আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৪

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৪
———————————————————- রমিত আজাদ

গত পর্বে ১৯৭৯ সালের ঘটনা প্রসঙ্গে লিখেছি। এবার সামান্য একটু পিছনে ফিরে যাই।
১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বাদশাহ মুহম্মদ জহির শাহ আফগানিস্তান শাসন করেন। তার চাচাতো ভাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহম্মদ দাউদ খান ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারপর তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকেন নি।

১৯৪৭ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক বৈশ্বিক ঘটনা। প্রবল প্রতাপশালী বৃটিশ সাম্রাজ্য তার গৌরব হারায় ও খন্ডবিখন্ড হয়ে পড়ে, ও একসময় সাম্রাজ্যটাই বিলীন হয়ে যায়। যার ফলে আফগানিস্তানের দোর গোড়ায় জন্ম নেয় একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান, আর স্বল্প দূরত্বেই আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত। বলা বাহুল্য যে, পাকিস্তান প্রায় তার জন্মলগ্ন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনুকূল্য পেতে থাকে। আর কিছুকাল পরে সহযোগীতা পায় আরেক পরাশক্তি চীনের কাছ থেকে। পরিবর্তিত এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, ১৯৪৭ সাল থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রচুর পরিমাণে অনুদান, অর্থনৈতিক সহায়তা, সামরিক সরঞ্জাম এবং সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করে আফগানিস্তান।

১৯৫৬ সাল থেকে রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে, নিয়মিতভাবে সোভিয়েত-আফগান সামরিক সহযোগিতা আরম্ভ হয় এবং ১৯৭০-এর দশকে দেশ দু’টির মধ্যে আরো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সামরিক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞদের প্রেরণ করে।

এদিকে সোভিয়েত পৃষ্ঠপোষকতায় আফগানিস্তানে মার্ক্সবাদী শক্তিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। আইডিওলজি মগজে ঢুকিয়ে দিতে না পারলে আনুগত্য পোক্ত হয়না, এই নীতি থেকেই সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার এটা করতে থাকে। ১৯৬৭ সালে মার্ক্সবাদী শক্তি পিডিপিএ ( পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ আফগানিস্তান) নূর মুহম্মদ তারাকী ও হাফিজুল্লাহ আমিনের নেতৃত্বাধীন খালক (জনতা) এবং বাবরাক কারমালের নেতৃত্বাধীন পারচাম (পতাকা) নামক দুইটি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বাদশাহ জহির শাহের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও নাজুক অর্থনৈতিক অবস্থা সৃষ্টির অভিযোগ উঠলে ১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই-এ ঘটনাটির সুযোগ নিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দাউদ খান একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। দাউদ খানের অভ্যুত্থানে আফগানিস্তানে এতকালের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। কোন না কোনভাবে দাউদ খানের শাসন আফগান জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, কিন্তু মার্ক্সবাদী শক্তি পিডিপিএ-এর সমর্থকদের নিকট দাউদের শাসন জনপ্রিয় ছিল না। না হওয়ারই কথা, কারণ তারা তখন ক্ষমতা দখলের পায়তারা চালাচ্ছিলো!

১৯৭৮ সালে ভারত রাজস্থানের মরুভূমিতে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার পর, পুরো উপমহাদেশেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করে আশেপাশের সবগুলো দেশ। আফগান রাষ্ট্রপতি মুহম্মদ দাউদ খান সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আফগান রাজনীতিতে পাকিস্তান ও ইরানের প্রভাব হ্রাস করবেন। এর আওতায় তিনি একটি সামরিকীকরণ প্রকল্প আরম্ভ করেন। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি চূড়ান্ত চুক্তি অনুযায়ী আফগান সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা দাবি করার অধিকার লাভ করে। তা করলেও দাউদ খান মূলত কম্যুনিস্ট ছিলেন না। তাই সোভিয়েত সরকারের দাউদ খানের প্রতি আস্থা ছিলো কম।

অন্যদিকে, সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার সমর্থ হয় আফগান সেনাবাহিনীর একাংশের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে। ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল পিডিপিএ-এর প্রতি অনুগত আফগান সেনাবাহিনীর সদস্যরা দাউদ খানের সরকারকে উৎখাত করে এবং দাউদ খান সপরিবারে নিহত হন। পিডিপিএ-এর মহাসচিব নূর মুহম্মদ তারাকী নবগঠিত আফগানিস্তান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবী পরিষদের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই শুরু হলো আফগানিস্তানে কম্যুনিস্টদের শাসনামল!

বাবরাক কারমাল ও মুহম্মদ নাজিবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ‘পারচাম’ উপদল আপাততঃ কোনঠাসা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে তারাকী সরকার কম্যুনিস্ট স্টাইলে ‘পারচাম’ উপদলের অনেককেই হত্যা করতে ও নির্বাসন দিতে শুরু করে।

আফগান কম্যুনিস্ট সরকার সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুকরণে একটি তথাকথিত আধুনিকায়ন ও সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেগুলোর বেশিরভাগই রক্ষণশীল আফগানরা ইসলামবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে একদিকে আফগান ইসলামপন্থীরা ও আরেকদিকে আফগান দেশপ্রেমিকরা (যারা তাবেদার সরকারকে মানতে পারছিলো না) কম্যুনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে নড়াচড়া করতে শুরু করে। ১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ শুরু হয়। পূর্ব আফগানিস্তানের নূরিস্তান প্রদেশে আফগান বিদ্রোহীরা স্থানীয় সেনানিবাস আক্রমণ করে এবং দ্রুতই সমগ্র দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই শুরু হয় কম্যুনিস্ট বনাম অকম্যুনিস্ট যুদ্ধ!

১৯৭৯ সালের হেরাতে একটি বিদ্রোহ দেখা দিলে আফগান রাষ্ট্রপ্রধান তারাকী সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং “সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রসহ বাস্তবিক ও কারিগরি সহায়তা” প্রার্থনা করেন। তবে আলেক্সেই কোসিগিন, তারাকীর প্রস্তাবের বিরোধী ছিলেন; কারণ এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে এমন আশঙ্কা তিনি করেছিলেন। আলেক্সেই কোসিগিনে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক সহায়তা লাভের জন্য তারাকীর সকল প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে বলেন “আমাদের বিশ্বাস, আফগানিস্তানে স্থলসৈন্য মোতায়েন করা হবে একটি মারাত্মক ভুল। যদি আমরা সৈন্য প্রেরণ করি, আপনাদের দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। বরং এর আরো অবনতি হবে। আমাদের সৈন্যদের কেবল বহি:শত্রুর সঙ্গেই নয়, আপনাদের নিজস্ব জনগণের একটি বড় অংশের সঙ্গেও লড়াই করতে হবে। আর জনগণ এ ধরনের ঘটনা কখনোই ক্ষমা করবে না”

প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের কাছ থেকে ঋণাত্মক উত্তর পেয়ে, জনাব তারাকী সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান ও কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব লিওনিদ ব্রেজনেভের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করেন। কিন্তু লিওনিদ ব্রেজনেভ তারাকীকে সতর্ক করে দেন এবং অনেকটা কোসিগিনের মত করেই বলেন যে, “আফগানিস্তানে প্রত্যক্ষ সোভিয়েত হস্তক্ষেপ কেবল আমাদের শত্রুদের জন্যই সহায়ক হবে – আপনাদের এবং আমাদের উভয়েরই”।

১৯৭৯ সালের মার্চে তারাকী কিউবার হাভানায় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের একটি সম্মেলনে যোগদান করেন। ফেরার পথে ২০ মার্চ তিনি মস্কোয় থামেন এবং ব্রেজনেভ, সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো ও অন্যান্য সোভিয়েত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে অবশেষে তারাকী কিছু সোভিয়েত সহায়তা আদায় করে নিতে সক্ষম হন। তারাকীর অনুরোধে সোভিয়েত-আফগান সীমান্তে সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই ডিভিশন সশস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করে, আফগানিস্তানে ৫০০ সামরিক ও বেসামরিক উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ প্রেরণ করে এবং প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ২৫% কম মূল্যে আফগানিস্তানের নিকট বিক্রি করা অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ করে।

১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উপ-প্রধানমন্ত্রী হাফিজুল্লাহ আমিন রাষ্ট্রপ্রধান তারাকীকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করেন এবং শাসনক্ষমতা দখল করেন। কট্টরপন্থী আমিন যেমন দলের অভ্যন্তরে তেমনি বাইরে বিদ্রোহীদের কঠোর হাতে দমনের চেষ্টা চালান, যার ফলে তার শাসনামলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য তীব্রতর হয়ে ওঠে।

এভাবে সোভিয়েতরা আফগানিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে কিছুতেই সন্তুষ্ট ছিল না। তারাকীর সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের পরেও সোভিয়েতরা তারাকীর শাসনামলে এবং আমিনের স্বল্পকালীন শাসনামলে আফগানিস্তানে সৈন্য মোতায়েন করতে অনাগ্রহী থাকে।

আফগান কম্যুনিস্ট সরকারের বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও সোভিয়েত নেতারা আফগানিস্তানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানান। উনাদের যুক্তি ছিল যে, প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ করলে তারা সমর্থন তো কিছু পাবেই না বরং, আফগান জনগণের শত্রুতাই কেবল অর্জন করবে এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা একটি প্রচারণামূলক বিজয় লাভ করবে। আফগানিস্তানের মত দেশে প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন মূলতঃ কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২৯শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৪৬মিনিট

Afghan War: My memories – 14
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.