আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১২

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১২
———————————————————- রমিত আজাদ

এই পর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করবো, তা হলো বৃটিশ সাম্রাজ্য বনাম রুশ সাম্রাজ্য।

বৃটিশ সাম্রাজ্য বনাম রুশ সাম্রাজ্য:
পৃথিবীতে এক একসময়ে এক এক ধরনের রাজনীতি প্রচলিত থাকে। অষ্টাদশ শতকের মধ্য ভাগে একটা আন্তর্জাতিক রাজনীতি শুরু হলো, তা ছিলো জাতীয়তাবাদ-এর উপর ভিত্তি করে ভূমি দখল বা রাজ্য বিস্তার। রাজ্য বিস্তার যে অতীতে হয়নি তা নয়, তবে সেগুলোর রূপ-প্রকৃতি ভিন্ন ছিলো। রোম সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্তারের রূপ-প্রকৃতি ছিলো একরকম; আবার ইসলামী খেলাফত-এর বিস্তারের রূপ-প্রকৃতি ছিলো আরেকরকম। এদিকে তৈমুর লং ও চেঙ্গিস খান-এর রাজ্য বিস্তারের রূপ-প্রকৃতি ছিলো একরকম, আবার মোগল সাম্রাজ্যের বিস্তারের রূপ-প্রকৃতি ছিলো ভিন্নরকম। জাতীয়তাবাদ-এর উপর ভিত্তি করে ভূমি দখল বা রাজ্য বিস্তার যারা শুরু করে তারা মূলতঃ হলো ইংরেজ জাতি, ফরাসী জাতি, স্প্যানিশ জাতি, জার্মান জাতি ও রুশ জাতি (বাকিদের কথা উল্লেখ করলাম না)। এদের মধ্যে ইংরেজ, ফরাসী ও জার্মান জাতি ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলো প্রোটেস্টান্ট; স্প্যানিশ জাতি ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলো ক্যাথলিক খ্রীষ্টান; এবং রুশ জাতি ধর্মীয় পরিচয়ে ছিলো অর্থোডক্স খ্রীষ্টান। এই সবগুলো জাতির ধর্মীয় পরিচয়ে মিল ও অমিল দুটাই রয়েছে। আপাতত একটা পয়েন্ট নোট করছি, তা হলো প্রোটেস্টান্ট হওয়ার কারণে ইংরেজ ও ফরাসী জাতি বর্ণবাদী, এবং তারা তাদের সাম্রাজ্যে বর্ণবাদের বিভিষীকা সৃষ্টি করেছিলো। আবার স্প্যানিশ ও রুশ জাতি বর্ণবাদী ছিলো না, তাই তাদের সাম্রাজ্যে বর্ণবাদের বিভিষীকা দেখা যায় নি। তবে লুট তরাজে সকলেই পটু ছিলো, এবং তাদের সকলেরই উদ্দেশ্য ছিলো বিভিন্ন জাতির তিল তিল করে অর্জন করা সম্পদ লুট করে এনে নিজ নিজ জাতিকে ধনী করে, নিজ দেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা। এই রাজনীতির এক কথায় নাম ‘সাম্রাজ্যবাদ’।

ইংরেজরা কয়েক শতাব্দি আগেই উত্তর আমেরিকা দখল করেছিলো। তারপর যখন উত্তর আমেরিকার ইংরেজরা নিজেদেরকে পৃথক জাতি মনে করে ও দাবী করে ইংরেজ রাজার প্রতি অনুগত থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করলো, তখন খোদ ইংরেজ রাজপরিবার আর সেখানে শক্তি ক্ষয় করা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন না। কারণ ততদিনে সমৃদ্ধিশালী বাংলা তাদের দখলে চলে এসেছে। আর এক বাংলা লুট করে তারা যে সম্পদ অর্জন করতে শুরু করলো তা গোটা আমেরিকা লুট করে যা পাওয়া যায় তার চাইতে বহু বহু গুণ বেশি! তাই বৃটিশ রাজপরিবার বাংলায় মনোনিবেশ করলো অধিক। বাংলায় বেইজড হয়ে (কলিকাতাকে রাজধানী করে) ইংরেজরা ধীরে ধীরে তাদের দক্ষিণ-এশিয় সাম্রাজ্য বিস্তার করতে শুরু করলো। ১৮৫৭ সালে মোগল সম্রাটের পতনের পর পুরো মোগল সাম্রাজ্যই ইংরেজদের দখলে চলে এলো। এদিকটায় বাকি রইলো কেবল আফগানিস্তান।

ওদিকে রুশীরাও অগ্রসর হচ্ছে। তাদের মূল বাসভূমি একদিকে ককেশাস পর্বত আরেকদিকে উরাল পর্বত পর্যন্ত। তারা দুই পর্বতই অতিক্রম করে অপরাপর দেশগুলো দখল করতে শুরু করলো। এভাবে তারা পূবে পৌঁছে গেলো পৃথিবীর শেষ সীমায় প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত। আর দক্ষিণে কাজাখিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ও তাজিকিস্তান দখল করে একেবারে আফগানিস্তানের দোর গোড়ায় এসে উপস্থিত হলো। আর এখানেই কূটনীতির মারাত্মক চাল! ইংরেজ সাম্রাজ্য যদি আফগান দখল করে, অথবা রুশ সাম্রাজ্য যদি আফগান দখল করে, তাহলে বৃটিশ সাম্রাজ্য ও রুশ সাম্রাজ্য পরষ্পরের মুখোমুখি অবস্থান নেবে! তাহলে নিশ্চয়ই উভয়কেই ভাবতে হবে যে, এই কাজটি তারা করবে কি করবে না। এভাবেই দুই প্রতাপশালী সাম্রাজ্যের মাঝখানে আফগানিস্তান পরিণত হলো একটি বাফার জোনে।

রুশ ভাবলো বৃটিশ যদি অগ্রসর হয় তাহলে তারা মুখোমুখী হবে আফগানদের, এবং যুদ্ধ হবে ইঙ্গ-আফগান। রুশীরা সেইফ! আবার বৃটিশ ভাবলো যে, রুশীরা যদি অগ্রসর হয় তাহলে তারা মুখোমুখী হবে আফগানদের, এবং যুদ্ধ হবে রুশ-আফগান। বৃটিশরা সেইফ!

ডুরান্ড লাইন:
এর মধ্যে ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ যে হয়নি তা নয়, তবে এই আলোচনায় আমি সেই প্রসঙ্গে যাবো না। আপাতত যেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই তা হলো, রুশ সাম্রাজ্য খুব বিপদজনকভাবে পামীর মাউন্টেনের কাছে চলে আসে, যা ছিলো বৃটিশ-ভারতের সীমান্তের খুব কাছেই। তখন বৃটিশ সিভিল সার্ভেন্ট ও কূটনৈতিক মর্টিমার ডুরান্ড (Mortimer Durand)-কে পাঠানো হয়, একটি সীমারেখা টানতে। যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ‘খাইবার গিরিপথ’ নিয়ন্ত্রণ করা। এভাবে পার্বত্য এলাকার সীমান্তের ডিমার্কেশন করতে গিয়ে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো ১৮৯৩ সালে, আফগান আমীর আবদুর রহমান খান-এর সাথে। এই লাইনটির নামই ডুরান্ড লাইন। এটি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান এর মধ্যে ২,৪৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমারেখা।

বিশ্ব-মানচিত্র মনযোগ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, চীন, পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের ঠিক মাঝখানে অতীব সরু এক চিলতে জমি বা ভুখন্ড রয়েছে যা আফগানিস্তানের। প্রশ্ন হলো, ইতিপূর্বে এই জমি কি বৃটিশ-ভারতের ছিলো? এটা কি ইংরেজরা ইচ্ছাকৃতভাবেই আফগানিস্তানকে দান করেছিলো? ইংরেজদের উদ্দেশ্য কি ছিলো?

দি গ্রেইট গেম (The Great Game):
পুরো উনিশ শতক জুড়েই চলছিলো আফগানিস্তানকে নিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্য বনাম রুশ সাম্রাজ্য একটা রাজনৈতিক দড়ি-টানাটানি। বৃটিশরা ভাবতো যে, রুশীরা আফগানিস্তান দখল করে ভারত-উপমাহাদেশে ঢুকে পড়বে। আর রুশীরা ভাবতো যে বৃটিশরা আফগানিস্তান দখল করে মধ্য-এশিয়ায় ঢুকে পড়বে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রুশিরা ইংরেজ, ফ্রান্স ও অটোমান সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়েছিলো। অনেকেরই ধারনা যে এই সময়ে দুই রুশ জেনারেল Duhamel এবং Khrulev বৃটিশ-ভারত দখলের পরিকল্পনা করেছিলেন। বিশ্ব-রাজনৈতিক ইতিহাসে এই রাজনীতির নাম ‘দি গ্রেইট গেম (The Great Game)’।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৭শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১০টা ০০মিনিট

Afghan War: My memories – 12
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.