আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১১

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১১
———————————————————- রমিত আজাদ

গণতান্ত্রিক উন্মুক্ততার কাছে পরাজিত হয়েছিলো সমাজতান্ত্রিক বদ্ধতা।

মানুষকে যেমন খাপে-মাপে ফেলে তৈরী করা যায়না, একইভাবে মানুষকে ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যেও বন্দী করে রাখা যায় না। যেমন প্রাচীনকালে একদল শাসক/পুরোহিত পারেনি, তেমনি মধ্যযুগের ক্যাথলিক পাদ্রীরাও পারেনি। সর্বশেষ উদাহরণ এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অপরাপর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো।

যে মানব সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে, যে মানব এভারেস্ট শৃঙ্গে পা রাখে, যে মানব মহাকাশ ফেঁড়ে চাঁদে পৌছে যায়, সেই মানবাত্মার চিরকালীন স্লোগান, “থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে!”

একটা প্রশ্ন ছিলো যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ‘মেইড গেইম’ বা ‘প্লানড গেইম’ কিনা? আসলে ভাঙন বা ফেইলিওর-টা অনিবার্যই ছিলো। রবি ঠাকুর তার ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে যা লিখেছিলেন, অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যাক্তিও সোভিয়েতের শুরুতেই ঐ একই কথা ব্যাক্ত করেছিলেন: গোড়াতেই গলদ রয়েছে, তাই এই সমাজব্যবস্থা টিকবে না।

তার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বীরা তো রয়েছেই। তারা তো তাদের মিশন সফল করার জন্য কাজ করে যাবেই। আর প্রতিযোগিতা/প্রতিহিংসায় সফলতা-ব্যার্থতা থাকেই। ঐ প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন বা কম্যুনিস্ট-রা পরাজিত হয়েছিলো। যাহোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর ভাঙন বিষয়ে আরেকটি ব্যাক্তির নাম উঠে আসে, তিনি হলেন ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু ভ্যাটিকান প্রধান পোপ জন পল (দ্বিতীয়)।

সমাজতন্ত্রের পতনে পোপ জন পলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে এখানে বিস্তারিত লিখবো না। আপাতত সংক্ষেপে বলছি যে, ১৯৭৯ সালে পোল্যান্ডে লেস ওয়ালেসা-র নেতৃত্বে শ্রমিক সংগঠন ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন ( যা এক অর্থে কম্যুনিজম বিরোধী আন্দোলন) শুরু করলে পরিস্থিতি এক ভয়াল রুপ নেয়। আমার এখনও মনে আছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিটিভি-তে প্রায়দিনই এই ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন দেখানো হতো। তাছাড়া পেপার-পত্রিকা তো আছেই। যা অবশেষে সামরিক শাসন দিয়ে অবদমন করা হয়েছিলো। প্রধান সামরিক শাসক ছিলেন জেনারেল জেরুজালেস্কি। যাহোক, এই ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে পোপ জন পল পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সফর করেন ও বলেন ‘Do not be afraid’, এবং পরে প্রার্থনা করেন: ‘Let your Spirit descend and change the image of the land … this land’. উল্লেখ্য, পোপ জন পল নিজেও জাতিগতভাবে পোলিশ ছিলেন।

১৯৮৪ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান-এর ফরেন পলিসির পরিবর্তন হয়। রিগ্যান প্রশাসন ভ্যাটিকানের সাথে খোলাখুলি সম্পর্ক করে। প্রোটেস্টান্ট শাসিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা ১৮৭০ সালের পরে এই প্রথমবারের মত ছিলো। ইন্টারেস্টিংলি, এবার ক্যাথলিসিজম-এর সাথে এই সুসম্পর্ক নিয়ে মার্কিন কংগ্রেস, কোর্ট ও প্রোটেস্টান্ট সংগঠনগুলো থেকে তেমন কোন বাধা ছিলো না। যেন সুচতুরভাবে কোন একটি সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যে সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপে ভূমিকা রাখার জন্য যে সকল খ্যাতিমান ব্যাক্তিদের নাম আসবে, তারা হলেন পোল্যান্ডের লেস ওয়ালেসা, তার প্রতিপক্ষ জেনারেল জেরুজালেস্কি; মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগ্যান, মার্কিন অপর রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ সিনিয়র, সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচভ ও উনার স্ত্রী রাইসা গর্বাচভা। কারো কাছে মাথা নত না করা আফগান জনগণের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। তবে পর্দার অন্তরালে থাকা আরো একটি নাম আসে, তা হলো, পোপ জন পল।

পোল্যান্ডের সলিডারিটি আন্দোলন সোভিয়েতের ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছিলো; এবং এই আন্দোলন এতটা তীব্র হতো না যদি ভেটিকানের শীর্ষে একজন পোলিশ পোপ না থাকতেন। তাছাড়া চেকোস্লাভাকিয়ায় সংঘটিত ১৯৮৯ সালের ভেলভেট রেভ্যুলেশন-এও পোপ জন পল-এর ভূমিকা রয়েছে। এরপর শুধু চেইন রিএ্যাকশনই হলো, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে একের পর এক কম্যুনিস্ট সরকারের পতন ঘটতে থাকলো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৫শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ০০ মিনিট

Afghan War: My memories – 11

—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.