আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৫

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৫
———————————————————- রমিত আজাদ

মার্কিন রাষ্ট্রদূতের হত্যাকাণ্ড:
একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আফগানিস্তানে বিরাজমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যে দেশটিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডলফ ডাবস একদল রহস্যময় জঙ্গির দ্বারা অপহৃত হন। এই জঙ্গিরা উগ্র ও কট্টরপন্থী কমিউনিস্ট দল “সেত্তাম-এ-মিল্লি” (“জাতীয় শোষণ”)-এর সদস্য ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৯৯০-এর দশকের প্রথমদিকে প্রকাশিত সোভিয়েত কেজিবির নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, আফগান সরকার আক্রমণটি অনুমোদন করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করার চেষ্টা করলেও, আলোচনার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডাবস গোলাগুলিতে নিহত হন। এই ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিকট এই আক্রমণটির ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে, এবং এইভাবে মার্কিন–সোভিয়েত সম্পর্কের অধিকতর অবনতি ঘটে।

১৯৭৯ সালের মার্চে রাষ্ট্রপ্রধান তারাকী এবং সোভিয়েত নেতাদের মধ্যে বৈঠককালে সোভিয়েতরা আফগান সরকারকে রাজনৈতিক সমর্থন প্রদান এবং সামরিক সরঞ্জাম ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু ১৯৭৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটলে সৈন্য প্রেরণের ব্যাপারে মস্কোর মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে। সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের মনোভাবের এরকম আকস্মিক পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ কি ছিলো, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে। তবে আফগানিস্তানের বিপজ্জনক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিদ্রোহ মোকাবেলায় আমিনের নেতৃত্বাধীন নতুন আফগান সরকারের ব্যর্থতা, ইরানি বিপ্লবের প্রভাবে আফগানিস্তান ও মুসলিম-অধ্যুষিত সোভিয়েত মধ্য এশীয় প্রজাতন্ত্রগুলোতে ইসলাম ধর্মীয় বিপ্লব বিস্তারের আশঙ্কা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্রমাবনতি প্রভৃতিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই বিষয়গুলো নিয়ে এখন আলোচনা করা যাক।

এখানে লক্ষ্য করার মত বিষয় হলো যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তান দুইটি দেশেই কম্যুনিস্ট-রা ক্ষমতায়। দুইটি দেশেই কোনরূপ গণতন্ত্র নাই। তার মানে জনগণের মতামতের ধার ধারেনা এই দুইটি সরকার। তাহলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কারা নেয়? নিঃসন্দেহে গুটিকতক ব্যাক্তি যারা জোরপূর্বক রাষ্ট্রের উপরমহলে বসে আছেন।

কম্যুনিস্ট গণহত্যা:
১৯৭৮ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অনেক গ্রাম্য মোল্লা ও গ্রামপ্রধানসহ প্রায় ২৭০০০ বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কুখ্যাত কম্যুনিস্ট গণহত্যার এই ভয়াবহতা দেখে আফগানিস্তানের অভিজাত শ্রেণির অনেক সদস্য, ধর্মীয় নেতা এবং বুদ্ধিজীবীগণ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। যা খোদ রাশিয়াসহ অন্যান্য কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রগুলোতেও অতীতে ঘটেছিলো।

১৯৭৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর হাফিজুল্লাহ আমিন ক্ষমতা দখল করেন। তাতে পরিস্থিতির আদৌ কোন উন্নতি হয় নাই। বরং নৈরাজ্য বৃদ্ধিই পায়। এদিকে আফগান মুজাহীদগণ তাদের বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে। মুজাহীদদের আক্রমণ যেমন হচ্ছিলো দেশের অভ্যন্তরে, তেমনি দেশের বাইরে থেকেও; মানে প্রতিবেশী পাকিস্তান, ইরান ও চীন থেকে।

আমীন ও মার্কিন ডিপ্লোম্যটদের বৈঠক:

আমিন যখন নেতা হন, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর আফগানিস্তানের নির্ভরতা কমাতে চেষ্টা করেন। এটি সম্পন্ন করার জন্য, তিনি পাকিস্তান এবং ইরানের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আফগানিস্তানের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্য রাখেন। আফগানিস্তানের অন্যতম প্রধান কমিউনিস্ট বিরোধী গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সাথে আমিন ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেছেন এমন খবর পেয়ে সোভিয়েত সরকার উদ্বিগ্ন হয়েছিল। তার সাধারণ অবিশ্বস্ততা এবং আফগানদের মধ্যে তার অজনপ্রিয়তা আমিনের জন্য নতুন “বিদেশী পৃষ্ঠপোষক” খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন করে তুলেছিল। আফগানিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত অ্যাডলফ ডাবস-এর মৃত্যুতে আমিনের জড়িত থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। তিনি যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন, তিনটি ভিন্ন আমেরিকান চার্জ ডি’অফায়ারের সাথে দেখা করেছিলেন । কিন্তু এর ফলে মার্কিন সরকারের চোখে আফগানিস্তানের অবস্থান উন্নত হয়নি। আমিনের সাথে তৃতীয় বৈঠকের পর, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত আফগানিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত জে ব্রুস আমস্টুটজ বিশ্বাস করেন যে “লো-প্রোফাইল মেইনটেইন করা, সমস্যাগুলি এড়ানোর চেষ্টা করা এবং কী হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা”-ই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমিন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ জিয়া-উল-হকের মধ্যে একটি যৌথ শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাব করে। পাকিস্তান সরকার, প্রস্তাবটির একটি পরিবর্তিত সংস্করণ গ্রহণ করে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগা শাহীকে আলোচনার জন্য কাবুলে পাঠাতে সম্মত হয়। ইতিমধ্যে, পাকিস্তানের প্রকাশ্য ও গুপ্ত বিভিন্ন বাহিনী, কমিউনিস্ট শাসনের বিরোধিতাকারী মুজাহিদিন যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যেতে থাকে।

হাফিজুল্লাহ আমিন-এর এই দ্বিমুখী নীতি ও মার্কিন কূটনৈতিকদের সাথে তার গোপন বৈঠক সোভিয়েত সরকারের মনে সন্দেহের উর্দ্রেক ঘটায়!

অবশেষে ১৯৭৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর সোভিয়েত পলিটব্যুরো আফগানিস্তান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এতকাল যাবৎ আফগানিস্তান আক্রমণের বিপক্ষে থেকেও সহসা কেন ও কি পরিস্থিতিতে এমন হঠকারী (উপরন্তু আত্মঘাতী) সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো পলিটব্যুরো এই বিষয়ে পরবর্তি পর্বে আলোচনা করবো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ৩০শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ২২মিনিট

Afghan War: My memories – 15
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.