আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৮

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৮
———————————————————- রমিত আজাদ

বিবেকবান ও দেশপ্রেমিক অনেক বুদ্ধিজীবি-ই সোভিয়েত ইউনিয়নের এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রতিবাদ করে রাজপথে নেমেছিলেন। তবে, কম্যুনিস্ট সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। এমন একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ‘আন্দ্রেই সাখারোভ (Andrei Dmitrievich Sakharov)।

আন্দ্রে দিমিত্রিভিচ শাখারভ (রুশ: Андре́й Дми́триевич Са́харов; জন্ম: ২১ মে, ১৯২১ – মৃত্যু: ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৮৯)। তিনি সোভিয়েত পরমাণু বিজ্ঞানী, ভিন্নামতাবলম্বী এবং মানবাধিকার কর্মী ছিলেন। উনাকে সোভিয়েত হাইড্রোজেন বোমা’র জনক হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত করা হয়।

শাখারভের রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে। এ সময় এন্টি-ব্যালেস্টিক মিসাইল সংক্রান্ত বিষয়ে সোভিয়েত-মার্কিন পারস্পরিক সম্পর্কে ব্যাপক প্রভাব বিস্তৃত হয়। ২১ জুলাই, ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের কাছে একটি গোপন বার্তা প্রেরণ করে তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘আমেরিকানদেরকে তাদের কথা রক্ষা করতে দাও’ এবং ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র বিস্তার রোধে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবকে মেনে নাও’ (“take the Americans at their word” and accept their proposal for a “bilateral rejection by the USA and the Soviet Union of the development of antiballistic missile defense”)। সোভিয়েত সরকার তার চিঠির বিষয়বস্তুকে কোনরূপ গুরুত্ব না দিয়ে তা নাকচ করে দেয়। সোভিয়েত সরকার এন্টি-ব্যালেস্টিক মিসাইল নিয়ে সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা কিংবা অন্য কোন প্রচারমাধ্যমে কোন কিছু আলোচনা করতে নিষেধ করে।

এরপর তিনি দেশী-বিদেশী পত্রিকায় কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। “Reflections on Progress, Peaceful Coexistence, and Intellectual Freedom”। এতে তিনি এন্টি-ব্যালেস্টিক মিসাইল ডিফেন্সকে বিশ্বের পরমাণু যুদ্ধের প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি পরমাণুর শক্তিকে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের ও পরমাণু অস্ত্রের যত্র-তত্র বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পরীক্ষণের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এই সকল কারণে, শাখারভকে সকল ধরনের সমর-সংক্রান্ত গবেষণা কর্ম থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। বিশ্বখ্যাত এই বিজ্ঞানীর ‘এ্যাকাডেমিশিয়ান’ উপাধীটিও কেড়ে নিতে চেয়েছিলো কম্যুনিস্ট সরকার। তবে বিজ্ঞানীদের সভায় গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে, কম্যুনিস্ট রাজনীতিবিদরা আর এটাকে বাস্তবায়িত করতে পারেনি।

১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত প্রচার ও গণমাধ্যমগুলো বিজ্ঞানী আন্দ্রেই শাখারভ এবং লেখক আলেকজাণ্ডার সোলঝেনিতসিনের কর্মকাণ্ডের দিকে তীক্ষ্ণ নজরদারী শুরু করে। শাখারভ, সোলঝেনিতসিনকে সাথে নিয়ে রাশিয়ান দাসোবৃত্তিতে প্রত্যার্পণ করা থেকে বিরত থাকেন। ঐ সময়ে হাতে গোনা যে কয়েকজন ব্যক্তি কম্যুনিস্ট সরকারের কোনরূপ শাস্তিকে ভয় পেতেন না সাখারোভ ছিলেন তাদের অন্যতম।

১৯৭৩ সালে আন্দ্রে শাখারভ প্রথমবারের মতো নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। অতঃপর তিনি ১৯৭৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগে সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা ছিল উনার। সেজন্য উনার স্ত্রী নরওয়ের অসলোতে সাখারোভের স্ব-লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। নরওয়ের নোবেল কমিটি শাখারভকে মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও অগ্রদূত হিসেবে বর্ণনা করেন।

আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন ঘটে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে। এর প্রেক্ষিতে শাখারভ ২২ জানুয়ারী, ১৯৮০ সালে জনসমক্ষে এ ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেন। ফলে উনাকেগোর্কি শহরে (নিঝনি নোভগোরোড) গৃহবন্দী করে রাখা হয়। ঐ সময় শহরটিতে বিদেশীদের জন্য নিষিদ্ধ ছিলো।

তিনজন রুশ বিজ্ঞানী – শাখারভ, অরলভ ও স্কারানস্কিকে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কম্যুনিস্ট সরকার তাদেরকে জেলে বন্দী করে রাখে। তাদেরকে সমর্থন করে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা একটি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল ‘সাইন্টিস্ট্‌স ফর শাখারভ, অরলভ অ্যান্ড স্কারানস্কি’। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন ওয়েন চেম্বারলেইন।

সাখারোভ-ই প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নে স্বাধীন ও বৈধ রাজনৈতিক সংগঠন তৈরীতে সাহায্য করেন। এছাড়াও, সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের বিরোধী পক্ষ হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে তিনি অল-ইউনিয়ন কংগ্রেস অব পিপিল’স ডেপুটিস দলের পক্ষ থেকে নতুন পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইন্টার-রিজিওনাল ডেপুটিস গ্রুপের সহ-নেতৃত্বে ছিলেন।

১৯৮৯ সালে তিনি সোভিয়েত পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত-এর আফগানিস্তান আক্রমণের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তদানিন্তন সোভিয়েত প্রধান মিখাইল গর্বাচভ তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাখারোভ বলেন, “আমি আমাদের আর্মীর বিরুদ্ধে কিছু বলছি না, তারা তো আদেশ পালনে বাধ্য। আমি দায়ী করছি সেই ভয়াবহ আদেশটিকে, যেই আদেশের বলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিলো।

সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার কোনরূপ বিরোধীতা, সমালোচনা, ভিন্নমত-কে সহ্যই করতে পারতো না। যেকোন বিরোধী মতকে তারা কঠোর হস্তে দমন করতো। তারপরেও আফগান যুদ্ধের বিরোধীতা করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পনেরোটিরও বেশি বড় আকারের বিক্ষোভ হয়েছিলো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ২৫মিনিট

Afghan War: My memories – 18

—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.