আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) পর্ব ১

আনহ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (গল্প) পর্ব ১
———————————————- রমিত আজাদ

ইউক্রেইন ও রাশিয়ার মধ্যে কি আদৌ যুদ্ধ লাগবে? ভ্রাতৃযুদ্ধ কি আদৌ সম্ভব?
এই প্রশ্নটিই নিজেকে করেছিলাম ১৩ই ফেব্রুয়ারী, ২০২২ সালের এক ঝকঝকে দুপুরে। বাংলাদেশে দিনটা পহেলা বসন্তের দিন। আমার জীবনে এই দিনটির একটা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আমার জীবনে গভীরভাবে ছাপ ফেলেছে এমন একজনার জন্মদিন আজ। বসন্তের পয়লা দিনে যার জন্ম। আমার চিরকালই মনে হয়েছে যে, আসলে তার জন্মই এই পৃথিবীতে বসন্ত নিয়ে এসেছে। আমি এই দিনে তাকে শুভ জন্মদিন জানিয়ে বার্তা দিতে ভুলিনা। অবশ্য ইউক্রেইন বা রাশিয়ায় ঐদিনে বসন্ত নয়, বরং শীতকাল। দুই দেশের শত শত মাইল ভূমি তুষারে ঢেকে থাকে। আমাদের পূর্ববর্তি জেনারেশনের হৃদয়ে দাগ কাটা কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সানফ্লাওয়ার’-এ নাকি এমন দিগন্ত বিস্তৃত তুষারের ছবি খুব সুন্দরভাবে দৃশ্যায়িত করা হয়েছিলো!

ফোন করলাম, আমার ‘খারকোভ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ জীবনের অতি ঘনিষ্ট ইউক্রেনিয় বন্ধু আলেকজান্ডার-কে। আলেকজান্ডার নামটিকে রুশ-ইউক্রেণীয় ভাষায় সংক্ষেপে ‘সাশা (Sasha)’ বলা হয়। আমরা বন্ধুরা ওকে ‘সাশা’ বলেই ডাকি। ছেলেটির সাথে আমার পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে। আবার আমরা একই ডরমিটরিতে থাকতাম। মনের মিল হলে পরিচয়ের পরে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আমার সাথে সাশার হয়েছিলোও তাই। তারউপর ডরমিটরিতে আমরা কাছাকাছি রুমেই থাকতাম। তাই আমার অথবা তার রুমে গল্প করে আমরা তখন কাটিয়েছিলাম ঘন্টার পর ঘন্টা। সাশা গ্রামের ছেলে তাই অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল। সাশার চরিত্রের একটি দিকের সাথে আমার মিল ছিলো। আমার মতই সাশা-ও ছিলো প্রবল জাতীয়তাবাদী। সে বরাবরই বলতো, “রুশীদের আমার ভালো লাগে না। ওরা আমাদের দেশের নয়। ওদের সাথে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্য রয়েছে।” আমি বলতাম, “কই, আমার তো মনে হয় যে, তোমাদের মধ্যে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্য নাই কোন। সবকিছু তো একইরকম লাগে আমার কাছে। শুধু ভাষাটাতেই কিছুটা পার্থক্য আছে।” উত্তরে সাশা বলতো, “তোমাদের বিদেশীদের কাছে অমনটাই মনে হবে। অতি দূর থেকে দৃশ্যপটের খুঁটিনাটি ভালো দেখা যায়না। আলোছায়ায় সবকিছু মিলেমিশে যায়। যেমনটা আমাদের কাছে মনে হয় যে, ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-বাংলাদেশ সবই তো এক। তাহলে ওরা ঝগড়া-ঝাটি করে আলাদা হয়ে গেলো কেন?” আমি বলতাম, “তোমরা তো অনেকগুলো বছর একসাথেই ছিলে, তাহলে ১৯৯১ সালে হঠাৎ আলাদা হয়ে গেলে কেন? আর একসাথে খারাপই বা কি ছিলে?” সাশা উত্তরে বলতো, “ইন্ডিয়া-পাকিস্তান-বাংলাদেশ তো অনেকগুলা বছর একসাথেই ছিলে। খারাপ কি ছিলে? তারপরেও ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে ক্রমান্বয়ে আলাদা হয়ে গেলে কেন?” আমি বলতাম, “সে অনেক কথা। একসাথে তো আর সাধে থাকিনাই। রাজতন্ত্রের আমলে বাহুবলে দখল করে একসাথে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিলো। তারপরেও আমরা বিভিন্ন সময়ে ঐ নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন শাসনামলে বসবাস করেছি তো। আমাদের স্বাধীন ‘পাল’ আমল ছিলো; স্বাধীন ‘সুলতানী’ আমল ছিলো, স্বাধীন ‘নবাবী’ আমল ছিলো। আবার বৃটিশ/প্রোটেস্টান্ট সাম্রাজ্যবাদী আমলেও বাহুবলে জোরপূর্বক একসাথে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিলো। তারপর তো আমাদের পূর্বপুরুষরা রক্ত ও ঘাম ঝরিয়ে সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটিয়ে, পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত করে পরিশেষে আমাদেরকে একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মান করে দিয়েছেন। আমাদের জেনারেশন ঐ আন্দোলন-সংগ্রাম-যুদ্ধ-বিগ্রহ দেখে নাই। আমরা চোখ খুলে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র দেখেছি। যা আমাদের নিজস্ব ঘর। আমার নিজের ঘর গরিবী হোক, বেড়ার হোক কি ছনের হোক; নিজের ঘর নিজের ঘরই। নিজের ঘরে শান্তিতে ঘুমানো যায়। আমাদের ভাষায় একটা কবিতা আছে”,

‘পাকা হোক তবু ভাই পরেরও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।’

সাশা বলতো, “ইউক্রেইন-রাশিয়ার বিষয়টাও অনেকটা ঐরকমই। জার আমলে জোরপূর্বক একসাথে থাকানো হয়েছিলো। কম্যুনিস্ট সোভিয়েত আমলেও তাই।” আমি বলতাম, “কই সোভিয়েত আমলে তো হ্যাপিলীই একসাথে ছিলে?” সাশা বলতো, “মোটেও তা নয়। কম্যুনিস্ট আমলে কোন জার্নালিজম ছিলো না। তারা মনের সুখে যা খুশী তাই প্রচার করতো। সত্য জানার বা যাচাইয়ের কোন পথ কম্যুনিস্টরা রাখে নাই। তুমি কো চেরনোভোল (Chornovil) -এর নাম জানো?” আমি বলতাম, “না। কে তিনি?” সাশা বলতো, “তিনি ইউক্রেইন-এর জাতীয়তাবাদী নেতা। সেই সোভিয়েত আমলেই তিনি একাধিকবার ইউক্রেইন-এর স্বাধীনতার দাবী তুলেছিলেন। আমি বলতাম, “না, এ ধরনের সংবাদ তো তোমাদের দেশ থেকে বেরিয়ে আমাদের দেশ তক পৌছাতো না!”

আমার ফোন কল ধরলো সাশা।
সাশা: হ্যালো।
আমি: সাশা। আমি আজাদ।
সাশা: হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি।
আমি: যুদ্ধ কি লাগলো বলে? এখানে অনেকেই বলাবলি করছে। আমার তো বিশ্বাস হয় না।
সাশা: না। কোন যুদ্ধ, এখনো লাগেনি। সীমান্তে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করেছে রাশিয়া। তবে আমার মনে হয় যে, এটা একটা শো-ডাউন।
আমি: আমারও তাই মনে হয়। এই যুগে ঘরের পাশেই কে আর ভ্রাতৃযুদ্ধ লাগাতে যাবে?!
সাশা: রাইট। ঐ যুগ আর নাই। ২০১৪ সালেও এমনটা হয়েছিলো। সীমান্তে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করে, ভয়টয় দেখিয়ে অবশেষে সরে গিয়েছিলো। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি আর কি।
আমি: ঠিক আছে। যুদ্ধ না লাগলেই ভালো। ভালো থাকুক সবাই। শুভ কামনা রইলো। আজ বিদায়।
সাশা: আজ বিদায়।

২৩শে ফেব্রয়ারী অফিসে গেলাম। সবাই বলাবলি করতে শুরু করলো। যুদ্ধ তো লেগে গিয়েছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। বাংলাদেশের আড্ডাবাজিতে যা হয় আর কি। সকলেই এক একজন রাজনীতি বিশারদ। সকলেই এক একজন যুদ্ধবিশারদ। যুদ্ধ লাগলে কি হবে? কেন এই যুদ্ধ লাগবে? এই যুদ্ধে রাশিয়ার লাভ-ক্ষতি কি? এই যুদ্ধে ন্যাটোর লাভ-ক্ষতি কি? এই নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ চলতে লাগলো। আমি চুপচাপ তাদের গল্পমূলক বিশ্লেষণ শুনলাম। আমি জানি যে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে প্রবলভাবে সেলফ-কনট্রাডিকশন বিদ্যমান। তারা মুখে মুখে ন্যাটো, আমেরিকা ও বৃটেন-কে ঘৃণা করে। সমাজতান্ত্রীক সোভিয়েত-কে ভালোবাসে। সেই ভালোবাসার রেশ এখনও অধুনা-নির্মিত পূঁজিবাদি রাশিয়ার প্রতি রয়ে গিয়েছে। আবার তাদের সকলেরই স্বপ্নের দেশ ঐ আমেরিকা-বৃটেন। ঐ সকল দেশের ভিসা-ইমিগ্রেশন পাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নিজের মেয়েকে আমেরিকা-বৃটেন প্রবাসীর কাছে বিয়ে দিয়ে কি করে স্বর্গে পাঠানো যায় সেই স্বপ্নে সর্বক্ষণ বিভোর থাকে।

২৩শে ফেব্রয়ারী বিকালে আবারো ফোন করলাম সাশা-কে। ফোনালাপে সাশা যা বললো, তার মোদ্দা কথা হলো; না, সরাসরি কোন যুদ্ধ এখনো লাগে নাই। সরাসরি কোন আক্রমণও হয় নাই। তবে টেনশন চলছে ভীষণ। সীমান্তের কিছু কিছু জায়গায় গোলাগুলির কথা শোনা যাচ্ছে। তবে সাশা আবারো আশা প্রকাশ করলো যে, সরাসরি কোন যুদ্ধ লাগবে না। এতে তো রাশিয়া বা ইউক্রেইন কারোই ক্ষতি ছাড়া লাভ নাই কোন। তাছাড়া এমন যুদ্ধ লাগলে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার উপর স্যাংশন আরোপ করতে পারে। তাতে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবে! আমিও আশা প্রকাশ করলাম যে, যুদ্ধ না লাগুক আমরা এটাই কামনা করি।

২৪শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা সময় সকাল ১১টা ১২ মিনিটে হঠাৎ করেই ফোন কল দিলো সাশা (আলেকজান্ডার)
সাশা: আজাদ, যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে।
আমি: হোয়াট?
নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি। এই আধুনিক যুগে। এই একবিংশ শতাব্দীতে, খোদ ইউরোপের সর্ববৃহৎ দু’টি আধুনিক রাষ্ট্র সহসা যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাবে তা আমি ভাবতেই পারিনি।
সাশা: যুদ্ধ লেগে গিয়েছে।
আমি: মানে কি?
সাশা: আমি চতুর্দিকে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
আমি ভীত হয়ে পড়লাম।
আমি” তোমার বাড়ীর আশেপাশেই?
সাশা: না। ঠিক আমার বাড়ীর পাশেই না। তবে কি, আমার গ্রাম তো রাশিয়ার সীমান্ত থেকে মাত্র তেরো কিলোমিটার দূরে। ওদিক থেকেই শব্দ আসছে।
আমি: গুলির শব্দ?
সাশা: শুধু গুলি নয়; রকেট, বোম্ব, গ্রেনেড সব ধরনের বিস্ফোরণের শব্দই আসছে।
আমি: রুশ বাহিনী কি ইউক্রেইন-এর ভিতরে প্রবেশ করেছে?
সাশা: ঠিক জানিনা। আমাদের এদিকে এখনো তো ভিতরে প্রবেশ করে নাই।
আমি: আমাদের তারুণ্যের শহর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর খারকোভ-এর কি অবস্থা?
সাশা: আমি কনস্তানতিন-কে ফোন করেছিলাম। ও তো খারকোভ-এই থাকে। কোস্তিয়া জানালো যে, খারকোভ-এর খুব কাছাকাছি চলে এসেছে রুশ সৈন্যরা। ওরা ইউক্রেইন-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী খারকোভ-কে দখল করতে চায়।

পূর্বাঞ্চলীয় এই নগরীটিতে রুশভাষীদের সংখ্যাই বেশী। তাছাড়া নগরীটি সীমান্ত থেকে খুব বেশী দূরে নয়!
আমি হতবাক হয়ে গেলাম! ওরা শেষ পর্যন্ত ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ শুরু করে দিলো?

বুঝলাম, ভাতৃযুদ্ধ তো আর নতুন কিছু নয়। অতি প্রাচীনকালের সেই মহাভারতের যুদ্ধও তো ভাতৃযুদ্ধই ছিলো! তবে কি সেই কথাই ঠিক, ‘বিনা যুদ্ধে নাহি মেটে ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা!’

ইতিপূর্বে একটি গল্প লেখা হয়েছিলো ‘হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২’। আজ আমার মনে হলো যে ২০২২ সালটা হ্যাপী নয় আনহ্যাপীই হবে।

সেই সহপাঠিনী তানিয়াকে ফোন করলাম। জানিনা খারকোভ-এর কি অবস্থা! কেমন আছে তানিয়া?
(চলবে)


(বাংলাদেশী ও বিদেশী বন্ধুদের মনে যা কিছু প্রশ্ন ও সাজেশন আছে করতে পারেন। সম্ভব হলে গল্পের মাধ্যমে প্রশ্নগুলির উত্তর দিবো)

রচনাতারিখ: ০৫ই মার্চ, ২০২২ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০৪টা ০৫ মিনিট

Unhappy New Year 2022
——————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.