আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ৪

আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) – পর্ব ৪
—————————————————- রমিত আজাদ

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর যে সকল প্রশ্নগুলো আমাদের সাধারণ মানুষদের মনে এসে ভীড় করে দাঁড়িয়েছিলো। এখন কি হবে? সোভিয়েতের ১৫টি রিপাবলিকের সরকার কারা হবে? জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী হিসাবে দায়িত্ব নেবে কোন দেশ? জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হিসাবে ভেটো ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে রাশিয়া, ইউক্রেইন, বিলোরাশিয়া, কাজাখিস্থান, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, ইত্যাদি ইত্যাদিদের মধ্যে কোন দেশটি? আচ্ছা, সারা পৃথিবীতে কি এখন আরো ১৫টি নিউক্লিয়ার পাওয়ার-এর জন্ম হলো? সোভিয়েতের সবগুলি রিপাবলিক-এই কি পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে? তাই যদি হয়ে থাকে, আর এই নাজুক রাজনৈতিক অবস্থায় যদি কোন একটি দেশ বিগড়ে যায়, তাহলে তা কি বিশ্বের জন্য হুমকীস্বরূপ নয়?

আরেকটি প্রশ্ন ছিলো ইউক্রেনে অধ্যায়নরত বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের মনে, তা হলো ইউক্রেইন তো স্বাধীন হয়ে গেলো, সোভিয়েত তো আর নাই; আমরা তো সোভিয়েত-এর স্কলারশীপপ্রাপ্ত; এখন আমাদের কি হবে? ইউক্রেন সরকার কি আর আমাদের দায়িত্ব নেবে? আমরা কি আর আমাদের পড়ালেখা/স্কলারশীপ কন্টিনিউ করতে পারবো?

সর্বশেষ প্রশ্নটির উত্তর প্রথমে দেয়ার চেষ্টা করছি। খারকোভ-এর বিদেশী ছাত্ররা হঠাৎ গুজব শুনতে পেলো যে, স্বাধীন ইউক্রেনে আর বিদেশী ছাত্রছাত্রীদেরকে পড়তে দেয়া হবে না। কারণ, তারা তো সোভিয়েত-এর স্কলারশীপপ্রাপ্ত। স্বাধীন ইউক্রেন তাদের দায়িত্ব কেন নেবে? আর বিদেশী ছাত্রছাত্রীদেরকে পড়ানোর টাকাটাই বা তারা কোথায় পাবে? তাই খুব দ্রুতই সব বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের কাছে টিউশন ফী চাওয়া হবে, অনাদায়ে/ অপারগতায় তাদেরকে ইউক্রেন ছাড়তে বলা হবে। এই নিয়ে বেশ হৈচৈ শুরু হলো। শহরের বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা এই প্রথম সংগঠিত হলো। গঠন করা হলো ‘অর্গানাইজেশন অব ফরেন স্টুডেন্টস’। তারা যোগাযোগ করে মিটিং করলো সিটি গভর্নমেন্টের সাথে। খারকোভ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল অডিটোরিয়ামে ‘অর্গানাইজেশন অব ফরেন স্টুডেন্টস’-এর সাথে মুখোমুখি কথা হলো সিটি গভর্নমেন্টের প্রতিনিধির। প্রতিনিধি জানালেন যে, বিদেশী ছাত্রছাত্রীদেরকে পড়তে দেয়া হবে না, এই ধরনের কোন সিদ্ধান্ত এখনও ইউক্রেইন সরকার নেয় নি। তবে এই বিষয়টি নিয়ে কিছু আলাপ আলোচনা চলছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট-টি হলো যে, আপনারা বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা সাবেক সোভিয়েত-এর স্কলারশীপপ্রাপ্ত। এখন তো আর সোভিয়েত নাই। এখন ইউক্রেইন স্বাধীন রাষ্ট্র। আপনাদের জন্য বরাদ্ধকৃত টাকা-বাজেট কিছুই তো ইউক্রেন সরকারের কাছে নাই; তাহলে আপনাদের-কে পড়ানোর টাকা স্বাধীন ইউক্রেন কোথায় পাবে? এই স্টেটমেন্ট-এর সাপেক্ষে বিদেশী স্টুডেন্টরা প্রশ্ন রেখেছিলো, “ইউক্রেন-এর অর্থকষ্ট বিষয়টি আমরাও অনুধাবন করতে পারছি। তবে আমাদের শিক্ষার জন্য তো টাকা/বাজেট সবই বরাদ্ধ রয়েছিলো। সেই টাকা-পয়সা এখন কাদের বা কোন দেশের হাতে? এই প্রশ্নের জবাবে সিটি গভর্নমেন্টের প্রতিনিধি সাফ সাফ জবাব দিলেন যে, “প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর উত্তরাধিকারি হলো বর্তমান রাশিয়া। তাই সোভিয়েত-এর সব দায়-দায়িত্ব রাশিয়াকেই নিতে হবে। টাকা-পয়সা বরাদ্ধ যা কিছু ছিলো, তা সব রাশিয়ার হাতেই থাকার কথা।” বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ী করলো। সকলের মনেই তখন শংকা, তাহলে কি স্বাধীন ইউক্রেন সরকার আমাদেরকে তাদের দেশ ছাড়তে বলবে? তখন আমরা কোথায় যাবো? রাশিয়া কি আমাদের দায়িত্ব নেবে?

ইউক্রেন-রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা সকলেই অত্যন্ত ভালো মানুষ। উনাদেরকে ফেরেশতার কাছাকাছি বললেও ভুল হবে না। যেমনি তাদের জ্ঞান, তেমনি তাদের বিনয়। সেই শিক্ষকদের সাথেও বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা নাজুক বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালাতে লাগলো। শিক্ষকরা বললেন, “চিরকাল তোমাদের পড়িয়ে এসেছি। তোমরা দেশী না বিদেশী এই নিয়ে তো কোনদিন ভাবিনি। তোমরা নিজ দেশ ছেড়ে, বাবা-মাকে ছেড়ে কত দূরে এসেছ! তোমাদের দেখে আমাদের অনেক মায়া লাগে! আমাদের মনে হয় না যে, ইউক্রেন সরকার তোমাদের বিষয়ে খারাপ কোন সিদ্ধান্ত নেবে। সরকারে যারা আছেন তারাতো অতীব জ্ঞানী-গুণী ব্যাক্তি, অত জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা ভুল বা নিঠুর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।”

যাহোক, বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা তাদের মত করে শান্তিপূর্ণ মিটিং-সমাবেশ চালিয়ে যেতে থাকলো। ‘অর্গানাইজেশন অব ফরেন স্টুডেন্টস’-এর নেতারা সাহসিকতা দেখিয়ে খোদ ইউক্রেইন-এর রাষ্ট্রপতি ‘লিওনিদ ক্রাভচুক’-কে চিঠি লিখলো (কম্যুনিস্ট শাসনামলে এই ধরনের চিঠি লেখা অত্যন্ত ভয়ের ব্যাপার ছিলো!)। যেখানে তাকে বিনিত অনুরোধ জানানো হয়েছিলো, বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের বিষয়টা যেন তিনি সদয়ভাবে দেখেন। মাসখানেক পরে সকল জল্পনা-কল্পনা ও শংকার অবসান ঘটিয়ে জানানো হয়েছিলো যে, স্বাধীন ইউক্রেন সরকার তাদের রাজধানী কিয়েভ থেকে সদয়ভাবে জানিয়েছেন যে, স্বাধীন ইউক্রেনে অধ্যায়নরত সকল বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশীপ যেমন ছিলো, তেমনিই থাকবে; তাদের কাছ থেকে কোন টিউশন ফী দাবী করা হবে না; ছাত্রছাত্রীদের ডরমিটরি, স্টাইপেন্ড, চিকিৎসা সব সুযোগ-সুবিধাই বহাল রাখা হবে। বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা নিশ্চিন্ত মনে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাক। স্বাধীন ইউক্রেন সরকার তাদেরকে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে।

এই ঘোষণার পরে ইউক্রেনে অধ্যায়নরত সকল বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন ইউক্রেন-এর প্রতি বিশেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ-এর জন্ম হয়েছিলো।

(চলবে)

(বাংলাদেশী ও বিদেশী বন্ধুদের মনে যা কিছু প্রশ্ন ও সাজেশন আছে করতে পারেন। সম্ভব হলে গল্পের মাধ্যমে প্রশ্নগুলির উত্তর দিবো)

রচনাতারিখ: ০৯ই মার্চ, ২০২২ সাল
রচনাসময়: দুপুর ১২টা ২৫ মিনিট

Unhappy New Year 2022 (4)
————————————- Ramit Azad

পূর্ববর্তি পর্বের লিংক

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.