা। যতদূর জানা যায় যে, সোভিয়েত-এর ভাঙনের সময়ে ন্যাটো-র সাথে চুক্তি হয়েছিলো যে, ন্যাটো তার কার্যকলাপ পূর্ব-ইউরোপ ও সাবেক সোভিয়েত রিপাবলিকগুলোতে প্রসারিত করবে না। কিন্তু যতই দিন যেতে থাকলো ন্যাটো সেই চুক্তি অবমাননা করে ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম মানচিত্র প্রসারিত করতে শুরু করলো। পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছিলো যে, ন্যাটো-র আল্টিমেট গোওল একেবারে রাশিয়ার বাড়ীর কাছে পৌঁছে তার গলা চেপে ধরা! যা নিঃসন্দেহে রাশিয়ার জনগণের জন্য হুমকীস্বরূপ!


(বাংলাদেশী ও বিদেশী বন্ধুদের মনে যা কিছু প্রশ্ন ও সাজেশন আছে করতে পারেন। সম্ভব হলে গল্পের মাধ্যমে প্রশ্নগুলির উত্তর দিবো)

রচনাতারিখ: ০৮ই মার্চ, ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ১১টা ৫৩ মিনিট

Unhappy New Year 2022 (3)
————————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.