আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১০

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১০
———————————————————- রমিত আজাদ

হ্যাঁ, যেটা বলেছিলাম। ‘গণতন্ত্র’ ও ‘কম্যুনিস্ট মতাদর্শ’ এই দুই নিয়ে আলোচনা করবো। সেই গ্রীসের ‘দেমোস’ ‘ক্রাতোস’ বা সাধারণ মানুষের শাসন, নিয়ে আমি ইতিপূর্বে একাধিক আর্টিকেল লিখেছিলাম। তাই ঐ বিস্তৃত তাত্ত্বিক আলোচনায় এই লেখায় আর যাবো না। আপাতত শুধু বলছি যে প্রাচীন গ্রীসে ‘এরিস্টোক্রেসি’ মানে অভিজাতদের শাসনের সাথে বিরোধ বাধলে পরিশেষে দার্শনিক ও স্টেটসম্যান সোলনের দূরদৃষ্টি থেকে জন্ম হয়েছিলো ‘দেমোক্রেসি’-র বা সাধারণ মানুষের শাসনের। অবশ্য এর ফলাফলও খুব ভালো ছিলো না, যখন জ্ঞানী সক্রেটিস স্বয়ং ‘দেমোক্রেসি’-এর বিরোধিতা করলেন, এবং ‘দেমোক্রেসি’-এর শাসকদের হাতেই (পরোক্ষভাবে) তিনি শহীদ হয়েছিলেন। ‘যে শাসনব্যবস্থা আমার গুরু-কে হত্যা করেছে, সেই শাসনব্যবস্থা আমি মানি না’, এমনই অভিমত ছিলো জ্ঞানী প্লেটোর। তাই তিনি উপস্থাপন করেছিলেন উনার স্বপ্নের ‘রিপাবলিক’-এর দর্শন। যেখানে শাসনব্যবস্থা না ‘এরিস্টোক্রেসি’ না ‘দেমোক্রেসি’, একেবারেই ভিন্ন কিছু। ঐভাবে জ্ঞানী প্লেটো এবং তার শিষ্য এরিস্টটলও ‘দেমোক্রেসি’ বিরোধী ছিলেন।

বহুকাল পরে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘দেমোক্রেসি’ এলো নব্যরূপে। যার স্ট্যান্ডার্ড সংজ্ঞা হিসাবে আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞাটিকেই মেনে নেয়া হয়েছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশের মালিক জনগণ। দেশ পরিচালনা করবে সরকার। কে বানাবে সরকার? জনগণই নির্বাচিত করবে তাদের সরকারকে। কোন আইনে চলবে দেশ? দেশের জনগণের তৈরী আইনেই চলবে দেশ। কার জন্যে কাজ করবে সরকার? দেশের জনগণের জন্য। একটা দেশের চরম মূহুর্তগুলোতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কে নেবে? উত্তর: দেশের জনগণ। কিভাবে জানা যাবে দেশের জনগণের সিদ্ধান্ত? উত্তর: নানা মেথডে জনমত যাচাই করে। অতীব প্রয়োজনে রেফারেন্ডম-এর আয়োজন করা হবে। দেশে কয়টি রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচলিত থাকবে? উত্তর: দেশের জনগণের যতগুলো মন চায়। প্রশ্ন: তারমানে কি দেশে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে? উত্তর: হ্যাঁ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে। প্রশ্ন: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কি ধর্ম চর্চা করা যাবে? উত্তর: যে যার ধর্ম নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে চর্চা করবে। কোন বাধা নাই।

এবার দেখা যাক ‘কম্যুনিজম’ কি বলে? কম্যুনিজমে দেশের মালিক কে? উত্তর: কৃষক-শ্রমিক ও অন্যান্য পেশাজীবিরা। প্রশ্ন: তারা কি সৃষ্টিশীল ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শিল্পপতি, ইত্যাদি হতে পারবেন? উত্তর: না। কম্যুনিজমে এই পেশাগুলোকে বিলুপ্ত করা হবে। কম্যুনিস্ট দেশে সরকার কে হবে? উত্তর: কম্যুনিস্ট পার্টি। প্রশ্ন: তারা কি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবে? উত্তর: নির্বাচনের কোন প্রয়োজন নাই, কারণ এম্নিতেই বোঝা যায় যে দেশের জনগণ কেবল তাদেরকেই গ্রহণ করবে। প্রশ্ন: নির্বাচন না হলে তারা কিভাবে ক্ষমতায় আসবে? উত্তর: যে কোন সুবিধাজনক পন্থায়, প্রয়োজনে সসস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। প্রশ্ন: তাদেরকে দেশের জনগণ মেনে নিয়েছে কিনা তা বোঝার জন্য কোন রেফারেন্ডমের আয়োজন করা হবে কি? উত্তর: না, দরকার নাই। প্রশ্ন: কম্যুনিস্ট দেশে কি নানা মত থাকতে পারবে? উত্তর: না, পারবে না। সকলের একটি মতই থাকতে হবে আর তা হলো কম্যুনিজম। প্রশ্ন: কেন কেবল, এই মতটিই কেন? উত্তর: কারণ, এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ! প্রশ্ন: কম্যুনিস্ট দেশে কি একাধিক রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে? উত্তর: না, পারবে না। কেবল একটি দলই থাকবে, তার নাম কম্যুনিস্ট পার্টি। প্রশ্ন: মানুষ তো আর রোবট না, তাদের মধ্যে তো নানা ধরনের চিন্তাভাবনা থাকতেই পারে! উত্তর: এটা করতে দেয়া যাবে না। তাদের সকলকে জোরপূর্বক একটি মত মানতে বাধ্য করা হবে। প্রশ্ন: কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে কি ধর্ম চর্চা করা যাবে? উত্তর: কোনক্রমেই ধর্ম চর্চা করা যাবে না। ধর্ম চর্চা মানেই তো নানা মত চর্চা করা, আর সেটা তো কম্যুনিজমে নিষিদ্ধ করা আছে। তাছাড়া, মার্ক্সিজমে ধর্মকে আফিম বলা হয়েছে ও বস্তুবাদী এই দর্শনে সৃষ্টিকর্তার অস্তিস্ত্ব-কে অস্বীকার করা হয়েছে।

এখন দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালেই দেখা যায় যে, কম্যুনিজম এমন একটি মতাদর্শ যা ‘গণতন্ত্র’ বিরোধী। তবে দেশে দেশে কম্যুনিস্টরা ‘গণতন্ত্র’-এর সুযোগ নিয়েছে। ‘গণতন্ত্র’-এর সূতিকাগারেই কম্যুনিজম-এর জন্ম ও বিকাশ। আর যেই দেশে কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছে, সেখানেই তারা প্রথম সুযোগেই গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে জনগণের মত প্রকাশের কোন অধিকার নেই। একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের কোন স্বাধীনতাই নেই। একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে ব্যাক্তির মুক্তচিন্তা ও তার বিকাশের কোন সুযোগ ও স্বাধীনতা নেই। প্রশ্ন: একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে আইনগুলো কারা তৈরী করবে? উত্তর: আইনগুলো মার্কস, এ্যাঙ্গেলস ও লেনিন কর্তৃক তৈরী করাই আছে। নতুন করে আইন তৈরী করার আর কোন প্রয়োজন নাই। প্রশ্ন: তাহলে দেশে সংসদ আছে কেন? উত্তর: টুকিটাকি নতুন কোন আইন তৈরী বা পরিবর্ধন-পরিবর্তন করার জন্য, তবে কঠোরভাবে মনিটর করা হবে যাতে নব্য আইনগুলো কিছুতেই মার্ক্সিজম-লেনিনিজম-এর সাথে সাংঘর্ষিক না হয় এবং ঐ কাঠামোর বাইরে না যায়। প্রশ্ন: কারা এই মনিটরিং-এর দায়িত্ব থাকবে? উত্তর: কম্যুনিস্ট গুরুরা! প্রশ্ন: কেউ যদি কম্যুনিস্ট মতাদর্শের বিরোধিতা করে? উত্তর: ইউরোপের ডার্ক এইজের ইনকুইজিশন-এর আদলে তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি হিসাবে জেল, জুলুম ও প্রয়োজনে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। প্রশ্ন: কেবলমাত্র, মতের অমিল হওয়ার জন্যই মৃত্যুদন্ড? উত্তর: হ্যাঁ। বললাম না, ইউরোপের ডার্ক এইজের ইনকুইজিশন-এর আদলে তা করা হবে। উদাহরণস্বরূপ: গ্যালিলিওকে যেভাবে থ্রেট করা হয়েছিলো বা জর্ডানো ব্রুণো-কে যেভাবে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো ঠিক ঐ মেথডে সব করা হবে। প্রশ্ন: একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র থেকে কেউ কি বহির্বিশ্বে যেতে পারবে? উত্তর: সেটাও ঐ ইউরোপের ডার্ক এইজের আদলে। কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে। বাইরে গমন হবে খুবই সীমিত। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়। কারণ বাইরে গেলেই তারা ভিন্ন মত ও ভিন্ন জীবনের সাথে পরিচিত হবে, এবং তাদের চিন্তায় পরিবর্তন আসতে পারে, তাই এটা হতেই দেয়া যাবে না। প্রশ্ন: বাইরে থেকে মানে অন্য দেশ থেকে কেউ কি কম্যুনিস্ট দেশে প্রবেশ করতে পারবে? উত্তর: সেটাও হবে খুব সীমিত পরিসরে। কারণ তারা আবার আমাদের সমাজের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। এটা হতে দেয়া যাবে না।

এইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে পড়েছিলো, একটা গণতন্ত্রহীন বদ্ধ রাষ্ট্রে!

মিখাইল গর্বাচভ ক্ষমতায় এসে দেশে গণতন্ত্রায়নের সিদ্ধান্ত নেন, এবং বহুদলীয় রাজনীতির প্রচলন করেন। তিনি তার বিদায়ী ভাষণে বলেছিলেন, However, work of historic significance has been accomplished. The totalitarian system which deprived the country of an opportunity to become successful and prosperous long ago has been eliminated. A breakthrough has been achieved on the way to democratic changes. Free elections, freedom of the press, religious freedoms, representative organs of power, a multiparty (system) became a reality, human rights are recognized as the supreme principle. (যাইহোক, ঐতিহাসিক তাৎপর্যের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা দেশকে অনেক আগে সফল ও সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল তা দূর করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পথে একটি যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হয়েছে। অবাধ নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ, একটি বহুদলীয় (ব্যবস্থা) বাস্তবতা হয়ে উঠেছে, মানবাধিকার সর্বোচ্চ নীতি হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে) Today I’d like to express my gratitude to all citizens who supported the policy of renovating the country, got involved in the implementation of the democratic reforms. I am grateful to statesmen, public and political figures, millions of people abroad, those who understood our concepts and supported them, turned to us, started sincere cooperation with us. (আজ আমি সেই সকল নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই যারা দেশে সংস্কারের নীতি সমর্থন করেছে, গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে জড়িত হয়েছেন। আমি স্টেটসম্যান, জনসাধারণ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বিদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ, যারা আমাদের মতবাদ বুঝতে পেরেছেন এবং তাকে সমর্থন করেছেন, আমাদের দিকে ফিরেছেন, আমাদের সাথে আন্তরিক সহযোগিতা শুরু করেছেন)

দেশের বদ্ধতার অবসান ঘটানোর জন্য মিখাইল গর্বাচভ ও তার সংস্কারপন্থী সরকার দরওয়াজা পুরোপুরি না খুলে, জানালাটা সামান্য খুলেছিলেন। কিন্তু ঝড়কে ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। তীব্র বাতাসে জানালা উড়ে যায়, দরওয়াজাও ভেঙে যায়! হু হু করে ঝড়ো হাওয়া প্রবেশ করে ভিতরের সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়!

Afghan War: My memories – 10
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.