আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৯

আফগান যুদ্ধ: দূর থেকে দেখা, শোনা ও কিছু স্মৃতি – ১৯
———————————————————- রমিত আজাদ

পর্ব ১৭-তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত কম্যুনিস্ট সরকার সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলাম।
এই পর্বে আফগানিস্তান ও আফগান কম্যুনিস্ট সরকার সংক্রান্ত কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবো।

প্রশ্ন ৬. আফগানিস্তানে কারা এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো?
উত্তর: তথাকথিত বিপ্লব-এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে কম্যুনিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। যা মূলত ছিলো একটি অভ্যুত্থান। এবং এরপর তারা তাই করতে শুরু করলো, যা পৃথিবীর সব দেশেই ক্ষমতায় আসার পর কম্যুনিস্টরা করেছিলো। গণহত্যা এবং ‘নো ইলেকশন’! কম্যুনিস্টরা ‘নির্বাচন শব্দটিকে যমের মত ভয় পায়। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, গণভোট বা নির্বাচন হলে তারা জিতবে না, কারণ তাদের কোন জনসমর্থন নাই। তাই তারা জোরপূর্বকই ক্ষমতা ধরে রাখে, এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চালায় যে, তারা জনতার সরকার এবং জনতার সমর্থন ও সম্মতিতেই তারা সব কিছু করছে। আফগানিস্তানে কম্যুনিস্ট সরকার নিজ অস্ত্র বা বাহুবলের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারছিলো না। কারণ সারা দেশে অসন্তোষ শুরু হয়েছিলো, ও সাহসী আফগান জনগণ কম্যুনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলো। তাই কাপুরুষ কম্যুনিস্টরা তাদের বাহুবলের জোর বৃদ্ধির লক্ষ্যে ও নিজেদের সিংহাসন টিকিয়ে থাকার লক্ষ্যে ‘বিদেশী প্রভুদের’-কে নিজ মাতৃভূমি আক্রমণের আহবান জানায়।

প্রশ্ন ৭. তারা কি এই বিষয়ে আফগান জনগণের মতামত বিবেচনায় এনেছিলো?
উত্তর: কখনো-ই নয়। এটা কম্যুনিস্টদের ধর্ম নয়। দেশের জনগণ তাদের কাছে প্রজার মত। প্রজার মত কি আর রাজায় নেয়?

৮. এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে আফগান জনগণ কি অংশগ্রহণ করেছিলো?
উত্তর: প্রশ্নই ওঠেনা। একটি কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রে এমন হয়না! এখানে গুটিকতক মানুষের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুপ্রীম অথোরিটি-ই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। যার আরেক নাম পলিটবুরো।

৯. সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে কি আফগান জনগণের অংশগ্রহণ ছিলো?
উত্তর: সরকারপক্ষে প্রায় ছিলো না। তবে এন্টি-সরকার পক্ষে জন গণের প্রায় পুরোটাই অংশ নিয়েছিলো।

১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে আফগানিস্তান ক্রমশঃ বহির্বিশ্বের প্রভাবের কবলে পড়ে। নগর ও শহরের মানুষরা পপ সঙ্গীত শুনত এবং রোমান্টিক ভারতীয় সিনেমা দেখত। ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মহিলারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করে এবং পশ্চিমা পোশাক-আশাক পড়তে শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামরিক একাডেমির ছাত্ররা ফার্সি অনুবাদে মার্কসবাদী সাহিত্য পড়তে শুরু করে, যেহেতু সোভিয়েত, চীনা এবং আমেরিকান দূতাবাস সকলেই নিয়মিত প্রোপাগান্ডামূলক সাহিত্য বিতরণ করেছিলো।
উচ্চশিক্ষা, মন্ত্রণালয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশী শিক্ষক এবং উপদেষ্টাদের ব্যাপক উপস্থিতি আফগানিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় বহির্বিশ্বের প্রভাবকে তীব্রতর করেছে।

বাদশাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এবং 1973 সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর, দাউদ উপজাতীয় এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব কমাতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু, এটি কমিউনিস্টদের কাছে তাকে জনপ্রিয় করে তোলেনি। কমিউনিস্টরা ভূমি সংস্কারের ধীরগতিতে হতাশ ছিল। অবশেষে, ১৯৭৮ সালে তথাকথিত এপ্রিল বিপ্লবে, দাউদ নিহত হন এবং কমিউনিস্টরা দেশের ক্ষমতা দখল করে।

নিষ্ঠুর এবং ফালতু কৃষি সংস্কার:
বহু শতাব্দী ধরে, আফগান কৃষি ও চাষাবাদ চুক্তিভিত্তিক কৃষক, দিনমজুর এবং জমি এবং এস্টেট মালিকদের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জটিল ঐতিহ্যবাহী নিয়ম অনুযায়ী সংগঠিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই, কমিউনিস্টরা বেশ কিছু কৃষি সংস্কারের সূচনা করে যা একটি অদ্ভুত এবং বিশৃঙ্খল পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তারা গ্রামাঞ্চলে জটিল সামাজিক কাঠামোকে বিপর্যস্ত করেছিল এবং কমিউনিস্টরা সাধারণ মানুষের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ছিল। কমিউনিস্টরা সাধারণ মানুষকে নিকৃষ্ট এবং অজ্ঞ মনে করত। ফলস্বরূপ, স্থানীয় দলগুলি শীঘ্রই সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।

১০. খোদ আফগানিস্তানে কি কোন মহলের এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান/প্রতিবাদ ইত্যাদি ছিলো?
উত্তর: খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই কমিউনিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ শুরু হয়।

পবিত্র যোদ্ধা – মুজাহিদীন:
অল্প সময়ের মধ্যে, সোভিয়েত বাহিনী এবং জাতীয় আফগান সেনাবাহিনী বৃহত্তর আফগান শহর এবং শহরগুলির উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে, যখন দেশের বাকি অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিদ্রোহগুলি ধীরে ধীরে ব্যাপক প্রতিরোধে পরিণত হয়। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে ইরান ও পাকিস্তানে ৭৫ টি ইসলামিক রাজনৈতিক প্রতিরোধ দল গড়ে তোলে। সুন্নি মুসলমান যোদ্ধাদের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন ছিল, যখন শিয়া মুসলমানরা মূলত ইরান থেকে তাদের প্রতিরোধ সংগঠিত করেছিল। পাকিস্তান এবং ইরান উভয়েই কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ইসলামী দলগুলিকে সমর্থন করেছিল, তাই অবশেষে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল সাতটি সুন্নি মুসলিম এবং তিনটি শিয়া মুসলিম দলের দ্বারা। ইসলামী দলগুলো এই প্রতিরোধকে একটি পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেছিলো – জিহাদ। তাই প্রতিরোধ যোদ্ধারা বিবেচিত ছিলেন ‘পবিত্র যোদ্ধা’- মুজাহিদিন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার মুসলিম প্রজাতন্ত্রের সীমান্তে একটি ইসলামী শাসনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, এবং তাই সোভিয়েত সৈন্যদের আফগানিস্তানে পাঠানো হয়েছিল “ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহায়তা” হিসেবে কাবুলে কমিউনিস্ট শাসনকে বাঁচাতে। এর সাথে মস্কো আশা করেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিবেশী দেশে আরেকটি উত্থিত ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

যাইহোক, ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ-কে আফগান জনগণ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেছিলো এবং যার ফল ছিলো এক দশক ব্যাপি যুদ্ধ এবং পুরো দেশের জনগণের জন্য অবিশ্বাস্য এক যন্ত্রণা।

এই যুদ্ধে প্রায় এক মিলিয়ন আফগান প্রাণ নিহত হয়, উপরন্তু তিন থেকে পাঁচ মিলিয়ন আফগান নারী-পুরুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যায়। আনুমানিক ১৪০০০ সোভিয়েত সৈন্যও তাদের জীবন হারিয়েছে। সরাসরি প্রাণগত ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধ রেখে যায় লক্ষ লক্ষ স্থল মাইন, ভূগর্ভস্থ সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক ধ্বংস এবং একটি অতীব জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি যার মধ্যে নিহিত ছিলো আরেকটি অনিবার্য গৃহযুদ্ধ।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১১টা ৪৮মিনিট

Afghan War: My memories – 19
—————————- Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.