আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৬

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৬
———————————————————- রমিত আজাদ

১৯৭৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর সোভিয়েত পলিটব্যুরো আফগানিস্তান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বিষয়টি নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার।

আমি ইতিপূর্বে একাধিকবার লিখেছি যে, যদিও আফগান কম্যুনিস্ট নেতৃবৃন্দ একাধিকবার আফগানিস্তান দেশে সোভিয়েত বাহিনীর সামরিক হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছিলো, কিন্তু সোভিয়েত নেতৃবৃন্দ নানাবিধ বিষয় বিবেচনা করে ঐরূপ আবেদনে সাড়া দেয়নি। কিন্তু ১৯৭৯ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরিস্থিতি এতটাই নাটকীয় মোড় নেয় যে শেষ পর্যন্ত মস্কো নেতৃবৃন্দ মত পাল্টায় ও আফগানিস্তান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এবার কয়েকটি প্রশ্ন। মস্কোতে কারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো? তারা কি এই বিষয়ে সোভিয়েত জনগণের মতামত বিবেচনায় এনেছিলো? এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সোভিয়েত জনগণের কি কোনরূপ অংশগ্রহণ ছিলো? সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে কি সোভিয়েত জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিলো? খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নে কি কোন মহলের এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান/প্রতিবাদ ইত্যাদি ছিলো?

আফগানিস্তানে কারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো? তারা কি এই বিষয়ে আফগান জনগণের মতামত বিবেচনায় এনেছিলো? এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে আফগান জনগণ কি অংশগ্রহণ করেছিলো? সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে কি আফগান জনগণের অংশগ্রহণ ছিলো? খোদ আফগানিস্তানে কি কোন মহলের এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান/প্রতিবাদ ইত্যাদি ছিলো?

প্রথমে মস্কো সংক্রান্ত প্রশ্ন গুলোর উত্তরে আসি। যে কোন শক্তিই অন্যান্য দেশে প্রচুর পরিমানে অদৃশ্য এজেন্ট ছড়িয়ে রাখে। এরা নানা জাতির, নানা ধর্মের ও নানা রূপের হয়। যেকোন অতি উন্নত রাষ্ট্রের সিক্রেট সংস্থা অত্যন্ত বুদ্ধিমান হয়। তারা এমন কাউকে এজেন্ট করবে না যে তাদেরকে দেখে যদু-মধুও চিনে ফেলবে! কাবুলে সোভিয়েতদের এমনসব হাই প্রোফাইল এজেন্ট ছিলো, যাদের মাঝে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও ছিলো। কাবুল থেকে কেজিবি এজেন্টদের মস্কোয় প্রেরিত তথ্য হাফিজুল্লাহ আমিনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ধারণা করা হয় যে, আমিনের দু’জন দেহরক্ষী বালিশ চাপা দিয়ে প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান তারাকীকে হত্যা করেছিল। কারো কারো মতে আমিন নিজেই একজন সিআইএ এজেন্ট ছিলেন; যদিও দ্বিতীয় বিষয়টি বিতর্কিত।

আমি গত পর্বে একটি ডকুমেন্টের ছবি শেয়ার করেছিলাম। যা ছিলো রুশ ভাষায় লেখা, এবং যার উপরে পাকা সীল দেয়া ছিলো ‘টপ সিক্রেট’। এটা সোভিয়েট পলিটব্যুরো-র মিটিং-এর রেজোলুশন ছিলো। যা ছিলো ১৯৭৯ সালের মার্চের ১৭ তারিখে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন Comrade L. I. BREZHNEV, Presiding
In attendance: Y.V. ANDROPOV, A.A. GROMYKO, A.N. KOSYGIN, A.Y. PELSHE, K.U. CHERNENKO, D.F.
USTINOV, P.N. DEMICHEV, B.N. PONOMAREV, M.S. SOLOMENTZEV, N. A.TIKHONOV, I.V.
KAPITONOV, V.I. DOLGIKH, M.V. ZIMYANIN, K.V. RUSAKOV, M.S. GORBACHEV।
লক্ষ্য করুন, প্রথম নামটি তদানিন্তন সোভিয়েত প্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভ-এর, এবং শেষ নামটি সর্বশেষ সোভিয়েত প্রধান মিখাইল গর্বাচভ-এর।

মাঝখানে আরো একটি নাম আছে D.F. USTINOV। উনার পুরো নাম Dmitriy Fyodorovich Ustinov, তিনি একজন মার্শাল ছিলেন। তিনি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। পাঠকদের অনুরোধ করবো, এই নামটি মনে রাখতে।

যাহোক, এই মিটিং-এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো যে,
BREZHNEV. It follows that the appropriate comrades should be authorized to carry them out
aggressively and if new questions arise in connection with Afghanistan, to submit them to the
Politburo.
ALL. Agreed.
BREZHNEV. Accordingly, we are adopting the decision:
To bring Comrade Taraki here tomorrow, March 20.
Discussions will be conducted by Comrades A. N. Kosygin, A. A. Gromyko, and D. F. Ustinov, and
then I will see him.
ALL. Very well.
With this the session was adjourned.

তারপর,
১৯৭৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর সোভিয়েট পলিটব্যুরো আরো একটি মিটিং-এ বসে। এবার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এবারের মিটিং-এ সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করবে’। তবে কথা আছে, কে কে উপস্থিত ছিলো এবারের মিটিং-এ? সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী Alexei Kosygin এই মিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন না। আমি ইতিপূর্বে লিখেছি যে, তিনি আফগানিস্তান আক্রমণের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। পূর্ণ পলিটব্যুরো-ও এই মিটিং-এ উপস্থিত ছিলো না। মাত্র শীর্ষ পাঁচজনই কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এই বিষয়ে Georgy Korniyenko, নামক একজন সোভিয়েত কূটনৈতিক বলেছিলেন যে, “As it happened, it was the initiative of a small and hawkish coterie of Soviet statesmen that had first gotten the ball rolling on a disastrous intervention, one that paved the way for the Union’s fall.” এই ভয়াবহ আত্মঘাতি সিদ্ধান্তই কম্যুনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিলো।

জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভ অনুসারে, সোভিয়েত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী দিমিত্রি উস্তিনভ ইতিমধ্যেই ১০ই ডিসেম্বর ১৯৭৯-তে “প্যারাট্রুপারদের একটি বিভাগ এবং সামরিক-পরিবহন বিমানের পাঁচটি বিভাগ মোতায়েনের প্রস্তুতি”-র আদেশ দিয়েছিলেন। উস্তিনভ “তুর্কিস্তান সামরিক জেলায় দুটি মোটর চালিত রাইফেল ডিভিশনের প্রস্তুতি বাড়ানোর এবং পন্টুন রেজিমেন্টের কর্মীদের বৃদ্ধি করে পূর্ণাঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।”

দেশের কমিউনিস্ট সরকারকে ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-কে অনিবার্যভাবে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা ১৯৭৯ সালের শেষ সপ্তাহেই শুরু হয়েছিল, যখন সোভিয়েত সেনারা মধ্য এশিয়ার আফগানিস্তান নামক দেশটি আক্রমণ করেছিল। যদিও দশ বছর পর ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সৈন্যরা আফগানিস্তান ত্যাগ করে, কিন্তু বিপূল ধ্বংসাত্মক এই যুদ্ধটি কেড়ে নেয় কয়েক হাজার সোভিয়েত সৈন্য এবং এক মিলিয়নেরও বেশি নিরপরাধ আফগান জনতার প্রাণ!

(চলবে)

রচনাতারিখ: ৩১শে আগস্ট, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৫৫মিনিট

Afghan War: My memories – 16
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.